কালিম্পং ও মর্গান সাহেবের বাড়ি

মর্গান হাউস

বর্তমানে পূণ্যভবনের বাসিন্দা বলতে কর্ণর মামা ও তাঁর স্ত্রী যিনি আমাকে অভ্যর্থনা করলেন। বাংলো থেকে দু’পা দূরে একটা ছাউনির তলায় চেয়ার টেবিল সাজানো… খোলামেলা পরিবেশে সামনে পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে দিব্যি আড্ডা আর লাঞ্চ পর্ব চলছে মামা ও তাঁর বন্ধুদের। মামিমা এগিয়ে দিলেন একথালা গরম খিচুড়ি সঙ্গে আচার – বেগুনিও ছিল, ফুরিয়ে গেছে। এই যথেষ্ট, সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয় নি – তার ওপর পাহাড়ে এত ওঠানামা পেটে ছুঁচোয় এখন ডন মারছে। খেয়ে দেয়ে এবার আসল কাজ – পূণ্য ভবনের স্কেচ করা। ঘাস জমির একধারে চেয়ার নিয়ে বসে পড়লাম। মামিমা কাজের লোককে দিয়ে এক ঝুড়ি অনেকটা চেরি গোছের কী একটা ফল আনিয়ে বললেন, এর নাম মোলোরো – ব্যাগে ভরে ফেলো, বাড়ি গিয়ে বলবে আচার বানিয়ে দিতে।’

মর্গান হাউসে ঢোকার রাস্তা

ফেরার সময় রাস্তা অবধি এগিয়ে দিয়ে মামিমা জানালেন, এটা ধরে সোজা ওপরে উঠলেই ‘মর্গান হাউস’। পরের বছরেই শীতের শুরুতে গিন্নিকে নিয়ে আবার কালিম্পং গিয়েছিলাম শুধুমাত্র এই মর্গান হাউসে থাকব বলেই। জনৈক মর্গান সাহেবের তৈরি কাঠ আর পাথরের বিশাল অট্টালিকা – যা এখন সরকারি ট্যুরিস্ট লজ্‌ – দোতলায় একটা ঘর নেওয়া ছিল। কালিম্পং-এর জিপ স্ট্যান্ড থেকে একশো টাকা দিয়ে মারুতি ভ্যানে চেপে আমরা উঠে গেলাম বাড়ির দোরগোড়া পর্যন্ত। দু’পাশে বাগান আর সবুজ ঘাসজমি – একটা তো প্রায় ফুটবল মাঠের সমান। জায়গাটা পাহাড়ের অনেকটা ওপরে। চারদিক খোলা, সামনেই কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝকমক করছে।

কাঠের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে ধপাধপ করে উঠে ডান হাতেই আমাদের ঘর। বিশাল খাট, আলমারি, সোফা সেট, লেখার টেবিল চেয়ার – সব মিলিয়ে এলাহি ব্যাপার। একতলা-দোতলা মিলিয়ে থাকার ঘর গোটা ছয়েক – বাকিগুলো লাউঞ্জ, খাবার ঘর, রান্নাঘর ইত্যাদি। রোদ ঝলমলে দিন, আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তাটা পেরোলেই গলফ কোর্স, সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, পাহাড়ের ঢালু বেয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অনেক নীচ অবধি। মাঠের ধার বরাবর হাঁটার রাস্তা রয়েছে, যত খুশি বেড়াও। ঢোকার মুখেই স্ন্যাক্সবার, সঙ্গে হাতে তৈরি মুখোশ, পুতুল, ব্যাগ ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গরম কফি খেতে খেতে একটা স্কেচ করে নিলাম। এখান থেকে কিছুটা হাঁটলেই ‘তাসি ডিং’ – আরও একটা থাকার জায়গা। বড় বড় গাছপালার মাঝখানে প্রায় লুকিয়ে আছে। বেশ ছিমছাম আর নিরিবিলি। তবে মুশকিল হল খাবার দাবার সব বাইরে থেকে আনাতে হয়। দুপুরে ভাত-সব্‌জি আর মুর্গির কারি দিয়ে লাঞ্চ সারলেও রাতে এদের কন্টিনেন্টাল খাবারটা ট্রাই করতে অনেকেই বলেছিল।

গলফ কোর্স

একটু বেলার দিকে এদের স্পেশাল রান্নার লোকটি এলেন – মোটাসোটা, হাসিখুশি, বয়স্ক এক নেপালি। সরাসরি ওঁকেই অর্ডার দেওয়া হল ডিনারে একটা গোটা চিকেন রোস্ট-এর। উনি গিন্নিকে ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন কীভাবে বানাবেন, মাংসর ওজন কতটা হবে, সঙ্গে আর কী থাকবে ইত্যাদি। ফ্রুট স্যালাড চেয়েছিলাম, জানা গেল, ওটা একদিন আগে বলতে হয় – নীচের বাজার থেকে টাটকা ফল নিয়ে আসে কি না। মর্গান হাউস ছাড়িয়ে আরও ওপর দিকে পাহাড়ের মাথা পর্যন্ত পুরো এলাকাটাই সেনা বাহিনীর আওতায় পড়ে। একেবারে চূড়ায় রয়েছে একটা গুম্ফা – বেশ লম্বা আর খটোমটো নাম। দুপুরে আমরা অদ্ভুত পরিচ্ছন্ন একটা রাস্তা ধরে আধঘন্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম। আশপাশের বহু লোক গাড়ি নিয়ে এখানে এসেছে, লাগোয়া মাঠে ফৌজিরা সব জমিয়ে ভলিবল খেলছে। গুম্ফার একেবারে টং-এর ছাদ থেকে চারদিকের খোলামেলা পাহাড়ের অপুর্ব দৃশ্য উপভোগ করা যায়। জনা চারেক কলেজে পড়া স্থানীয় মেয়ে নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টায় মশগুল ছিল। আমাদের দেখে একজন হেসে বলল, আঙ্কল, আপনারা দুজনে দাঁড়ান, আমি ছবি তুলে দিচ্ছি।’ পড়ন্ত রোদ, সব ছবিতেই ওর ছায়া এসে যাচ্ছে। শেষকালে বললাম অ্যাঙ্গেলটা একটু পাল্টাতে।

তাসি ডিং টুরিস্ট লজ

বেলা ছোট হয়ে আসছে, মর্গান হাউস ফিরতে না ফিরতেই ঝুপ করে সন্ধ্যে নেমে গেল। এবার হাত পা ছড়িয়ে রিল্যাক্স করার সময়। মুচমুচে ফ্রায়েড চিকেন এল – ওয়াইনের বোতল খুলে কর্তা গিন্নি দুজনে বসলাম। অতবড় বাড়িতে আমরাই একমাত্র বোর্ডার – ফলে বেশ নিঝুম পরিবেশ। ভূতের বাড়ি হিসেবে মর্গান হাউসের যথেষ্ট খ্যাতি আছে। ১৯৩০-এর দশকে জর্জ মর্গান নামের এক ইংরেজ এই বাড়ি বানিয়ে থাকতে শুরু করেন এবং এখানেই ওঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। সাহেব সম্ভবত তারপর দেশে ফিরে গেলেও সেই মহিলা নাকি ভূত হয়ে আজও বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ান – এখানে থাকতে এসে অনেকেই তাঁকে দেখেছে বলে জোর গলায় দাবী করে।

কালিম্পং সার্কিট হাউস

ওয়াইনের ঘোরে আমারও হয়ত সেই রাতে মিসেস মর্গানের সঙ্গে মোলাকাত হয়ে যেতে পারত। কিন্তু গিন্নি কিছুতেই আমাকে ঘরের বাইরে পা বাড়াতে দিল না। রাতে যে রোস্টটা এল, সেটাও তার বিশেষ পছন্দ হয়নি। নভেম্বর মাসেও তেমন ঠাণ্ডা লাগছে না দেখে সত্যিই বেশ অবাক হলাম। পাহাড়ের ক্লাইমেটটা ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। এই কালিম্পঙেই তো আজকাল গরমকালে পাখার দরকার হয় বলে শুনতে পাই … যদিও তার কোনও ব্যবস্থাই চোখে পড়েনি।

পরের দিনই আমাদের নেমে গিয়ে ট্রেন ধরা। তবে সকালে ব্রেকফাস্টটা কিন্তু জব্বর হল, ঘাস জমিতে, রঙিন ছাতার তলায় টেবিল-চেয়ার পেতে। হালকা রোদে পিঠ দিয়ে বসে টোস্টে কামড় দিতে দিতে ভাবছিলাম, কলকাতায় ফিরে আমিও একটা ভূত দেখার গা ছমছমে গল্প বানিয়ে ফেলব কি না।

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/the-beautiful-kalimpong-seen-trough-the-eyes-of-an-artist/

দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here