রবীন্দ্রনাথের জন্ম হিন্দুসমাজচ্যুত পিরালি শাখায় !

একটি অবগাহন ও তেঁতুলতলা থেকে রবীন্দ্রনাথ

(প্রথম পর্ব)

বীন্দ্রনাথের জন্ম আর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির জন্ম প্রায় সমান তাৎপর্যের‚ অন্তত আমার কাছে |

বাঙালি কোনওদিন ভুলবে না রবীন্দ্রনাথের জন্মের বাংলা তারিখ | কিন্তু জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির জন্মকথা বাঙালি ভুলেই গেছে | অথচ জোড়াসাঁকো ঠাকুরপরিবার ছাড়া রবীন্দ্রনাথকেও তো ভাবা যায় না | উনিশ শতকে বাঙালির নবজাগরণে অনন্য এই পরিবারের অবদান | তা-ই রবীন্দ্রপ্রসঙ্গে আসবার আগে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির জন্মকথাটা একটু বলে নিই |

এই জন্মকাহিনির শুরু ১৭৮৪ সালের চিৎপুরে | সেই সময়ের চিৎপুরের সঙ্গে আজকের চিৎপুরের মিল সামান্যই | পাথুরিয়াঘাটা থেকে একটু দূরে চিৎপুরের পশ্চিম প্রান্ত | এখানে আবর্জনা ও দুর্গন্ধে মজে-যাওয়া একটি নালা | অথচ দক্ষিণ-পুবে চোখে পড়ে ভারী সুন্দর একটি কাঠের সাঁকো | সাঁকোর নীচে এক টলমল পুকুর |

১৭৮৪-র গ্রীষ্মের দুপুরে ওই পুকুরে অবগাহনে নামলেন গোষ্ঠীপতি বৈষ্ণব শেঠ |
এই সেই ঐতিহাসিক স্নান যা ঠিক ওই দিন‚ ওই সময়‚ ওই পুকুরে না ঘটলে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পত্তনই হত না !
ঠাকুরবাড়ির জন্মকথার বীজটি নিহিত বৈষ্ণব শেঠের ওই অব্যর্থ অবগাহনে !
বৈষ্ণব শেঠ স্নান করতে করতে তাকালেন পুকুর পাড়ের দিকে | দেখলেন‚ সেখানে গাছের ছায়ায় গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দনকে ভোগ দিচ্ছেন এক দীর্ঘাঙ্গ গৌরবর্ণ সুকান্ত ব্রাহ্মণ |

বৈষ্ণব শেঠের বুঝতে দেরি হল না‚ এই ব্রাহ্মণ সপরিবার আশ্রয় নিয়েছেন ওই তেঁতুলগাছের তলায় |

কে এই ব্রাহ্মণ ? খোঁজ নিলেন বৈষ্ণব শেঠ | জানলেন‚ ব্রাহ্মণ পরম বৈষ্ণব | নাম নীলমণি |
নীলমণিকে ডেকে পাঠালেন বৈষ্ণব শেঠ | বললেন‚ আপনি নিশ্চয় শান্তিরাম সিংহের বাগানটা দেখেছেন | ওই বাগানের পাশে আমারও একটু জমিজায়গা আছে (আজ যা সিংহিবাগান নামে পরিচিত) | সেই জমির একটা অংশ আমি আপনাকে দান করতে চাই | আপনি ব্রাহ্মণ এবং পরম বৈষ্ণব | আমার ইচ্ছে আপনি সেখানে সপরিবার আপনার গৃহদেবতা লক্ষ্মীজনার্দনকে নিয়ে বসবাস করুন | আপনাকে আর তেঁতুলতলার ওই ঝুপড়ির মধ্যে থাকতে হবে না |

— গোষ্ঠীপতি বৈষ্ণব শেঠ‚ আপনি আমাকে মার্জনা করবেন‚ আমি গরিব ব্রাহ্মণ‚ তবু আমি অব্রাহ্মণের দান গ্রহণ করতে অক্ষম‚ বললেন নীলমণি |

গোষ্ঠীপতি বৈষ্ণব শেঠ নীলমণির এমন অহংকারে রেগে গেলেন না | বিনয়ের সঙ্গে বললেন‚ কিন্তু আপনার লক্ষ্মীজনার্দন নিশ্চয় জাতবিচার করেন না | তাঁদেরই আমি দান করলাম এই জমি |

গোষ্ঠীপতি বৈষ্ণব শেঠের সেই দান করা জমিতে একটি চালাঘর করে বসবাস শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষ নীলমণি ঠাকুর ! রবীন্দ্রনাথ জন্মাবেন এই ঘটনার সাতাত্তর বছর পরে |

নীলমণি ঠাকুরের এই চালাঘরেই শুরু জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির !

এ বার যাওয়া যাক আরও পুরনো দিনের কথায় | জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পূর্বপুরুষরা পাঁচশো বছর আগে ছিলেন কুলীন ব্রাহ্মণ |

এই বংশেরই একটি শাখা পরবর্তীকালে ব্রাত্য হলেন ‘পিরালি ব্রাহ্মণ’ নামে |
রবীন্দ্রনাথের জন্ম হিন্দুসমাজচ্যুত পিরালি শাখায় !

সময়টা পনেরো শতকের কাছাকাছি | গৌড় চলে গেছে হিন্দু শাসকের হাত থেকে পাঠান শাসকদের হাতে | শেষ হয়েছে বল্লাল সেন-লক্ষ্মণ সেনের যুগ | গৌড় শাসন করছেন পাঠান সুলতান নাদির শাহ | সুলতানের খাস লোক খান জাহান আলি সেই সময় তাঁর ক্ষমতা বাড়াচ্ছেন পদ্মার দক্ষিণ পাড়ে | সেখানেই গড়ে তুলছেন নতুন জনবসতি |

মামুদ তাহিরের নাম কেউ মনে রাখেনি | তিনি ছিলেন খান জাহান আলির ডান হাত | এই মামুদ তাহির কুলীন ব্রাহ্মণ থেকে মুসলমান হয়েছিলেন |

কেন তাঁর এই ধর্মত্যাগ ? কারণ‚ এক মুসলমান মোহিনীর হাতছানি | সমাজচ্যুত‚ ধর্মচ্যুত এই কুলীন ব্রাহ্মণ শেষ পর্যন্ত আশ্রয় পেলেন খান জাহান আলির ছত্রছায়ায় | একদা কুলীন ব্রাহ্মণ হয়ে উঠলেন কট্টর মুসলমান | প্রভাব ছড়ালেন যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনায় |

মামুদ তাহির থাকতেন চেঙ্গুটিয়ার পিরল্যা বা পিরালিয়া গ্রামে | গ্রামের লোকজন তাঁকে ডাকতে শুরু করল ‘পির আলি’ নামে |

সেই সময় দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরী ছিলেন এক ক্ষমতাবান জমিদার | তিনি রাজনৈতিক মতলবে নিজের লোকবল নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন পির আলি-র পাশে | যশোর জুড়ে চলল পির আলি আর দক্ষিণানাথের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বিস্তারের কর্মযজ্ঞ |

দক্ষিণানাথ যে জায়গাটিকে দখল করে নিলেন তার নাম দক্ষিণডিহি | চেঙ্গুটিয়ার ভৈরব নদীর পাড়ে এই জায়গা | ওই ভৈরব নদীর তীরে দক্ষিণানাথ গড়লেন এক কালীমন্দির | আর এই মন্দিরঘাটের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির সম্পর্ক শুরু হল অদূর ভবিষ্যতে | কী করে শুরু হল সেই সম্পর্ক‚ এবার সেই কাহিনি |

দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরীর চার ছেলে‚ এক মেয়ে | বড় আর মেজো ছেলে‚ কামদেব ও জয়দেব লেখাপড়ায় বেশ ভাল | এবং তারা হয়ে উঠল পির আলির বিশেষ প্রিয়পাত্র | চাকরিও পেয়ে গেল পির আলিরই অধীনে |

সেজো ও ছোটো ভাই‚ যথাক্রমে রতিদেব ও শুকদেব‚ পির আলির চাকরি করল না বটে‚ কিন্তু তাঁরই কৃপায় দক্ষিণডিহির জমিদারি তত্ত্বাবধানের কাজ করতে লাগল |

বেশ চলছিল এইভাবে | কিন্তু এল আকস্মিক বিপর্যয় | অপ্রত্যাশিত ভবিষ্যতের দিকে
বেঁকে গেল কামদেব-জয়দেবের জীবন |

রমজানের বিকেলবেলা | চলছে রোজার পবিত্র উপবাস | তখনও আসেনি সান্ধ্য-নমাজের লগ্ন‚ যার পরে ভাঙবে রোজার উপবাস | এমন সময় পির আলি-কে রোজার ফল উপহার দিল এক পারিষদ | পির আলি ফলের ঝুড়ি থেকে তুলে নিলেন একটি রসালো লেবু | বুক ভরে সেই নিহিত রসের সুবাস নিয়ে বললেন‚ আহা ! কী মনোহর!

আর তখুনি কামদেব-জয়দেব একসঙ্গে বলে উঠলেন‚ একী ! আপনি রোজার সান্ধ্য নমাজের আগেই উপোস ভাঙলেন ?

—-তার মানে ? প্রশ্ন করলেন বিমূঢ় পির আলি |

—-আমরা হিন্দুরা বিশ্বাস করি খাবারের গন্ধ শুঁকলেই অর্ধেক খাওয়া হয়ে যায় |

হিন্দু থেকে মুসলমান হওয়া মামুদ তাহির ওরফে পির আলি সবার সামনে নিজেকে অপমানিত বোধ করলেন | মনে মনে তখুনি সিদ্ধান্ত নিলেন‚ কামদেব-জয়দেবের উপর প্রতিশোধ নিতেই হবে |

এসে গেলে সুযোগ | এক বসন্তসন্ধ্যার সমাগমে পির আলি আমন্ত্রণ জানালেন দুই ভাইকে | হঠাৎ পির আলির বাসভবন ম-ম করে উঠল গো-মাংসের গন্ধে | ব্রাহ্মণরা তো নাকে চাপা দিয়ে পালালেন | পালাতে পারলেন না কামদেব-জয়দেব | পথ আটকে দিলেন স্বয়ং পির আলি | বললেন‚ কামদেব জয়দেব‚ কতক্ষণ নিঃশ্বাস  বন্ধ করে থাকবে তোমরা ? আর তোমরাই তো বলেছ‚ খাবারের গন্ধ নাকে যাওয়া মানেই খাওয়া হয়ে গেল | সুতরাং আজ তোমরা গরুর মাংস খেলে | হিন্দু সমাজে এর পরে তোমাদের স্থান হবে কি ?

—এ তো অর্ধেক খাওয়া‚ পুরো নয় বলল কামদেব |

—ঠিক ঠিক‚ বলল জয়দেব |

পির আলি চোখের ইশারা করলেন | পির আলির লোকজন কামদেব‚ জয়দেবের মুখে জোর করে গুঁজে দিল গরুর মাংস | ব্রাহ্মণেরা দূর থেকে এই দৃশ্য দেখলেন | কামদেব-জয়দেবের আর কোনও জায়গাই থাকল না হিন্দুসমাজে |

মুসলমান হতে বাধ্য হল কামদেব-জয়দেব | কামদেবের নতুন নাম হল কামালুদ্দিন খাঁ চৌধুরী | আর জয়দেব পরিচিত হল জামালুদ্দিন খাঁ চৌধুরী নামে | এইভাবে শুরু হল কুলীন ব্রাহ্মণ জমিদার দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরীর বংশের ইসলাম শাখা |

এই বংশের অন্য আর একটি শাখাও দেখা দিল অনিবার্যভাবে | দাদা কামদেব-জয়দেব তো মুসলমান হল | ছোট ভাইরা কী করবে ? তারা তো থাকে দাদাদের সঙ্গে একই বাড়িতে | তারা নিজেরা কিছু করল না | হিন্দুসমাজ তাদের একঘরে করল | ‘পির আলি’-র সঙ্গে তাদের নামও জড়িয়ে গেল | তারা ব্রাহ্মণ থাকল বটে‚ কিন্তু হিন্দুরা তাদের বিদ্রূপ করে বলতে লাগল ‘পির-আলি-ব্রাহ্মণ’| তারপর তারা সমাজে পরিচিত হল একঘরে ‘পিরালি’ ব্রাহ্মণ নামেই |

পিরালি-ব্রাহ্মণ রতিদেব-শুকদেবের ধোপা নাপিতও বন্ধ হল | হিন্দুসমাজ তাদের জীবন অসহনীয় করে তুলল | তাদের একমাত্র সুন্দরী বোনের নাম রত্নমালা | কোনও ব্রাহ্মণ সমাজচ্যুত হওয়ার ভয়ে তাকে বিয়ে করতে চাইল না | কিন্তু শুকদেব শেষপর্যন্ত বোন রত্নমালার বিয়ে দিতে পেরেছিল | এক রাতের জন্য এক ব্রাহ্মণ যুবক শুকদেবের বাড়িতে আশ্রয় নেয় | সেই যুবকের নাম মঙ্গলানন্দ মুখোপাধ্যায় | এই সুযোগ হাতছাড়া করেনি শুকদেব | মঙ্গলানন্দকে সে দেখাল বিশাল জমিজায়গার লোভ | একই সঙ্গে সম্পদ ও সুন্দরী বউ পাওয়ার লোভ সামলাতে পারেনি মঙ্গলানন্দ | সে বিয়ে করল রত্নমালাকে |

রত্নমালাকে বিয়ে করার পর মঙ্গলানন্দ আর দেশে ফিরতে পারল না | সে অবিশ্যি বিয়ের যৌতুক হিসেবে পেল আড়াইশো বিঘে জমি | এই জমির ওপরেই বেড়ে উঠতে লাগল পিরালি ব্রাহ্মণ বংশের আর এক শাখা |

(পরবর্তী পর্বে সমাপ্য)

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements
Previous articleঝাড়ুপেটা করে খুন কি আদৌ সম্ভব ? প্রশ্ন হাইকোর্টের
Next articleরবিঠাকুরের এঞ্জিনিয়ারিং
রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
তাঁর কর্মজীবন শুরু ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে স্কটিশ চার্চ কলেজে | তারপর তিনি আজকাল সংবাদপত্রে যুক্ত হন সহকারী সম্পাদক রূপে | সেখান থেকে সহকারী সম্পাদক রূপে আনন্দবাজার পত্রিকায় | বর্তমানে তিনি যুক্ত সংবাদ প্রতিদিন-এর সঙ্গে | তবে এখন তাঁর প্রধান পরিচয় সাহিত্যিক হিসেবে | তাঁর বেস্টসেলার বইগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাণসখা বিবেকানন্দ ( দু খণ্ড)‚ কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট‚ রবি ও সে ‚ আমি রবি ঠাকুরের বউ‚ রবি ও রাণুর আদরের দাগ‚ নায়ক রবি ( ১ ম খণ্ড)‚ দ্বারকানাথ থেকে রবীন্দ্রনাথ; ঠাকুরবাড়ির গোপনকথা‚ প্লাতা নদীর ধারে; রবীন্দ্র-ওকাম্পোর প্রণয়কথা | সম্প্রতি ‘রাধা ও রবি’, ‘স্বামী’-সহ একাধিক সংগ্রহে সমাদৃত হয়েছে তাঁর ভাষ্যপাঠ |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.