কেতজেল পাখি (শেষ পর্ব)

Bengali Novel

মাটি থেকে ফুট তিনেক ওপরে লাফিয়ে উঠলো অভিরূপের শরীরটা। মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ার আগেই বিস্ফোরণে ছিটকে আসা একটা পাথরের টুকরো সপাটে এসে লাগলো কপালে। পরমুহূর্তেই সটান মাটিতে আছড়ে পড়ল অভিরূপ। আবছা হয়ে আসা চোখের দৃষ্টি। চারদিকে ধোঁয়া, আগুন, গুলির শব্দ। আধো অবচেতনে মুখের সামনে এগিয়ে আসা একচোখ … দুটো লোহার মতো হাত … কাঁধে তুলে নিচ্ছে অভিরূপকে … দৌড়োচ্ছে খানাখন্দ ডিঙিয়ে … তারপর সব অন্ধকার!

কানে মোবাইল। হিস্টিরিয়াগ্রস্থ রুগীর মতো চিৎকার করছিল শ্রীতমা। “দিব্যেন্দুবাবু, শুনতে পাচ্ছেন … আমি যাব ওখানে। একটা কিছু ব্যবস্থা করুন! প্লিইইজ … অভি …।”

অভিরূপের ফ্ল্যাট। সোফায় এলিয়ে পড়ে থাকা সুহাসিনী। অভিরূপের মা। জ্ঞানহীন। মুখে জলের ছিটে দিচ্ছে কাজের মেয়ে আরতি। সামনে খোলা টিভি স্ক্রীন। ঘোষিকার গলা – “লাতেহারের জঙ্গলে যৌথবাহিনী বনাম মাওবাদীদের মধ্যে তীব্র গুলির লড়াই। হতাহত একাধিক … কলকাতা থেকে নিউজ কভার করতে যাওয়া একজন সাংবাদিকও রয়েছেন সেখানে …”। শ্রীতমার হাত থেকে খসে যাওয়া মোবাইলটা ধপ করে পড়ে গেল সোফার ওপরে।

“এই তো জ্ঞান ফিরেছে!” যেন কয়েক আলোকবর্ষ দূর থেকে একটা পাতলা সুতোর মতো ভেসে আসছে কথাগুলো। অনেকক্ষণ সময় লাগলো অভিরূপের চোখ দুটো খুলতে। সামনে বসা শশী। “মর্টার অ্যাটাক … আমি তো ভয় পাচ্ছিলাম কোমায় চলে গেলেন বুঝি। যাক, হোয়াট আ রিলিফ!” লম্বা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললেন ডাক্তার। পাশে বসা অবিনাশ। মুখে ম্লান হাসি। ছেঁড়া জলপাই ইউনিফর্ম। ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগে এখানে সেখানে। কনুইয়ের কাছে মোটা করে ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটা গলায় ঝোলানো। “এবারও বেঁচে গেলাম কমরেড … একটা ছোট্ট চুমু দিয়েই বেড়িয়ে গ্যাছে মর্টারের টুকরোটা। মনে হয় বেড়ালের মতো ন’টা জান আমার। মরছি না কিছুতেই। কিন্তু দুজন কমরেড শহীদ। একজন মারাত্মক ইনজিওরড।” মুখটা পাথরের মতো ভারী। দীর্ঘশ্বাস ফেললো অবিনাশ। “তবু সান্ত্বনা, আপনাকে তো বাঁচাতে পারলাম। তবে আর চিন্তা নেই। আপনি এখন সেফ। এটা আমাদের সবচেয়ে স্ট্রং গেরিলা জোন।” ম্লান হাসির মধ্যেও একটা আত্মতৃপ্তির ছাপ এক চোখে। “আপনাদের এখানকার করসপন্ডেন্টের সঙ্গে কথা হয়েছে। কাল সকালে আমাদের বলে দেয়া জায়গায় একটা গাড়ি আসবে আপনাকে রাঁচি নিয়ে যেতে। তাহলে আর কী? এবার তো বাড়ি। কালকের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাবেন আশা করি। আমি যাই, ওদিকটা আবার একটু দেখি গিয়ে।” অভিরূপের থেকে সামান্য দুরে আর একটা ক্যাম্পখাট। চাদরে গলা অবধি ঢাকা দেওয়া আরেকটা শরীর। পাশে ঝোলানো স্যালাইনের বোতল। রক্তের পাউচ। দুটো ব্যাটারি চালিত লাইট জ্বলছে তাঁবুর মধ্যে। কথা বলতে বলতে সেদিকে এগিয়ে গেল অবিনাশ। সঙ্গে ডঃ শশী।

রাত সাড়ে সাতটা। চেম্বারে বসা দিব্যেন্দু। অফিস ছুটির পরেও বাড়ি যাননি। চারপাশে ঘিরে বসে থাকা সহকর্মীরা। সেঁজুতি, দ্বৈপায়ন, অর্জুন পিল্লাই …। প্রচণ্ড টেনশনের ছাপ সবার চোখেমুখে। “একটু আগে ফোন এসছিল ব্রিজেশের কাছ থেকে। ওর কাছে খবর এসেছে – অভি ইজ সেফ। কাল আর্লি ইন দ্য মর্নিং একটা গাড়ি পাঠাতে হবে ওদের বলে দেওয়া কোন জায়গায়। সেখান থেকে অভিকে পিক-আপ করে নেবে গাড়িটা। ব্রিজেশ কথা বলে বন্দোবস্ত করে রেখেছে। রিলায়েবল ড্রাইভার অ্যান্ড ব্রেভ অলসো। আশা করা যায় কোন প্রবলেম হবে না। কিন্তু এদিকে আবার একটা সমস্যা … ওই শ্রীতমা। অভির গার্লফ্রেন্ড। প্রচণ্ড জেদ ধরেছে। ও রাঁচি যাবেই। অর্জুন …।” পিল্লাইয়ের দিকে তাকালেন দিব্যেন্দু। “তুমি এক কাজ করো। তুমিও যাও মেয়েটার সঙ্গে। ট্রাভেল এজেন্টকে বলো কাল যে কোনও মর্নিং ফ্লাইটে রাঁচির দুটো টিকিটের ব্যবস্থা করতে। ফেরার টিকিটটাও কনফার্ম করতে ভুলো না। আর একটা কথা, গাড়ির ড্রাইভার ছাড়া আর কাউকে ওরা অ্যালাও করবে না জানিয়ে দিয়েছে। মেয়েটিকে বুঝিয়ে বোলো কথাটা। ওকে, নাউ লেটস ব্রেক দ্য সেশন।” বলতে বলতে ব্লেজারটা গায়ে গলিয়ে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন দিব্যেন্দু ব্যানার্জি।

অনেক রাত। রণজিৎ সিং রাঠরের কোয়ার্টার। সোফায় মুখোমুখি বসা রণজিৎ সিং আর সঞ্জীব পাঠক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দুটো শরীর। সামনে সেন্টার টেবিলে রামের গ্লাস। “স্যাড সঞ্জীব, ভেরি স্যাড … হামলোগোঁকা দো বাহাদুর জওয়ান মুঠভেড় (এনকাউন্টার) মে শহীদ। সবসে বড়ি আফশোস কি বাত … অবিনাশ … ওহ জঙ্গল কি লুমড়ি (শেয়াল) … ইস বার ভি বাঁচকে নিকাল গিয়া। ড্যাম ইট!” হতাশায় টেবিলে সজোরে একটা ঘুষি মারলেন রাঠোর।

“ওই যে আপনার গাড়ি।” পাহাড়ের বাঁকে দাঁড়িয়ে অবিনাশ। ব্যান্ডেজ বাঁধা একহাত গলায় ঝোলানো। অপর হাতের আঙুল ইশারা করছে নীচের রাস্তায়। ওর তর্জনীকে অনুসরণ করে নীচে তাকালো অভিরূপ। একটা নীল রঙের মারুতি ওমনি। দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশে। ওপর থেকে একটা ছোট্ট বাক্সের মত দেখাচ্ছে গাড়িটাকে। “এটুকু রাস্তা আপনাকে একাই যেতে হবে কমরেড … আর এই নিন।” পকেটে হাত ঢোকালো অবিনাশ। বেড়িয়ে এলো ছোট পাউচে মোড়া দুটো সিমকার্ড। ও দুটোর কথা ভুলেই গেছিল এই ক’দিনে। অবিনাশের পাশে দাঁড়ানো দুই দেহরক্ষী। সতর্ক চোখ ঘুরছে চারপাশে। পা বাড়ানোর আগে ওর হাতখানা চেপে ধরলো অভিরূপ। “একটা অনুরোধ আছে। বেহালা বাজানোটা ছাড়বেন না। হয়তো ওটা কোনও একদিন আপনাকে অস্ত্র নামিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।” উত্তরে সেই ঝকঝকে হাসি – “আপনার আশাটা হয়তো কোনদিন পূরণ হবে না। তবে বেহালাটা ছাড়ব না। আসলে আমার রক্তে মিশে গ্যাছে ওটা। আর আমারও একটা রিকোয়েস্ট আছে। আমার বন্ধু সুদীপ্ত … জিগরি দোস্ত, লাঙ্গোটি কা ইয়ার … এখান থেকে ফিরে গিয়ে যে লেখাটা লিখবেন সেটা যদি ওর চোখে পড়ে, ঠিক চিনে নেবে আমাকে। যদি কোনভাবে যোগাযোগ হয় তাহলে ওকে বলবেন খেলাটা আজও ছাড়িনি আমি … কেতজেল পাখিটা এখনও উড়ছে আকাশে। খাঁচায় পোরা যায়নি পাখিটাকে। তাহলে আসি কমরেড। লাল সালাম!”

ফয়েলের মোড়ক খুলে সিমকার্ড দুটো মোবাইলে লাগাতে লাগাতে টলোমলো পায়ে উৎরাই ভেঙ্গে নামছিলো অভিরূপ। কপালে ছটা স্টিচ। মোটা করে বাঁধা ব্যান্ডেজ। কড়া ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক আর পেইনকিলার। তবু কনকনে যন্ত্রণাটা ফিরে আসছে বারবার। অনেকটা নেমে এসে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো পিছনে। নাঃ, কেউ নেই! রাতের গভীর ঘুম ভাঙ্গিয়ে বিছানায় উঠে বসিয়ে দেওয়া একটা স্বপ্ন বা আকাশে সগর্জনে ফেটে পড়েই মিলিয়ে যাওয়া কোন আতসবাজীর রঙিন ফুলকির মতোই পাহাড়ের বাঁকে মিলিয়ে গেছে অবিনাশ!

বিরসা মুণ্ডা এয়ারপোর্টের লনে এসে ব্রেক কষলো নীল মারুতি ওমনি। ড্রাইভারের কাঁধে ভর দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো অভিরূপ। চারপাশে পুলিশ, নিউজ চ্যানেল আর খবরের কাগজের সাংবাদিকদের ভিড়, ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানি। হাত নাড়ছে অর্জুন। পাশে দাঁড়ানো শ্রীতমা। এক পা বাড়ানোর আগেই ছুটে এলো হরিণীর গতিতে। হাউহাউ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো বুকে। আঁচড়াচ্ছে, খামচাচ্ছে, গুমগুম করে কিল মারছে বুকে। ছটপট করছে উন্মাদিনীর মতো – “ইউ … ইমপসিবল রাস্কাল। এভাবে আর কতবার … কতদিন? লিসন, লিসন টু মি অভি … আই নিড আ ফ্যামিলি। আই ওয়ান্ট এভরিথিং সেফ, সিকিওরড অ্যান্ড সেটেলড … ডু ইউ হিয়ার মি? ইউ ব্লাডি ডেফ …।” কেঁদেই চলেছে শ্রীতমা। চোখের জলে ভিজে যাওয়া জ্যাকেট, পুলওভার। ভাবছিল অভিরূপ। শ্রীতমা একটা সংসার চায়। সাজানো গোছানো, নিরাপদ, পরিপাটি … একদিন এসব হবেও হয়তো। তারপর সেই নিউজডেস্ক, পাতা ছাড়া, কলেজের চাকরি, উইকএন্ডে মাল্টিপ্লেক্স-শপিংমল, ই এম আই স্কিম, নিত্যনতুন গ্যাজেটস, ছুটিছাটায় মন্দারমনি কি লোলেগাঁও, ছেলেমেয়ের স্কুলের খোঁজ … ফ্লাইটে এখান থেকে বড়জোর ঘন্টাখানেক। একটা অন্য দুনিয়া। আর এদিকে? একটা চোখ। একটাই স্বপ্ন। হয়তো বা ভুল। নাকি ভীষণ অন্যরকম। আর পাঁচ-দশটা চেনা ছকে বাঁধা নয়। ঠিকানা, বন্ধু, মা, লেভ ইয়াসিন হতে চাওয়া গোলকিপিং গ্লাভস … সব হারিয়ে ফেলে এই পালামৌর জঙ্গলে। পাখির পালকের মতো, শিমূল তুলোর মতো প্রেম। ডানা থেকে খসে, বীজ থেকে ফুটে উড়তে উড়তে এসে পড়েই ফের উধাও হয়ে গেছে। কী হবে স্বপ্নটার? এটা তো মানতেই হবে সি আর পি এফ, পুলিশ, কোবরা ব্যাটেলিয়ান … রোজ লেগে থাকা এনকাউন্টার, অ্যামবুশ, মৃত্যুমিছিল। কিন্তু দেশের সৈন্যবাহিনী, তারা এখনও নামেনি এই যুদ্ধে। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ পদাতিক বাহিনী। সঙ্গে এয়ার ফোর্স। তারা নামলে কী হবে? আরেকটা জাফনা? আরেকটা ত্রিঙ্কোমালি? আরেকটা বাত্তিকলোয়া? আরেকটা মাইলাই? মাইলের পর মাইল জ্বলে পুড়ে যাওয়া অরন্যভূমি, ফুলপাতা, পশুপাখি, ছিন্নভিন্ন লাশের পাহাড়, বিরসার ছেলেপুলে …। কার আড়ালে আশ্রয় নেবে ওই একচোখে দেখা স্বপ্নটা? ডানা ভেঙ্গে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়বে না তো কেতজেল? আর ভাবতে সাহস হচ্ছে না। বুকের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা কান্নার উচ্চরোল ফোঁপানিতে পরিণত হয়েছে এতক্ষণে। ধীরে ধীরে কাঁপুনি থেমে গিয়ে স্থির, শান্ত হয়ে আসছে নরম শরীরটা। চারদিক থেকে এগিয়ে আসা ক্যামেরা বুম, ভয়েজ রেকর্ডার, পেন আর নোট খাতা। শ্রীতমার পিঠে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ফেললো অভিরূপ।

গত পর্বের লিঙ্ক –
https://banglalive.com/ketjel-pakhi-the-bird-with-the-fiery-wings-bengali-novel-21/

সুপ্রিয় চৌধুরী
জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর কলকাতার পুরোনো পাড়ায়। বহু অকাজের কাজী কিন্তু কলম ধরতে পারেন এটা নিজেরই জানা ছিল না বহুদিন। ফলে লেখালেখি শুরু করার আগেই ছাপ্পান্নটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। ১৪২১ সালে জীবনে প্রথম লেখা উপন্যাস 'দ্রোহজ' প্রকাশিত হয় শারদীয় 'দেশ' পত্রিকায় এবং পাঠকমহলে বিপুল সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে আরও দুটি উপন্যাস 'জলভৈরব' (১৪২২) এবং 'বৃশ্চিককাল' (১৪২৩) প্রকাশিত হয়েছে যথাক্রমে পুজোসংখ্যা আনন্দবাজার এবং পত্রিকায়। এছাড়া বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং দু চারটি ছোটগল্প লিখেছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আর লিটিল ম্যাগাজিনে। তার আংশিক একটি সংকলন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে 'ব্যবসা যখন নারীপাচার' শিরোনামে। ২০১৭ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার।

12 COMMENTS

  1. শেষটা বড়ো কাঁদিয়ে গেল ওই একচোখ । গল্প হলেও তো এর অনেকটাই তো সত্য। সব বিনোদন ছেড়ে যারা মানুষের জন্য শড়াই করেছে তারা কি পেল বা কি পাচ্ছে। শুরুটা সেই জাত পাত । আজও reservationনিয়ে আমরা চেঁচামেচি করি। কেউ একবারও বলি না ওহে নামের পিছনে titleটা তুলে দিক সরকার। শুধু থাকি মানুষ হয়ে । বাঁচি মানুষ হয়ে। এতো ভালো লি
    লেখা দেওয়ার জন্য, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সুপ্রিয় স্যার ।

    • কাঁদিয়ে দিল আপনার লেখাও। সত্যি, পদবীহীন, গোত্রহীন, জাতপাত এবং ধর্মহীন একটা সমাজব্যবস্থা কবে যে স্থাপিত হবে মহোদয়া ! তবে তার কোন লক্ষণ দেখছি না চারপাশে। বরং পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠছে দিন কে দিন, বিশেষ করে আমাদের এই পোড়া দেশে। তবু তো আমাদের আশা নিয়ে ঘর করতেই হবে আমাদের ! ভাল থাকবেন।

  2. আজ ১-লা জুন। প্রকাশিত হল বাংলা লাইভ ডট কমে প্রকাশিত আমার ধারাবাহিক উপন্যাস কেতজেল পাখির শেষ ( ২২ ) পর্ব। যারা এই দীর্ঘ সময় ধরে আমার লেখাটি পড়ার ধৈর্য দেখালেন, তাঁদের সবার কাছে আমার একান্ত অনুরোধ – লেখাটি কেমন লাগলো ( ভাল, মন্দ, দোষগুন, সমস্ত দিক মাথায় রেখে ) জানাবেন নিঃসঙ্কোচে। আপনাদের মহামুল্যবান মতামত আমাকে সমৃদ্ধ করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে খামতি কাটিয়ে উঠে আরো ভাল লেখার।
    ধন্যবাদান্তে
    লেখক

  3. বড্ড বেশী তাড়াহুড়ো করে শেষ করলেন লেখক। সম্পাদনার চাপে কেতজেল পাখি মুক্তি পেল না উন্মুক্ত আকাশে, কেমন যেন বুড়িয়ে গেল, এটা লেখক কেটজেলের কথা বলছি, । নায়ক কেতজেল কে একেবারে ব্যম লোকে Cছেড়ে দেয়া হল। বিপ্লব যখন এক পর্যায়ের থেকে অন্য পর্যায়ে যায়, কিন্তু কোথাও পৌঁছয় না। কল্পনার রুম্ম্যানি গেঁড়ে বসে। একটা অনিশ্চয়তা থেকে ভিন্ন আর একটিতে প্রবেশ করার সময় মতাদর্শ যতটা ধাত্রী হয় সেটা কার্যকরী নয়, তবে মৌলিক বটে, প্রয়োজন পড়ে রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি, সেটাই কান্ডারি তখন। ওই যাত্রা কেতজেল পাখির জন্যে নয়, তার জন্য প্রয়োজন বাঘের মতো অনেক কষে চুপটি করে মাইলের পর মাইল বুকে ভর করে এগিয়ে যাওয়া।অবিনাশ তো বাঘ বেড়ালের gene mutation এর ফল, ও হয়তো পারবে, গল্প এই অনিশ্চয়তয় সফল, । প্রত্যেকটি সফলতার সঙ্গেমিশে থাকে অসফলতার ওপাশ টা, দেখার ভ্রম বা বোঝার ভঙ্গিমা। এই dialectics টাই গল্পের প্রকাশ। এবারের “কেতজেল পাখি” তাই উপন্যাস হয়ে উঠলো না, বড় গল্প হওয়ার শেষ দিকটা কেমন যেন আহত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোলো, এগিয়েই হাসপাতালের বেডে আশ্রয় নিলো , ঠিক অভিরূপের মতো, কি অনবদ্য সমাপতন! এখানে লেখনীর সাফল্য, সেটা পরে পাওয়া চোদ্দ নাকি সাড়ে পNএর আনা বলামুস্কিল, ওই অনেকটা উচ্চ মাধ্যমিক এ 500 র মধ্যে 499 পাওয়ার মতো। পরীক্ষক নিজের কাছে আধ আনা রেখে দেবে, নিজের ভাও বাড়াবার জন্যে যেমনটি আমি করছি, 500 যে 500 দেওয়ার মতপ্রাণ খোলার জন্যে যে সেজদা দরকার , সেইসালাম বা সমর্পন তা যেন reserve রেখে দিলাম, Bহিষণ কষ্ট পেলাম, বুক চিরে গেল, টাওপার্লাম না , লেখক ক্ষমা করবেন। না এ করলেও নাস্তিকের ভাষায় বলতে হয়, “কি আর করা”, বেগানা ঘুরে বেড়াবে , আমার অতৃপ্তির চাহিদা টুকু। সেলাম আমার প্রিয়তম লেখক, । অবিনাশ এর খোঁজ কি শেষ হয়? হবেই বা কেন? এই দুরাশা মানুষের হবে কেন ? ন হন্যতে….এই খোঁজ , এই অনুসন্ধানের তপস্যা।

    • প্রথমেই একটা নির্ভেজাল সত্যি কথা বলে নি। আমার এই লেখাটি প্রকাশের ক্ষেত্রে কখনো কোথাও একটি শব্দও কাটছাঁট করেননি বাংলা লাইভ ডট কম কর্ত্রীপক্ষ। তার জন্য ধন্যবাদ অবশ্যই তাঁদের প্রাপ্য। অতঃপর আসি নিজের কথায় । আমি নিজেই কি তাহলে নিজের লেখার সম্পাদনা করলাম ? এ প্রশ্নের উত্তরও এককথায় – না । এক বিখ্যাত কবি একবার বলেছিলেন – কলম অশরিরী। কথাটা বিশ্বাস করি মনেপ্রাণে। তো সেই কলম তার স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে ভর করে যেদিকে উড়তে চেয়েছে, উড়তে দিয়েছি তাকে, ঠিক গল্পের ওই কেতযেল পাখিটার মতই। বাধা দিই নি কোথাও। তার পরেও কতটা অসম্পূর্ণতা অথবা ঘাটতি রয়ে গেল তার শ্রেষ্ঠ বিচারক পাঠকই। তাদের মুলয়বান মন্তব্য আমি সর্বদা শিরোধার্য। তাদের কাছে প্রতিদিন শিখি আমি। সবশেষে বলি খুব ক্ষুদ্রাকারে হলেও এই চোখদুটোও সামান্য স্বপ্ন দেখেছিল একদিন। সেই স্বপ্নটাকেই হয়তো চারিয়ে দিতে চেয়েছিলাম অবিনাশের মধ্যে। হয়তো ব্যর্থ, অসফল তবু চেষ্টা তো করলাম। বিখ্যাত শায়ের চির সাম্যবাদী সাহির লুধিয়ানভি ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টির ভুমিকায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে একদা একটি অসামান্য শের রচনা করেছিলেন। অনেকদিন আগে শোনা, খানিকটা ভুলভ্রান্তি হতে পারে তবুও তুলে দেয়ার লোভ সামলাতে পারলামনা। লাইনদুটো এরকম। ‘এক হাসিন সপনা যো কাবিল-এ- নামুমকিন / এক হাসিন মোড় পে লেকে উসে আলবিদা কহেনা বেহতর হ্যায়।’ যার বাংলা অর্থ – একটি সুন্দর স্বপ্ন যা কখনই সফল হবার নয় / এক সুন্দর বাঁকে নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়াই ভাল। সাতজম্মেও সাহির হতে পারবো না। তবু তার অসফল অনুগামী হয়েই না হয় রয়ে গেলাম আমি !-

  4. ক্লিশে হয়ে যাওয়া অসাধারণ শব্দটা বললে কম বলা হয়, এমনি শ্বাসরোধী মারাত্মক রাজনৈতিক উপন্যাস এই কেতজেল পাখি।গতি,সাসপেন্স ও আবেদনে যা পাল্লা দেয় লেখকের “দ্রোহজ” উপন্যাসের সঙ্গে। বাংলা সাহিত্য ভীষণভাবে সমৃদ্ধ হল। আবার স্বাদ পাওয়া গেল হেমিঙ্ওয়ের।

    • প্রথমদিন থেকে আমার লেখার সঙ্গে রয়েছেন। কেতজেল পাখির শেষ পর্ব অবধিও রইলেন। ভবিষ্যতেও থাকবেন, আমি নিশ্চিত।

  5. কি জানেন, মনে হচ্ছে একটা যুগের শেষ হল। ‘দ্রোহজ’ পড়ার পরেও যে তেষ্টাটা রয়ে গেছিল,এই দীর্ঘ যুদ্ধবিগ্রহ ও তার সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ধারা,আমাকে অন্য এক প্রশান্তি এনে দিল।অনেক ধন্যবাদ এমন লেখা উপহার দিবার জন্য।অনেক ধন্যবাদ বহু প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য।অনেক ধন্যবাদ,চোখে জল এনে দেবার জন্য।

    বই আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রইলাম।

    • rরাজনৈতিক বিশ্লেষণ কতটা সঠিক করতে পারলাম জানিনা। তবে কিছুটা হলেও আপনাদের ভাল লাগাতে পারলাম, চোখে জল আনতে পারল্মম, এটাই লেখক হিসাবে পরম প্রাপ্তি। বই হয়ে কবে বেরোবে এখনই বলতে পারছিনা।

  6. অরণ্য ও পাহাড়ের পরিবেশ ও গেরিলা জীবনের বাস্তবতা নিখুঁত ডিটেলিং এর মাধ্যমে মূর্ত হয়ে উঠেছে

  7. পাঠক লেখাটা চোখে দেখতে পাচ্ছেন, লেখকের পরম প্রাপ্তি এটাই।

  8. কেতজেল পাখি উপন্যাসই। নিছক বড় গল্প নয়। এখানে উপন্যাসের মতো সাবপ্লটগুলো ফ্ল্যাশব্যাকের মতো চলে এসেছে অবিনাশের স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে। এছাড়া আনুষঙ্গিক নানা ঘটনার মধ্যে দিয়েও। সর্বোপরি রিয়ালিজমের বিস্তৃত উপস্থাপনা ও বৃহৎ প্রেক্ষাপটে তার ব্যাপ্তির মধ্যে দিয়ে এটি উপন্যাস হয়ে উঠেছে।। ওল্ড ম্যান অ্যাণ্ড দ্য সী এর মতো কলেবরে ক্ষুদ্র হলেও তাই এটা রচনাগুণে সার্থক উপন্যাস। নিজস্ব শ্রেণী অবস্থান ও নিজস্ব জীবন বৃত্তের সাপেক্ষে অভিরূপের প্রতিক্রিয়া ও ভাবনার সীমাবদ্ধতা পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে। কেন্দ্রীয় চরিত্র অবিনাশের নির্মাণতো অতুলনীয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও সংশয় সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here