বাবা-মেয়ের শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছিলেন : অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

Aniket Chattopadhyay Interview

আদতে সাংবাদিক | যুক্ত ছিলেন কলকাতা টিভির সঙ্গে | এরপর ‘বাই বাই ব্যাঙ্কক’, ‘গোড়ায় গণ্ডগোল’, ‘ছ-এ ছুটি’র মতো রোম্যান্টিক কমেডি দিয়ে ফিল্ম দুনিয়ায় প্রবেশ | বানিয়েছেন ‘শঙ্কর মুদি’র মতো রাজনৈতিক ছবি | তারই মাঝে ফেলুদা ও ব্যোমকেশের সঙ্গে টক্কর দিলো তাঁর গোয়েন্দা ‘কিরীটী রায়’ | পরিচালক অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় তন্ময় দত্ত গুপ্ত |

আপনি কিছু কমেডি ধর্মী ছবি পরিচালনা করেছেন।তারপর ওই ধারা থেকে সরে এসে কিরীটী রায়’-এর মতো ছবি করলেন কেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : এখন কোন পরিচালক কি ছবি করবেন,সেটা নির্ভর করে প্রযোজকের ওপর ।প্র যোজক ব্যোমকেশ চেয়েছেন বলে ব্যোমকেশ হয়েছে।ওনারা চেয়েছেন বলে অনেক দিন পরে ফেলুদা হলো । তাই কিরীটীর ব্যাপারটাও আমি ঠিক করিনি।আমার প্রোডিউসার বলেছিলেন-“একটা কিরীটী রায় লিখে ফেলো” । তাই চিত্রনাট্য লিখে ফেললাম । আমাকে তিনটে গল্প দেওয়া হয়েছিল । তার মধ্যে থেকে একটা গল্প করতে বলা হয় ।

সেখান থেকে আপনি “সেতারের সুর” করলেন ?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : হ্যাঁ । কিন্তু আমি শুধু কিরীটীর ওই তিনটে গল্প পড়িনি । আরো অনেক গল্প পড়েছি । কারণ একটাই । কিরীটী চরিত্রের একটা গ্রাফ আছে । সেটা বোঝার জন্য অন্যান্য গল্প পড়া প্রয়োজন । প্রথমে যে তিনটে গল্প পড়েছিলাম,সেখানে কোথাও ছিল না যে কিরীটী রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারে । কিন্তু অন্যান্য গল্পে  কিরীটীর গান গাওয়ার বিষয়টা রয়েছে । কিরীটী গান গায় এবং গান বোঝে । সেই জায়গা থেকে আমি ‘সেতারের সুরে’ কিরীটীর গলায় মৃদু রবীন্দ্রসঙ্গীত রেখেছি ।

রুম নাম্বার ১০৩ নামের একটা থ্রিলার ছবি দিয়ে আপনি আপনার কেরিয়ার শুরু করতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেটা তখন হয়নি এই না হওয়ার পেছনের কারণ কী?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : ওই ছবিতে বাবা মেয়ের একটা সম্পর্ক ছিল । এই সম্পর্কের জন্য ২০০৮ সালে প্রযোজক পিছিয়ে যান ।

বেশ কিছু কমেডি ছবির পরে যখন কিরীটী করলেন,তখন কি একটা অন্যরকম ফিলিং হলো?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : ছবি তৈরির মূল ব্যাপারটা এক । সেটা হলো গল্প বলা । আসলে যে কোনও ছবির প্রেক্ষিত সেই ছবিকে তৈরি করে । এই প্রেক্ষিতের ওপর নির্ভর করে ছবির ট্রি্টমেন্ট,ছবির মুভমেন্ট । ১৯৫৬ সালে তৈরি ছবির গতি আর ২০১৬ সালে তৈরি ছবির গতি এক হবে না । স্বাভাবিক ভাবেই ২০১৬ সালের গতি অনেক বেশি হবে । মানুষ এখন অনেক আধুনিক । অনেক ডায়ানামিক । সেই দিক থেকে আমাকে ১৯৫৬ সালের কিরীটী কেমন হবে সেটা ভাবতে হয়েছে ।

আপনার নিজের ঠিক কী ধরনের ছবি করতে ইচ্ছা করে?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : আমি আসলে রাজনৈতিক ছবি বানাতে চাই । রাজনীতির কথা বলতে চাই । রাজনীতি আমার নিজস্ব জায়গা ।

ফেলু এবং ব্যোমকেশ, কিরীটীর তুলনায় অনেক বেশি জনপ্রিয়।সেক্ষেত্রে কিরীটী করার সময় কখনও কি মনে হয়েছিল এই দুই গোয়েন্দার তুলনায় “কিরীটী রায়” মানুষ কম দেখতে পারেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : আমি জানি না তন্ময় তোমার বয়স কতো । আমাদের বয়সে আমরা প্রথম পড়েছি কিরীটী । পড়েছি বললে ভুল হবে । গোগ্রাসে পড়েছি । কারণ কিরীটীর মধ্যে অসম্ভব রিডিং প্লেজার রয়েছে । ব্যোমকেশের তুলনায় কিরীটী পড়া অনেক সহজ । ব্যোমকেশ প্রাপ্তমনস্ক সাহিত্য । আর কিরীটীর মধ্যে একটা হিরোইক ব্যাপার রয়েছে । কিরীটী একজন হিরো ডিটেকটিভ । তাই কিরীটীর রিকল ভ্যালু আছে । সেই জন্য আমার আশঙ্কা কম ছিল । তবে অন্য একটা বিষয় নিয়ে চিন্তা ছিল ।

কী চিন্তা?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : আমার কিরীটীর আগে অন্য পরিচালকের পরিচালিত কিরীটী হয়ে গিয়েছিল । সেটা অদ্ভুত ধরনের হয়েছিল । তাই আমার মনে হয়েছিল কিরীটীর ব্র্যাণ্ড কোথাও একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । ফলে আমার কিরীটী দেখার সময় লোকের আগের কিরীটীর ইমেজ মাথায় থাকবে না তো?—এই প্রশ্নটা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল ।

চারদিকে এতো গোয়েন্দা কাহিনী নিয়ে সিনেমা হওয়ার পেছনে কি কোনও কারণ আছে?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় :  গুরুত্বপূর্ণ কোনও কারণ নেই । ব্যোমকেশ হিট করার সঙ্গে সঙ্গে আর এক পরিচালক বলল আমিও ব্যোমকেশ তৈরি করব । এভাবেই হচ্ছে । এসব কি সুস্থ বিষয়!এদিকে বাংলায় কোনও রাজনৈতিক ছবি নেই । কারণ প্রোডিউসারেরা কোনও ঝুঁকি নিতে চান না । ১৯৫৬ সালে উত্তম-সুচিত্রার ‘সাগরিকা’ সব স্তরের মানুষ দেখেছিল । এবং এই বিষয়টা আমার পরিচালিত ছবি “কিরীটী রায়ের” মধ্যে আছে । বাড়ির মালিক যেমন ‘সাগরিকা’ দেখেছিল তেমনই বাড়ির কাজের লোকও দেখেছিল । এখন এই বিষয়টা নেই । এখন অভিজাত সম্প্রদায় যে সিনেমা দেখে সেই সিনেমা বাড়ির কাজের লোক দেখে না । দুই পক্ষের রুচির মধ্যে এখন বিস্তর ব্যবধান দেখা দিয়েছে । প্রোডিউসারেরা প্রায় সবাই ঝুঁকিহীন ভাবে আরবান সিনেমা করতে চান । অনেকেই চায় একটু সেক্সুয়াল ঘাঁটাঘাঁটি । কিন্তু কেউই সামাজিক,রাজনৈতিক বা বৈপ্লবিক ভাবে কোনও কিছু করতে চায় না । আমার ধারণা আজকের সময়ে মানুষ ভালো রাজনৈতিক ছবি নিশ্চয়ই দেখবেন ।

রুম নাম্বার ১০৩ ছবিটা করার সময় আপনি নাকি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : সৌমিত্রদা আমার পছন্দের অভিনেতাদের অন্যতম । সৌমিত্রদা বাংলা সিনেমার একটা কাল্ট ফিগার । সেই মানুষটাকে আমি নির্দেশনা দেব আর যদি ওনার কোনও শট ভালো না লাগে তখন আমি ওনাকে কী বলব?আমি কি বলতে পারব—“সৌমিত্রদা আপনার অভিনয়টা হোল না”! এই সব  নিয়ে আমি খুব চিন্তায় ছিলাম । কিন্তু সৌমিত্রদা ফ্লোরে বিষয়টাকে খুব সহজ করে দিলেন । উনি বললেন —“অনিকেত তুমি ঠিক কী চাইছ,সেটা বোঝাও”। আমি ওনাকে বোঝাতেই শটটা ওকে হয়ে গেলো । আমরা সবাই হাততালি দিলাম । আর একটা কাজ সৌমিত্রদা করেছিলেন ।

কী?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : শুটিংয়ের সময় যখন আমরা আলো করতাম তখন সৌমিত্রদা বসে কবিতা লিখতেন । সেই সমস্ত কবিতার বেশ কিছু আমি সৌমিত্রদার কাছ থেকে নিয়েছিলাম । সেগুলো আমার কাছে একটা বড় প্রাপ্তি ।

আপনি বলেছেন আপনি কখনও প্রযোজকদের দরজায় দরাজায় টাকার জন্য ঘোরেন নি এই কথার মধ্যে সত্যতা কতোটা?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : এখনও পর্যন্ত আমি ওই কাজ করিনি । আমাকে প্রযোজকেরা ডেকেছেন । আমি গিয়েছি । আমার সঙ্গে কথা বলার পর তাদের মনে হয়েছে আমাকে দিয়ে ছবি করানো যায় । কিন্তু আমি স্ক্রিপ্ট নিয়ে সিনেমা তৈরির জন্য কখনও প্রোডিউসারের কাছে যাই নি ।

আপনার কথা সর্ব্বাংশে সত্যি ধরে নিয়ে একটা প্রশ্ন করছি আপনার প্রথম ছবির ক্ষেত্রেও কি ওই একই নীতি অনুসরণ করেছিলেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : আমার বন্ধু কৌস্তুভ রায় । ও কলকাতা টিভির অন্যতম একজন । আমি কৌস্তুভের চ্যানেলে সাংবাদিকতা করতাম । একটা সময়ের পর আমি  ঠিক করেছিলাম চাকরি আর করব না । কারণ আমি আমার কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম না । চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তে কৌস্তুভ আমাকে ছবি তৈরির অফার দেয় । আমি তখন আমার লেখা স্ক্রিপ্ট শোনাই ।

ওটা কোন ছবির স্ক্রিপ্ট ছিল?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : ‘রুম নাম্বার ১০৩’ । ওই ছবির স্ক্রিপ্ট শোনার পর সকলেই ঘরথেকে বেরিয়ে গেলেন । পরে তারা বললেন — “বাবা মেয়ের যৌন শারীরিক সম্পর্ক নিয়েবাংলা ছবি হয় নাকি”!বাবা মেয়ের যৌন শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে অনেকেই আপত্তি জানিয়েছিলেন । সুতরাং ওই ছবি ছেড়ে দিয়ে আমি “ছ এ ছুটি”  করলাম ।

এরপর কি আপনি ছবি তৈরির আরো অফার পেয়েছিলেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : পেয়েছিলাম । রিলায়েন্স আর মিঃ জালান ছবি করার জন্য বলেছিলেন । আমি করেছিলাম । তারপর মিঃ চুড়িয়াল ছবি করার জন্য বললেন । আমি ছবি করলাম । এভাবেই আমি ছবি করেছি । কখনই প্রোডিউসার লিস্ট দেখে তাদের ফোন কোরে আমি ছবি করার কথা বলিনি ।

১৯৫৬ সালের পুরোনো কলকাতাকে খুব সুন্দর ভাবে “কিরীটী রায়”-তে রিক্রিয়েট করা হয়েছে এখন কলকাতা অনেক বদলে গেছে সেই সময়ের কলকাতাকে রিপ্রেজেন্ট করতে গিয়ে কোনও সমস্যা হয়েছে?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : পিরিয়ড ফিল্মের একটা প্রতিবন্ধকতা থাকে । কারণ পিরিয়ড ফিল্ম যে কোনও জায়গায় শ্যুট করা যায় না । আমি তাই জায়গার তুলনায় কনটেন্টের ওপর বেশি জোর দিয়েছি । ‘কিরীটী রায়’ সিনেমার সঙ্গে আমি ১৯৫৬ সালের মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাগরিকা’ সিনেমার কালচারাল এলিমেন্ট জুড়ে দিয়েছি । এটা বাস্তব সত্যি যে ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্দিরা সিনেমা হলে সাগরিকা রিলিজ করেছিল । এছাড়া ‘কিরীটী রায়’ সিনেমার সঙ্গে সেই সময়ের রাজনৈতিক রেফারেন্সের একটা যোগসূত্র তৈরি করেছিলাম । ৫৬ সালের কমিউনিস্ট আন্দোলনের কথা ছবিতে ঘুরে ফিরে এসেছে । ‘কিরীটী রায়’-তে পলিটিকাল কালচারাল রেফারেন্স আছে বলেই ছবিটা সেই সময়কে শনাক্ত করেছে।

কিরীটী রায়ের চরিত্রে চিরঞ্জিতকে ঠিক কী ভেবে সিলেক্ট করেছিলেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : চিরঞ্জিত ছাড়া আমার কাছে কোনও বিকল্প ছিল না । কারণ আমি পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন বছরের আশেপাশে  মধ্যবয়স্ক কিরীটী চেয়েছিলাম । কিরীটী রায়কে লম্বা, মেদহীন হতে হবে । তার চেহারায় আভিজাত্য থাকতে হবে । আমি প্রথমে বেনুদার (সব্যসাচী চক্রবর্তী)কথা ভেবেছিলাম । কিন্তু বেনুদার মুখের দাগগুলোর জন্য ওকে খুব টাফ দেখায় । সেটা কিরীটী রায়ের ক্ষেত্রে চলবে না । আর বেনুদার একটা বিরাট ফেলুদা ভ্যালু আছে । তাই দীপকদা(চিরঞ্জিত)ছাড়া আমার কোনও অপশন ছিল না ।

কিরীটী ছবিতে একটা অনবদ্য ট্রিটমেন্ট আছে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে কিরীটী নিজস্ব কল্পনায় রিকনস্ট্রাক্ট বা পুননির্মাণ করেছে আর সেই ঘটনাতেও কিরীটীর শারীরিক উপস্থিতি দেখা গিয়েছে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অতীতের রহস্য সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে বলে কিরীটীর সম্পূর্ণ অংশ রঙিন এবং ঘটে  যাওয়া অংশ সাদা কালো দেখানো হয়েছে একই ফ্রেমে রঙিন এবং সাদা কালোর মেলবন্ধনের ভাবনা আপনার মধ্যে কী ভাবে এলো?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : কিরীটীর ক্ষেত্রে আমার কাছে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল । সেটা হলো কিরীটীকে আমায় ফেলু ও ব্যোমকেশের থেকে আলাদা করতে হবে । কিরীটী ভীষণ ভাবে শার্লক হোমস প্রভাবিত । স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ডের দ্বারা অনুপ্রাণিত । স্কটল্যাণ্ড ইয়ার্ড কিন্তু রিকনস্ট্রাক্ট থিওরিতে বিশ্বাসী ছিল । অপরাধ হওয়ার পরে কীভাবে অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল সেটা তারা ভাবনায় রিকনস্ট্রাক্ট করত । এখন ইনভেস্টিগেশনের সময় কলকাতা পুলিশও এই ফরমুলা প্রয়োগ করে । আমি এই প্রসেসটা কিরীটীর মধ্যে আনলাম । কিরীটীর একটা তৃতীয় নয়ন আছে । যার মাধ্যমে কিরীটী শোনা ঘটনাকে রিকনস্ট্রাক্ট করে । এই ভাবে কিরীটী সত্যিটাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করে । বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কিরীটী অতীতকে দেখছেবলে কিরীটীকে আমি রঙিন রেখেছি । আর অতীত ঘটনাকে আমি সাদা কালো দেখিয়েছি ।

অরিন্দম শীল “ব্যোমকেশ পর্ব” ছবিতে সাহিত্যের বাইরে বেরিয়ে ব্যোমকেশকে সুপার হিরো হিসেবে দেখিয়েছেন কিন্তু শরদিন্দুর ব্যোমকেশ কোনও ভাবেই সুপার হিরো নয়।এই বিষয়কে আপনি কীভাবে দেখেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : ১৯৫৬ সালের ঘটনা দেখাতে হলে আমাকে ১৯৫৬ সালের মতো করে উপস্থাপনা করতে হবে । ব্যোমকেশের ক্ষেত্রে যদি ১৯৪৮ সালের ঘটনাকে দেখাতে হয় তাহলে সেই সময়কেই ধরতে হবে । তা না করে স্বাধীনতার পরের বছরের ঘটনায় ক্যারাটে ঢুকিয়ে হাস্যকর পরিবেশ তৈরির কোনও মানেই হয় না । ক্যারাটে তখনও বাংলার জনজীবনে প্রবেশ করেনি । সুতরাং ব্যোমকেশের ক্যারাটেপনা ওই সময়ে প্রযোজ্যই নয় । তারপর আমেরিকানদের ফেলে দেওয়া অস্ত্র নিয়ে তেভাগা আন্দোলনের বিষয়টাও চূড়ান্ত হাস্যকর । এমনকী তেভাগা আন্দোলনে হ্যাণ্ড গ্রেনেডের ব্যবহার, তথ্যবিকৃতি ছাড়া কিছু নয় । পিরিয়ড সিনেমা করতে গিয়ে সময়কে গুলিয়ে দেওয়ার মধ্যে কোনও কৃতিত্ব নেই ।

আপনি দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা করেছেন সাংবাদিকতার সঙ্গে চলচ্চিত্রের কখনও কোনও যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : আমার ছবির মধ্যে সাংবাদিকতার এলিমেন্ট থাকে ।‘গোড়ায় গণ্ডগোল’ ছবির একটা দৃশ্যে মদ্যপ এক পুলিশ অফিসারের কানে কেউ একজন বলে —“দিদি আসছে” । সে সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে ওঠে । এটা এক ধরনের রাজনৈতিক কমেন্ট । আমার ‘ছ এ ছুটি’ ছবির একটা সংলাপ হলো –“অতো নন্দন-টালিগঞ্জ,টালিগঞ্জ-নন্দন কোরো না বাছা, গুলিয়ে নন্দীগ্রাম হয়ে যাবে । বুদ্ধদা-কে দেখে শেখো” । এই সংলাপ সেই সময়ে নন্দন কর্তৃপক্ষ বাদ দিতে বলেছিল । কারণ তখন বুদ্ধবাবু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন । যদিও আমি সেই সংলাপ বাদ দিই নি । এই ধরনের রাজনৈতিক বিবৃতি এক রকমের জার্নালিস্টিক এ্যাপ্রোচ ।

আপনার শৈশবে পরিবারপরিবেশে সিনেমা এবং সাংবাদিকতার কোনও চর্চা ছিল?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : না, ছিল না । আমার সংবাদপত্র পড়ার প্রবল প্রবণতা ছিল । বাড়িতে বাবা, মা দুজনেই কমিউনিস্ট পার্টি করতেন । বাবা ছোটবেলায় আমাকে একটা ক্যামেরা কিনে দিয়েছিলেন । সেটা আমার কাছে একটা পরম প্রাপ্তি ছিল । বাবা রেলে কাজ করতেন বলে আমরা বাবার সাথে ঘুরতে যেতাম । তখন খাতায় সমস্ত ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখে রাখার নির্দেশ বাবা আমাদের তিন ভাই বোনকে দিতেন । আমরা বিহারে থাকতাম । ওখানে খুব লোডশেডিং হতো । লোডশেডিংয়ের সময় বাবা খাটিয়ায় বসে শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ, হ্যামলেটের গল্প শোনাতেন । বাবা আমাদের গণসঙ্গীত শিখিয়েছিলেন । প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে জেনেছি বাবার আনা বইগুলো থেকে । ছোটবেলায় এই ধরনের প্রিপারেশনের মধ্যে ছিলাম । কিন্তু সাংবাদিকতা করব,ছবি করব—এ ধরনের ভাবনা ছিল না ।

ছবি করার ইচ্ছে আপনার মধ্যে কীভাবে এলো?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : ছোটবেলায় আমি খুব কমিক্স পড়তাম । তখনই ভিসুয়ালাইজ করতাম । স্ক্রিপ্ট লেখার চেষ্টাও করতাম । আমি পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের ম্যাগাজিনে একটা নাটক লিখেছিলাম । কিন্তু তেমন ভাবে ছবি করার প্রস্তুতি ছিল না । বড় হয়ে অডিও ভিস্যুয়ালে কাজ করার সময় ছবি করার ইচ্ছে জাগে । জগন্নাথ গুহ,অভিজিত দাশগুপ্ত-র কাছ থেকে আমি ক্যামেরা,আলো এবং এডিটের পরামর্শ পেয়েছিলাম । টেলিভিশনে আমার দীর্ঘ সময় গেছে । ওখানে অনেক কাজ করার পর আমি ছবির জগতে এলাম।

আপনি রাজনীতি সচেতন একজন মানুষ রাজনৈতিক ছবি করার ইচ্ছে কি আপনার আছে? 

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : আছে । আমি ‘শঙ্কর মুদি’ নামে একটা রাজনৈতিক ছবি করেছি ।

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার এলো বামপন্থী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটল এই পরিবর্তনের প্রতিফলন বাংলা ছবিতে দেখা গেলো না এই ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গী কী?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : তন্ময় তুমি বলছ বামপন্থী শাসন ব্যবস্থার অবসানের কথা । শেষ দশ বছর বামফ্রন্টের বামপন্থার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না । আর সেটা ছিল না বলেই একটা নতুন সরকার এলো । বাংলা ছবিতে পরিবর্তনের প্রতিফলনের প্রসঙ্গে বলব যে নন্দীগ্রামের আন্দোলন নিয়ে ছবি করা উচিত ছিল । নন্দীগ্রামের লড়াই সারা পৃথিবীর কাছে একটা বড় দৃষ্টান্ত । এর থেকে সারা পৃথিবী শিক্ষা নিল যে উন্নয়নকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না ।

এই নতুন সরকারের শাসননীতি আপনার কেমন লাগছে?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : অনেক কিছু অত্যন্ত পজিটিভ । কণ্যাশ্রী প্র্কল্প,সাইকেল দেওয়া, গ্রামের হসপিটালগুলোর উন্নয়ন,দু’টাকা দরে চালের ব্যবস্থা— এগুলো আশাপ্রদ বিষয় । পাশাপাশি এই সরকারের সঙ্গে যে দুর্নীতি এবং অসহিষ্ণুতার প্রসঙ্গ আসছে সেটা সমর্থনযোগ্য নয় ।

বামফ্রন্ট যখন ক্ষমতায় ছিল তখন আপনি বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : নিশ্চয়ই । তারা তো আমার কাছের লোক । আমি কমিউনিস্ট পার্টি করেছি । তাদের সঙ্গে বহুবার বহু বিষয় নিয়ে বিতর্ক হয়েছে । বুদ্ধবাবু, বিমানদা, অনিলদার সঙ্গে আমার এ ব্যাপারে কথা হয়েছে । কিন্তু তারা ক্রমাগত সরকার নির্ভর একটা দল তৈরি করেছেন । যে দল আজ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে । আমার মনে আছে আমার মেম্বারশিপ প্রথম সই করেছিলেন নেপালদেব ভট্টাচার্য । সফিদা আমাদের এসএফ আইয়ের সম্পাদক ছিলেন । এদের সঙ্গে আমার বহুবার মতবিরোধ হয়েছে । যার ফলে আমাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয় ।

এবার একটা র‍্যাপিড ফায়ার অভিনেতা হিসাবে কাকে আগে রাখবেন —চিরঞ্জিত না প্রসেনজিত?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : এনারা দুজনেই স্টার । অভিনয় দিয়ে আমি এদের বিচার করব না ।

যদি একজনকে নির্বাচন করতে বলা হয়,তাহলে কার নাম বলবেন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : তারকারা অভিনয়ের ঊর্ধ্বে । তাই দুজনের নামই বলব ।

সত্যজিত রায় না ঋত্বিক ঘটক?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : ঋত্বিক ঘটক ।

জীবন থেকে সিনেমার রসদ সংগ্রহ নাকি সিনেমা থেকে জীবনের রসদ সংগ্রহ?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : জীবন থেকে সিনেমার রসদ সংগ্রহ ।

প্রযোজকের ইচ্ছায় বিষয় নির্বাচন নাকি নিজস্ব ইচ্ছায় বিষয় নির্বাচন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : আমার কোনও অপশন নেই । তাই প্রযোজকের ইচ্ছায় বিষয় নির্বাচন ।

সৃজিত না শিবপ্রসাদ?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : সৃজিত ।

অভিনেতা হিসেবে কে ভালো —অঞ্জন দত্ত নাকি কৌশিক গাঙ্গুলী?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : কৌশিক গাঙ্গুলী ।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ।

সিনেমা কি শুধুই বিনোদন নাকি শিক্ষামূলক বিনোদন?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : শিক্ষামূলক বিনোদন বললে ক্লিশে শোনায়।সিনেমা ডাল-ভাতের মতো জরুরি বিষয়।

শেষ প্রশ্ন জীবনের কাছ থেকে কী পেতে ইচ্ছে করে?

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : জীবনের কাছ থেকে প্রাণবন্ত জীবন পাওয়াটাই আমার কাছে জরুরী ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.