জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবার কুশারীদের সেই ধারা‚ যার সঙ্গে মিশ্রণ ঘটেছিল পিরালি ব্রাহ্মণদের

একটি অবগাহন ও তেঁতুলতলা থেকে রবীন্দ্রনাথ ( দ্বিতীয় পর্ব )

( প্রথম পর্বের পরে…)

বার যাচ্ছি এই পিরালি ব্রাহ্মণদের প্রসারিত শাখা-প্রশাখার আর এক পর্বে | এই পর্বে দেখা যাবে কীভাবে পিরালি ব্রাহ্মণদের একটি শাখার সঙ্গে মিশে গেল কুলীন কুশারী ব্রাহ্মণদের একটি ধারা | তৈরি হল তেত্তিরিশ পুরুষ ধরে রবীন্দ্রনাথের ‘gene ‘ বা বংশাণু |

এই পর্বের শুরু বর্ধমানের কুশ গ্রামে | সেখানে থাকেন দীন নামের এক ব্রাহ্মণ | কুশ গ্রামের ব্রাহ্মণ বলে তিনি পরিচিত কুশারী ব্রাহ্মণ নামে | কুলীন ব্রাহ্মণ হিসেবে কুশারীদের বিশেষ খ্যাতি ছিল‚ যতক্ষণ না তাদের সঙ্গে মিশ্রণ ঘটল পিরালি ব্রাহ্মণদের |

কুশারীরা ছড়িয়ে পড়ল বঙ্গদেশের সর্বত্র — যশোরের ঘাটভোগ – দমুরহুদা থেকে ঢাকার কয়কীর্তন থেকে বাঁকুড়ার সোনামুখি থেকে খুলনার পিঠাভোগ | পিঠাভোগের কুশারীরাই হয়ে উঠল সবচেয়ে প্রভাবশালী ও অবস্থাপন্ন |

এবার আসি আসল কথায় — জোড়াসাঁকোর ঠাকুরপরিবার পিঠাভোগের কুশারীদের সেই ধারা‚ যে-ধারার সঙ্গে মিশ্রণ ঘটেছিল ব্রাত্য‚ সমাজচ্যুত পিরালি ব্রাহ্মণদের |

পিঠাভোগের আদিপুরুষ ভট্টনারায়ণ | এই বংশেরই তেত্তিরিশতম পুরুষটি জন্মালেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ১৮৬১ সালে | তিনি রবীন্দ্রনাথ | ভট্টনারায়ণ থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সরলরেখাটি এইরকম—-

১ ভট্টনারায়ণ

২ আদিবরাহ

৩ বৈনতেয়

৪ সুবুদ্ধি

৫ বিবুধেশ

৬ গাঁউ

৭ গঙ্গাধর

৮ পশুপতি

৯ বিঠোক

১০ ধরণীধর

১১ তারাপতি

১২ গঙ্গারাম

১৩ ঊষাপতি

১৪ সুরেন্দ্র

১৫ রামরূপ

১৬ হলায়ুধ

১৭ ধর

১৮ কুমার

১৯ বিষ্ণু

২০ হরমুখ ( ডাক নাম হাড়ো )

২১ গোবর্ধন

২২ মহাদেব

* ২৩ জগন্নাথ

২৪ পুরুষোত্তম

২৫ বলরাম

২৬ হরিহর

২৭ পঞ্চানন

২৮ জয়রাম

২৯ নীলমণি

৩০ রামমণি

৩১ দ্বারকানাথ

৩২ দেবেন্দ্রনাথ

৩৩ রবীন্দ্রনাথ

* তেইশতম পুরুষ জগন্নাথ থেকে এই বংশ মুসলমান-স্পৃষ্ট পিরালি ! কীভাবে‚ সেই কাহিনিই ঠাকুরবাড়ির আদিকথা |

ভৈরব নদীর কেয়াতলার ঘাট | এই ঘাটেই দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণাকালীর মন্দির | এক প্রবল ঝড় জলের রাত | সেই দুর্যোগের রাত্তিরে কেয়াতলার ঘাটে বাধ্য হলেন বজরা ভিড়াতে কুলীন ব্রাহ্মণ জগন্নাথ কুশারী |

জগন্নাথের অসহায়তার সুযোগ গ্রহণ করল দক্ষিণানাথের সমাজচ্যুত ছেলে শুকদেব | জগন্নাথকে বলল‚ এই মন্দিরে আশ্রয় গ্রহণ করতে হলে আমার মেয়ে সুন্দরীকে বিয়ে করতেই হবে | জগন্নাথ বিয়ে করতে বাধ্য হলেন সেই দুর্যোগের রাতে | ঠিক এমনই জোর করেই বোন রত্নমালার সঙ্গে কুলীন ব্রাহ্মণ মঙ্গলানন্দের বিয়ে দিয়েছিল শুকদেব | মঙ্গলানন্দের মতো জগন্নাথও সমাজচ্যুত ! কুলীন থেকে হয়ে গেলেন ‘পিরালি’ ব্রাহ্মণ | বাড়িও ফিরতে পারলেন না | বসবাস শুরু করলেন যৌতুক হিসেবে পাওয়া খুলনা জেলার বারোপাড়া নরেন্দ্রপুর গ্রামের উত্তরে উত্তরপাড়া গ্রামে |

জগন্নাথের জীবনকাল ষোল শতকের গোড়ার দিকে | ইনিই ঠাকুরবাড়ির প্রথম ঘরজামাই | রবীন্দ্রনাথ এই ঘরজামাই প্রথার সঙ্গে বেশ অভ্যস্ত ছিলেন | তা-ই হয়ত তাঁর ‘চিরকুমার সভা’ নাটকে অক্ষয় এমন উজ্জ্বল আমুদে ঘরজামাই !

জগন্নাথকে ঘরজামাই করে বেশ আদর-যত্নেই রেখেছিল শুকদেব | জগন্নাথ-সুন্দরীর দ্বিতীয় পুত্র পুরুষোত্তম | তিনি রবীন্দ্রনাথের ঊর্ধ্বতম দ্বাদশ পুরুষ | তাঁর জীবনকাল ষোল শতকের মাঝামাঝি |

রবীন্দ্রনাথের সাত পুরুষ আগে পঞ্চানন উত্তরপাড়া ছেড়ে পাকাপাকিভাবে চলে এলেন কলকাতায় | চলে আসেন মূলত অর্থের সন্ধানে | পর্তুগিজ-ওলন্দাজ প্রভৃতি বিদেশি বণিকদের আগমনে তখন রমরম করছে কলকাতা | এছাড়া সেখানে শেঠ-বসাকদের সুতাবস্ত্রের হাট | সে কারণেই জায়গাটার নাম ‘সুতানুটি’ |

কলকাতা গ্রামের দক্ষিণে আদি গঙ্গার ধারে গোবিন্দপুর | জেলে মালো কৈবর্তদের বাস সেখানে | পঞ্চানন কুশারী বাসা বাঁধলেন এদের মধ্যে | তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য‚ যে সব বিদেশি জাহাজ আসে গোবিন্দপুরে‚ তাদের কিছু কিছু মাল সরবরাহ করে সাহেবদের সঙ্গে ব্যবসা করা | পঞ্চানন ব্যবসা জমিয়ে ফেললেন | গোবিন্দপুরের গঙ্গার ধারে জমি কিনে বাড়িও করলেন | এবং প্রতিষ্ঠা করলেন শিবমন্দির |

মন্দির প্রতিষ্ঠা করায় ব্রাহ্মণ পঞ্চাননের প্রতি জেলে-মালো-কৈবর্তদের ভক্তি আরও বাড়ল | তারা তাঁকে পঞ্চানন ঠাকুর বলে ডাকতে শুরু করল | সাহেবদের মুখে এই ‘ঠাকুর’-ই হয়ে গেল টেগোর | কালক্রমে পঞ্চানন ঠাকুর বা টেগোর হয়ে উঠলেন ছোটখাটো একটি ‘স্টিভেডর’ বা জাহাজে মাল বোঝাই-খালাস করার ব্যবসায়ী | পঞ্চানন ঠাকুরের হাতে কিছু টাকাপয়সা আসতেই তিনি অনেকটা জমি কিনে ফেললেন | সেই জমির ওপর‚ আজ যেখানে ফোর্ট উইলিয়াম‚ পঞ্চানন ঠাকুর সেখানে তৈরি করলেন একটি গোলপাতার ঘর ! এটিই কলকাতার প্রথম ঠাকুরবাড়ি |

পঞ্চানন ঠাকুরের দুই ছেলে | জয়রাম ও সন্তোষরাম | এঁদেরই আমলে সেই গোলপাতার বাড়ি ফুলে ফেঁপে উঠল ধর্মতলায় | তখন ধর্মতলার নাম ছিল ধনসায়র | জয়রামের-সন্তোষরামের প্রকাণ্ড বাড়িই পরিচিত হল ধনসায়রের ঠাকুরবাড়ি নামে | ১৭০০ সালে আমিন হলেন জয়রাম-সন্তোষরাম | বাড়তে লাগল ঠাকুরবাড়ির সম্পদ ও প্রতিপত্তি |

একদিকে বাড়ছে জয়রাম ঠাকুরের বিষয়-সম্পত্তি | অন্যদিকে বাড়ছে তাঁর পরিবার | যশোরের দুই মেয়েকে বিয়ে করেছেন তিনি | এক স্ত্রীর নাম গঙ্গা | অন্য স্ত্রী রামধনি | গঙ্গার দুই ছেলে‚ আনন্দীরাম ও নীলমণি | রামধনিরও দুই ছেলে‚ দর্পনারায়ণ ও গোবিন্দরাম |

নীলমণি ঠাকুরই ঠাকুরবংশের জোড়াসাঁকোর ধারার উৎস | তাঁর সঙ্গে কাহিনির শুরুতে দেখা হয়েছে আমাদের | তিনি থাকেন তেঁতুলগাছের নীচে একটি চালাঘরে | তাঁর এই অবস্থার কারণ তাঁর সতাতো ভাই দর্পনারায়ণ | নীলমণি ঠাকুর তাঁর সমস্ত টাকা দর্পনারায়ণের কাছে গচ্ছিত রেখে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি নিয়ে উড়িষ্যা গিয়েছিলেন | ফিরে এসে সেই অর্থ ফেরৎ পেলেন না | তিনি নিঃস্ব | জোড়াবাগানের বৈষ্ণবচরণ শেঠের কৃপার দৃষ্টি পড়ল এই সুদর্শন ব্রাহ্মণের উপর | বৈষ্ণবচরণ শেঠের কাছ থেকে গৃহদেবতা লক্ষীজনার্দনের নামে নীলমাণি ঠাকুর পেলেন মেছুয়াবাজার অঞ্চলে জোড়াসাঁকোতে এক বিঘে জমি | ১৭৮৪-তে সেখানে তিনি তৈরি করলেন একটি আটচালা ঘর | কোথায় ধনসায়রের প্রাসাদ | আর কোথায় জোড়াসাঁকোতে এই আটচালার ঘর ! রবীন্দ্রনাথ জন্মাবেন ঠিক সাতাত্তর বছর পরে !

সাতাত্তর বছরের মধ্যে ঠাকুরবাড়িতে ঘটল এক প্রবল ঘটনা | এই ঘটনার নাম দ্বারকানাথ ঠাকুর ( ১৭৯৪-১৮৪৬ ) | ইনি জয়রামের প্রপৌত্র‚ নীলমণির পৌত্র‚ রামমণির পুত্র‚ রামলোচনের পোষ্য পুত্র‚ দেবেন্দ্রনাথের পিতা‚রবীন্দ্রনাথের পিতামহ |

দ্বারকানাথ না জন্মালে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি কোনওদিন খুঁজে পেত না তার অতুলনীয় বৈভব ও মহিমার ঠিকানা |

দ্বারকানাথ ইংল্যান্ডে মারা যাওয়ার পর কেটে গেছে পনেরো বছর |
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির আর্থিক অবস্থায় ভাটা পড়েছে |
১২৬৮ বঙ্গাব্দ | ২৫ বৈশাখ | ইংরেজি তারিখ ৭ মে‚১৮৬১ |
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মাল দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা সুন্দরীর চোদ্দতম সন্তান‚ অষ্টম পুত্র |
সময়: রাত দুটো আঠাশ মিনিট সাঁইতিরিশ সেকেন্ড | জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তৈরি হল বাচ্চার জন্মকোষ্ঠী |

শিশুটির জন্ম কৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে | তার ঠিকুজির ওপর লেখা হল এই ভবিষ্যৎবাণী : শুক্লের দশা ভোগ্য | দুটি অর্থ  এই সাঙ্কেতিক বাণীর – এক‚জাতক আজীবন সংগ্রামের পথে প্রতিষ্ঠিত করবে নিজের বিপুল পরিচয় | দুই‚জাতক আজীবন সন্ধানী হবে ইন্দ্রিয়ঘন উপলব্ধি ও উপভোগের | ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ করে সে কখনওই যাবে না বৈরাগ্যের পথে |

এসে গেল শিশুটির নামকরণের দিন |

শিশুর পিতা দেবেন্দ্রনাথ‚ ব্রাহ্ম |

তিনি ঘোষণা করলেন‚ আমার এই ছেলের নামকরণ ও অন্নপ্রাশন হবে কোনও দেবদেবীর পূজা ছাড়াই !

বজ্রপাত হল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে | সরে দাঁড়ালেন পুরোহিতরা |

নারায়ণশীলা ছাড়া নামকরণ ও অন্নপ্রাশন ? অসম্ভব !

দেবেন্দ্রনাথ বললেন‚ শুধু একটি পিঁড়ির প্রয়োজন |

এলো পিঁড়ি |

সেটিকে রাখা হল হোমাগ্নির পাশে |

চারপাশে দেওয়া হল আলপনা |

দেবেন্দ্রনাথ বললেন‚ পিঁড়ির চারপাশে ছোট ছোট গর্ত করো |

তাই করা হল —- সারিবদ্ধ গর্ত !

দেবেন্দ্রনাথ বললেন‚ ওই গর্তগুলির মধ্যে সারি দিয়ে বসিয়ে দাও মোমবাতি |

পালিত হল গৃহকর্তার আজ্ঞা |

দেবেন্দ্রনাথ পিঁড়ির মাঝখানে রক্তচন্দনের অক্ষরে লিখলেন একটি নাম —

রবীন্দ্রনাথ

তারপর জ্বালিয়ে দিলেন সব কটি বাতি |

আগুন কাঁপছে ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামটির উপর |

নাম নয়‚ যেন নতুন আলোর অভ্যুদয় |

দেবেন্দ্রনাথ একটিবার উচ্চারণ করলেন‚ রবীন্দ্রনাথ !

তারপর বললেন‚ সূর্যের সূর্য !

(সমাপ্ত)
(প্রথম পর্বের লিঙ্ক : https://banglalive.com/jorasanko-thakurbari-pirali-brahmins/ )

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.