ইংরেজি ক্যালেন্ডারের বারো মাসের নামকরণের কাহিনি!

292

পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই ব্যবহৃত হওয়া ইংলিশ ক্যালেন্ডার রোমানদের তৈরি। প্রাচীন গ্রিকবাসীদের নিজস্ব বছরের সময়কাল ছিল তিনশো চার দিনের এবং তা দশটি মাসে বিভক্ত ছিল। বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হত মার্চ-কে। খ্রিস্টপূর্ব সাতশো অব্দে রোম-সম্রাট নুমা পম্পিলিউস গ্রিক ক্যালেন্ডারের সঙ্গে বছরের এগারো ও বারে মাস হিসাবে যথাক্রমে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি-কে যুক্ত করেন । ওই বারো মাসের ক্যালেন্ডারটি আগের থেকে ভাল হলেও তাতে কিছু সমস্যা থেকে যাচ্ছিল। তবু দীর্ঘ দিন ওই ব্যবস্থাই বজায় ছিল। পরবর্তীকালে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে রোম-সম্রাট জুলিয়াস সিজারের নির্দেশে ক্যালেন্ডারকে তারিখ অনুযায়ী সাজানো হল এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি হল বছরের প্রথম এবং দ্বিতীয় মাস ।

জুলিয়াস সিজারের সময়কালে নির্মিত এই ক্যালেন্ডারকে ‘জুলিয়েন ক্যালেন্ডার’-ও বলা হয়ে থাকে। ইংরেজি ক্যালেন্ডারে বছরের প্রথম মাস জানুয়ারি। জানুয়ারি মাসের নামের পিছনে আছেন রোমান দেবতা জেনাস। দুই মুখ দিয়ে তিনি সামনে ও পিছনে দেখতে পান। খ্রিস্টজন্মের প্রায় ৬৯০ বছর আগে সম্রাট নুমো পম্পিলিস এই মাসকে বছর শুরুর প্রথম মাস হিসেবে ঘোষণা করেন।

বছরের দ্বিতীয় মাস ‘ফেব্রুয়ারি’-র শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘ফেব্রুয়ারিয়াস’ (februarius) থেকে, যার অর্থ শুদ্ধ করা। রোম-সম্রাট পম্পিলিউস প্রবর্তিত প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে ফেব্রুয়ারি বছরের শেষ মাস হিসাবে চিহ্নিত ছিল। এই শেষ মাসে রোমানরা একটি শুদ্ধিকরণ বা পুরনো বছরের যা কিছু খারাপ যত আবর্জনা ঝেড়ে ফেলে নতুন বছরকে আমন্ত্রণ করবার উৎসব করত; অনেকটা বাংলা বছরের চৈত্রশেষের গাজন উৎসবের মতো। এই শুদ্ধিকরণ উৎসবের নাম থেকেই মাসটির নাম ‘ফেব্রুয়ারি’। প্রথম দিকে ফেব্রুয়ারি মাসের দিন সংখ্যা ছিল তিরিশ।

এর পরবর্তী মাস মার্চ এর নামকরণ করা হয় রোমান যুদ্ধের দেবতা ‘মার্স’কে শ্রদ্ধা জানাতে। তাঁর নাম অনুসারে এই মাসের নাম হয় মার্চ। প্রাচীন রোমানরা বিপক্ষকে বাধ্য করতেন যাতে সমস্ত যুদ্ধ মার্চ মাসে বন্ধ থাকে। এর কারণ, সেই সময় মার্চ ছিল নতুন বছরের প্রথম মাস ও উৎসবের মাস।

বছরের চতুর্থ মাস এপ্রিল-এর নামকরণ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। রোমানদের মতে এই মাসটি তাদের প্রেমের দেবী ‘ভেনাস’(Venus)-এর কাছে উৎসর্গীকৃত মাস । Venus শব্দটিকে গ্রিক ভাষায় বলা হয় ‘অ্যাফ্রেডাইটি’ (Aphrodite), যা থেকেই এপ্রিল (April) শব্দটির উৎপত্তি। আবার অনেকে বলেন, গ্রিক দেবী ‘এফ্রোডাইট’ থেকে এই মাসের নামকরণ হয়েছে।

বছরের প্রথম মাস ‘মে’-এর নামটি এসেছে গ্রিক পুরাণে বর্ণিত পৃথিবী ধারণকারী এ্যাটলাস-এর কন্যা মাইয়া (Maia)-র নাম থেকে। মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে ১ মে তারিখটি একজন ‘মে-কুইন’ অভিষিক্ত করবার উৎসব হিসাবে পালন করা হত। প্রাচীন রোমানদের বিশ্বাস ছিল, দেবদেবীর মধ্যে কখন কোন দেবতা পৃথিবীতে নামবেন, তা নাকি দেবী ‘মাইয়া’ ঠিক করে থাকেন।

ষষ্ঠ মাস ‘জুন’-এর নামকরণের উৎস নিয়েও দ্বিমত রয়েছে। অনেকে মনে করেন, ‘জুনিয়াস’ (Junius) নামে কোনও একটি রোমান পরিবারের নাম থেকে এর উৎপত্তি। কিন্তু অধিক প্রচলিত মত হল ‘জুন’ নামটি এসেছে গ্রিক দেবরাজ জুপিটারের রানি জুনো (Juno)-র নাম থেকে। প্রাচীন রোমানদের কাছে জুন মাস ছিল বিয়ের মাস। এই মাসের নামকরণের পিছনে আছেন রোমানদেবী ’জুনো’। ইনি ছিলেন দেবতাদের রানি।

সপ্তম মাস ‘জুলাই’-এর নামটি এসেছে বিখ্যাত রোম-সম্রাট জুলিয়াস সিজারের নাম থেকে। এর আগে এই মাসের নাম ছিল অবশ্য ছিল ‘কুইন্টিলিস’। সিজারের মৃত্যুর পর (খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ অব্দ) এই নামকরণ হয়।

অষ্টম মাস ‘অগস্ট’-এর সময়কালটিও পুরনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছিল ষষ্ঠ মাস।  সিজারের পৌত্র (ভ্রাতুষ্পুত্রের পুত্র) রোম-সম্রাট অগস্টাস-এর নামানুসারে এই মাসের নাম হয় ‘অগস্ট’।

ইংরেজি ক্যালেন্ডারের শেষ চারটি মাস ‘সেপ্টেম্বর’, ‘অক্টোবর’, ‘নভেম্বর’ ও ‘ডিসেম্বর’ পুরনো ক্যালেন্ডার অনুসারে ছিল যথাক্রমে সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম মাস; সেজন্য নামগুলিও তাদের সেই পরিচয়ই বহন করত। যেমন ‘সেপ্টেম্বর’ নামটি এসেছে ‘Septem’ শব্দ থেকে, যার অর্থ সপ্তম। অক্টোবর এসেছে ‘Octo’ থেকে, যার অর্থ খ্রিস্টপূর্ব ৪৫ সালে যখন জুলিয়াস সিজার তার নাম অনুসারে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার শুরু করলেন, সেখানে ক্রম অনুসারে প্রথম ছয়টা মাস ঠিক একই থেকে গেল। কিন্তু নতুন দুটো মাস জানুয়ারি ও ফ্রেব্রুয়ারি অতিরিক্ত যোগ হওয়ায় সেপ্টেম্বর হয়ে গেল নয় নম্বর মাস।

ল্যাটিন ‘অক্টো’ মানে আট আর ‘বার’ শব্দটি বিশেষণ হয়ে সাফিক্স হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। অক্টো শব্দটির অর্থ অষ্টম কিন্তু জুলিয়ান এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে অক্টোবর হচ্ছে দশম মাস। ওই একই ভাবে নভেম্বর মাস এল ‘নভেন’ যার মানে নবম থেকে। বাস্তবে নভেম্বর মাস ১১তম মাস।

বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে-র নামটিও পুরনো ক্যালেন্ডার থেকে ধার করা। শব্দটি এসেছে ‘Dsecem’ থেকে, যার অর্থ দশম। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম অব্দ থেকে প্রচলিত হওয়া ‘ইংলিশ ক্যালেন্ডার ইয়ার’-এ মাসের সংখ্যা দশ থেকে বারোতে বৃদ্ধি পাওয়ায় শেষ চারটি মাসের পর্যায়ের মানও পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আজও দু’হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বছরের মাসের এই নামগুলি ব্যবহার হয়ে চলেছে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.