রেশমি শিফনে সোনা রুপোর জরিতে বোনা ময়ূর পোশাক শোভা পেত লেডি কার্জনের অঙ্গে

1066

বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় লর্ড কার্জন আলো করে আছেন দিল্লি দরবার | পথের কাঁটা রাজন্যবর্গ হয় নির্বাসিত‚ নয় তো ফুলে পরিণত হয়েছে | তাঁর আর উদ্ভাসিত হতে বাধা কোথায় ? সে সময় তাঁর স্ত্রীও ঝলমল করছিলেন | কিছুটা স্বামীর গর্বে‚ বাকিটা আক্ষরিক অর্থে | ভাইসরেইন-এর অঙ্গে তখন পিকক গাউন | যার ছটা বিলেত পেরিয়ে গিয়ে পৌঁছেছিল তাঁর জন্মভূমি আমেরিকার শিকাগো শহরেও |

১৯০৩ সালে দিল্লি দরবার দেওয়া হয়েছিল | রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের সিংহাসনে অভিষেক উপলক্ষে | সেই আপ্যায়নেই কার্জনপত্নী মেরি পরেছিলেন এই পোশাক | সোনার সুতোয় বোনা গাউনের উপরে জারদৌসি নক্সা | সঙ্গে ময়ূরের পালক | যা বোনা হয়েছিল কাচপোকার ডানা দিয়ে | লেডি কার্জনের জন্য এই পোশাক বানিয়েছিলেন ফরাসি ডিজাইনার জন-ফিলিপ | তৎকালীন প্রসিদ্ধ ফরাসি ফ্যাশন কেন্দ্র ‘ হাউজ অফ ওয়র্থ’-এর নক্সাদার ছিলেন জন ফিলিপ | ইউরোপে আলোচনার তুঙ্গে উঠেছিল এই গাউন |

পোশাকের প্রেমে পড়ে গেলেন স্বয়ং রানি | রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী‚ রানি আলেকজান্দ্রিয়া | তিনি লেডি কার্জনকে লন্ডনেই ওই পোশাকে দেখেছিলেন | সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ইচ্ছে হল ওই একইরকম গাউন তিনি পরবেন সিংহাসনে অভিষেকের দিন | থাকতে হবে ওরকমই ঘন বুনোটের জারদৌসি কাজ | 

ভাইসরয় পত্নীর জন্য প্রথমে বাছাই শিফনে সোনা-রুপোর জরি দিয়ে বুনেছিলেন দিল্লি ও আগ্রার শিল্পীরা | তারপর তা জাহাজে করে গিয়েছিল প্যারিস | সেখানে গাউনে বসেছিল সাদা শিফনের গোলাপ | আর ময়ূরের পালক ও কাচপোকার ডানা | এখন জরির উজ্জ্বলতা ম্লান হয়েছে অনেকটা | কিন্তু কাচপোকার ডানা এখনও ঝকমকে |

দিল্লি দরবারে এই পোশাক লেডি কার্জন পরার পরে তা শিরোনাম হয় শিকাগো ট্রিবিউনে | করণ তিনি শিকাগোর মেয়ে ছিলেন | গাউন পরিহিত লেডি কার্জনের প্রতিকৃতি আঁকতে শুরু করেছিলেন শিল্পী উইলিয়ম লংসডায়াল | তবে সেই কাজ শেষ অবধি দেখে যেতে পারেননি লেডি কার্জন | ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রয়াত হন | ছবি আঁকার কাজ শেষ হয় ১৯০৯-এ | 

লেডি কার্জনের বিশেষ ইচ্ছায় তৈরি হয়েচিল পিকক গাউন | তিনি ভারতীয় সূচি শিল্পের সমঝদার ছিলেন | তাঁর অনেক বান্ধবীও ফরমায়েশ করে এই পোশাক বানিয়েছিল | তবে কোনওটাই তাঁর পোশাকের মতো হয়নি | মেরির পোশাক তৈরি হয়েছিল দু ভাগে | বডিস ও স্কার্ট | দুই অংশেই ছিল জারদৌসি কাজ | বডিসে নেকলাইন বরাবর বসানো ছিল দামী পাথর | 

স্কার্ট ছিল কয়েক স্তরের | বস্ত্র বিশেষজ্ঞরা গবেষণার পরে মনে করেন‚ ওই কাপড় আসলে সিল্ক শিফন | তার নিচে ছিল সুতীর মসলিনের আর এক স্তর বা লাইনিং | গাউন জুড়ে সোনা ও রুপোর সুতোর ঠাসা কাজ | বোনা হয়েছে ময়ূরের পালক | আর তাতে কাচপোকার ডানার অংশ মাপমতো বসানো হয়েছে‚ ময়ূর পালকের চোখ হিসেবে | স্কার্টের সূচি শিল্প সম্পন্ন হয়েছিল ভারতে | তারপর তা বিভিন্ন অংশে পাঠানো হয়েছিল প্যারিসে | একসঙ্গে সেলাই করে গাউন হবে বলে | বডিসের উপর বেশিরভাগ কাজ অবশ্য হয়েছিল প্যারিসেই | যার মধ্যে মূল ছিল সাদা রেশমের একশো গোলাপ | পরে কাপড় ফেঁসে যাওয়ায় ওই গোলাপ তুলে পাল্টানো হয় |

বর্তমানে লেডি কার্জনের বিখ্যাত ময়ূর পোশাক সংরক্ষিত ডার্বিশায়ারে কার্জনদের আদি বাসভবনে | তার অধীশ্বরীর মৃত্যুর ১১৩ বছর পরেও লুটিয়ে আছে সে‚ এক ম্যানেকিনের গায়ে |

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.