বাংলালাইভ রেটিং -

Banglalive

সিনেমাটা দেখতে দেখতে প্রথম যে কথাটা মনে হচ্ছিল, সেটা হল এই যে, ঠিক কোন দর্শকের কথা ভেবে ছবিটা বানাতে গেলেন দেব? যে জনগণ এতদিন দেবের ‘পাগলু’ ড্যান্স দেখে সিটি মেরেছে, এটা কি তাঁদের জন্যে তৈরি?

যদি এটা তাঁদের জন্যে তৈরি হয়, তাহলে এ সিনেমায় এন্টারটেনমেন্টের দরকারি সেই মশলাগুলো কোথায় গেল, ভাই?

নাকি ছবিটা তৈরি হল সিনেমার সিরিয়াস দর্শকদের কথা মাথায় রেখে? যদি তাঁদের জন্যে ছবি বানিয়ে থাকেন, তবে এটা তো মনে রাখা উচিৎ ছিল যে, এর আগেই সেই লোকগুলো রাকেশ শর্মার ‘ফাইনাল সলিউশন’ (২০০৪) আর অনুরাগ কাশ্যপের ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ (২০০৪) দেখে ফেলেছে। চৌদ্দ বছর আগে ওরকম দুটো ছবি হজম করার পর এই এখন আজকে বসে ‘কবীর’ দেখতে সেই লোকগুলোর কেমন লাগতে পারে, সেটা আপনি বলুন, দেব।

আমার তো বারবার মনে হচ্ছিল, ‘কবীর’-এর আসল গণ্ডগোল হয়ে গেছে এইটে যে ছবিটা বানাতে বসে ছবির টার্গেট ভিউয়ার কারা, সেটাই বুঝে উঠতে পারে নি কেউ। না প্রোডিউসার দেব, না ডিরেক্টর অনিকেত।

ফলে যেটা দাঁড়িয়েছে, ছবিটা হয়ে দাঁড়িয়েছে না ঘরকা-না ঘাটকা গোছের একটা কিছু যেন

ছবি দ্যাখার পর জনগণের সম্ভাব্য রিঅ্যাকশন বোধহয় দু’রকম হতে পারে। যাঁরা ছবি জুড়ে লাচা-গানা আর মস্তি ড্রামার আরক খুঁজতে যাবেন, তাঁরা ভাববেন, পয়সাগুলো বেকার বেকার জলে চলে গেল, যাহ। আর সিরিয়াস কিছু অ্যান্টি থিসিস খুঁজতে গেলে মনে হবে, হরিবোল, এটা কি সিনেমা নাকি পাড়ার ক্লাবের তাপ্পি মারা নাটক হচ্ছে, ভাই?

স্টোরির ডিটেলে পরে ঢুকছি, আগে একদম লাস্ট সিনটা বলি। গল্পের টুইস্টটা ফাঁস করছি না, শুধু এটুকু লিখি, একদম শেষপাতে রাষ্ট্রের রক্ষাকর্তা এসে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক গুলি ঠুকে দিচ্ছে রাষ্ট্র-শ্ত্রুর কপালের মধ্যিখানে ঠিক। এখানে ছবির শেষ, আর ঠিক এরপর এন্ড ক্রেডিটে কী দ্যাখান হচ্ছে, জানেন? সেই রাষ্ট্রের রক্ষাকর্তা এবং রাষ্ট্র-শত্রু দুজনে হেভি কেত মেরে মুভমেন্ট দিচ্ছে ‘কবীর’-‘কবীর’ বলে একটা গানের সঙ্গে অনেকটা ঠিক গড়পড়তা ছবির স্টাইলে যেন!

ঠিক আগের মুহূর্তে কপালে গুলি খেয়ে যাকে মরে যেতে দেখলেন, এখন আবার সেই তাঁকেই এভাবে গানের তালে তালে স্টেপ মেলাতে দেখতে হবে কেন, এই প্রশ্নটা মনে আসবে না, বলুন? মিনিমাম কাণ্ডজ্ঞান থাকলে কেউ এমন একটা ছবির শেষে এরকম গান রাখে?

মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, ছবির মেকিং নিয়ে সিরিয়াসলি মন বোধহয় দিতেই চায় নি কেউ। একের পর এক সিন জুড়ে তাই অ্যামেচার সব হাব ও ভাবের গন্ধ।

আবার একটা উদাহরণ দিই, শুনুন। দুরন্ত এক্সপ্রেসের কামরায় ইয়াসমিন খাতুন (রুক্মিণী মৈত্র) তখন আলতাফ কবীরকে (দেব) খুলে বলছে ভোপাল দাঙ্গার কথা। কী ভাবে তখন হিন্দু প্রতিবেশীরা এসে জুলুম করেছিল ওদের ওপর, সেটা বলতে গিয়ে উত্তেজিত সে। তার সঙ্গে এটাও দেখছি জুড়ে দিল যে, দাঙ্গা থেমে যাওয়ার পরে হিন্দু প্রতিবেশীদের নামে নিজের ঘরদোর এমনি এমনি লিখে দ্যায় নি ইয়াসমিনের বাবা। ওর বাবার গলায় পিস্তল ঠেকিয়ে জোর করে ঘরবাড়ি সব লিখিয়ে নেওয়া হয়।

সিনেমায় এই ডায়ালগের সঙ্গে ভিস্যুয়াল হিসেবে ডিরেক্টর দেখিয়ে দিচ্ছেন ফ্ল্যাশ ব্যাকে সেদিনের সেই সিন। মজার কাণ্ড হল, ইয়াসমিন মুখে বলছে পিস্তল ঠেকানোর কথা, কিন্তু অন স্ক্রিন দ্যাখা যাচ্ছে, খোলা তরোয়াল ছাড়া সেখানে আর কারুর হাতে অস্ত্র নেই কোন!

জ্বলন্ত বিষয় নিয়ে সিনেমা বানাতে গিয়ে নিজেরাই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন বলে জানি। কিন্তু তাই বলে এই জ্বলজ্যান্ত ভুলগুলোও চোখ এড়িয়ে যাবে?

যেটুকু শুটিং অন লোকেশন হয়েছে, সেটা নিয়ে বলার কিছু নেই। ঝাঁ চকাচক সিন। কিন্তু স্টুডিওর মধ্যে যে শুটটা করতে হয়েছে, সেটা দেখে তো মনে হচ্ছে, গলির কোণে সস্তা কোন নাটক হচ্ছে যেন। শুট করতে গিয়ে কারুর মনে হল না যে ছবির লুক-ফিল সব চরম ভাবে এই সিনগুলোয় এসে ধ্বসে পড়ছে বলে?

ইয়াসমিনের বাবার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রদীপ মুখোপাধ্যায়। ফ্ল্যাশ ব্যাকের একটা দৃশ্যে দরকার হয়েছিল তাঁর বছর পঁচিশ আগের একটা লুক। সেই লুকটা আনতে গিয়ে ভদ্রলোককে যে পরচুলোটা পরানো হল, সেটা দেখে আমার তো অন্তত বিষম খাওয়ার দশা।

যে কোন ছবি জমাতে গেলে দরকার হয় ঠাসবুনোট স্ক্রিপ্ট। সেখানেই তো ছবিটা ডাহা ফেল মেরে গেল ভাই। স্ক্রিপ্ট নিয়ে এত কথা বলার আছে যে, লিখতে বসলে লিস্ট শেষ করে উঠতে পারব না বোধহয়।

মোদ্দা একটা কথা বলুন, যদি দেশের শত্রুটিকে গুলি করেই নিকেশ করতে হবে, তবে সেটা তো মুম্বইয়ের রাস্তায় এক পলকেই করে ফ্যালা যেত স্যর। তার বদলে রাস্তার ট্যাক্সিওয়ালা থেকে শুরু করে দুনিয়ার সব লোককে হাত করে সেই উগ্রপন্থীর সঙ্গে রাতভর গামা লেভেলে লাটক করার দরকার কী ছিল? দেশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স বাহিনীর লোকজন সব উগ্রপন্থী ধরতে গিয়ে এত গামবাট হন নাকি?

স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সের তরফ থেকে বিশেষ এক জঙ্গীর ওপর এত নজর রাখা হচ্ছে যে সেই জঙ্গী কবে কোন কামরায় রেলের টিকিট কাটবে থেকে শুরু করে কোথা থেকে সে ট্যাক্সি ধরে স্টেশনে যাবে, সবই নাকি টাস্ক ফোর্সের জানা! জঙ্গীর বিয়ে ভেঙেছে না ভাঙেনি, জঙ্গীর আত্মীয় স্বজন কে থাকে কলকাতার আলিপুরে, কে থাকে দার্জিলিংয়ের বোর্ডিং স্কুলে আর কে থাকে জার্মানির ফ্র্যাঙ্কফুর্টে, সব নিয়ে হোম ওয়ার্ক করা হয়ে গেছে তাঁদের। এত নিখুঁত হোম ওয়ার্ক করতে পারেন যারা, তাঁরা শুধু এই খবরটা রাখতে পারেন না যে, শহর জুড়ে ছড়ান হয়েছে বিস্ফোরণের জাল?

একটা ডায়ালগে শোনান হল, এগার জায়গায় বিস্ফোরণের প্ল্যান নাকি পুলিশ রুখে দিয়েছে আগেই। কিন্তু সাত জায়গায় ব্লাস্ট হয়েই গেছে ঠিক। ব্যাস, এই ডায়ালগটাই শুধু আছে। কিন্তু এগার জায়গায় বিস্ফোরণের প্ল্যান রুখল কী করে পুলিশ, সাত জায়গায় তাদের চেষ্টা ফেল মারল কেন, সে সব নিয়ে এই সিনেমায় কোন শব্দ নেই। মুজাহিদিন যে জঙ্গীকে নিয়ে এত রিসার্চ ওয়ার্ক সেরে রেখেছিল টাস্ক ফোর্সের লোক, ওই বিস্ফোরণে সেই জঙ্গীর ভূমিকা নিয়েও ছবিটা পুরো চুপ!

ভাবতে পারছেন, ভাই?

সিনেমায় এরকম একটা সিকোয়েন্স আছে যে, সেই জঙ্গীর একটা ফোনে ট্রেস করে ফ্যালা হচ্ছে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন থার্ড ইন কম্যান্ড সৈয়দ আবদুল রহিম টুন্ডার (বরুণ চন্দ) সমস্তিপুরের হিলটপের ঘর। এখানে কোশ্চেন ওঠে দুটো। এক, যদি এই জঙ্গীর একটা ফোন থেকে এক নিমেষে দলের অন্যতম বড় চাঁইয়ের নাগাল পাওয়া যায়, তো সেটা করতে এতদিন সময় লাগল কেন?

আর দুই নম্বর পয়েন্ট হল, ট্রেনের মধ্যে বিপদ হলে, বাঁচার জন্যে মুসলিম সেই জঙ্গী বেছে বেছে হিন্দু বন্ধুদেরই শুধু ফোন করতে থাকে কেন? হিন্দুদের ওপর তো তাঁর জাতিঘৃণা প্রবল! অথচ একটু চাপে পড়লেই সেই তাঁদের কাছেই হাত পাততে হয়?

লিখতে গিয়ে কোথায় কোথায় স্ক্রিপ্টে চরম সব ছ্যাঁদা রয়ে গেছে, বোঝা যাচ্ছে তো ভাই এবার?

হিন্দু যে দুই বন্ধুর কথা লিখলাম, তাঁদের একজনের নাম তমাল (অভিনয়ে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়) আরেকজন হলেন তন্ময় (অভিনয়ে অম্বরীশ ভট্টাচার্য)। দুজনেরই সাকুল্যে এই ছবিতে মিনিটখানেক রোল। অকিঞ্চিৎকর এই ভূমিকায় এঁদের মতো সুঅভিনেতাকে অপচয় করার মানে কী, বুঝতে পারি নি আমি। আর চরম টেনশনের সময় হঠাৎ অম্বরীশকে ইউজ করে জোর করে কমেডি ঠুসে দেওয়ার চেষ্টাটাও খুব আনাড়ি গোছের লাগল।

কাট টু এবার আসুন সোজা বিস্ফোরণের সিনে। বাংলা ছবির বাজেট যা, তাতে সত্যিকারের বম্ব ব্লাস্টের ফিল দিতে গেলে হাঁফ ধরে যাবে, জানি তাই ব্লাস্ট দ্যাখানোর রকম নিয়ে লিখে লজ্জা দেওয়ার ইচ্ছে নেই কোন। শুধু এটুকু লিখি যে, মুখে বলছেন গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়াতে ব্লাস্ট হয়েছে, আর সঙ্গে ভিস্যুয়াল এটা দ্যাখাচ্ছেন যে, কাদের একটা ঘরোয়া বার্থ ডে পার্টিতে জানলার কাছে ব্লাস্টের আগুন ঝলসে উঠছে জোরে, স্ক্রিনে এরকম হতে দেখলে হঠাৎ যেন কেমন একটা লাগে!

শহরে একের পর এক বিস্ফোরণে মানুষজন মরতে থাকলে পুলিশবাহিনীর তো দমছুট হাল হয়ে যাওয়ার কথা ভাই! এই ছবিতে সে সব দৃশ্য বিন্দুমাত্র নেই।

উলটে দেখতে পাবেন যে, সদর দফতরে গুছিয়ে বসে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সবুজে লেখা কী সব যেন কোড ব্রেক করার জন্যে ব্যস্ত আছেন তাঁরা! নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে তখন এটা বুঝে নিতে হবে যে, এরা পুলিশ নয়, এরা হচ্ছে স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স। বিস্ফোরণ নিয়ে এদের ছটফট না করলেও চলে।

একটা শহরে একই দিনে একের পর এক সাতটা ব্লাস্ট হলে শহরের ওপর যে কী এফেক্ট আসে, সেটা এই সিনেমার কোনখানেই নেই!

ছবির পোস্টারে লেখা আছে দেখবেন যে এটা নাকি ‘ইন্সপায়ারড ফ্রম ট্রু ইনসিডেন্ট’এখানে ভাষার প্যাঁচটা খেয়াল করুন প্লিজ। ‘বেস্‌ড অন’ না লিখে লিখেছে ইন্সপিরেশনের কথা। এই একটা শব্দ এদিক ওদিক করে নিলেই, ভেবে দেখুন, গল্পের নামে যা-ইচ্ছে-তাই চালিয়ে দেওয়া যায়।

মুম্বইয়ের ব্লাস্ট নিয়ে অনেক লিখেছি, এবার কলকাতার ব্লাস্ট নিয়ে লিখি কিছুটা, শুনুন। চমকাবেন না ভাই, ‘ইন্সপায়ারড ফ্রম ট্রু ইনসিডেন্ট’ ছাপ লাগানো এই ছবিতে দ্যাখান হচ্ছে, ২০১২ সালে বম্ব ব্লাস্ট নাকি হয়ে গেছে আপনার এই কলকাতাতেও!

কলকাতাতে বিস্ফোরণের ছকে তখন নাকি শহরে ঢুকেছিল বেশ কয়েকজন জঙ্গী। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিল পারভেজ (শতাফ ফিগার), ইমতিয়াজ (অর্ণ মুখোপাধ্যায়) কিংবা আশরাফের (কৃষ্ণেন্দু দেওয়ানজি) মতন সব লোক।

আজ বাদে কাল ব্লাস্ট করতে গিয়ে নিকেশ হতে পারে যারা, তারা কী ভাবে যে জীবন কাটায়, সেটার কিছুটা আঁচ পেয়েছিলাম সন্তোষ শিভনের ‘দ্য টেররিস্ট’ (১৯৯৮) দেখে। এই ছবিটা দেখে সে সব ফিলিং আমার ঘেঁটে গেল স্যর জাস্ট। এই ছবিতে তো দেখতে পাচ্ছি, জঙ্গীরা বিস্ফোরণের প্ল্যান-ট্যান করার আগে মহাফুর্তিতে থাকে!

হৈ-হৈ করে রুটি খেতে চায় বাড়িতে, আর কারণ হিসেবে কলকল করে দিব্যি বলে, ‘আর কটা দিন রুটি নসিব হবে জানি না’। জানেন তো এই ডায়ালগগুলোয় ‘রুটি’ শব্দটাও খট খট করে লাগছিল এসে কানে। এই জঙ্গীদের যে রকম দ্যাখান হল ভাই, তাতে এঁদের উচ্চারণ কি ‘রুটি’ হওয়া উচিৎ, নাকি ‘রোটি’?

কলকাতায় বোম ফাটানোর আগে ওই জঙ্গী ক’জন যেভাবে কলকাতা ঘুরে ঘুরে সরেজমিনে নিজেরা সব দেখতে লাগল, একেকবার তো মনে হচ্ছিল, বোম ফাটানোটা এদের কাছে পিকনিক করার মতো কিছু একটা বিষয় হবে বুঝি! মনে হল কয়েকবার যেন ‘রেকি’ শব্দটাও বলতে শুনলাম ওদের। আরে দাদা, ওটা তো যতদূর জানি, শুটিং পার্টির মার্কামারা লব্জ, ইসলামিক টেররিজমেও ঠেসেঠুসে ওই শব্দ কি ঢুকিয়ে দিলেন, ভাই?

এরপর ফাইনাল অপারেশনের আগে এরা কী কাণ্ড করলো, সেটা শুনুন। জমিয়ে কলকাতার বিরিয়ানি সাঁটাতে দুজন গেল দোকানে। আর সেই সময় কলকাতা পুলিশের কাছে সোর্স মারফৎ পৌঁছে গেল গেরস্থ পাড়ার অস্থায়ী সেই জঙ্গী ঘাঁটির খবর।

সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে, কলকাতার সেই জঙ্গী ঘাঁটি আক্রমণে দলে দলে পুলিশ ঢুকছে পাড়ায়। ঘাঁটিতে তখন দুই জঙ্গী হাজির। তাদের সঙ্গে পুলিশের তখন কী গুলির লড়াই শুরু হয়ে গেল, বাপ্‌স! আর ওদিকে যে দু’জন তখন বিরিয়ানি খেতে গেছে, হঠাৎ করে দোকানে রাখা পাশের টিভিতে সেই জঙ্গী-নিধন লড়াইখানা লাইভ দেখে তাদের তো প্রায় চমকে চৌদ্দ হাল!

স্যর, মাথা খাটিয়ে স্ক্রিপ্টটা একটু লিখতে শিখুন প্লিজ। নিজেদের গুপ্ত ঘাঁটিতে হঠাৎ করে পুলিশি হানা ঘটতে দেখলে বিরিয়ানির দোকানে যাওয়া দুই জঙ্গীর তো দ্রুত শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া উচিৎ। কারণ এই শহরে তখন তাদের কোন থাকার জায়গা, অস্ত্র-শস্ত্র, বোমা-গুলি কিছুই হাতে নেই। সব পুলিশের হাতে!

এসব লজিক হাওয়ায় উড়িয়ে কী দ্যাখালেন আপনি, বলুন! ওই দুই জঙ্গী ঠিক করলো বোম্ব ব্লাস্ট তারা করেই ছাড়বে শহরে। সেই মতো তৈরিও হয়ে গেল ঠিক তারা।

একটা কথা বলুন আমায়, বিরিয়ানির দোকানে তো নিশ্চয় বোমা-বন্দুক সঙ্গে করে ঢোকেনি ওরা, নাকি? তাহলে নিজেদের আসল ঘাঁটি পুলিশ-কবলে যাওয়ার পর ফের নতুন করে বোমা বন্দুক জোগাড় করল কী করে ওরা?

সেই উত্তর এই ছবিতে নেই!

লাগেজের মধ্যে বোমা পুরে রাস্তার কোথাও সেটা ফেলে আসার জন্যে পিঠের ব্যাগে ইয়া বড় মেশিনগান নিয়ে চোর চোর মুখে ঘুরতে হয়, সেটাও এই ছবি দেখে জানতে পারলাম স্যর। একটা কথা এখানে না লিখে পারছি না যে, ইমতিয়াজকে দেখে যে ভাবে কলকাতার এক মেট্রো স্টেশনের পুলিশ গার্ডের সন্দেহ হল কিছু, আর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে বিশাল পুলিশ বাহিনী এসে তাড়া করতে লাগল ইমতিয়াজকে, আর শুরু হয়ে গেল গুলির যুদ্ধ, সেটা দেখে শুনে মনে হচ্ছিল যিনি এসব স্টোরি প্ল্যান করেছেন, রিয়্যালিটি নিয়ে হয় তাঁর আইডিয়া নেই কোন, নইলে খুব সতর্কভাবে রিয়্যালিটিকে এড়িয়ে গিয়ে ঢপ দ্যাখানটাই তাঁর চাল।

পুলিশের সঙ্গে গুলির লড়াই লড়তে লড়তে ইমতিয়াজ আবার মরছে গিয়ে নকশাল নেতা সরোজ দত্তের স্মৃতিফলকের নিচে। কী ভেবে এসব শুট করেছেন জানি না, সিনটা দেখতে গিয়ে মাথার মধ্যে ঘেঁটে ঘ হয়ে যাচ্ছিল সব। কী প্রমাণ করতে চাইছেন দাদা? ওই নকশাল নেতা আর এই মুসলিম টেররিস্ট সেম?

ছবি দেখতে গিয়ে খুব যেটা মনে হচ্ছিল যে, বহুদিন ওয়েট করে করে ফাইনালি গরমাগরম সাবজেক্ট নিয়ে ছবি বানানোর সুযোগ পেয়ে নিজেকে আর সামলাতে পারেন নি এই ছবির স্রষ্টা মান্যবর। ছবির কাহিনী চিত্রনাট্য লেখার জন্যে মিনিমাম যে সময় আর নিষ্ঠা লাগে, তার কোন তোয়াক্কা না করে কোন মতে কিছু লিখে নিয়ে ব্যাস নেমে পড়েছেন মাঠে!

এরকম টানটান কোন থ্রিলার লেখার কোন অভ্যেস নেই বোধহয় আগে। না হলে জানতে পারতেন, দুরন্ত এক্সপ্রেসের হাড়-হিম করা জার্নি দ্যাখাতে গেলে, তার পুরোটা দ্যাখাতে হয়। পুরো রাতটা আপনার মেন ক্যারেকটাররা কে কী করলো, গল্পে কোন হদিশ থাকলো না তার, এভাবে কী থ্রিলার জমে নাকি? ইন্টারভ্যালের পর এক লাইনে সেরে দিচ্ছেন, রাতে নাকি ওরা ঘুমিয়ে পড়েছিল জাস্ট! জীবন মৃত্যু পলকা সুতোয় নাচছে যেখানে, লোকে সেখানে রাত হয়েছে বলে ট্রেনের বাঙ্কে ঘুমিয়ে পড়বে? এটা ইয়ার্কি নাকি অন্য কিছু, বলুন আমায় প্লিজ।

ছবির মেন ক্যারেক্টারদের রাতের খাওয়া কিংবা টয়লেট-গমন এত যত্ন করে দ্যাখালেন, সেটা দিব্যি লাগল ভাই। কিন্তু ওদের সকালের জলখাবার বা সেই সময়ের টয়লেট-গমন নিয়ে আর লাটক হল না কিছু? সেটা নিয়ে তো আপনি দেখছি অস্বাভাবিক চুপ!

প্যান্ট্রি থেকে যে কোন খাবার সার্ভ হবে না, তার একটা কারণ হিসেবে মুম্বই ব্লাস্টের গল্প শুনিয়েছেন আপনি। কিন্তু ওই ব্লাস্টটা তো আর আগে থেকে টাস্ক ফোর্সের প্ল্যান করে রাখা নয়। যদি ব্লাস্ট না হত, প্যান্ট্রি থেকে কেউ না আসার ব্যাপারটা কী লজিকে ম্যানেজ করতেন বলুন আপনি স্যর?

যদি স্ক্রিপ্টের সব লাইন স্ক্যান করতে বসি, তো দেখতে পাব, ছবির মধ্যে গণ্ডা গণ্ডা এরকম সব অসঙ্গতির ভিড়।

যথাসম্ভব সাবধানে এই লেখাটা লিখলাম, যাতে যে সব চমকগুলো ছবির শেষে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন আপনি, তার কোনকিছু এই রিভিউ থেকে ফাঁস না হয়ে যায়। লেখার কোন অংশ বুঝতে যদি এর ফলে অসুবিধে হয়ে থাকে, সে জন্য আগাম ক্ষমা চেয়ে রাখছি আমি।

তবে এসবের পরেও আলতাফ কবীর আর ইয়াসমিন খাতুনের একটা সিন নিয়ে আলাদা করে না লিখে থাকা যাচ্ছে না আদৌ। সিনটা হল এরকম যে ভীষণ রেগে ইয়াসমিন নামে মেয়েটি কবীরের গেঞ্জি ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়েছে জোরে। আর নিরস্ত্র সেই একলা মেয়েকে থামিয়ে দিতে অমনি তখন চারপাশ থেকে উঠে আসছে একের পর এক পুরুষ সিংহের মেশিন গানের নল!

কোন লজিকে এই মোমেন্টটা শুট করলেন দাদা? একলা একটা মেয়েকে আটকে দিতে সত্যি সত্যি এতগুলো অস্ত্রধারী পুরুষ লাগে বুঝি?

এত প্রশ্ন তুলছি মানে কিন্তু এটা নয় যে, এই ছবিটার কোন কিছুই ভাল লাগে নি আমার। সত্যি বলতে কী, দুটো ব্যাপার তো মনে ধরে গেছে বেশ।

এক হচ্ছে, ‘মৌলা মৌলা’ গানটা। গানের মধ্যে বেশ কিছুটা বিশুদ্ধ বাংলা লিরিক আছে, সেটা শুনতে শুনতে একটা সময় দ্রব হয়ে যাচ্ছিল খুব মন।

আর দুই হচ্ছে ছবির একটা ডায়ালগ যে, দাঙ্গা কখনও হিন্দু কিংবা মুসলমানরা করে না, দাঙ্গা করে দাঙ্গাবাজরা। ইনফ্যাক্ট ছবির শেষ দিকে এই ডায়ালগটা শুনতে গিয়ে মনে হল, শুধু এই ডায়ালগটা শোনাবেন বলেই বোধহয়, ছবির নির্মাতারা বানিয়ে ফেলেছেন এই আস্ত গোটা ছবি!

সেটা যদি সত্যি হয়, বলতেই হয় উদ্দেশ্য খুব ভাল। শুধু মুশকিল হল এইটে যে, স্পেসিফিক কোন মেসেজ দিতে ছবি বানালে, সেটা আদৌ সিনেমা হয় না প্রচার চিত্র, সেটা নিয়ে ছোটমাপের খটকা আছে একটা।

কলকাতার একটা হল-এ ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো ‘কবীর’ দেখতে ঢুকে দেখি মেরে-কেটে জনা বিশেক লোক। শেষ দু-তিনটে রো ছাড়া পুরো হাউস প্রায় ফাঁকা মাঠের মতো পড়ে।

ছবি বানিয়ে পাবলিকের মন জেতা আজকাল খুব কঠিন বলেই জানি। প্রযোজক আর পরিচালক দুজনেই সফল হন – অনেক অনেক শুভ কামনা জানিয়ে রাখছি আমি।

আরও পড়ুন:  প্রশিক্ষক মারছেন খুদে সাঁতারুদের! ভিডিও তুলে বিতর্কে অভিনেতা অরিত্র

NO COMMENTS