স্বর্গের কাছাকাছি

কাশ্মীরী দেবশিশু

আগর ফেরদৌস বর রু এ জমিন অস্ত
হামিন অস্ত-ও, হামিন অস্ত-ও, হামিন অস্ত…!

বিখ্যাত পার্সি কবি আমির খশরুর লেখা এই লাইন দুটির বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় –
‘পৃথিবীতে স্বর্গ যদি থেকে থাকে
তবে তা এখানেই, এখানেই এবং এখানেই…’

এই অধমের আমির খশরু পড়ার সৌভাগ্য হয়নি| এই লাইন দুটি প্রথম শুনলাম আমাদের ড্রাইভার মনজুর ভাইয়ের কাছে| বছর পয়তাল্লিশের সুদর্শন চেহারার মনজুর ভাই বেশ আমুদে মানুষ| গল্প করতে পেলে আর কিছু চান না| শ্রীনগর থেকে গুলমার্গের পথে ছুটছে আমাদের গাড়ি| আর মনজুর ভাই অনর্গল বলে চলেছেন কাশ্মীর সম্মন্ধে নানা বিখ্যাত মানুষের উক্তি, প্রবাদ ও কিংবদন্তি| ওনার কথা শুনতে শুনতে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলাম| সত্যি কথা বলতে কি এখনো পর্যন্ত কাশ্মীর আমাদের তেমনভাবে মুগ্ধ করতে পারেনি বরং খানিকটা হতাশই করেছে| গতকাল দিল্লি থেকে ফ্লাইটে আসার সময় জানলা দিয়ে দেখা তুষার শৃঙ্গগুলি মনে যে উল্লাসের সঞ্চার করেছিল শ্রীনগরে ল্যান্ড করার সাথে সাথে তা যেন নিমেষে মিলিয়ে গেল| বিকট আওয়াজ করে আকাশে চক্কর কাটছে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার| কয়েক মিটার অন্তর দাঁড়িয়ে থাকা সাঁজোয়া গাড়ি থেকে উঁকি দিচ্ছে কালাশনিকভের হিমশীতল দৃষ্টি| এসব পেরিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটল শ্রীনগর শহরের দিকে| দুপাশের দৃশ্যাবলির সাথে ‘ভূস্বর্গ’ বিশেষণটি কিছুতেই মেলাতে পারছিলাম না| দুপাশে না দেখতে পাচ্ছি বরফ না দেখতে পাচ্ছ সবুজের চিহ্ন| গোটা উপত্যকা সূর্যের তাপে খাঁ-খাঁ করছে| মার্চের শেষে সূর্যের তেজ যে এত প্রখর হতে পারে তা ভাবা যায়নি| মনজুর ভাই জানালেন অল্প কয়েকদিন আগেও গোটা উপত্যকা ঢাকা ছিল বরফের আস্তরণে| দিন দুই হলো বরফ গলেছে| আর সবেমাত্র বরফের আস্তরণ থেকে মুক্তি পাওয়ার ফলেই গাছগুলি এমন ন্যাড়া অবস্থা| পাতা ধরতে আরো দিন পনেরো লাগবে| ধুত! কাশ্মীর এসে বরফ দেখতে পাব না! সঙ্গীসাথীরা হা হুতাশ শুরু করলেন| কেউ কেউ তো বলেই ফেললেন, ‘বড্ড ওভারহাইপড জায়গা!’

হোটেলে জিনিসপত্র রেখে অল্প কিছু মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে| ঘিঞ্জি, ধুলোভর্তি একটি জনপদ আর এবড়ো-খেবড়ো, খানা-খন্দে ভর্তি রাস্তা| না রয়েছে কোন আধুনিক শপিং মল, না রয়েছে কফি শপ| গোটা ডাল লেক জুড়ে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে শয়ে শয়ে হাউসবোট| খুঁজে পেলাম না ‘কাশ্মীর কি কালি’র কোন নস্টালজিয়া| সন্ধেবেলা হোটেলের রুমে আপত্কালীন বৈঠক ডেকে ঠিক করা হলো শ্রীনগর এ সময় নষ্ট করার কোন মানেই হয় না| এর চেয়ে গুলমার্গ গেলে হয়তো বরফের দেখা পাওয়া যেতে পারে| সেই মতো লটবহর নিয়ে আজ সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছি গুলমার্গ-এর উদ্দেশ্যে| নিজেদের মধ্যে গল্প গুজব, আড্ডা-ইয়ার্কি চলছে এমন সময় হঠাত্ই একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝটকা! সকলে তাকালাম বাইরের দিকে| আর বাইরে তাকাতেই… ‘ইউরেকা!!!’ এই তো সেই অমূল্য রতন! এই তো সেই মহার্ঘ্য ‘বরফ’ যা বড় অবহেলায় পড়ে আছে রাস্তার পাশে| শুধু রাস্তা কেন, রাস্তার দুধারের বড় বড় পাইন গাছগুলির উপরও মিহি বরফের আস্তরণ| প্রত্যেকটা গাছ যেন এক একটি ‘ক্রিসমাস ট্রি’| আর যায় কোথা! গাড়ি থামিয়ে পুরু বরফের কম্বলে আচ্ছাসে গড়াগড়ি খেলাম আমরা কতিপয় আদেখলা বঙ্গসন্তান| এর পর যত এগোলাম, অপার বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করলাম তুষারের সাম্রাজ্যবাদ| পুরু বরফের আস্তরণ থেকে কোনোরকমে মাথা তুলে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে একটি ছোট্ট জনপদ, জানলাম এটাই গুলমার্গ| গোটা গুলমার্গ জুড়ে বেশ একটা উত্সবের পরিবেশ| কেউ স্কি করছেন, কেউ স্লেজ করে ঘুরছেন, কেউ ঘোড়ার পিঠে আবার কেউ বা শুধুই বরফের উপর লুটোপুটি খাচ্ছেন| ফেরিওয়ালারা বিক্রি করছেন ‘কাশ্মীরী কাওয়া’ যা আসলে গরম জলে জাফরান ও বাদাম মেশানো এক উপাদেয় পানীয় এবং ঠাণ্ডায় বিশেষ ভাবে কার্যকরী|

হোটেল পর্যন্ত পৌঁছতে পারলো না আমাদের গাড়ি| বরফের জন্য রাস্তা বন্ধ| স্থানীয় মানুষেরা নামমাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে হোটেলে পৌঁছে দিলেন আমাদের জিনিসপত্র| পিছন পিছন অনভ্যস্ত পায়ে হাঁটলাম আমরাও| এরপর সন্ধেবেলায় হোটেলের রুমে গরম কফি আর পকৌড়া সহযোগে জমিয়ে আড্ডা|

গুলমার্গ গন্ডোলা
গুলমার্গ গন্ডোলা

পরদিন সকালে আমাদের প্রথম গন্তব্য ‘গুলমার্গ গন্ডোলা’| ভেনিস-এর নৌকোর নামে নামকরণ করা হয়েছে এখানকার কেবল কার-এর| উইকিপিডিয়া জানান দিচ্ছে এটাই পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম রোপওয়ে সার্ভিস| নিয়ে যায় সাড়ে বার হাজার ফুট ওপরের আফারবাত পর্বতে| নৈসর্গ ও অ্যাডভেঞ্চারের আশায় চড়ে বসলাম কেবল কার, থুড়ি গন্ডোলায়| দুলতে দুলতে গন্ডোলা চলল উপরের দিকে| পরের আধঘন্টা কেউ কোন কথা বলতে পারলাম না| শুধু অপার বিস্ময়ে চেয়ে থাকলাম প্রকৃতির অকৃপণ ঐশ্বর্যের দিকে| চারিদিক নিঃস্তব্ধ| মাঝে মাঝে শুধু ক্যামেরার শাটারের শব্দ| পাইন গাছের জঙ্গল পেরিয়ে গন্ডোলা চলেছে আফারবাত পর্বতের উদ্দেশ্যে| একটা সময়ের পর খেয়াল করলাম নিচে আর গাছপালাও দেখা যাচ্ছে না| শুধু ধূ ধূ বরফ| যেন কোন বরফের মরুভূমিতে প্রবেশ করছি আমরা| মানসপটে যে ছবি জমা হয়ে থাকছে কোন ক্যামেরার লেন্সে তা ধরা অসম্ভব| অগত্যা এক সময় ক্যামেরাটাও ঢুকিয়ে রাখলাম ব্যাগে| আফারবাত পর্বত এতটাই উঁচুতে যে সেখান থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে মেঘ ছাড়া বিশেষ কিছুই দেখা গেল না| তবে দেখা পেলাম ভারতবর্ষের নানা শহর থেকে বেড়াতে আসা মানুষজনের| কাশ্মীরের তুষারশৃঙ্গে এ যেন এক মিনি ইন্ডিয়া|

গুলমার্গ এক সময় পরিচিত ছিল গৌরীমার্গ নামে| পরে যোড়শ শতকে রাজা ইউসুফ খান এর নামকরণ করেন ‘গুলমার্গ’| আজও গোটা গুলমার্গ জুড়ে ছড়িয়ে আছে অনেকগুলি হিন্দুমন্দির| একটি ছোট্ট পরিসরের মধ্যেই দেখতে পেলাম একটি দুর্গা মন্দির, একটি মসজিদ ও একটি গুরুদোয়ারা| বিকেলের আজানের সুর মিলিয়ে যেতে না যেতেই শুরু হয় সন্ধের আরতি|

পরের দিন সকালটা ভোলার নয়, ২৬ মার্চ| ওয়ার্ল্ড কাপ সেমিফাইনালে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মুখোমুখি| ব্রেকফাস্টের জন্য হোটেলের সমস্ত গেস্ট জড়ো হয়েছে রেস্টুরেন্ট-এ| এমন সময় টিভিতে শুরু হলো জাতীয় সঙ্গীত| সকলেই বেশ অস্বস্তিতে| উঠে দাঁড়াতে ইতস্তত বোধ করছেন| কারণ জায়গাটার নাম কাশ্মীর| হোটেলের স্টাফরাও ঠায় বসে আমাদের দেখছেন| এখানে বলে রাখি গড়পড়তা সব কাশ্মীরী মানুষের মধ্যেই  নিজের দেশের প্রতি এক প্রচন্ড অভিমান রয়েছে| অনেকে হয়তো নিজেদের ভারতীয় বলেও মানতে নারাজ| নিজেদের কাছে ওদের পরিচয় শুধুই ‘কাশ্মীরী’| এর কারণ হয়ত টিভি দেখে বা খবরের কাগজ পড়ে কোনভাবেই বোঝা সম্ভব নয়| এমন সময় আমরা কয়েকজন বীরপুঙ্গব উঠে দাঁড়ালাম| দেখাদেখি উঠে দাঁড়াতে লাগলেন বিভিন্ন টেবিলের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষজন| গুল্মার্গের বরফাবৃত প্রান্তর প্লাবিত হলো ‘জনগনমন অধিনায়ক হে’-র সুরে| কী আশ্চর্য! দেখলাম উঠে দাঁড়িয়েছেন হোটেলের কর্মচারীরাও…ওদের মুখে মৃদু হাসি| যে হাসির মধ্যে মিশে রয়েছে বন্ধুত্ব ও সহমর্মিতা| সেদিন ওদের মধ্যে জাতীয়তাবোধের থেকেও বেশি কিছু আবিষ্কার করলাম, তা হলো, মানবতাবোধ| নিজেদের ভারতীয় না ভাবলেও ভারতীয় মানুষের প্রতি কোন বৈরিতা ওদের নেই| অথচ এই মানুষগুলোকেই আমরা জঙ্গি, পাকিস্তানি বলে অতি সরলীকরণ করে থাকি| সেই সঙ্গে নতুন করে আবিষ্কার কলাম বহুবার স্কুল, কলেজ, অফিস এ গাওয়া ‘জনগণমন অধিনায়ক হে’ গানের শক্তি| আজকের সকালটি বহুদিন স্মৃতিতে থেকে যাবে| আমাদের দ্বিতীয় গন্তব্য পহেলগাঁও| রাস্তার দুপাশে আপেল বাগান| মাঝখান দিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটছে আমাদের গাড়ি| কিছুদূর পর থেকে চপলা নারীর মতো আমাদের সঙ্গ নিল সর্পিল, খরস্রোতা লিডার নদী| রাস্তায় দেখা মিলল স্কুলফেরতা কাশ্মীরী দেবশিশুদের| ছবির মতো সুন্দর কিছু গ্রাম পেরিয়ে আমরা পৌছলাম পহেলগাঁও-এ|

pahelgam
পহেলগাঁও

বিকেলবেলা এখানকার বিখ্যাত প্যারাডাইস রেস্টুরেন্টে গিয়ে পেট পুরে খাওয়া হলো নানা কাশ্মীরী পদ যেমন রিস্তা, গুস্তাভ, ইয়াখনি, ত্বক মাস ও কাশ্মীরী পোলাও..যার স্বাদ জিভে লেগে রয়েছে| খাওয়াদাওয়া সেরে হোটেলের ম্যানেজারের সাথে গল্পগুজব করছি এমন সময় বাইরে থেকে সঙ্গীদের চিত্কার শুনে গিয়ে দেখি স্নো ফল শুরু হয়েছে| স্নো ফল যে এত স্বর্গীয় এত অপার্থিব হতে পারে তা জানা ছিল না| মুহূর্তে গোটা জায়গাটা ঢেকে গেল বরফের চাদরে| আমাদের রাস্তায় লুটোপুটি খেটে দেখে স্থানীয় মানুষেরা প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন| পরদিন সকালে নয়নাভিরাম পহেলগাঁও গল্ফ কোর্স দেখে রওনা দিলাম বেতাব ভ্যালির উদ্দেশ্যে| লিডার নদীর পাশে এই জায়গাতেই শুটিং হয়েছিল সনি দেওল-অমৃতা সিং অভিনীত ‘বেতাব’ ছবির ‘জব হাম জঁওয়া হোন্গে’ গানটির| তার পর থেকেই এই উপত্যকা ‘বেতাব ভ্যালি’ নামে পরিচিত|

তিনদিন পহেলগাঁও-এ কাটিয়ে ফিরে এলাম শ্রীনগরে| তবে এবারে আর শ্রীনগর হতাশ করলো না| তার যাবতীয় সৌন্দর্য উপুড় করে দিল আমাদের সামনে| গাছগুলোয় সুন্দর সবুজের ছোঁয়া লেগেছে| দূরের বরফ ঢাকা পাহাড়ের ছায়া পড়েছে ডাল লেকের জলে| এমনকী বিকেলের সোনালী আলোয় ডাল লেককেও অপরূপ রূপসী লাগছে| শিকারে আধশোয়া হয়ে ডাল লেক-এ ঘুরছি, রেডিওতে বাজছে ‘ইয়ে চাঁদ সা রওশন চেহরা…’ তৃপ্তিতে চোখ বুজে আসে|

ডাল লেক
ডাল লেক

গোটা শ্রীনগর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে মুঘল বাদশাদের তৈরি করা বেশ কিছু প্রমোদ উদ্যান| এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো শালিমার বাগ| এই শালিমার বাগেই নিভৃতে স্ত্রী নুরজাহানের সঙ্গে সময় কাটাতে আসতেন বাদশা জাহাঙ্গীর| এচারাও রয়েছে নিশাত গার্ডেন, চশমেশাহী, পরিমহল ইত্যাদি| প্রতিটি বাগানই অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী| বাগানের প্রত্যেকটি চিনার গাছের ছায়ায়, প্রত্যেকটি স্তম্ভে, প্রত্যেকটি ফোয়ারায় মিশে রয়েছে ইতিহাস, কাশ্মীর এলে অবশ্য ঘুরে দেখুন এই বাগানগুলি|

কে যেন খবর দিল আগামীকাল থেকে খুলছে শ্রীনগরের বিখ্যাত টিউলিপ গার্ডেন| প্রতিবছর নেদারল্যান্ডস থেকে লক্ষ লক্ষ টিউলিপের চারা এনে লাগানো হয় এই বাগানে| এই বাগান সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকে মাত্র এক মাস| এ দুর্মূল্য সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না| অতএব সকাল সকাল ভিড় জমালাম টিউলিপ গার্ডেন-এ| চারিদিকে পাহাড় ঘেরা এই বাগানটিকে ‘স্বর্গ্যদান’ বললে কিছুমাত্র অতিরঞ্জন হয় না|

টিউলিপ গার্ডেন|
টিউলিপ গার্ডেন|

কৌতূহলবশে ঢুঁ মেরেছিলাম ওল্ড শ্রীনগর বা ডাউনটাউন এলাকায় যা কুখ্যাত ‘মিনি পাকিস্তান’ নামে| টুরিস্টরা কেন এই অঞ্চলটা এড়িয়ে চলেন টা বুঝতে পারলাম কিছুটা এগোনোর পরই| কিছুদূর পর পর বাড়ির দেওয়ালে বড় বড় করে ইন্ডিয়ান আর্মি-র উদ্দেশ্যে লেখা রয়েছে ‘Indian Dogs Go Back’, কোথাও বা লেখা ‘Welcome Taliban’, যা দেখলে রক্ত হিম হয়ে যায়| এখানেই পরিচয় হলো একটি পরিবারের সঙ্গে যাদের পেশা হলো ‘Papermashi’ কাগজ ভিজিয়ে মন্ড তৈরি করে তা ছাঁচে ফেলে বিভিন্ন রকম শিল্পসামগ্রী তৈরি করার কলা ‘Papermashi’ নামে পরিচিত| এটি কাশ্মীরের অতি প্রাচীন কুটিরশিল্প|| পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত উত্সাহের সাথে ঘুরিয়ে দেখান নিজেদের কারখানা, নিজেদের তৈরি করা শিল্পসামগ্রী| জানালেন কোনরকম সরকারি সাহায্য ছাড়াই কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওরা বাঁচিয়ে রেখেছেন কাশ্মীরের এই অতি প্রাচীন শিল্পকলা| নিজেদের শিল্পের প্রতি এই ভালোবাসা, এই আবেগ দেখে আর যাই হোক ওদের জঙ্গি বলে ভাবতে মন সায় দিলো না|

শ্রীনগরে কেনাকাটা করবার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো হলো ডাল গেট| এখানের কাতারে কাতারে রয়েছে পেপারমাসি, কাশ্মীরী শাল, কার্পেট ও ড্রাই ফ্রুটস এর দোকান| একবার ঢুঁ মারলাম একটি অভিজাত কার্পেট এর কারখানায়| এক একটি কার্পেট যেন এক একটি পেন্টিং| দাম ও আকাশছোঁয়া| দুই থেকে দশ লক্ষ টাকার মধ্যে| কারখানার মালিক চা না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়লেন না| নিজে হাতে দেখালেন কার্পেট তৈরির পদ্ধতি| ভারতবর্ষ ও ভারতবর্ষের বাইরে বহু দেশের বহু শহরে গিয়েছি কিন্তু কাশ্মীরী মানুষের মতো ‘মেহমান নওয়াজি’ আর কোথাও দেখিনি| এক কাশ্মীরী দোকানদারকে সে কথা বলতে উনি হেসে জবাব দিলেন, ‘আমাদের আর কী দেখছেন, আমাদের বাবা কাকারা আরো ভালো ছিলেন…’

আমাদের ড্রাইভার মনজুর ভাইয়ের খুব ইচ্ছে ফ্যামিলি নিয়ে একবার কলকাতা বেড়াতে আসার| কিন্তু ওনাকে ঠিক ভালোভাবে আমন্ত্রণ জানাতে পারলাম না| কাশ্মীরী মানুষের যে অতিথিপরায়নতা আমরা দেখলাম, আমরা বাঙালিরা কি সেরকম অতিথিপরায়নতা দেখাতে পারবো ওনাদের? আমাদের ট্যাক্সিওয়ালা, অটোওয়ালারা কি ওদের সাথে একই রকম ব্যবহার করবেন যে ব্যবহার মনজুর ভাইরা আমাদের সাথে করলেন?

বিমানবন্দরে আমাদের ছাড়তে আসার পথে মনজুর ভাই বারবার বললেন, একবার নভেম্বর নাগাদ আসুন, কাশ্মীরের অন্য রূপ দেখবেন| মনে মনে ভাবলাম কাশ্মীর বুকের মধ্যে যেভাবে চেপে বসেছে, এক নভেম্বরে হবে না| ফিরে ফিরে আসতে হবে| আমির খশরু এমনি এমনি বলেননি…

‘আগর ফেরদৌস বর রু এ জমিন অস্ত
হামিন অস্ত-ও, হামিন অস্ত-ও, হামিন অস্ত…!’

Advertisements

2 COMMENTS

  1. ‘ভূস্বর্গ’ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। এই লেখাতে অনেকটাই তার দর্শন হয়ে গেল।

  2. Krishanu, thank you for the post. I must admit that I was glued till the end of your post, not only because you wrote and framed it well, but also I was comparing my feelings and experience.
    I visited Kashmir in 2006, almost a decade now. Would like to add two cherries on the cake you baked.
    One, to fight the cold, people carry “Kangri” . It is a portable and moving heater that Kashmiris keep in their pheran, a long woollen cloak reaching down to the knees worn by people during the frosty winters. The kangri is earthenware filled with glowing embers and encased in pretty handmade wicker baskets and is carried as a personal warmer. One of them told me, they had to find this remedy, as they could not afford to buy clothes to fight nature, or they would have to fight with hunger.
    Second, Kashmir has rich heritage of music and martial arts. Which I was expecting somewhere in this article but did not find. On ending note, I would request everyone who will read this post, to visit Kashmir at least once, as Kashmir not only means Shammi Kapoor or sweet dimple on Sharmila’s cheek, Kashmir is one of our states, where people have very limited scope of earning but depend on tourism mostly. So more we visit, more they will find a better life. Thank you.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.