পার্টি করলেই বাইকের-গাড়ির স্পিড বেড়ে যায়

খবরের কাগজে সম্প্রতি একটা ছবি দেখলাম। খুলে দেওয়া হয়েছে গার্ডেনরিচ উড়ালপুল। আর তা উদ্বোধনের একটু পরেই উড়ালপুলের উপর দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে ছুটে আসছে দুটো মোটরবাইক। প্রথম বাইকে বসে তিনজন। পিছনের দুজনের হাতে ধরা পতাকায় ফুল উড়ছে হাওয়ায়। দুটো বাইকের সওয়ারীদের কারও মাথাতেই হেলমেট নেই। স্টিল ছবি দেখে তো গতিবেগ বোঝার উপায় থাকে না। তবে রাতের অন্ধকার, বৌনি হওয়া শুনশান উড়ালপুল, ধ্বজা ওড়ানো অভ্রভেদী রথ আর হেলমেটহীন সওয়ারির বডি ল্যাঙ্গোয়েজ, চালচলন দেখে এটা আন্দাজ করা কঠিন নয় যে বাইকের গতিবেগ ছিল ভালই। যাকে বলে, হুশ করে বেরিয়ে যাওয়া। হতেই হবে। কারণ, উপরের প্রতিটা শর্তই আসলে এক অন্যের পরিপূরক।

এটুকু পড়ে মনে হতেই পারে, এ আর নতুন কথা কি! তবে এটা যত বেশি করে মনে হবে, তত মঙ্গল। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাঁরা দু’কথা শোনার পরেই বলেন, বলে থাকেন, ‘চৌত্রিশ বছরে কি এগুলো হয়নি? তখন তো কিছু বলতে শুনিনি।’ প্রশ্নটা সেটা নয়। প্রশ্নটা হল, ঢাকঢোল পিটিয়ে আইন তৈরির পর সেটা বাস্তবায়িত করতে সদিচ্ছা কতটা আছে তা দেখা। সেই দেখার চোখে যদি গান্ধারীর আবরণ থাকে, তা ভুল। আগেও, পরেও।

পথ নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ে দু’দিন পর পরই নতুন আইনের কথা শুনি। ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’ এখন তো প্রায় প্রবাদবাক্য। রাজপথের যেখানেই তাকাই, সেখানেই জ্বলজ্বল করে এই চারটে শব্দ। এ ছাড়াও প্রতিটা বাস, প্রতিটা হলুদ ট্যাক্সির চামড়ায় উল্কির মতো লেখা ‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইভ’। হয়ত বাধ্য হয়েই। দুটো বাস রেষারেষি করে যখন, একই সঙ্গে এই চারটে শব্দও করে! বাইক নিয়ে মাসকয়েক আগেই যখন দুর্ঘটনা ঘটছিল পরপর, তখন নিয়ম করা হয়েছিল দিনের বেলাতেও বাইকের হেডলাইট জ্বালাতে হবে। বাইক তো এমনিতেই চঞ্চলা। আর বাইক যখন বাইকবাহিনী হয়, তখন চাঞ্চল্য আরও বাড়ে বৈকি। দাপটের। হেডলাইট জ্বালানোর অর্থ উল্টোদিক থেকে আসা গাড়িগুলোকে আরও সাবধান করে দেওয়া। তফাৎ যাও! খবরের চ্যানেলে, কাগজে এটা ‘খবর’ হয়ে বেরনোর পর দু’তিন দিন দিনের বেলা এমনটা হতে দেখেছিলাম। তাও শতকরা দশ শতাংশের বেশি বাইকে নয়। সেই লিখন ধূলায় হয়েছে ধূলি অনেক দিন আগেই। কোথায় গেল ‘নো হেলমেট, নো পেট্রোল’? তেলের পাম্পগুলো তো ব্যবসা করতেই রাস্তায় নেমেছে। বাসের গায়ের ‘মালের দায়িত্ব আরোহীর’ মতোই তেল ভরার স্টেশনগুলোও ভিতরে ভিতরে জানে, মাথার দায়িত্ব আসলে আরোহীরই। ফলে তারা মন দিয়ে ব্যবসাটা করে। তেল নিয়ে বিল মেটানোর পরে কেউ যদি রাস্তার ডিভাইডারে, হাসপাতালে কিলবিল করে, তা দেখার দায়িত্ব তো তাদের নয়।

কাজের সূত্রে মধ্য কলকাতায় যেতে হয় প্রতিদিন। বাসে করে যাই। জানলার ধারে বসে মাঝে মধ্যেই দেখি, প্রবল গতিতে পাশ দিয়ে প্রায় উড়ে গেল একটা বাইক। এই আছে, এই নেই। হেলমেটের প্রশ্নই ওঠে না। বাইকের এমন যাওয়াটা অনেকটা ‘কোথা যে উধাও হল’ ধরনের। যখন সাহসে কুলায়, স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশকে জিজ্ঞেস করি, ‘কিছু বললেন না স্যার?’ বেশিরভাগ পুলিশই এমন উটকো প্রশ্নকে পাত্তা দেন না। সানগ্লাসের ভিতর দিয়ে হয়তো আমার দিকেই রক্তচক্ষু থাকে, বুঝতে পারি না। তবে এক জন ট্রাফিক পুলিশকে বলতে শুনেছিলাম, ‘কী করব দাদা? পাড়ার ছেলে। পার্টি করে।’ একটু দীর্ঘশ্বাস। তারপরে বলেছিলেন, ‘এখন যা দেখছি, তাতে পার্টি করলেই বাইকের-গাড়ির স্পিড বেড়ে যায়। তা সে ফুলপার্টি হোক বা ডিজে পার্টি!’

অটোতে নাকি পাঁচজন ওঠানো বারণ। আইনবিরোধী। চালকের ডানদিকে লোক বসানোর ব্যাপারটা নৈব নৈব চ। তবে মুশকিলটা হল, ও যে মানে না মানা। শহরের যে সমস্ত জায়গায়, রাস্তার মোড়ে এই নিয়ে খানিকটা হলেও কড়াকড়ি আছে, সেখানে অফিসিয়ালি কারেক্ট থাকার জন্য অটোচালকরা এক আশ্চর্য উপায় আবিষ্কার করে ফেলেছেন। ‘কড়া’ রাস্তার ‘মামা’ময় মোড় কিংবা রাস্তার যেখানে পুলিশ কিয়স্ক আছে, সেখান থেকে কুড়ি-পঁচিশ মিটার দূরে নেমে যেতে বলা হয় অটোর হতভাগ্য পঞ্চম আরোহীকে। রইল বাকি চার। অটো কিয়স্ক পেরোয়। একটু এগিয়ে ফের টুক করে তুলে নেওয়া হয় ফেলে আসা লোকটিকে। ওই পঞ্চম যেন পালাতে না পারেন, তার জন্য কয়েকটা অটোকে হাফ ভাড়াও আগেও নিয়ে নিতে দেখেছি। এমন কিছু অটোও চোখে পড়েছে যেখানে চালকের বাঁদিকে দুজন, ডানদিকে একজন। সেই আদিযুগ থেকেই আইন আইনের পথে চলে, অটো অটোর।

কোনও কোনও অটোতে ফুল ভলিউমে গান বাজে। যেহেতু অটোর স্পিকারগুলো থাকে পিছনের দিকে, ফলে পিছনের সারিতে বসা যাত্রীদের এই নিয়ে চূড়ান্ত দুর্ভোগ পোয়াতে হয়। না শোনার অধিকার বলেও তো একটা বিষয় হয়। জানি, অটোয় গান বাজানো আইনবিরুদ্ধ। অথচ অসুবিধা হলেও এই নিয়ে কখনও কিছু বলার উপায় নেই। সত্যি কথা বলতে কি, অধিকাংশ মানুষই অটোতে চড়েন ভয়ে ভয়ে। গত বছরে খুচরো না দেওয়ার জন্য মার খেয়েছেন। এখন অনেককে মার খেতে হয় খুচরো পয়সায় ভাড়া মেটালে। চেনা চৌহদ্দির মধ্যে দেখেছি, নাগেরবাজার-দমদম রুটের বহু অটো প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দেয় স্টেশনের অনেক আগে, যেন টুক করে ইউটার্ন নিয়ে আবার উল্টোদিকের যাত্রী তোলা যায়। শোভাবাজার-উল্টোডাঙা রুটের অটোর ভাড়া অনেকটা শেয়ার বাজারের মতো। আট টাকা থেকে পনেরো টাকা, যে যা খুশি হাঁকতে পারে। নিজের চোখে দেখেছি, এক সহযাত্রী এই নিয়ে প্রশ্ন করায় তাঁকে চার অক্ষরের চাবুক মেরে মাঝরাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। উল্টোডাঙা স্টেশন থেকে বইমেলা প্রথম দিন গিয়েছিলাম দশ টাকায়। পরের দিন একই রাস্তার জন্য কুড়ি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছিল। ‘বইয়ের জন্য হাঁটুন’ জানতাম, তবে ‘বইয়ের জন্য ঠকুন’ ওই প্রথম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কোনও নিয়ম নেই?’ কালা চশমার ডিজে মিক্সের তালে তালে গাড়ি কাঁপাতে কাঁপাতে মাশরুমছাঁট, ট্যাটুশোভিত অটোচালক গুটখার পিক ফেলে বলেছিল, ‘এটাই নিয়ম, ডাডা।’ মনে পড়ছে, ট্যাটুতে ছিল দুটো ফুল।

গত নির্বাচনের আগে সারা শহর-মফস্বল জুড়ে রাতারাতি গজিয়ে উঠেছিল অগুণতি বাসস্ট্যান্ড। কার অনুপ্রেরণায়, কার উদ্যোগে আর কার আহ্বানে প্রতিটা বাসস্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়, সেটাই ছিল মুখ্য। রাশি রাশি হাসি মাখা ছবির আড়ালে বাস স্টপেজের নামই ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। সেই বাসস্ট্যান্ড এখন কল্লোলিনী শহরের কল্লোলের জায়গা। আড্ডাঠেক। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠেকের চরিত্রও বদলায়। আমরা ঠেকেও শিখি না। আমাদের এ শহরে বাস আর কোন কালে স্টপেজে দাঁড়ায়? অথচ দেশের অন্যান্য মেট্রো শহরে দেখেছি, বাসে ওঠা এবং নামার ক্ষেত্রে ভয়ঙ্করভাবে নিয়ম মেনে চলা হয়। হাত দেখালেই বাসস্ট্যান্ড—এ সংস্কৃতি সেখানে এখনও গড়ে ওঠেনি। ভাগ্যিস।

বছরখানেক আগের কথা। মধ্যরাতে টলিপাড়ার এক নায়কের বেসামাল গাড়ি চালানোয় প্রাণ যায় তাঁর পাশে বসা বান্ধবীর। কয়েকদিন এ নিয়ে তোলপাড় হয় খুব। শোনা গিয়েছিল, নতুন নিয়ম হচ্ছে জলদি। শহরের পানশালাগুলোকে বলা হয়েছিল, তাঁদের রেস্তোরাঁয় বসে যাঁরা পেগের পর পেগ অর্ডার করবেন, তাঁদের রাস্তায় ‘ছাড়া’র আগে রেস্তোরাঁ-পানশালা কর্তৃপক্ষকেই ব্রেথ অ্যানালাইজার দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে দেখে নিতে হবে, সেই সুরারসিক আদৌ গাড়ি চালিয়ে বাড়ি যাওয়ার উপযুক্ত আছেন কি না। না হলে রেস্তোরাঁকেই অ্যাপ ক্যাব বুক করে তাঁকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সেই নিয়ম বলবৎ হয়েছে কি না ব্রহ্মা জানেন। বলা হয়েছিল, বেসামাল গাড়ি চালানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় নিতে হবে পানশালাকেও, যেখানে সুরায় মজেছিলেন অভিযুক্ত। গত এক বছরে একটিও রেস্তোরাঁ-পানশালার বিরুদ্ধে এমন কোনও খবর কানে আসেনি। অথচ দেখুন, মধ্যরাতে ফুটপাত বদলের ঘটনা কিন্তু কমেনি।

হেলমেট না পরলে নাকি কড়া জরিমানা। ‘কড়া’-র অর্থ অবশ্য যে সার্জেন্ট যতটুকু প্রসাদে খুশি। বেশিরভাগ সময়েই এইসব হেলমেট টেলমেট দেখার কোনও লোক থাকেনা। উল্কাবেগে চলে যে বাইক, তা ধরারও লাগাম কই? উল্কার মতো কেউ ঝরে পড়লে অবশ্য খবরের কাগজে স্ট্যাম্প সাইজ বরাদ্দ হয়। তারপর আবার যে কে সেই। শহরের যে কোনও অনুপ্রেরণা মোড়া বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে মিনিট পাঁচেক বসুন। সামনে তাকান। রাস্তাঘাটের নিরাপত্তার আরও যা যা দেখবেন, তার সিকিভাগও হয়তো এই লেখাতে বলা হয়ে উঠল না।

অথচ শ্রাবণের ধারার মতো তৈরি হচ্ছে পথ নিরাপত্তা নিয়ে একটার পর একটা আইন। প্রশাসক চশমাটা নাকের উপরে তুলে বলবেন, আইন তো করে দিয়েছি, মানবে আম-আদমি। বিচারক কপাল কুঁচকোবেন। বলবেন, আইন না জানাটা পার পাওয়ার রাস্তা হতে পারে না। আর কয়েক লক্ষ মানুষ বাইকে স্টার্ট দেবেন। কলার তুলে, প্রতিদিন। বাস অটোরও অ্যাক্সিলারেটরে দ্রামা দ্রিম দ্রিম।

আইন! অট্টহাস্যে সকল বিঘ্ন-বাধার বক্ষ চেরে।

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.