আমি অস্কার পেয়ে গেছি : কাঞ্চন মল্লিক

কাঞ্চন মল্লিকের পরিচয় নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই | শুধু কমেডি নয়‚ অভিনেতা হিসেবে কাঞ্চনের রেঞ্জ অবাক করার মতো | অভিনয় থেকে ব্যক্তিগত জীবন‚ প্রাণ খুলে কথা বললেন তন্ময় দত্ত গুপ্তর সঙ্গে |

আপনি সিনেমায় আসার আগে সেলসের চাকরি,বিউটি পার্লারে কাজ করতেন।কেমন ছিল সেই সময়?

কাঞ্চন মল্লিক : সেই সময় সংসার চালাতে হতো।কেরিয়ার সম্পর্কে ভাবার সময় পেতাম না।ন্যূনতম গ্রাসাচ্ছাদনের দরকার ছিল।থিয়েটার করতাম।সেটা ছিল প্যাশন।কখনও ভাবিনি ফোটোশুট করে সিরিয়াল বা সিনেমার প্রোডাকশান হাউজে দেব।আমার যা চেহারা তাতে ফোটোশুট করে কোনও লাভও হতো না।তাই চাকরির পাশাপাশি থিয়েটার করতাম।

সেটা কি নব্বইয়ের দশক?

কাঞ্চন মল্লিক : হ্যাঁ, নব্বইয়ের দশক।আমি ডোর টু ডোর,শপ টু শপ সেলস করতাম।এল আই সি,ইউ টি আই-এর এজেন্ট ছিলাম।এই করে সংসার চলত।নব্বইয়ের দশকের শেষে সিরিয়ালে ছোট ছোট চরিত্র করেছি।তার পরে করলাম “জনতা এক্সপ্রেস”।

নব্বইয়ের দশকে আপনি কৌশিক সেনের স্বপ্নসন্ধানীতে থিয়েটার করছেন।শেষের দিকে সিরিয়ালও করছেন।সিনেমাকে তখন কীভাবে দেখছেন?

কাঞ্চন মল্লিক : আমি সব ধরনের ছবি দেখি।বিরাট বোদ্ধার মতো ফেলিনি,ত্রুফো,গোদার দেখেছি,তা নয়।সেই সব ছবি পরে দেখেছি।আমি খুব অমিতাভ সাপোর্টার।গুছিয়ে অমিতাভ বচ্চনের ছবি দেখেছি।ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো গেছি।তখন যে সিনেমা করব মনের কোণে আসেনি।

গ্রুপ থিয়েটারের ক্ষেত্রে একটা কথা প্রচলিত,এই থিয়েটারে অভিনয় করলে পয়সা পাওয়া যায় না।ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো।আপনার বাড়ির লোক তেমন কিছু বলেনি?

কাঞ্চন মল্লিক : আমার বাড়ি থিয়েটার মনোভাবাপন্ন ছিল না।যদিও আমার ঠাকুমা চিত্রা মল্লিক যাত্রা শিল্পী।দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময় উনি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন।একটা অভিনয়ের পরিমণ্ডল ছিল।কিন্তু আমি বিরাট ব্যাকআপ পাইনি।থিয়েটার আমাকে মানসিক বিষাদ থেকে বার করত।থিয়েটার আমার কাছে ছিল অক্সিজেন।

আপনি জনপ্রিয় হওয়ার পরে ছেড়ে চলে যাওয়া বান্ধবীরা নাকি আবার ফিরে এসেছিল?

কাঞ্চন মল্লিক : প্রশ্নটা আপনি ঘুরিয়ে রাখছেন তো।আমি পরিস্কার করে বলছি।থিয়েটার একটা ভালোবাসার জায়গা।থিয়েটারের প্রতি একজন নাট্যকর্মীর কতোটা প্যাশনথাকে সেটা বান্ধবীর বোঝা সম্ভব নয়।

সিনেমার জনপ্রিয়তা দেখেই কি সবাই আকৃষ্ট হয়?

কাঞ্চন মল্লিক :  সিনেমায় পরিচিতি পেলে মানুষ ভাবে সে বড় হয়ে গেছে।আমার নাম ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বান্ধবীরাই বলল —“কাঞ্চন আমাদের ভালো বন্ধু ছিল”।পাবলিক ফিগার হয়ে যাওয়ার মজাটাই এরকম।

লাইমলাইটের এতো জোর?

কাঞ্চন মল্লিক : তা আর বলতে!লাইমলাইট গায়ে পড়লে সবাই সব ভুলে যায়।

আপনার চেহারা একেবারেই নায়কের মতো নয়এই রোগা পাতলা চেহারায় কী করে পপুলার হলেন?

কাঞ্চন মল্লিক : দুটো ফ্যাক্টর কাজ করে।আপনি মানুষের কাছে যত যাবেন,মানুষগুলোকে আপনার মানুষ মনে করতে হবে।পাশের লোকটাকে পাশের লোক বলে মনে করতে হবে।আমার বাড়িতে একটা আয়না ছিল।যেখানে দেখে আমি এ্যাসেস করতাম।আমার রোগা চেহারায় হিরো হওয়া সম্ভব নয়।আমার হাড় গিল গিলে হাত —এটা বাস্তব।এটাকে মেনে নিতে হবে।একটা ছোট মুখে বড় কথা বলি?

বলুন।

কাঞ্চন মল্লিক : আজ যদি ছবি বিশ্বাসের হাঁপানি স্টাইলাইজেশন হতে পারে,তাহলে আমার চেহারা নয় কেন।আমি কেন নিজেকে রোগা কাঞ্চন বলতে ইতস্তত করব।আমি তো বাঁটুল কাঞ্চন নই।আমি যদি আমার শরীরকে নিয়ে মজা করি।বা মকারি করি,সেটা তো মিথ্যে নয়।আর লোকের তা ভালো লাগছে।আমি তাদের এন্টারটেইন করতে পারছি।দ্যাটস ইট।

আপনার ক্ষেত্রে বিনোদনের দুটো শ্রেণী রয়েছে।থিয়েটার শিক্ষামূ্লক বিনোদন অন্যটা নিছকই বিনোদন।দুটো ভিন্ন শ্রেণীকে ব্যালেন্স করেন কীভাবে?

কাঞ্চন মল্লিক : দাদা আমি আপনাকে একটা কথা বলি।বিনোদনটা বিনোদনই।দুটো চোর যখন কথা বলে,তখন তাদের মধ্যে থেকে একটা ক্লাস বা শ্রেণী উঠে আসে।আমার কাছে প্রত্যেক মানুষই মানুষ।কেউ পৈতে পরা নয়।বা গামছা পরা নয়।থিয়েটার ছাড়া সিনেমায় আমি একটা ভারী কথা বলে দিতে পারি।সেটা খুব হাসির ছলে বলি।ব্যঙ্গের ছলে বলি।তাই আমার কাছে বিনোদনটা বিনোদনই।আলাদা শ্রেণী বলে কিছু নেই।

আপনার কী মনে হয় আপনার মতো রোগা ছেলেকে সবাই ভালোবাসে কেন?

কাঞ্চন মল্লিক : কারণ তারা এই ছেলেটাকে পাড়ায় দেখে।বা আমাকে মনে করে নেক্সট ডোর নেবার।সেটাই মানুষের সঙ্গে কানেক্ট তৈরি করে।

শুধুমাত্র পেশার তাগিদে কোনও চরিত্র করতে কখনও বাধ্য হয়েছেন?

কাঞ্চন মল্লিক : এটা সবার ক্ষেত্রে হয়।নাম বলব না।আমি যখন হাফ প্যাণ্ট পরে বা খালি গায়ে অভিনয় করি,তখন সেই চরিত্র আমি হাণ্ড্রেড পারসেন্ট বিলিভ  করি।পারিশ্রমিকের জন্য সবাই কাজ করেন।কেউ মহৎ কিছু করছেন না।সবাই পারিশ্রমিক নিয়ে কাজ করছেন।

আপনার মধ্যে যে কমেডি মার্কা স্ট্যাম্প পড়ে যাচ্ছে, সেটা কী ভাবায়?

কাঞ্চন মল্লিক : ক্যামেরার সামনে আমার ২১ বছর কাজ করা হয়ে গেছে।এখন তো তবুও রাজকাহিনি,ধনঞ্জয়,জুলফিকারের মতো ছবির আসে।যে কথাটা আপনি বলছেন, সেটা ঠিক।কিন্তু তার জন্য দুই পক্ষেরই ওয়েট করতে হয়।

দুই পক্ষ বলতে?

কাঞ্চন মল্লিক : আমি এবং পরিচালক প্রযোজক।তাদেরও বুঝতে দিতে হবে,সময় দিতেহবে।তাদেরকেও বোঝাতে হবে যে দুরকম ছবিতে আমি অভিনয় করতে পারি।আমি “নটীর পুজো” বলে একটা নাটক করেছিলাম।সেখানে মাধবাচার্য বলে একটা নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয় করেছি।নাটকটা দেখে আমার স্কুলের এক বন্ধু বলেছিল —“ভাইরে ভাই, কী করেছিস,অনেকদিন পর খালি গায়ে কাঞ্চন মল্লিককে দেখে কেউ হাসল না”।মাঘন রাজার পালায় আমি আমার জামাটা ছুঁড়ে ফেলে দেই।কই কেউ তো হাসে না।এই লোকগুলোই তো আমার সিনেমা দেখতে যায়।আমি স্টেজে সিরিয়াস অভিনয় করার সময় কেউ তো হাসে না।এটাই প্রাপ্তি।

এরকম অনেক প্রতিভাবা অভিনেতা ছিলেন এবং আছেন,যাদের এখন কাজ নেই।উত্তম কুমারের সমসাময়িক অভিনেতা নির্মল কুমার।তাঁকেকে বিগত দশ কি পনেরো বছর ধরে স্ক্রিনে দেখাই যায় না।তিনি নিখোঁজ রহস্যের মতো।কখনও মনে হয় আপনিও একদিন নিখোঁজ রহস্য হতে পারেন?

কাঞ্চন মল্লিক : সেটা জেনেই এ জগতে এসেছি।আমাকে কেউ বন্দুক ধরে এই প্রফেশনে আনেনি।দশটা পাঁচটার ডিউটি আমার দ্বারা হবে না।নির্মল কুমারের প্রসঙ্গে বলি,আপনি একদিকের পার্সপেক্টিভের কথা বলছেন।উল্টোদিকের পার্সপেক্টিভটাও আপনাকে দেখতে হবে।আমি কাউকে ছোট করছি না।পরের প্রজন্মের অনেকে হারিয়ে যাচ্ছেন।কথা হলো সেটা কি শুধু একতরফা?বোধহয় নয়।তুলসী চক্রবর্তীর মতো অভিনেতারও মূল্যায়ন হয়নি।বিদেশে থাকলে স্যার উপাঢি পেতেন মশাই।

এই অবস্থা কেন হচ্ছে বলে মনে হয়?

কাঞ্চন মল্লিক : সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় কিন্তু সত্যজিৎ রায়,মৃণাল সেন,ঋত্বিক ঘটকের ছবি করেন নি।তার মানে কি উনি খারাপ অভিনেত্রী?কী বলবেন বলুন।এখানে কিছু তো বলার নেই।আজকের সময় পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়,খরাজ মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতা রয়েছেন।আমি,রুদ্রনীল,তনিমা সেন রয়েছি।একটা সেরকম স্ক্রিপ্ট কি পেলাম?তেমন ডিরেক্টর পেলাম কি?যে কমেডিটাকে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের মতো হ্যাণ্ডেল করতে পারে…।

দর্শকদেরও সেই টেস্ট কি আর নেই?

কাঞ্চন মল্লিক : দাদা একটা কথা আপনাকে বলছি।কিছু মনে করবেন না।আপনি একসময়ে রসগোল্লা খেতেন।মাঝখানে আপনাকে ভেজাল খাইয়ে আপনার স্বাদ নষ্ট করা হয়েছে।তারপরের একটা প্রজন্ম এসে সেই টেস্টবারগুলোকে জিভছোলা দিয়ে চাঁচার কাজ করছে।ম্যাজিকের মতো এসে কেউ ট্রেণ্ডটা পালটে দিতে পারে না।আশি নব্বইয়ের দশকে আপনাকে খাইয়েছে ফলিডল।হঠাৎ করে দর্শক  যদি বলে—“পায়েস কোথায় গেলো”?তখন একটাই কথা বলার থাকে।

কী?

কাঞ্চন মল্লিক : ফলিডল খেয়ে যাদের অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে,পায়েসের  স্বাদ পেতে তাদের সময় লাগবে।

খালি গায়ে লাফালাফি করতে করতে কখনও মনে হয় —এটা কী করছি ?

কাঞ্চন মল্লিক : তার জন্যই থিয়েটার করি।আজ সৃজিত মুখার্জী ম্যাকবেথ যদি করে,তাহলে কি ম্যাকবেথের রোল আমাকে দেবে?দেবে না।ভালো কাজের খিদে নিয়ে বসে আছি।একটু অন্যরকম কাজ পেলে ভাবি,কীভাবে পুরানো বলে আউট সুইং করব।আরো কিছু বলার আছে।

কী বলার আছে?

কাঞ্চন মল্লিক : আগে রজতাভ দত্ত স্বপ্নসন্ধানীতে “প্রথম পার্থ” করত।বাংলা ছবিতে ওকে কেউ এরকম চরিত্র দেবে?

এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনও বাণিজ্যিক কারণ আছে?

কাঞ্চন মল্লিক : বোধ হয় আমার খালি গায়ে অভিনয় বিক্রি হয়।কী করা যাবে বলুন?

ভালো কাজের খিদে আপনার আছে।এমন কোনও ফিডব্যাক আছে যা টনিকের মতো আপনাকে ইন্সপায়ার করেছে?

কাঞ্চন মল্লিক : আমি একবার লক্ষ্মীপুজোর সময় উত্তমকুমারের বাড়িতে গিয়েছিলাম।আমার সৌভাগ্য গৌরব আমাকে নেমনতন্ন করেছিল।বাড়িটার মধ্যে ঢুকলেই কেমন নস্টালজিক হয়ে পড়ি।উইথ পারমিশন দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলোর মোবাইল ক্যামেরায় ফটো তুলি।পক্ককেশের শ্বেতশুভ্র মহিলা আমাকে জড়িয়ে বললেন —“তুমি এসেছ”!আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন —“তোমার অভিনয় আমার খুব ভালো লাগে।এ বাড়িতে অনেকেই এসেছেন।অনেকের কাজ দেখেছি।তোমার কৌতুক অভিনয় দেখে আবার ভালো লাগছে”।উনি গৌরবের ঠাকুমা হন।আমার তখন মনে হল আমি অস্কার পেয়ে গেছি।

এখন অনেকে আপনার ফ্যান।আপনি কার ফ্যান?

কাঞ্চন মল্লিক : অনেকে আমার চেহারা দেখে চিন্ময় রায়ের সঙ্গে তুলনা করেন।আমি ফিজিক্যাল অ্যাক্টিং খুব পছন্দ করি।আমি ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুব ফ্যান।এখনও ওনারছবি হাঁ হয়ে দেখি।

বাংলায় নায়কদের মধ্যে কাকে মনে হয় সেরার সেরা?

কাঞ্চন মল্লিক : অভিয়াসলি উত্তম কুমার।কোনও কথা হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here