‘কণ্ঠ’ কি আসলে অবাস্তব আর ফিল-গুড রূপকথা?

KANTHO REVIEW

‘কণ্ঠ’ দেখতে দেখতে যে কথাটা মনে হচ্ছিল, এই লেখাটা লিখতে গিয়ে শিরোনাম হিসেবে লিখে দিলাম সেটাই। সত্যি কি এটা ক্যান্সার থেকে যুদ্ধ করে ফিরে আসার স্টোরি? নাকি এই গল্প আসলে মিথ্যে, মেকি, ফিল-গুড বাজার-চলতি সিনেমা-মার্কা কিছু?

সারা জীবন চেন স্মোকিং চালিয়ে গিয়ে থ্রোট ক্যানসারের কবলে পড়েন আমার খুব চেনা এক মানুষ। তাঁকে সুস্থ জীবনে ফেরত আনার তুমুল লড়াই কাজ দেয় নি কোন। বেসরকারি ফাইভ স্টার হসপিটালে এই রোগের সঙ্গে নাতিদীর্ঘ লড়াই শেষে চরম হার হয়ে যায় তাঁর। সে সময় সেই লড়াইয়ের খুব সামান্য এক অংশ ছিলাম আমিও। কিন্তু থাক সে কথা, ব্যক্তিগত সেই কাহিনি বলতে বসার পরিসর নয় এটা।

ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করা কাকে বলে, ঠিকঠাক সেটা বুঝতে হলে উলটে দেখতে পারেন বরং বিশেষ একটা বই। বইয়ের নাম ‘কর্কটসহবাস’ (থীমা, প্রথম প্রকাশ ২০১২)। প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষ অজয় গুপ্তের কোলন ক্যানসার হয়েছিল। বয়স তাঁর সত্তর পেরিয়ে গেছে তখন। সেই বয়সে চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যানসার ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়ে সেই রোগের সঙ্গে তুমুল এক ফাইট দেন তিনি। আর হ্যাঁ, জিতেও যান শেষে! সেই যুদ্ধের পুরো বিবরণ ডার্ক হিউমারে গার্নিশ করে এই বইটায় লিখে রেখেছেন তিনি।

সেই বইয়ের ভূমিকায় একটা অমোঘ লাইন লেখা রয়েছে, জানেন? ‘গত শতকের ষাটের দশকে আমার এক দাদা-কাম-বন্ধুর জামাইবাবু ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে ডা. অমিয় সেন বলেছিলেন, ক্যান্সার হলে চিকিৎসা না করালে মারা যাবেন। চিকিৎসা করালে ধনে-প্রাণে মারা যাবেন।’ এখন এটা যে কী নিষ্ঠুর এক সত্যি কথা, সেটা এই রোগের সঙ্গে সাধারণ মানুষ যাঁরা লড়তে গেছেন, সবাই তাঁরা জানেন।

ঠিক এই অ্যাঙ্গেল থেকে নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদের ‘কণ্ঠ’ দেখতে বসে মনে হচ্ছিল, বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন গল্প বোধহয় এটা। কারণ পুরো ছবিতে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই লড়তে দেখানো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সরাসরি একবারও কোথাও বলা হচ্ছে না কোন টাকা-পয়সার কথা!

এক জায়গায় এরকম একটু কথা রয়েছে যে, অসুখের জন্যে সংসারের পুরুষ মানুষটা একেবারে বসে গেছে বলে উপার্জনের পুরো লোড গিয়ে পড়ছে তাঁর স্ত্রীর ওপরেই শুধু। কিন্তু বেসরকারি হসপিটালে এই অসুখ সারাতে গেলে অ্যাকাউন্টে যে কুবেরের ধন রাখতে হয়, সেটা নিয়ে ছবিতে কোথাও একটা শব্দ নেই!

ছবিতে ক্যানসারের পুরো চিকিৎসা যেন রূপকথার ম্যাজিকের মতো হল!

রেডিও জকি অর্জুন (শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)। এটা তারই ক্যানসার থেকে সুস্থ হয়ে ফেরত আসার গল্প। তার স্ত্রী পৃথা (পাওলি দাম) – টিভি চ্যানেলের নিউজ অ্যাংকরিং করে। আর আছে রোমিলা (জয়া আহসান)। অপারেশনে ‘ভয়েস বক্স’ বাদ চলে যাওয়ার পর নতুন করে কথা বলা শেখার জন্য অর্জুন শরণ নেয় তার।

এটা তো মানতেই হবে যে, ছবির বিষয় হিসেবে অনবদ্য এটা। শুধু মুশকিল হল, ছবির সঙ্গে রিয়্যালিটির কানেক্ট খুব কম। সেটা যদি ঠিক ঠিক ভাবে থাকতো তো এ ছবির মাস্টারপিস হয়ে যাওয়ার কথা।

আমার মত মিডল ক্লাস লোকের কাছে টাকার ব্যাপারটাই সবচেয়ে বড় খটকা লাগায় মনে! বাংলা বাজারে কত হতে পারে একজন রেডিও জকির মাইনে? কত হতে পারে একজন নিউজ অ্যাংকরের ফি-মাসের টাকা? সিনেমায় তো এটাও আবার দেখান হচ্ছে যে, আরও কিছু এক্সট্রা রোজগার করার জন্যে সকালবেলা নিজের বাড়িতে আবৃত্তি শেখানোর ক্লাসও বসায় অর্জুন। তা’ তেমন একটা বাড়িতে এসে এমন রোগ ছোবল মারল, অথচ কারুর টাকা-পয়সার অসুবিধে হল না?

আত্মীয়েরা হিন্ট দিতে তবে অর্জুন বুঝতে পারল, ওর ব্যয়ভার ওর বৌয়ের কাছে ‘বোঝা’!

ছবির একেবারে শুরুর দিকে আসুন। একটা অ্যাওয়ার্ড শোয়ের সিন। ‘হিট’ রেডিও শো করে ‘ভয়েস অফ বেঙ্গল’ পুরস্কার পাচ্ছে অর্জুন। আর সেই পুরস্কারের মঞ্চে উঠে মাইক হাতে কথা বলতে গিয়েই ও দেখল ‘চোক্‌ড’ হয়ে গেছে গলা! পুরস্কার নিল বটে, কিন্তু কোন কথা বলা হল না ওর। রোগের প্রথম ছোবল সেটা! এই মুহূর্তটা এমন যে, গায়ে কাঁটা দিয়ে গেল দেখে!

কিন্তু আফশোসের ঘটনাটা কী জানেন? এই একটা সিনের পরে বাকি পুরো ছবিটায় এমন কোন সিন এল না আর, যেটা দেখে শিরশিরে অনুভূতি হবে গায়ে, গলায় দলা পাকাবে কী-যেন-কষ্ট এসে!

এরপর কাশির গমকে রক্ত। ঝকঝকে এক নার্সিং হোমে ডাক্তারের কাছে অর্জুন আর পৃথা। কী দ্রুত ডাক্তার ধরে ফেললেন, ক্যানসার হয়েছে গলায়। ‘রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি অনেক আছে, কিন্তু ফোর্থ স্টেজ বলে সার্জারি করতে হবে’ শুনিয়ে দিলেন তিনি। এবার মুশকিল হল এই যে, ক্যানসার কনফার্ম হওয়ার এই এক্সট্রিম ধাক্কাটা অর্জুনের শরীরে-মনে কোথাও গিয়ে লাগলো কিনা, সেটা সিনেমা দেখে তেমন কিছু বোঝা তো গেল না আদৌ! উলটে অর্জুন দেখলাম গলা চড়িয়ে দিব্যি তক্কো চালিয়ে যাচ্ছে যে, যেহেতু ও ওর গলার আওয়াজ বেচেই খায়, তাই অপারেশান কিছুতে করাতে চায় না ও! একটা দৃশ্যে পঁচিশ বছরের সঙ্গী সিগারেটকে যেভাবে বিদায় জানাতে দেখি, তাতে মনে হয় পুরোটা যেন নীচু লয়ের রোমান্স চলছে কোন!

ওর পরিজনদের একজনও ওকে তিরস্কার করে এটা বলে না যে, চেন স্মোকিং করে করে স্বেচ্ছায় রোগটাকে নিজের শরীরে ডেকে এনেছে ও!

একটা ঘরে সবাই কথা বলছে রোগটা নিয়ে, তখন হঠাৎ ওর সাত বছরের ছেলে টুকাই ঢুকে পড়ে বলল, ‘বাবা আমি ফার্স্ট হয়েছি’। আর এটা শুনে ঝরঝর করে কাঁদতে শুরু করল সেই ঘরের সব লোক! আমি তো দেখে থ’ হয়ে গেছি পুরো! মনে হচ্ছে, আরে বাবা, এই যে অন স্ক্রিন সব চোখের জল, সেটা তো স্ক্রিনেই আটকে থাকছে, ইমোশনটা উপচে এসে একবারও তো ছুঁয়ে যাচ্ছে না মন!

এর একটু পর ‘আমার হাঁটুজলে, স্মৃতিরা ভেসে চলে, জীবন কথা বলে, সবাই চুপ’ বলে অর্জুন আর পৃথার নাচের দৃশ্য, বৃষ্টিতে ভিজে প্রেমের দৃশ্য আর এর সঙ্গে কাট করে করে ঝাঁ-চকচকে হসপিটালে অর্জুনের অপারেশানের জন্য অ্যাডমিট হয়ে যাওয়ার দৃশ্য!

এর আগে অবধি ছবিতে দেখা গেছে অর্জুনের একগাল দাড়ি। হসপিটালের সিন থেকে দেখবেন, সেই দাড়ি কমে হয়ে গেছে ফ্রেঞ্চ কাট! সেটা দেখে আমার অন্তত কনফিউজ্‌ড লাগছিল খুব, কারণ বুঝতে পারছিলাম না, গলায় অপারেশানের ক্ষেত্রে কমপ্লিট শেভ না করে এভাবে ফ্রেঞ্চ কাট রাখার ব্যাপার ডাক্তারেরা অ্যালাউ করলেন কেন!

নাকি এটা ওই যাকে ‘সিনেম্যাটিক লাইসেন্স’ না কী যেন বলে, সেইটে?

শুধু অপারেশান না, এরপর প্রায় ঝড়ের বেগে রেডিয়েশন অবধি শেষ! আর ঘটনা হল, এই যে রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রায় অসহ সব মোমেন্ট, সেগুলোর কোন ডিটেল ছবিতে নেই! মায় রেডিয়েশনের ফলে কোন সাইড এফেক্ট অবধি আপনি হতে দেখবেন না কোন!

রেডিয়েশনের ফলে যে সমস্ত সাইড এফেক্ট হতে পারে, সেটার অন্যতম একটা হল, যেখানে ‘রে’ দেওয়া হবে, সেই পুরো অংশ জুড়ে বেশ কয়েক সপ্তাহের জন্য সম্পূর্ণ হেয়ার লস। কিন্তু হাঁ হয়ে গেলাম এটা দেখে যে, এই হেয়ার লসের কোন চিহ্ন অর্জুনের ফ্রেঞ্চ কাটে নেই! বাকি পুরো ছবিতে ওর এই লুকটাই আছে! এমনকি যখন ও ঘোরতর ডিপ্রেশনে, তখনও অবধি কী যত্ন নিয়ে ওই ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি মেনটেন করে গেছে!

ছবি দেখে মনে হচ্ছিল, এর অন্যতম দুর্বলতা রিসার্চ এবং স্ক্রিপ্ট! সিগারেট থেকে ক্যানসার হয়, আজকের দিনে সেটা তো কিছুটা অবভিয়াসের মতো। কিন্তু এটা ছাড়াও শরীরে ক্যানসারের উস্কানি তো আরও বহু কিছুই দেয়! এমন বেশ কয়েকটা জিনিষ তো এই ছবিতে দেখানো হল কার্যত যেন নিরীহ এবং নির্দোষ চিজ বলে!

তার একটা হচ্ছে ধূপকাঠির ধোঁয়া। সিগারেটের ধোঁয়া যত ক্ষতিকর, তার চেয়ে ধূপের ধোঁয়া কিছু কম ক্ষতিকর নয়! তা’ ছবিতে একটা দৃশ্যে ঘরের মধ্যে দেখতে পাবেন সেই আপাত-নিরীহ ধোঁয়া। আবার পার্টির একটা দৃশ্যে দেখবেন জমিয়ে তৈরি হচ্ছে আমিষ কাবাব! নন-ভেজ এই কাবাব তো আসলে কার্সিনোজেনিক খুব।

এরপর আরও দেখবেন ঢেঁকুর তোলার জন্যে গেলাস গেলাস কোলা-মার্কা সফ্‌ট ড্রিংক পান করছে অর্জুন! আর অসুস্থ শরীরে বাজারে গিয়ে প্রথম যেটা কিনছে সেটা একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের ইনস্ট্যান্ট ন্যুড্‌লস! দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল জানতে চাই যে, এমন একটা রাজরোগ নিয়ে তৈরি ছবি, অথচ লাইফ স্টাইলের ‘পজিটিভ’ হ্যাবিট হিসেবে এসব কী চিজকে ছবিতে প্রমোট করছেন আপনারা?

রোমিলার ক্যারেক্টারটা মনে হচ্ছিল অসঙ্গতিতে ভরা। সামান্য একটা টব ভেঙে ফেলার জন্য যে তার সহায়ক কোন লোকের ওপর অসভ্য ভাবে চেঁচাতে পারে তার তো আসলে চূড়ান্ত এক ইনসেনসিটিভ মন! এই ক্যারেক্টারের ইনট্রো হিসেবে এর চেয়ে ভাল কোন সিন পাননি বুঝি কেউ? নাকি এটা কনশাসলি করা? এটা বোঝাতে যে, ট্রেনার হিসেবে দেখতে যাদের এমপ্যাথেটিক লাগে, সেই মানুষগুলোও লো-ইনকাম ক্লাশের ওপর সংবেদনহীন হয়!

এবার স্টোরি-স্ক্রিপ্টের দুর্বলতাটা বলি। অর্জুন মল্লিক নিজের ভয়েস ঠিক করার জন্যে ঠিকানা খুঁজে যার বাড়ি গিয়ে পৌঁছল, দেখা গেল অতীতে একসময় তার মেয়েকেই সুইসাইড করার থেকে বাঁচিয়েছিল ও! এখন এমন চরম একটা কাকতালীয় ঘটনা বাস্তবে যদি কোনদিন ঘটেও থাকে, অন স্ক্রিন তা দেখালে কিন্তু সেটা খুব উদ্ভট আর অবিশ্বাস্য লাগে। ছবিটা বানাতে গিয়ে সেটা একবার মনে হল না কারুর?

আর যে রোমিলাকে নিয়ে বলতে গেলে কিছুই জানে না অর্জুন, তাকে প্রথম একবার দেখেই সে জানিয়ে দিল ‘ইউ আর দ্য বেস্ট’! অর্জুন কি এরকমই ফ্ল্যাটারি করার লোক?

কোথায় কোথায় জোড়াতালি পড়েছে ছবিতে, এবার কিছুটা বোঝা যাচ্ছে তো তা’?

যেটা আসলে হতে পারত অসম এক যুদ্ধ লড়ার টানটান হাড়-কাঁপানো ছবি, সেটার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি গুঁজে দেওয়া আছে অরুচিকর সিন! এরমধ্যে অন্যতম হল পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তনিমা সেনের সিন। ক্যানসারে স্বর-হারানো মানুষদের কথা বলতে শেখানোর কাজ করেন পরাণ অভিনীত চরিত্রটি। তাঁর নিজেরও একই অসুখ, এবং দীর্ঘ অভ্যাসে রিকভার করে নিয়েছেন প্রায়। এঁর কাছে শোনা গেল, প্রথম স্বর ফিরে পাওয়ার পর ইনি নাকি চার অক্ষরের এক গালাগালের ফিফটি পারসেন্ট দিয়েছিলেন, সেটা হল ‘বোকা’। এই দারুণ ‘মজার’ লাইন শুনে হেসে উঠে হাততালিতে ‘হল্‌’-এর লোক গড়িয়ে পড়ল ঠিকই, কিন্তু আমার তখন বেরসিকের মত মনে হচ্ছিল, ছবিতে যারা গালাগালি শুনে হাততালি দেয় – দর্শকাসন আলো করে বসে থাকা এই লোকগুলো কারা?

এর একটু পরেই নেক্সট ধাক্কাটা এল। পরাণ-তনিমা অভিনীত দুই চরিত্রের মধ্যে হালফিলে ফিজিক্যাল রিলেশন কেমন আছে, ঠারেঠোরে সেটা জানতে চাইল অর্জুন। আর এটা শুনে ফের একবার লোকের মধ্যে হৈ-হৈ হাসি আর সিটি মারবার জোশ! এই বয়সের সিনিয়র দুই অভিনেতাকে নিয়ে এমন দৃশ্য আমার কিন্তু হজম হয় নি, স্যরি।

আসলে বয়স্ক মানুষকে ছবিতে ইউজ করা হয়েইছে কমিক রিলিফ করে। চিত্রা সেনের মতো অভিনেত্রীকে দিয়ে চটুল যে ছ্যাবলামিটা করানো হল, সেটা দেখে মনে হচ্ছিল, কে জানে, আজকালকার পাবলিককে মজিয়ে রাখার জন্যে বোধহয় এসব দেখাতে হয়!

এর পাশাপাশি, সো-কল্‌ড আলোকপ্রাপ্তা আধুনিক মহিলাকে দেখান হয়েছে এক্সট্রিম রিগ্রেসিভ বলে। হ্যাঁ, পৃথার কথাই বলছি। ছবির শেষদিকটায় আসুন। একদিন সারাটা দিন রোমিলার সঙ্গে কাটাতে হয়েছে অর্জুনকে। সরল ভাবে সেই বিবরণ পৃথাকে শোনায় সে, এটাও বলে পৃথাকে তখন মিস করছিল খুব। ব্যাস, এটা শুনেই আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায় পৃথার! সঙ্গে সঙ্গে ও এটা ভেবে নেয় যে, ওর বরের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেছে রোমিলার! আর সোজা রোমিলার বাড়ি গিয়ে সরাসরি তাকে বলেও দেয় অর্জুনের জীবন থেকে একেবারে বিদায় নেওয়ার কথা!

এই পার্টিকুলার সিনটা দেখতে গিয়ে মনে হচ্ছিল মান্ধাতার আমলের ক্লিশে টাইপের সিনেমা দেখছি যেন। সিনটা যখন চলছিল, পরপর বেশ কয়েকটা ‘হাই’ না তুলে থাকতে পারি নি আমি!

ক্যানসার রোগীকে নিয়ে দুই নারীর মধ্যে চাপা রেষারেষি দেখিয়ে দিচ্ছেন বেশ। অথচ ল্যারিংক্স ক্যানসারের রোগী ‘ইলেকট্রোল্যারিংক্স’ নামে যে যন্ত্রের সাহায্যে কথা বলতে শুরু করছে, সেই যন্ত্রটা যে ঠিক কেমন যন্ত্র, কাজ করে কী ভাবে, তার প্রপার ইনট্রো থাকছে না কোন! ছবির একটা দৃশ্যে যখন ব্যাটারি ফুরিয়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেল মেশিনটা, আর তাই বিপাকে পড়ল অর্জুন, মেশিন নিয়ে ইনট্রো থাকলে সেই সিচুয়েশনটা তো বুঝতে সুবিধে হত বেশি!

অভিনয় নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমেই লিখতে হবে জয়া আহসানের নাম। খাদ্যনালী দিয়ে কী ভাবে কথা বলতে হবে, সেই ট্রেনিং দেওয়ার দৃশ্যগুলোয় এই মহিলাই সেরা। ঢেঁকুর তোলার আওয়াজগুলো কী রিয়্যাল বলে মনে হচ্ছিল, বাপ্‌স! অর্জুনের ভূমিকায় শিবপ্রসাদকেও দিব্যি লাগে স্ক্রিনে। খাদ্যনালী কিংবা মেশিন দিয়ে বিশেষ টোনে বলা স্বরের সঙ্গে যেভাবে ম্যাচ করে দেখান হল ভূতের রাজার স্বর, সেটাও বেশ জমিয়ে দেয় সিন।

কিন্তু বেশ চোখে লাগছিল ‘ইন ফিল্ম’ ব্র্যান্ড ইনটিগ্রেশনগুলো! কোথাও শুধু ভিস্যুয়াল দিয়ে, আবার কোথাও ডায়ালগেও গোছা গোছা ব্র্যান্ড মেনশন আছে! আর এই লিস্টিতে সর্ষের তেল থেকে শুরু করে খবরের কাগজ, রেডিও চ্যানেল থেকে উড়োজাহাজ – কোন জিনিষটা নেই! সবথেকে রগড় জমেছে অর্জুনের সফট ড্রিংক খাওয়ার সিনে। ছবি জুড়ে এত এত ব্র্যান্ড দেখানো হয়েছে, অথচ দেখবেন সফ্‌ট ড্রিংক্‌সের সিনটায় বোতল থেকে ব্র্যান্ডের নাম লেখা মোড়কখানা ছেঁড়া! তার মানেটা কী, জানেন? চেষ্টা করেও এটার জন্য স্পনশরশিপ পাওয়া যায় নি কোন! আর তাই এই সিনের ব্র্যান্ড প্রেজেন্সও ধাঁ!

যে ছবিতে এত হিসেব কষে ব্র্যান্ড প্লেসমেন্ট হয়, সে ছবিতে রিয়্যাল লাইফের লোকজনকে হাজির হতে দেখলে ঘাবড়ে যাই বেশ। মনে হয় যে, এর পেছনেও কিছু ডিল-টিল আছে কিনা। ছবির শুরুতে একটা অ্যাওয়ার্ড শো, শেষে আরেকটা। শুরুর শো-তে দেখবেন বাস্তবের এক অভিনেতার সপ্রশংস প্রেজেন্স, আর শেষের শো-তে এক গায়িকার! বুঝতে পারছিলাম না যে, এই প্রেজেন্সগুলো নেহাত এমনি এমনি হল, নাকি এর পেছনেও গূঢ় কোন ইকুয়েশন আছে!

শরীরের অক্ষমতা কাটিয়ে ওঠার তুমুল সব পাঠ দিয়েছিল ‘নাচে ময়ূরী’ (১৯৮৬) বা ‘ব্ল্যাক’-এর (২০০৫) মতো ছবি। এমন ধাঁচে তৈরি আরও বেশ কিছু ছবি আছে। ‘কণ্ঠ’ সেই পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছতে পারেনি ঠিকই। কিন্তু এটাও তো সত্যি যে, অভিনব এই বিষয় কোন বাংলা ছবিতে এর আগে দেখাও যায়নি আর।

শরীরের অপরিসীম দুর্দশাতেও কাউকে কাউকে এ ছবি হয়তো ভেঙে না পড়ার সাহস জোগাতে পারে।

এক হিসেবে দেখতে গেলে, সেটাও তো কম কথা নয় কোন। আর হ্যাঁ, একজন মানুষও যদি ছবিটা দেখে ধূমপান ছাড়ার চেষ্টা করেন, তাহলে তো আর কথাই নেই, ছবির সৃজন সার্থক হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here