জয়চণ্ডীর পাথুরে পাহাড়

1051
পাহাড়ের মাথায় চণ্ডীমাতার মন্দির

উদ্দেশ্যটা আসলে ছিল অযোধ্যা পাহাড়ে যাবার – সেই মতো রাতের ট্রেন আদ্রা-চক্রধরপুর-এ পুরুলিয়া অব্দি টিকিট কেটেছিলাম | কিন্তু অনেকে বলল পথে জয়চণ্ডীটা একবার ঘুরে যেতে – ওখানকার পাহাড়গুলো দেখার জিনিস | আমি যে দেখিনি তা নয় তবে সেটা সত্যজিৎরায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় – যেখানে পাঠশালার পণ্ডিতমশাই অর্থাৎ  সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় লুকিয়ে থাকবে আর গুপি-বাঘার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে | অতএব পুরুলিয়া অব্দি না গিয়ে ভোর সাড়ে পাঁচটা নাগাদ নেমে পড়লাম ‘আদ্রা’ স্টেশনে | ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, একে তো প্রচন্ড ঠান্ডা তার ওপর চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার | যাব রঘুনাথপুর – ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করার পর বাস ছাড়ল – মাত্র পনেরো মিনিটের পথ – সৈকতকে আগেই বলা ছিল একটা নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করবার জন্য – ও আদতে পুরুলিয়ার ছেলে, কর্মসূত্রে কলকাতায় থাকলেও এই জেলাটি ওর চষে খাওয়া | এখানে ওর বোন আর ভগ্নিপতি মুরলী বরাট থাকে – ভদ্রলোকের ব্যবসা ট্যাবসা আছে | সাত সকালে পৌঁছে চা আর গরমাগরম পকৌড়া খেয়ে বরাটের বাইকে চেপে তিনজনে মিলে রওনা দিলাম জয়চণ্ডীর দিকে | দূর থেকেই পাহাড়গুলো চোখে পড়ছিল কিন্তু সামনে গিয়ে দাঁড়াবার পর বেশ হকচকিয়ে গেলাম – একেবারে সমতল জায়গায় এই ধরনের উঁচু পাহাড় গজিয়ে উঠল কী ভাবে!

চারপাশে ছোট ছোট সাঁওতাল গ্রাম
চারপাশে ছোট ছোট সাঁওতাল গ্রাম

এর মধ্যে বড় তিনটের নাম জানতে পারলাম – যুগঢাল, দক্ষিনা কাঠি আর জয়চণ্ডী | প্রথমেই উঠে গেলাম জয়চণ্ডীর মাথায় – চণ্ডীমাতার মন্দির দেখতে – ভক্তদের জন্য সিঁড়ি করা আছে তাই বেশ সুবিধে | ওপর থেকে চারপাশের দৃশ্য এক কথায় অপূর্ব – অনেক দূর অব্দি খোলা প্রান্তর-ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সাঁওতালদের ছোট ছোট গ্রাম – একটা রেল লাইন দেখা যাচ্ছে, হেলতে দুলতে লোকাল ট্রেন চলে গেল আসানসোলের দিকে | হাতে সময় কম, সন্ধের মধ্যেই পুরুলিয়া শহর পৌঁছতে হবে ফলে তড়িঘড়ি পরের দুটো পাহাড়ে চড়ার প্রস্তুতি নিলাম – এখানে শুধুই বড় বড় পাথর – খাঁজে খাঁজে পা রেখে উঠতে হয় – এ সব জায়গা ‘Rock Climbing’-এর জন্য বিখ্যাত |

সৈকতরা ফিরে গেল, আমি বসে পড়লাম ছবি আঁকতে | পাহাড়গুলোর ঠিক মাঝখানে একটা বড় ঝিল মতো রয়েছে –গ্রামের লোকেরা চান করছে, কাপড় কাচছে, স্থানীয় লোকেরা সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে – আজ রবিবার ফলে ঢাউস সব বাস নিয়ে পিকনিক পার্টি এসে জায়গাটাকে রীতিমতো সরগরম করে তুলেছে | পাথুরে, ন্যাড়া, তামাটে এই পাহাড় চত্ত্বরে লাল নীল জামা পরা সব লোকজন ঘোরাঘুরি করছে – অনেক ওপর থেকে দেখে মনে হচ্ছে রঙিন পিঁপড়ের দল |

ঝিলের জলে গ্রামের লোকেরা চান করে, কাপড় কাচে
ঝিলের জলে গ্রামের লোকেরা চান করে, কাপড় কাচে

সত্যজিৎ রায়কে সত্যি সেলাম জানাতে হয় এই রকম একটা লোকেশন বাছাই করার জন্য | উনি নাকি বাংলার গ্রাম আর পাহাড় ব্যাপারটা একই সঙ্গে চেয়েছিলেন | এই রকম গ্রামের নাম হল ‘নান্দুয়ারা’, যার প্রায় ঘাড়ের ওপর থেকে আগাপাশতলা পাথরের চাঁই দিয়ে সাজানো পাহাড় শুরু হয়ে গিয়েছে | এখানকার লোকেরা সারাক্ষণ সিঁটিয়ে থাকে এই বুঝি একটা পাথর গড়িয়ে এসে তাদের ঘর বাড়ির ওপর পড়ল |

কাজল কর্মকার
কাজল কর্মকার

ফেরার পথে এখানে একটা চায়ের দোকানে বসলাম – চা বিস্কুট খেতে খেতে আড্ডা জমালাম মালিকের সঙ্গে – এক মুখ দাড়ি গোঁফওলা বছর চল্লিশের কাজল কর্মকার – জিজ্ঞেস করলাম সত্যজিতের শুটিংয়ের কথা – অমনি গড়গড় করে বলে গেল – তখন ও ক্লাস ফাইভ না সিক্সে পড়ে- স্কুল পালিয়ে শুটিং দেখতে গিয়েছিল – গুপি-বাঘার খাওয়া, সৌমিত্রর ছুরি হাতে পাহাড়ের গুহা থেকে বেরিয়ে আসা কত কিছু | সিনেমাটা নাকি ও বহুবার দেখেছে | কাজলের একটা স্কেচ করে নিতে ভুলিনি | জয়চণ্ডীর পাহাড়ের ইতিহাস থেকে এরাই বা বাদ যাবে কেন?

Advertisements

4 COMMENTS

  1. I have started my Service life from this place. We choose to live in Nanduara village due to proximity of this hill. My lifetime memorable evenings are spent there……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.