সুপ্রিয় চৌধুরী
জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতার পুরোনো পাড়ায়। বহু অকাজের কাজী কিন্তু কলম ধরতে পারেন এটা নিজেরই জানা ছিল না বহুদিন। ফলে লেখালেখি শুরু করার আগেই ছাপ্পান্নটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। ১৪২১ সালে জীবনে প্রথম লেখা উপন্যাস 'দ্রোহজ' প্রকাশিত হয় শারদীয় 'দেশ' পত্রিকায় এবং পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে আরও দুটি উপন্যাস 'জলভৈরব' (১৪২২) এবং 'বৃশ্চিককাল' (১৪২৩) প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে পুজোসংখ্যা আনন্দবাজার এবং পত্রিকায়। এছাড়া বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং দু চারটি ছোটগল্প লিখেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর লিটিল ম্যাগাজিনে। তার আংশিক একটি সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে 'ব্যবসা যখন নারীপাচার' শিরোনামে। ২০১৭ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।

তাছাড়া সারাজীবন পুলিশের মার খেয়ে আর পালাতে পালাতে হাজারটা চোটের ব্যথা আর রোগজ্বালা বাসা বেঁধেছে শরীরে। তোদের ভারবোঝা হয়ে যাবো আমি। বিপদে পড়বি তোরা। আমি জানি তোরা চলে যাবার পর সব সন্দেহ এসে পড়বে আমার ওপর। আমাকে অনেক রগড়াবে ওরা। চাই কি জানেও মেরে দিতে পারে। তবুও তসল্লি (সান্ত্বনা) একটাই, সারাজীবন গুনাহর রাস্তায় হাঁটলেও শেষ বেলায় একটা নেক (সঠিক) কাজ করলাম। পরওয়ার্দিগার বোধহয় আমার সব গুনাহ (পাপ) মাফ করে দেবেন এর জন্য। যা বেটা, বদর বদর।” হেসে আমার কাঁধে একটা চাপড় মেরেছিল চাচা।

পালাবার জন্য পরদিন বিকেলবেলাটাকেই বেছে নিয়েছিলাম আমরা। গিণতির জন্য সেলে ঢোকাবার আধঘণ্টা আগে বেরিয়ে যেতে হবে। রীতিমতো পাঁজি জোগাড় করে দেখে নেওয়া হয়েছিল সময়টা। তখন গঙ্গায় জোয়ার থাকে না। তাছাড়া ওপারে পৌঁছোতে পৌঁছোতে সন্ধে নেমে পড়বে প্রায়। অন্ধকার আমাদের সাহায্য করবে। দলে কল্লোলদা, প্রদ্যোতদা, কালাচাঁদদা, আমি ছাড়া আরও চারজন। সবার প্রথমে কুয়োয় নেমেছিলাম আমি। তারপর দুমিনিটের গ্যাপে গ্যাপে বাকি সাতজন। আদিগঙ্গার পাঁক-কালো জল কখনও কোমর, কখনও বুক সমান। ঠেলে ঠেলে পেরিয়ে যেতে সময় লেগেছিলো আরও মিনিট দশেক। কাদায় মাখামাখি হয়ে হাঁচোড়পাঁচোড় করে পাড়ে উঠেই ঢুকে পড়েছিলাম ঘিঞ্জি বস্তি আর পুরোন বাড়িগুলোর সরু সরু গলির মধ্যে। এঁকেবেকে পেরিয়ে যাচ্ছিলাম গলিগুলো। ঠিক সেই সময় হঠাৎই মনে হলো এই বোধহয় শেষবারের মতো ছেড়ে যাচ্ছি শহরটাকে। মার সঙ্গে আর দেখা হবে না কোনদিন! ভাবামাত্র দাঁড়িয়ে পড়লাম শকলাগা মানুষের মতো। যে করে হোক মার সঙ্গে শেষবারের মতো, অন্তত একবার দেখা করে যেতে হবেই। মুহূর্তে ঘুরে গিয়ে হাঁটা লাগালাম উল্টোদিকে। দশ পনেরো পা এগিয়েছি এই সময় পেছন থেকে একটা হাত, খামচে ধরলো কাঁধটা। প্রদ্যোতদা। আমি নেই দেখে ও অনেকটা এগিয়ে গিয়েও ফিরে এসছে ফের। “ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস গাধা! জলদি পা চালা। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যেতে হবে এলাকাটা ছেড়ে।” গঙ্গার ওপার থেকে ততক্ষণে ‘পিই ই’ আওয়াজে বাজতে শুরু করেছে পাগলী সাইরেন। গলির মোড়ে, বস্তিবাড়িগুলোর পায়রার খোপের মত জানলায়, জলের কলের লাইনে মানুষজনের ভয় আর উদ্বেগ মাখানো মুখ। ফিসফাস কথার টুকরো। “নকশাল! … জেল ভেঙে পালিয়েছে!” দ্বিধা আর পিছুটানটা কেটে গেল এক মুহূর্তে। প্রদ্যোতদার হাত ধরে টেনে দৌড় দৌড় এ রাস্তা ও রাস্তা বহু রাস্তা ঘুরে সেই দৌড় একদিন এসে থামলো পালামৌর জঙ্গলে। পেছনে ফেলে এলাম অনেক কিছু। আমার শহর, খালধারের ধচাপচা বস্তি, পার্কের পাশে তিনতলা ইস্কুলবাড়ি, ফুটবল ম্যাচ, জিততাল গুলি খেলা আর ঘুরির প্যাঁচ, রাস্তার লড়াই, শ্রী, উত্তরা, রুপবাণীর লাইনে মারামারি, নিজের থেকেও প্রিয় সব বন্ধুবান্ধব কমরেডস, মায়ের শাড়িতে ধোঁয়া আর ডালের গন্ধ সেই ছোটবেলা থেকে ভালোলাগা প্রায় সবটুকু।

এখানে এসেও সে যে কি ভয়ঙ্কর কষ্ট। জঙ্গল, জোঁক, মশার কামড়, না খেয়ে পাগলের মত হেঁটে যাওয়া দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। ক্ষিদে তেষ্টা আর হাঁটার ধকল সহ্য না করতে পেরে মাঝেমাঝেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছি দলের প্রায় প্রত্যেকে। ফের উঠে পথ হাঁটছি। ক্ষিদের জ্বালায় বুনো ফল, শাকপাতা, গেছো শামুক, জংলি ইদুর, শেকড়কন্দ, ব্যাঙের ছাতা কিছু বাদ দিচ্ছি না। খাবার দাবার চিনি না। কোনটা বিষাক্ত আর কোনটা নয়। ফলে থেকে থেকে মারাত্মক পেটের রোগে ভুগছি। আমাদের মধ্যে প্রথম মারা গেল জাইরুল। কমরেড জাইরুল ইসলাম। মুর্শিদাবাদে বিশাল অবস্থাপন্ন জোতদার বাড়ির ছেলে। আমারই বয়সী। ক্ষিদের ঠেলায় ব্যাঙের ছাতা ধরনের কি একটা ছিঁড়ে খেয়েছিলো গাছের গোড়া থেকে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শুরু ভেদবমি আর জলের মতো পায়খানা। ওষুধপত্তর কিচ্ছু নেই। পুরো চব্বিশ ঘণ্টা কাটেনি বিশাল ঝাঁকড়া একটা মহুয়া গাছের নীচে গোর দেওয়া হয়েছিল কমরেড জাইরুলকে। জঙ্গলে প্রথম শহীদ।

Banglalive-6

মাস তিনেক বাদে জঙ্গলে প্রথম সাফল্যের মুখ দেখলাম আমরা। এর আগে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় আদিবাসীদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা হয়ে যেত আমাদের। দূর থেকে আমাদের দেখতো ওরা। খানিকটা সন্দেহ আর ভয় মেশানো দৃষ্টিতে। আকার ইঙ্গিতে খাবার চাইলে বা কথা বলতে গেলেই একছুটে মিলিয়ে যেত গভীর জঙ্গলে। ডাকাতটাকাত ভাবতো বোধহয় আমাদের। ওদের মধ্যে একজন মংটু। ওর বউ তুতিয়া। জঙ্গলে গেছিলো কাঠ কুড়োতে। কাঠ কুড়িয়ে ফেরার পথে ওকে ধরেছিলো দুই ফরেস্ট গার্ড। চেক করার নামে বিট অফিসে নিয়ে গিয়ে বারবার ধর্ষণ করেছিল দুজন মিলে। তারপর ভীষণ রকম আহত আর অচৈতন্য দেহটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেছিল জঙ্গলের রাস্তায়। এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটতো জঙ্গলে। যথেচ্ছ আদিবাসী মেয়ে ভোগ করার খোলা ছুট দিয়ে ওদের পাঠানো হতো এখানে। তার ওপর কন্ট্রাক্টরদের কাছে কাঠচুরির মোটা হিস্যা। এইসব এলাকায় ডিউটি পাওয়াটা যে কোন ফরেস্ট গার্ডের কাছে অনেকটা ‘প্রাইজ পোস্টিং’এর মতো।

Banglalive-8

রাস্তার ওপর স্ত্রীর অচৈতন্য দেহটার সামনে বসে ডুকরে কাঁদছিল মংটু। চারপাশে ভিড় করে দাঁড়ানো আদিবাসীরা। ঠিক এরকম একটা সময়ে আমাদের দলটার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ওদের। একফোঁটা আদিবাসী ভাষা জানা না থাকলেও কান্নাকাটির কারণটা বুঝে নিতে অসুবিধে হয়নি একটুও। সেই রাতেই বিট অফিস অ্যাটাক করি আমরা। মদ খেয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছিল ওই দুই হারামজাদা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই খাটিয়া সমেত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে তুলে আনা হয় দুজনকে। বাকি কাজটা করে দিয়েছিল মংটুদের হাতের টাঙ্গি। আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল বিট অফিস। সেই শুরু। জঙ্গলের কোনায় কোনায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে গেছিল খবরটা। মংটু আর তুতিয়া। আমাদের দলে প্রথম আদিবাসী রিক্রুট। উপরি পাওনা গার্ডদের দুটো বন্দুক আর গুলিভর্তি বড় একটা বাক্স। স্কোয়াডের প্রথম অস্ত্র।

Banglalive-9

ইতিমধ্যেই বিহারের শহরাঞ্চল, অন্ধ্র, বাংলা থেকে জেলভাঙ্গা আর লুকিয়ে থাকা আরও কমরেডস ঢুকতে শুরু করেছেন। দেখতে দেখতে বড়সড় সংগঠন গড়ে উঠলো আমাদের, এই বিশাল পালামৌ ছোটনাগপুর – বস্তার – দণ্ডকারণ্য অঞ্চল জুড়ে। রাষ্ট্র আর প্রশাসনের বেশ কিছুদিন সময় লাগলো আমাদের মতিগতি বুঝে উঠতে। যখন বুঝতে পারলো তখন দেরী হয়ে গ্যাছে অনেকটাই। তবে দেরী হয়ে গেলেও হাত গুটিয়ে বসে রইলো না ওরাও। সমস্ত নখদাঁত বের করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো আমাদের বিরুদ্ধে। পুলিশ – সি আর পি এফ – প্যারামিলিটারি ফোর্স আমাদের দাপটে এইসব অঞ্চলে জমি হারাতে থাকা জোতদার – জমিদার – বানিয়া, উঁচুজাতের বড়লোকেরা সব এককাট্টা হয়ে গ্যালো নকশালদের বিরুদ্ধে। আর এদিকে দুনিয়ার যতো গরীবগুর্বো দলিত আদিবাসী জোট বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়লো আমাদের পক্ষে। সেই লড়াইয়ের আঁচ শুধু জঙ্গলেই আটকে রইলো না। বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়লো আরা – ভোজপুর – গয়া – আওরঙ্গবাদ – জেহানাবাদ – নালন্দা – বৈশালির মতো সমতল জেলাগুলোতেও। আমাদের স্কোয়াডগুলোকে ‘লাল দস্তা’, ‘লাল সেনা’ নামে ডাকতে শুরু করলো স্থানীয় মানুষজন। উল্টোদিকে তৈরি হল রনবীর সেনা, গৈরিক সেনা, ব্রহ্মর্ষি সেনা, লোরিক সেনা, সানলাইট সেনা উঁচুজাত আর বড়লোকদের প্রাইভেট আর্মি। পেছনে সরাসরি মদত পুলিশ আর প্রশাসনেরশয়ে শয়ে গরীব – দলিত – আদিবাসীদের খুন করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে শুরু করলো ওরা। পাল্টা মারের রাস্তায় নেমে পড়লাম আমরাও। জোতদার – জমিদার – বালিয়াদের হাভেলী অ্যাটাক, অ্যাকশন, গণ আদালত, মৃত্যুদণ্ড চলতে থাকলো সমানতালে। পুরোপুরি যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুযুধান দুপক্ষ। এরকম একটা ভয়ঙ্কর লড়াইয়ের দিনে শহীদ হলো প্রদোতদা। চান্দোয়ায় এক সুদখোর বানিয়ার বাড়িতে অ্যাকশন সেরে ফিরে আসছি, একটা মকাইক্ষেতের মধ্যে আমাদের ঘিরে ফেললো রণবীর সেনার লোকজন। সংখ্যায় আমাদের প্রায় তিনগুন। দুপক্ষের মধ্যে টানা গুলির লড়াই। উল্টোদিক থেকে ছোঁড়া একটা গুলি সরাসরি এসে লাগে প্রদ্যোতদার বুকে। মকাইক্ষেতের মধ্যে দিয়ে গুলি চালাতে চালাতে নিরাপদ জায়গায় টেনে এনেছিলাম শরীরটাকে। তখনও বেঁচে ছিল প্রদ্যোতদা। মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসছিল চলকে চলকে। পাগলের মত চীৎকার করছিলাম, কাঁদছিলাম হাউহাউ করে – “তোমার কিচ্ছু হবে না দাদা শহর থেকে ডাক্তার তুলে নিয়ে আসবো। একদম চিন্তা কোরো না।” ঘোলাটে চোখের চাউনি চিকচিক করে উঠেছিল এক সেকেন্ডের জন্য। ফিকে একটা হাসি – “আমার লড়াই শেষ কমরেড। তুই কিন্তু লড়াইটা ছাড়িস না। নিশানা যেন ঠিক থাকে …”। থিরথির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট। তারপর আমার কোলে মাথা রেখে স্থির হয়ে যাওয়া বরাবরের জন্য।

কোয়েল নদীর ধারে কমরেডদের লাল সেলাম আর চিতার দাউ দাউ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছিল প্রদ্যোতদা আর সঙ্গে লম্বা একটা পথচলার ইতিহাস। শুনলে হয়তো অবাক হবেন জেল পালিয়ে আমরা যে আটজন প্রথম এখানে এসেছিলাম তার মধ্যে একমাত্র আমি ছাড়া কেউই আজ আর বেঁচে নেই। কল্লোলদা চলে গিয়েছিলো জাঙ্গল ম্যালেরিয়ায়। দুদিনেরও কম সময়ে ব্রেনে পৌঁছে গিয়েছিলো রোগটা। পুলিশের কুমিংয়ের মধ্যে রয়েছি তখন। ডাক্তার ডাকা যায়নি। কালাচাঁদদা মরেছিলো সাপের কামড়ে। বাকিরা কালাজ্বর, পেটের অসুখ আর পুলিশ এনকাউন্টারে। আমার ডেস্টিনি হয়তো আজও আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে পালমৌর জঙ্গলে, আপনাকে এই লম্বা পথ হাঁটার গল্পটা শোনানোর জন্য। “দীর্ঘ একটা শ্বাস টানলো অবিনাশ। চোখ তুলে তাকিয়ে রইলো, ‘ট্রি ই ই’ শব্দে নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে উড়ে গেল কোন রাতচরা পাখি। সেই উড়ে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো মানুষটা। তারপর আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে তাকালো অভিরূপের দিকে। লাতিন আমেরিকার বিদ্রোহী কবিগায়ক ভিক্তর হারার ‘উনা উন ভেজ রেভেল্যুশনারিও’ (ওয়ান্স আ রেবেল) গানটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল অভিরূপের। একটা লোক। সেই ছোটবেলা থেকে লড়তে লড়তে ক্লান্ত। একটা জীবন ভীষণ অন্যরকমভাবে বাঁচা আর পেরিয়ে আসা বিপদসংকুল একটা রাস্তা অ্যাতোটা সময় ধরে। সাধারন চেনাশোনা চৌহদ্দির একদম বাইরে। কোন প্রশ্ন না করে একদৃষ্টে অবিনাশের দিকে তাকিয়ে রইলো অভিরূপ। কিছুক্ষণ বাদে নিরবতা ভাঙ্গলো উল্টোদিক থেকেই – “প্রদ্যোতদা, কল্লোলদারা তো চলে গ্যালো। ওদের রক্তে মজবুত হওয়া এখানকার মাটিতে ভরসার পা গেড়ে বসলো আমাদের। জঙ্গলের বুকে গরীব মানুষের রাজ কায়েম হলো। এদিকে বাইরে থেকে আরও প্রচুর কমরেড চলে আসতে লাগলেন জঙ্গলে। একটা ফুল ফ্লেজেড গেরিলা আর্মি। কদিন বাদে এলেন কমরেড রামারাজু। অন্ধ্রের মানুষ। পার্টির সর্বোচ্চ স্তরের নেতা। ছোটখাটো চেহারা। মাথায় টাক। মুখে সবসময় লেগে থাকা মিষ্টি হাসি। ভীষণ ভালোমানুষ একটা চেহারা। আমাকে খুব পছন্দ করতেন। দুর্দান্ত বেহালা বাজাতেন মানুষটা, আমার গানবাজনার ঝোঁক দেখে অবসর সময়ে বেহালাটা নিয়ে বসিয়ে দিতেন আমাকে। হাতে ধরে শেখাতেন। আমিও উৎসাহ পেয়ে গেলাম খুব। জাঙ্গল মার্চ, অ্যাকশন প্ল্যান, পার্টি ক্লাস ঠাসা কর্মসূচী সারাদিন। তার মাখখানে সামান্য ফাঁক পেলেই বেহালাটা নিয়ে বসে পড়তাম। প্রদ্যোতদাদের ধরিয়ে দেওয়া বই পড়ার নেশাটাও ফের পেয়ে বসলো কমরেড রামারাজুর হাত ধরে। এবার ইংরিজী বই। দেশ বিদেশের। মনে আছে, প্রথম যেদিন এডগার স্নোর লেখা ‘রেড স্টার ওভার চায়না’ বইটা আমার হাতে তুলে দিলেন উনি, আমি তো আঁতকে উঠেছিলাম “ইংরিজী”। হেসেছিলেন রামারাজু। ঠিক কল্লোলদার মতো করে। প্রায় হুবহু একই কথা। “পড়ো, প্রথমবারে বুঝতে না পারলে অথবা ভালো না লাগলেও। দেখবে বইয়ের সঙ্গে থাকতে থাকতে একদিন ঠিক ভালো লেগে যাবে। অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছিল কমরেড দাদার কথা। তারপর তো কত বইই না পড়লাম অ্যাতোগুলো বছরে। রেজি দেব্রের ‘রেভল্যুশন উইদিন রেভল্যুশন’, লুই মারিঘেল্লার ‘গেরিলা ওয়ারফেয়ার, চার্লি চ্যাপলিনের ‘হিয়ার আই এ্যাম’, মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’ । এদিকে দেশের পরিস্থিতিও পাল্টাচ্ছিলো দ্রুত।

চলবে

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-15/

আরও পড়ুন:  ধোঁয়াবনবিহারিণী

1 COMMENT

  1. এই জেল ব্রেক পার্ট টা আরেকটু বড় করে থাকলে যেন ভালো হতো, মন ভোরলো না। ট্রিলজির শেষ খণ্ডে একটু মাথায় রাখবেন – যদি সম্ভব হয়।

এমন আরো নিবন্ধ