কেতজেল পাখি (পর্ব ১৯)

Bengali Novel

“ডিক্টেটরশিপ অফ দ্য প্রলেতারিয়েত না ডিক্টেটরশিপ অফ দ্য পার্টি? যেখানে শহর থেকে আসা ভদ্রলোকরাই রাজা আর স্থানীয় মানুষ? স্রেফ প্রজা।” পরবর্তী কথাগুলো বলার জন্য বুকের মধ্যে অনেকটা দম টেনে নিলো অভিরূপ। অনেকটা সাহসও। কারণ ওর দিকে স্থির একচোখে তাকিয়ে আছে অবিনাশ। তবু ভয় পেলে চলবে না। নইলে নিজেকে ইমপার্শিয়াল জার্নালিস্ট বলে ভাবার কোন মানেই হয় না। ফের শুরু করলো অভিরূপ। “আমি এখানে আপনাদের আশ্রিত। তাই উত্তর দেওয়া বা না দেওয়াটা নির্ভর করছে আপনার ওপর। তবু একটা প্রশ্নের জবাব দেবেন? আপনাদের পার্টি নেতৃত্বের সর্বোচ্চ স্তরে একজনও দলিত বা আদিবাসী নেই কেন? কেন সেখানে শুধুমাত্র রাও – রেড্ডি – বোস – সান্যাল – গান্ধী – মুখার্জিদের ভিড়? সেই তিরিশের দশক থেকে নিয়ে আজ অবধি একমাত্র জঙ্গল সাঁওতাল ছাড়া এর কোন ব্যতিক্রম দেখিনি শুনিনি অথবা পড়িনি আমি। কেন আপনাদের পলিটব্যুরোতে মহিলা কমরেডদের উপস্থিতি অ্যাতো নগন্য? সরকারী অথবা বেসরকারী বামপন্থী – অন্ততঃ এই একটা ব্যাপারে কোন ফারাক নেই দু’দলের মধ্যে। তফাৎ যেটুকু সেটা ওরা পার্লামেন্টে আর আপনারা জঙ্গলে।”

এক তোড়ে বলে যাবার সময় খেয়াল করেনি, বলে ফেলে খেয়াল পড়লো থরথর করে কাঁপছে বুকের ভেতরটা। পাক মারছে চোরা ভয়। বারান্দার চওড়া কার্নিশে আলগোছে শুইয়ে রাখা কালাশনিকভ। লেজার লাইটের মতো ছিটকে আসা একচোখের দৃষ্টি। সরাসরি ফোকাসড অভিরূপের দিকে। যদি কিছু …? ওকে অবাক করে দিয়ে ঝকঝকে সাদা দাঁত মেলে হাসলো অবিনাশ। “সিগ্রেট আছে আপনার কাছে? আজকাল অবশ্য খুব কম খাই। সেও বিড়ি বা চুট্টা … গ্রামের লোকের কাছে চেয়ে চিন্তে, মাঝেমধ্যে … থাকলে দিন তো একটা।” হতবাক অভিরূপ! অ্যাতোটা তীব্র সব প্রশ্নগুলোকে কি নিশ্চিন্তে আর ঠাণ্ডামাথায় ট্যাকেল করছে লোকটা। “হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই …।” পকেট থেকে প্যাকেটটা বের করে লাইটার জ্বালিয়ে ধরিয়ে দিলো। নিজেও ধরালো একটা। সিগ্রেটে লম্বা টান দিয়ে অনেকটা ধোঁয়া বুকে টেনে নিল অবিনাশ। “কথাটা কিছুটা হলেও ঠিক বলেছেন আপনি। সত্যি, এব্যাপারে বহু চেষ্টা চালিয়েও দলিত – আদিবাসীদের এখনও নেতৃত্বের সর্বোচ্চস্তরে তুলে আনা যায়নি সেভাবে। মেয়েদের ক্ষেত্রেও কথাটা প্রায় একইরকমভাবে খাটে। তবে এটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস। দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া। এখনও সেভাবে সাফল্য না পেলেও চেষ্টাটা চলছে নিরন্তর।”

“প্রায় চার যুগ।” কেটে কেটে উচ্চারণ করল অভিরূপ। “দীর্ঘস্থায়ী প্রচেষ্টার পক্ষে সময়টা একটু বেশি হয়ে গেল না কমরেড? এতো গেল একটা দিক। আরেকটা ক্ষেত্রেও এই দীর্ঘস্থায়ী শব্দটা ব্যবহার করেন আপনারা। ‘দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ’ মাও জে দংয়ের কথা। কোট করেন বারবার। এই যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী সঠিক পথে চললে সমাজের সর্বস্তরে এর বিকাশ ঘটবে। কিন্তু আপনাদের ক্ষেত্রে ঘটেনি সেটা। দীর্ঘ চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে জঙ্গলেই আটকে রয়েছেন আপনারা। শহরে এমনকি সমতলের গ্রামেও সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি আপনাদের পার্টি। আমার মনে হয় কোথাও দীর্ঘস্থায়ী গেরিলাযুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধ ভেবে গুলিয়ে ফেলেছেন আপনারা। আপনাদের লড়াই, আদর্শ আর ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও বলছি কথাগুলো। আর এইখানেই বোধহয় মারাত্মক ভুলটা হয়ে যাচ্ছে। ভাববেন না নিজে বিশাল বোদ্ধার মত জ্ঞান দিচ্ছি। আসলে সারা পৃথিবীর ইনসার্জেন্সি প্রবলেম আর গেরিলা ওয়ারফেয়ার নিয়ে অল্পসল্প পড়াশুনা আছে আমার। বহু সময় কাটিয়েছি লাইব্রেরী, আর্কাইভ আর ইন্টারনেটে। বেশ কিছু বইও কিনেছি। সেই পড়ার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি – আপনাদের আগে ষাটের দশকে বার্মায় সেখানকার কম্যুনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিশাল সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল। কিন্তু যেদিন স্থানীয় আদিবাসীরা বুঝল আসলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে শহর থেকে আসা শিক্ষিত মানুষেরা, সেদিন থেকে আন্দোলনে ফাটল দেখা দিতে শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই সেই ফাটল ধসে পরিণত হয়। তারপর একসময় বার্মার জঙ্গল থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় কম্যুনিস্টরা। দিশাহীন আদিবাসীরা ড্রাগ মাফিয়ায় পরিণত হয়। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া মধবিত্তের নেতৃত্ব পরবর্তীতে একই ঘটনা ঘটিয়েছিল পেরুতে। এটাকে কি আপনাদের পার্টি নেতৃত্ব অস্বীকার করতে পারে?”

অভিরূপের তীব্র ঝাঁঝালো প্রশ্নের উত্তরে ফের একবার হাসলো অবিনাশ। একচোখের দৃষ্টি একবারও সরেনি অভিরূপের মুখ থেকে। “কথাগুলো কি একটু বেশিরকম একপেশে হয়ে গ্যালো না কমরেড? কতগুলো ব্যর্থতাকেই আপনি বড় করে দেখালেন অথচ চিন, কিউবা, ভিয়েতনামের সাকসেস আপনার নজরেই এলো না?”

“জানতাম আপনি ঠিক এই কথাগুলোই বলবেন।” অবিনাশের প্রশ্নগুলোকে যেন ছোঁ মেরে লুফে নিল অভিরূপ। “যে কটা দেশের সাফল্যের উদাহরণ আপনি টানলেন তার সবকটাতেই সশস্ত্র লড়াইয়ের পাশাপাশি তীব্র-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল শহরে আর গ্রামে। মানুষের সমর্থন তৈরি হচ্ছিল এবং সেটা বেড়েই চলেছিল উত্তরোত্তর। আর তা শুধু ওই দেশগুলোর নিজের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ছাড়িয়ে পড়েছিল গোটা বিশ্বে। জনমত তৈরি হচ্ছিল। জাঁ পল সাত্র, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, পাবলো নেরুদা, জন লেনন, পাবলো পিকাসো, জোন বায়াজ, বার্টান্ড রাসেল, চার্লি চ্যাপলিন, এ্যানা লুই স্ট্রং, এডগার স্নো, বব ডিলনদের মতো লেখক – গায়ক – শিল্পী – বুদ্ধিজীবিরা, আই মিন হোল সিভিল সোসাইটি পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ওই সব লড়াইয়ের। সারা দুনিয়া জুড়ে বিশাল সব মিছিল আর আন্দোলন হয়েছিল সংগ্রামের সমর্থনে আর শান্তির পক্ষে। আর সেটা অন্যায়কারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই বেশি। আর এদিকে আপনারা? গণ আন্দোলনের এই বিপুল সম্ভাবনাময় দিকটাকে কোন গুরুতই দিলেন না। ঠিক একই ভুল হয়েছিল সত্তর দশকে এখানে, পাশের দেশ শ্রীলঙ্কায়। আপনাদের আর ওখানকার ট্রটস্কিপন্থী ‘জনতা বিমুক্তি পেরিমুনা’ আন্দোলনে। যুব, ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপেন এ্যাকটিভিটিজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল দলের তরফে নির্দেশ জারি করে। তাই যখন সেটব্যাক এলো তখন আর ব্যাক আপ ফোর্স পাঠানোর জন্য আর একজনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। রেজাল্ট, সামান্য কয়েক বছরের মধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়েছিলো লড়াইগুলো। কটু শোনালেও কথাগুলো কিন্তু সত্যি।”

“দেখুন কমরেড আপনাদের ওই ‘সো কলড’ গণ আন্দোলন-টন … আসলে প্রতিবাদী প্রতিরোধী মানুষকে ভুলিয়ে রাখার একটা অত্যন্ত ধূর্ত ফিকির মাত্র। যাতে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কখনই হাতে অস্ত্র তুলে না নেয়। এর জলজ্যান্ত নমুনা নেপাল। প্রায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ফেলতে যাওয়া একটা পার্টি হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে এই ফাঁদে পা দিলো। আর তার ফলাফল আজ চোখের সামনে। প্রথম দলের নেতারা ভোটে জিতে মন্ত্রী-সান্ত্রী হলো। তারপর নেপালের রাজনীতিতে একটু একটু করে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল দলটা। শেষ হয়ে গেল এতবড় একটা আমূল পরিবর্তনের সম্ভবনা। আসলে সিস্টেম এটাই চায়।” এবার খানিকটা রুঢ় শোনালো অবিনাশের গলা। চৌকোনা চোয়ালজোড়া একে অপরের গায়ে চেপে বসতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে।

মাথা নীচু করে এক মনে অবিনাশের কথা শুনছিল অভিরূপ। কথা শেষ হলে মাথা তুলে তাকাল। “সরি, আপনার কথাগুলো মানতে পারলাম না কমরেড। ওখানকার সশস্ত্র লড়াইয়ের হাত ধরেই পরবর্তীতে নেপালে যে বিশাল গণ আন্দোলন গড়ে ওঠে তার ফলে ওই দেশটায় যুগ যুগ ধরে চলে আসা রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। ডেমোক্রাসির জিত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা – সেই গণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল আপনাদের মতো একই রাজনীতি অর্থাৎ আর্মস স্ট্রাগলে বিশ্বাসী সেই দলটাই। আর অপ্রাসঙ্গিকতার কথা বলছেন? গণতন্ত্রে অপ্রাসঙ্গিক বলে কিছু হয় না। অস্থায়ী বা চিরস্থায়ী বলে কিছু নেই এখানে। এটা মনে রাখতে হবে, আপনাদের বন্ধু এবং সহযোগী ওই দলটার টপ লিডারশীপের একজনই কিন্তু বসেছিলেন নেপালে প্রধানমন্ত্রীর আসনে। যেটা ওই দেশে বিশাল মাস মুভমেন্টেরই রেজাল্ট। আসলে এই গণ আন্দোলনের শক্তি অপরিসীম। সেই বিয়াল্লিশের অসহযোগ থেকে শুরু করে পসকো, নর্মদা, নন্দীগ্রাম … বার বার এর সাফল্য প্রমানিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও সাউথ আফ্রিকা, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া … এরকম উদাহরণ ভুরি ভুরি । নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, হুগো চাভেজ, ডানিয়েল ওর্তেগার মতো নেতা, যারা এক সময় আর্মস স্ট্রাগলের পলিটিকসে বিলিভ করতেন তারাও পরবর্তীতে মাস মুভমেন্টের এই বিপুল ক্ষমতাকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন আর সেটাই ওই সব দেশগুলোয় সমাজ বলুন, রাজনীতি বলুন … একটা বিপুল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। অথচ সেই মাস মুভমেন্টের মতো এরকম একটা ম্যাসিভ পাওয়ারকে আপনারা ইগনোর করলেন, ডিসওন করলেন, বারবার।”

অবিনাশের দিকে দু পা এগিয়ে গেলো অভিরূপ। “একটা প্রশ্নের জবাব দেবেন কমরেড? গতকাল দীর্ঘ সময় ধরে আপনার কথায় কখনই উঠে আসেনি প্রসঙ্গটা। আপনারা যখন প্রথম এইসব অঞ্চলে আসেন তখন আপনাদের পাশাপাশি এই একই এলাকায় আরও তিনটে দল কাজ করতে এসেছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শ, শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গি, উদ্দেশ্য চারটে দলেরই প্রায় এক। তবু ‘তৈলাধার না পাত্রাধার’, শুধুমাত্র হামবড়া এই মনোভাবকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়ে গেছিলেন দীর্ঘদিন। বহু মানুষ, সবকটা দলেরই মারা গেছিলেন সেই লড়াইয়ে। অনেক রক্ত ঝরিয়ে অবশেষে দু’হাজার চার সালে এক হলেন আপনারা, তিনটে দল। কিন্তু বাকি রয়ে গেল আরেকটা ফ্র্যাকশন যারা আপনাদের পলিটিকাল ডমিনেশনকে মেনে নেয়নি। আর্মস স্ট্রাগলের পাশাপাশি মাস মুভমেন্টের ওপরও জোর দিয়েছিল। শুধুমাত্র সামান্য কিছু মতাদর্শগত ফারাকের জন্য এই এলাকা থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিলেন তাদের। স্রেফ মাসল পাওয়ার আর বন্দুকের জোরে। জঙ্গলে আপনাদের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। জোতদার – পুলিশ – কনট্রাকটর – ইনফর্মার … এরা না হয় আপনাদের শ্রেণীশত্রু কিন্তু একযুগ পেরিয়ে এসে একবারও কি মনে পড়ে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে মারা যাওয়া মানুষগুলো আপনাদের কে ছিল? ক্লাস এনিমি না মার্টার কমরেডস? হয়তো আপনাদের সঙ্গে নীতি আদর্শে অনেক ফারাক তবু এই একই ব্যাপার ঘটেছিল শ্রীলঙ্কায়। এল টি টি ই –র ক্ষেত্রে। তামিলদের আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে লড়তে থাকা বাকি সবকটা দলকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল ওরা জাফনা, বাত্তিকলোয়া, ত্রিঙ্কোমালি – এই তিনটে তামিল অধ্যুষিত দ্বীপ থেকে। ঠিক আপনাদের মতো। ভেবেছিল একচেটিয়া রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ওদের। ভুল, আসলে বিচ্ছিন্ন আর একা হয়ে গিয়েছিল ওরা। দীর্ঘদিন এরকম চলতে চলতে শেষমেশ রাষ্ট্র তার পুরো দাঁতনখ বের করল। পরিণাম কী হয়েছে আমি আপনি সবাই জানি। পুরোপুরিভাবে না হলেও বাংলার জঙ্গলমহলে এর ফল ভুগেছেন আপানারাও। পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে আদিবাসীদের তরফে গড়ে ওঠা একটা নিরপেক্ষ এবং অরাজনৈতিক গণ আন্দোলনের স্বঘোষিত পরিত্রাতা হয়ে হঠাৎ একদিন মুখে গামছা বেঁধে আর কাঁধে এ-কে ফর্টি সেভেন ঝুলিয়ে নেমে এলেন আপনারা। দুর্দান্ত সম্ভাবনাময় একটা আন্দোলনকে স্রেফ হাইজ্যাক করে নিলেন। শুরু হয়ে গেল বেপরোয়া, লাগামছাড়া খুনখারাপি । একটানা। প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক থেকে বিরোধী মত পোষণ করা দলীয় কর্মী। কেউ ছাড় পেলেন না। খুলে রাখা ফিসপ্লেটে লাইন ছেড়ে ছিটকে গেল জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেস। একশোর কাছাকাছি নিরীহ মানুষ মারা গেলেন। আহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। আশা করি তারা কেউ শ্রেণীশত্রু নয়। আপনারা ঘটনার দায় স্বীকার না করলেও অস্বীকার বা প্রতিবাদও করলেন না তেমন জোরেসোরে। একচেটিয়া খুনজখম আর লাগামহীন সন্ত্রাস। এর ফল ভুগতে হলো আপনাদের। স্থানীয় মানুষ আপনাদের পাশ থেকে স্বরে গেলো। রাষ্ট্র আর প্রশাসনের কাউন্টার টেররের মুখে পড়ে জঙ্গলমহল থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন আপনারা। অস্বীকার করতে পারেন কথাগুলো?” উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিলো অভিরূপের গলা। মনে হচ্ছিল নিজে যেন বলছে না কথাগুলো। কেউ বলাচ্ছে ওকে দিয়ে। নিছক সাংবাদিকতার ফর্ম্যাটে বাঁধা থাকছে না প্রশ্নগুলো। তুলল তর্কের পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে। সংক্ষিপ্ত থাকছে না মোটেই। সামনে দাঁড়ানো একটা মিথ। অলৌকিক কোন অতিমানবের মতো। অশরীরীর মতো বন্দুক কাঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে জঙ্গলমহলে, চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। সেই মিথটাকে ভাঙতে হবে।

চলবে…

গত পর্বের লিঙ্ক –
https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-18/

5 COMMENTS

  1. বিতর্ক সংগ্রামের এক রূপ. সশস্ত্র লড়াই এর চাইতে কম তো নয় ই বরং বেশি, কারণ এই বিতর্কগুলোই বন্দুক ধরে রাখার শর্ত সৃষ্টি করে আর শক্তি সঞ্চয় করে দীর্ঘ কালীন জনসমাবেশ কে নিশ্চয়তা দেয়. দীর্ঘকালীন জনসমাবেশের জঠর থেকেই দলিত নেতৃত্বের ভ্রুণ জন্ম নেই, তাকে জন্ম দিয়ে বাড়িয়ে তুলতে গেলে লাগে দীর্ঘকালীন প্রতিবাদ, প্রতিরোধের সংস্কৃতির . আজকের রহিত ভেমুলা, কানহাইয়া চিন্টু কিন্তু সেই আন্দোলনেরই ফলস্বরূপ. সুপ্রিয় দা মননশীল লেখক, আবার বস্তুনিষ্ট ও বিলক্ষণ. বিতর্ক কে এত দ্রুত লয়ে নিয়ে এলে হয়ত তার গভীরতা আর গাম্ভীর্য দুটোতেই একটু চিড় ধরার সম্ভাবনা থাকে. জনসমাবেশের অভিঘাত না পেয়েই অবিনাশ বিষয় টিকে অনুধাবন করতে পারবেন সেটা একটু কষ্টকল্পিত , তাঁর কাছে এই উপলব্ধি কিন্তু সেই বই পড়া জ্ঞান ই , অর্থাত একজন পেটি বুর্জুয়া র থেকে আলাদা কিছু নয়. জনসমাবেশ এর গুরুত্ব কখনই বই পড়ে হয় না. লাখ মানুষের দৃপ্ত মিছিল কে দেখতে হয়, সামুহীকতার একটা তাকত আছে যা ব্যক্তির যোগফল উদ্ভূত সমষ্টিকে ছাড়িয়ে যায়, সেটা সমুহীকতার নিজস্ব ব্যাকরণ. দলিত নেতৃত্ব নিজেরা পেটি বুর্জুয়া হতেই পারেন , কিন্তু সমুহীকতার চাপ নিরন্তর থেকে যায়, সেখানে জিগনেস শুকিয়ে গেলেও হাজার চিন্টু কুমারী তৈরী করে, হাজার ছত্রধর, হাজার শশধর তৈরী করে.. এই শর্ত সৃষ্টি একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী জনসমাবেশ ই হাসিল করতে পারে. সুপ্রিয় দা কে অনুরোধ , বিতর্ক নিয়ে সাহিত্যের মননের আঙ্গিনায় খুব একটা কাজ হয় নি, এটা র ওপরে নজর দিয়ে আরো গভীরে আমাদের নিয়ে চলুন. পরিশেষে আমার সশ্রদ্ধ লাল সালাম জানবেন .

  2. কমরেড খ্যাপা যা বলছেন তা কষ্ট দেয়।জিগনেশরা শেষ। লেখক সত্তার নাম অভিরুপ। লেখক মাত্রই উচ্চবর্গীয় চিন্তক হন।এই লেখক সামাজিক চিন্তার আবহে নিজস্ব সত্ত্বাকে চ্যালেঞ্জ করছেন।পরশ পাথর পাওয়া যাবে।সুপ্রিয় চৌধুরী যে ভাবে বলছেন, এ ভাবে কেও ভেবেছেন? দলিত থেকে নেতা হয় না। জঙ্গল ছাড়া। দাদা আপনি মতামত দেন নি। আত্ম কথন করেছেন। উত্তর নেই। দিতে পারেন নি। রোহিত ভেমুলা বা জঙ্গল সাঁওতাল হচ্ছে ব্যতিক্রমী। কিন্তু যখন দলিত সামাজিক নিরাপত্তা পায় না, তখন সে একা হয়ে যায়। কমরেড তোমাদের সেলাম। ভেবেছ তো। উত্তর পাওয়া যাবে, কোন এক দিন। সেদিন আগত প্রায়। আমার ভাষা বুঝবে সেদিন তোমরা। বিশ্লেষণ অসাধারণ।

  3. কথাটা সত্যি। দীরঘস্থায়ী কোন বিতর্ককে সাহিত্যে বিশেষ করে উপন্যাসের আঙ্গিনায় এনে ফেলাটা খুবই কঠিন কাজ। সবচেয়ে সমস্যায় পড়েছি বিতর্কের সময় অভিরুপ চরিত্রটিকে নিয়ে। লেখার সময় বিশেষত এই বিতর্ক পর্বটিতে প্রতিমুহূর্তে অভিরুপের চরিত্রে নিজেকে অভিনয় করে যেতে হয়েছে মানসিকভাবে। এই একই চরিত্রে আমি একসাথে মিশিয়ে দিতে চেয়েছি লোহিয়া, জয়প্রকাশ নারায়ন সুজাত ভদ্র, নন্দিনী সুন্দর, হিমাগশু কুমার, অরুন্ধুতী রায়, হর্ষ মান্দার, শঙ্খ ঘোষকে, যে শুধুমাত্র একজন ইমপারশিয়াল জারনালিস্ট নয়, গান্ধীবাদ, মারক্সিজম, কিছুটা র‍্যাডিক্যালিজমও মিলেমিশে রয়েছে যার ভিতরে, সর্বোপরি যে একজন আদ্যন্ত মানবতাবাদী। সবচাইতে মুশকিল হচ্ছে এই মনোভাবের খানিকটা আমি বিশ্বাস করি, খানিকটা করিনা। এরকম দুরূহ একটি প্রচেষ্টায় কদ্দুর সফল হয়েছি, আদৌ হয়েছি কিনা সে বিচার করবেন আপনারা, পাঠকরা। লেখক নয়।

  4. এটাও সত্যি যে ওপেন ফ্রন্ট মাস মুভমেন্টের ক্ষমতা নিয়ে অক্সিজ্ঞতা সঞ্চয় করার আগেই অবিনাশকে জঙ্গলে চলে যেতে হয়েছিল। নথিং ডুইং !

  5. প্রত্যেকটা পর্ব যেন ভিন্ন স্বাদের । ঘটনাগুলো যেন চোখের সামনে ঘটছে। কি টান এই লেখার। আগ্রহে বসে থাকি। কতটা অধ্যাবসায় থাকলে এরকম লেখা যায় ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.