কন্যাশ্রীর বালা কি পরাধীনতার বালা!

পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই কম বেশি এই দাসত্ব প্রথার প্রচলন ছিল, এমনকি আমেরিকা বা ইংল্যাণ্ডের মত তথাকথিত সভ্য দেশেও এই দাসত্ব প্রথার রমরমা ছিল।সেক্ষেত্রে আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম হতে পারে না।স্কট লেভির মতে, দাসত্ব ভারতের অর্থশাস্ত্র, বা তারও আগে মহাভারতের সময়ের ঘটনা।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথাগত দাসত্ব প্রথার অবলুপ্তি হয়।তথাকথিত সভ্য দেশের মধ্যে আমেরিকার পার্লামেন্টের ত্রয়োদশ অ্যামেডমেন্টে এই প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। পুরোপুরি দাসত্ব প্রথার থেকে শুধুমাত্র মহিলাদের দাসী করে রাখার প্রথা তুলনামূলক কম পুরানো, এই প্রথাও প্রায় সব দেশেই কম বেশি প্রচলিত ছিল।একটা সময় মহিলাদের শুধুমাত্র যৌন দাসী হিসাবে বিক্রির মত এক ঘৃণ্য প্রথা প্রচলিত ছিল, অনেক দেশের গরিব বাবা-মা তাদের মেয়েদের কম বয়সেই কোন এক ধনীব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দিয়ে যেত।সময়ের সাথে সাথে এই প্রথার প্রথাগত অবলুপ্তি হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের একটা আধুনিক রূপ রয়ে গেছে।

অন্যান্য দেশের থেকে আমাদের দেশের এই দাসত্ব প্রথার চরিত্র অনেকটাই আলাদা।মুসলিম শাসনকালে অমুসলিমদের দাস করে রাখবার একটা প্রথা প্রচলিত ছিল, তার আগেও বলা হয় আর্যরা অনার্যদের দাস করে রাখত, আবার কয়েক বছর আগে সংবাদপত্রে একটা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় আরবের বিভিন্ন দেশে অনেক ভারতীয় মহিলা শুধুমাত্র দাসী হিসাবে কাজ করছে।এটাতো দাসী প্রথার প্রকাশ্য রূপ, কিন্তু আধুনিক সমাজে বেশ সুকৌশলে একটা পুরুষতান্ত্রিকতাকে মহিলাদের ওপর চাপাবার সুন্দর প্রয়াস চালানো আগেও হয়েছিল আবার এখনও হয়ে যাচ্ছে, যেমন ধরা যাক আপনাকে চকলেট দিয়ে নাম সংকীর্তন করতে বলা হল অথবা আপনার হাতে চকলেট দাতার নাম খোদাই করা একটা বালা পরিয়ে দিয়ে বলা হল,‘যেখানে যাবেন এটা দেখাবেন।‘ আপনি আরো চকলেটের আশায় সেই বালা দেখাতে লাগলেন, তাহলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকেও কি দাসত্ব প্রথা বলা হবে না?এখন আপনি বলতে পারেন, এতে অন্যায়টা কি, আমাকে কিছু জিনিস অন্যদের মনে করাতে হচ্ছে, বা দেখাতে হচ্ছে, অসুবিধা কোথায়?

সরকারের ভর্তুকি দেবার প্রসঙ্গে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে, ছেলেকে চকলেট দেবার থেকে বাবাকে চাকরি দেওয়া ভালো কিন্তু করা হয় এর ঠিক উল্টোটা।কথাটার মানে?খুব পরিষ্কার, যেমন ধরুন আমাদের রাজ্যের যা অবস্থা তাতে চাকরি না থাকুক ‘শ্রী’ দের কিন্তু ছড়াছড়ি।কতজন যে কত রকমের ‘শ্রী’ ‘ভূষণ’ পেয়েছেন এবং পেয়ে মুখে একটা কুলুপ এঁটেছেন তার ধারণা যে কোন আম বাঙালির কাছেই এই মুহূর্তে বেশ স্পষ্ট।

তবে সমস্ত রকমের ‘শ্রী’ এর মধ্যে সব থেকে জনপ্রিয় প্রকল্প হল ‘কন্যাশ্রী প্রকল্প’, এই প্রকল্পে কী দেয় বা না দেয় সেটা আলোচনা করা মুর্খামিই হবে, কারণ বাংলার প্রায় প্রতি ঘরেই কেউ না কেউ কন্যাশ্রী প্রকল্পের টাকা ও সুবিধা পেয়েছে, নিঃসন্দেহে এটি একটি অসাধারণ প্রকল্প।স্বয়ং মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর স্বপ্নের এই প্রকল্পের জন্য উনিও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন।বিতর্কও আছে,অনেকে আবার বলছেন একদিকে যেমন রাজ্যে মহিলাদের কোন সম্মান বা নিরাপত্তা নেই সেখানে এই সব প্রকল্প প্র্রদান অনেকটা হেঁয়ালির মত লাগে।ব্যাপারটা অবশ্য এমনি ভাবে না দেখলেও কোন ক্ষতি নেই, একটা প্রকল্পের সুবিধা সমাজের বহু ছাত্রী পাচ্ছেন এটাই বড় কথা, অনেকেরই বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়া আরম্ভ হয়েছে, এমনকি সরকার দাবি করছে এই প্রকল্পের ফলে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলে স্কুলে ড্রপ আউট রেট যেমন কমেছে তেমনি বাল্য বিবাহ বা মেয়ে পাচারের মত ঘটনাগুলোও অনেকেটাই হ্রাস পেয়েছে ।

এত পর্যন্ত কোন অসুবিধা নেই, কিন্তু সমস্যা ঠিক তার পরে।যদি শুধু মাত্র কন্যাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে টাকা দেবার মধ্যেই বিষয়টির শেষ হয়ে যেত কারোর কিছু বলবার থাকত না, কিন্তু কন্যাশ্রীদের নিয়ে আরম্ভ হল আরো অনেক রকমের অনুষ্ঠান, যেমন ধরা যাক স্কুলে স্কুলে কন্যাশ্রী ক্লাব তৈরী, ক্যুইজ কন্টেস্ট, ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং সর্বশেষে বিভিন্ন জেলায় কন্যাশ্রীদের নিয়ে বিভিন্ন রকমের জেলাস্তরের অনুষ্ঠান,সব শেষে কন্যাশ্রীদের জন্য ব্রোঞ্জের বালা প্রদান অনুষ্ঠান, আপত্তির মূল কারণ এখানেই।ভারতীয় হিন্দু সমাজের মেয়েদের বিয়ের পর শাঁখা, পলা, নোয়া, বা চুড়ি পরবার প্রথা এখনও প্রচলিত আছে, এর পিছনে অনেক যুক্তি কু’ যুক্তি বর্তমান, যেমন কেউ কেউ এই শাঁখা, পলা বা সিঁদুরের মধ্যে মেয়েদের তিনটে গুণের বহিঃপ্রকাশের কথা বলে, অন্যদিকে বিজ্ঞানের দিকে মহিলাদের শরীরে ক্রমাগত যে ক্যালসিয়াম ও লোহার ঘাটতি হয় সেটাকে মেটানোর অন্য একটি উপায় হিসাবে এই শাঁখা, সিঁদুর বা পলা পরবার কথা বলা হয়, পুরুষকে তো কিছু পরতে হয় না। আমরা যদি সেই নারীবাদীদের কথা ধরি তবে অবশ্যই কন্যাশ্রীর বালাটাকেও শুধুমাত্র সরকারের দাসত্বের একটা নমুনা অথবা শুধুমাত্র প্রচারের একটি বিশেষ কৌশল হিসাবে মনে করতেই পারি।কয়েকদিন আগেই স্কুলে স্কুলে দুটি বিশেষ গ্রিটিংস কার্ড আসে, একটি ছাত্র-ছাত্রীদের এবং অপর একটি তাদের অভিভাবক বা অভিভাবিকাদের জন্য, এই দুটি কার্ডের মূল বক্তব্য অনেকটা একই রকম, ‘তোমরা এই জিনিস, এই প্রকল্প, এই ভিক্ষা এতদিন ধরে পেয়ে এসেছ, আগামীদিনে এই সব কিছু পেতে গেলে আমাকেই ভোট দাও, তার বিনিময়ে ভুলে যাও চাকরির কথা,ভুলে যাও প্রায় সমস্ত চাকরির পরীক্ষাকে প্রহসনে পরিনত করবার ঘটনা,ভুলে যাও নারী নির্যাতন,পঞ্চায়েত ভোটের কয়েকশ মানুষের মৃত্যুর কথা, ভুলে যাও কলেজে ভর্তির নামে চলা চরম দুর্নীতির কথা, শুধু মনে রাখো প্রকল্প প্রভৃতি।‘

আমরা ছাপোষা মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষজন খুব বেশি গভীরে যেতে ভয় পাই, ভয় পাই ভাইয়ের না পাওয়া চাকরির কথা বলতে বা বাবার অর্ধেক বেতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে, তার থেকে এই কন্যাশ্রী বা সবুজ সাথী নিয়ে যতটা ভুলে থাকা যায়।শেষকালে বলতেই হয়, পশ্চিমবাংলার মাত্র তিন শতাংশ মানুষ সরকারি কাজ করেন, তারা পে-কমিশন পাক কি না পাক, তাতে বাকি সাতানব্বই শতাংশ মানুষের খুব একটা এসে যায় না, যে সরকারি কর্মচারীরা গড়ে মাসে খুব কম করেও তিন হাজার টাকা কম পাচ্ছেন, আর তাদের না দেওয়া টাকাতে মাসে কম করে বারো জন কন্যাশ্রী বা সবুজ সাথী পাচ্ছে, তাতে আর কিছু হোক বা না হোক ভোটের অঙ্কে কিন্তু বেশ লাভই হচ্ছে।তাই এই কন্যাশ্রীদের যদি একটা লোহার বালা দিয়ে বেঁধে দেওয়া যায়, তাহলে তারা এমনকি তাদের বাবা মা’রাও লেজ নাড়ানো ছাড়া আর কিছু করবে না এটা ধরেই নেওয়া যায়, একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন ভাবে বেঁধে রেখে, সাধারণ মানুষের চোখে তাদের ভিলেন বানিয়ে, ভোটের ময়দানে খুব একটা যে লোকসান হবে না সেটা ভালো ভাবেই জানা ।তার ওপর সরকারি কর্মচারীদের তো ‘ঘেউ ঘেউ’ ‘দাও দাও’ এর মাধ্যমে চারপেয়ে বানানো হয়েই গেছে, এবার এই কন্যাশ্রীদেরও চারপেয়ে বানালে ক্ষতি না হয়ে লাভই হবে, অন্তত ভোটের ময়দানে।

Avatar
জন্ম ১৯৮১| ইংরাজিতে এম এ| নেশা কবিতা ও ছোট গল্প লেখা |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here