গলনাঙ্ক-শেষ পর্ব

968

(গত পর্বের পরে…)

‘নো হার্ড ফিলিংস | আয় না বস না এখানে‚ প্লিজ !’

সে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে যশমাল্যর দিকে | যশ আবার বলে‚ ‘ আয়‚ গর্বী | বস |’

ধীর পায়ে এবার গিয়ে বসে গর্বী যশের উল্টো দিকের সোফায়‚ ‘জল খাবি?’ জানতে চায় যশ |

তার এবার একটু খারাপ লাগে‚ এত কথা সে বলল যশকে কেন ? যশ কী করেছে ? যশের ওপর রাগ করার তো কোনও কারণই নেই তার | হয়ত যৌন সম্পর্ক স্থাপন হলে মানুষের ওপর মানুষের এক ধরণের দাবি তৈরি হয়‚ এবং যশ তার কাছে সে অর্থে কিছু দাবিও করেনি‚ শুধু রঘুবীরের ব্যাপারে গর্বীকে বিমুখ করে তোলার চেষ্টা করছে — এই যা |

‘হ্যাঁ‚ জল খাবো |’ আজ আর গর্বী নিজে উঠে যেতে পারে না ফ্রিজ খুলে জল আনার জন্য | যশ ফ্রিজ খুলে বোতল বের করে গ্লাসে জল ঢেলে এগিয়ে দেয় তাকে | সে জল খায়‚ যশ বলে‚ ‘দ্যাখ্‚ স্ক্রিপ্টটা শেষ‚ সত্যিই এখন আর তোর কোনও কাজ নেই‚ তুই কিন্তু সত্যিই আমার দিক থেকে ফ্রি | সামনে তোর ফাইনাল সেমেস্‚ তোর এখন নিজেকে সময় দেওয়া দরকার | অথচ সামনের মাসেই আমরা ফ্লোরে যাচ্ছি | আউটডোর আছে | তোর পক্ষে এই দিকে এনগেজ হওয়া সম্ভব হবে না | পরে যদি আবার কখনও একসঙ্গে কাজ করার কোনও স্কোপ আমি দেখতে পাই‚ তোর যদি অসুবিধা না থাকে তাহলে আমরা আবার কাজ করব‚ কী আছে !’

যশমাল্যর কথাগুলো বুঝতে একটু সময় লাগে তার এবং সে সত্যিই বুঝতে পারে না উত্তরে কী বলবে‚ হঠাৎ তার শুধু এটুকু মনে হয় হাতে এখন তার মাত্র দুটো টিউশন রয়েছে |

ঠিক এই সময় ফ্ল্যাটের বেল বেজে উঠলে উঠে দাঁড়ায় যশমাল্য | ‘ওরা এসে পড়েছে মনে হয় | ঠিক আছে গর্বী তাহলে‚ কোনও দরকার হলে তোকে ফোন করে নেবো‚ কেমন ?’

সে উঠে দাঁড়ায় চটপট‚ দরজার সামনে দাঁড়ানো মুখ গুলোর সব কটাই তার চেনা‚ রানী এবং চিত্রাঙ্গদা ব্যস্ত ভাবে কথা বলে নিজেদের মধ্যে | ওরা তার দিকে তাকায় না‚ অন্যরা তাকায়‚ সে অল্প হাসলে ওরাও হাসে‚ বলে‚ ‘হাই গর্বী‚ লং টাইম নো সি ?’

ওরা ভেতরে ঢুকে যায়‚ সে বেরিয়ে আসে | ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ হয়ে যায় খুট শব্দ করে |

একটা ভয়ের বীজ

——————–

চোখে সানগ্লাস এঁটে হাঁটতে থাকে গর্বী | সে দেখে এই গরমের মধ্যেও ক্রিকেটীয় পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে‚ কাঁধে ক্রিকেটের কিট নিয়ে রাস্তা পারাপার করছে অল্পবয়সী ছেলেরা | লেকের মাঠে‚ বিবেকানন্দ পার্কের মাঠে চলছে ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ |

ভবানীপুরে যে বাড়িটায় তারা পেয়িংগেস্ট থাকত তার দুটো বাড়ি পরে ছিল শঙ্কর বসাকদের বাড়ি | শঙ্কর ছেলেটা খুব কালো ছিল‚ সাহানা আর তার সঙ্গে একটা বন্ধুত্বই হয়ে গেছিল শঙ্করের | শঙ্কর ছিল বাড়ির একমাত্র ছেলে | মিতালি ছিল শঙ্করদের বাড়ির ভাড়াটে | মিতালিদের অবস্থা একদম ভাল ছিল না | শঙ্কর ভালোবাসত মিতালিকে | মিতালি ভালবাসত অন্য একটা ছেলেকে | হরিশ মুখার্জি রোডেই বাড়ি ছেলেটার | মিতালি এবং ছেলেটা বিয়ে করবে ঠিক হওয়ার পর দেখা গেল সেই বিবাহে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে | ছেলেটার বাড়ির তরফে দাবি দাওয়া ছিল কিছু‚ যা মিতালির বাবার পক্ষে পূরণ করা অসম্ভব | শঙ্কর এগিয়ে এল বিয়েটা সম্ভবপর করতে |

গর্বী আর সাহানা জিজ্ঞেসও করেছিল‚ ‘অ্যাই শঙ্করদা‚ তুমি তো মিতালিকে ভালবাসো |
তুমি কেন ওর বিয়েতে হেল্প করছ ? তোমার কষ্ট হচ্ছে না ?’

ষাটের দশকের বাংলা সিনেমার নায়কের মত করে শঙ্কর বলেছিল‚ ‘ও সুখী হলেই আমি সুখী | ‘

তখন নিজেকে আঁতেল ভাবতে শুরু করেছে গর্বী‚ সবে সবে ঢুকেছে যাদবপুরে‚ শঙ্করের কথা শুনে ভীষণ হেসেছিল সে‚ এবং নিজের মোটর বাইক বিক্রি করে‚ সেভিংস টেভিংস ভেঙে শঙ্কর সত্যিই অনেকগুলো টাকা যেদিন তুলে দিল মিতালির বাবার হাতে একটু অবাকই হয়েছিল বলা বাহুল্য | নিজেদের বারান্দা থেকে মিতালির বিয়ের প্যান্ডেল দেখে সাহানা আর তার দুঃখ-ও হয়েছিল সেদিন খুব | তারা বলাবলি করেছিল‚ ‘এসব পুরোনো পাড়ার লোকজনের মানসিকতা একদম অন্যরকম |’

বিয়ের দিন পর্যন্ত ঠিকই ছিল সব | বারান্দায় দাঁড়িয়ে তারা দেখল বর এল‚ বরযাত্রী এল‚ বিয়ের সব রিচুয়ালস দেখার উপায় ছিল না তাদের‚ কারণ তাদের নেমন্তন্ন ছিল না | ওই পাড়ায় তারা ছিল একেবারেই বাইরের লোক | এমন কী বাড়ির মালিকও বিনা প্রয়োজনে বাক্যালাপ করতেন না তাদের সঙ্গে | বারান্দা থেকে যতটুকু দেখা যায় দেখে ঘুমোতে গেল সাহারা আর সে |

সকালে উঠে দেখল রাস্তাটা লোকে লোকারণ্য | তারা ভেবেছিল বিয়ে বাড়ির লোকজন | কিন্তু কান্নাকাটি শুনে‚ পুলিশের জিপ দেখে খোঁজ নিতে জানতে পারল শঙ্কর সে রাতেই আত্মহত্যা করেছে | খুব খারাপ লেগেছিল তাদের‚ শঙ্করকে একটুও ভাল ছেলে বলে মনে হয়নি | যশমাল্যকে সে তুলনায় অনেক বেশি নম্বর দেওয়া যায় |

হাঁটতে হাঁটতে ফোনবুক ঘেঁটে নির্মিতি বসু রায়কে ফোন করল গর্বী | পার্ক স্ট্রিটে নির্মিতির একটা বিজ্ঞাপন সংস্থা আছে‚ আকারে ছোটখাটো | বড় ক্লায়েন্ট বলতে সে রকম কেউ নেই | তবু বেশ ভালই রান করছে সংস্থাটা |

নির্মিতি চার্বাক দার বান্ধবী‚ কলেজের ক্লাসমেট | চার্বাকদার সূত্রেই নির্মিতির সঙ্গে আলাপ তার | লাস্ট ইয়ারের আগের ইয়ার ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখা হলে নির্মিতি তাকে নিজের সংস্থায় জব অফার করেছিল | তখনও যশমাল্যর সঙ্গে পরিচয় হয়নি গর্বীর | বলেছিল‚ ‘দ্যাখো না‚ ভালো লাগলে কোরো‚ নইলে ছেড়ে দিও’|

নির্মিতি ফোন ধরল‚ ‘হ্যাঁ‚ কে?’

‘আমি গর্বী মিত্রা‚ চার্বাকদার ছাত্রী |’ বলল সে দ্বিধা মিশ্রিত সুরে |

‘ও হ্যাঁ‚ হ্যাঁ‚ গর্বী‚ বলো কেমন আছো’ ! উচ্ছসিত হয়ে উঠল নির্মিতি |

‘তুমি কি অফিসে আছো নির্মিতি ?’

‘আজ তো সানডে | অফিস বন্ধ ‘|

আজ রবিবার ? খেয়ালই ছিল না গর্বীর‚ রবিবারই তিনিশ নামের মেয়েটার শিফট করার কথা | কী উদ্দেশে ফোন করেছে জানাল গর্বী নির্মিতিকে | পরিষ্কার বলল‚ ‘বাবার রেখে যাওয়া টাকা ভেঙে ভেঙে খেতে চাই না আমি | যেখানে হোক ঢুকতে পারলে ভাল হয় ‘|

‘না‚ না‚ তুমি ঠিকই ভাবছ | ওটাতে হাত না দেওয়াই ভাল‚ আজকাল তো বাবা‚ মা মাথার ওপর থাকতেও পড়তে পড়তে সবাই সবাই জব করতে ঢুকে যাচ্ছে |’

আমার এখানেই তো তোমার বয়সী দু তিনজন রয়েছে | ইভনিং -এ আসে | কিন্তু আমি শুনেছিলাম তুমি যশমাল্যর সঙ্গে কাজ করছ ? হোয়াট অ্যাবাউট দ্যাট ?’

‘আমি ‘ফ্রিমেন’ ছেড়ে দিয়েছি |’

‘যশমাল্যর সঙ্গে তোমার টার্মস কী রকম ?’

‘এই মুহূর্তে সেটা বলা মুশকিল নির্মিতি | আমি নিজেও সেটা জানিনা |’

‘তুমি এক কাজ করো‚ অফিসে চলে এসো কাল‚ পরশু | আসলে যশ ও তো এক সময় বিজ্ঞাপনে ছিল | আমরা ‘মুদ্রা’ তে এক সঙ্গে কাজ করেছি | আমার সঙ্গে ওর একটা অন্য সম্পর্ক | আমি একটু দেখে নিই তোমাকে নিলে যশের আবার ফিলিংস হার্ট হয় কিনা | বোঝোই তো গর্বী‚ একে তো কলকাতায় বড় ক্লায়েন্ট নেই‚ টিকে থাকাই মুশকিল‚ তার ওপর যশ টশ হঠাৎ অনেক উঠে গেছে | আমি কাউকে চটাতে চাই না |’

সেই সকালে রঘুবীরের সঙ্গে কথা হয়েছিল ফোনে | তারপর আর কোনও যোগাযোগ হয়নি | এখন তার রঘুবীরের কাছে চলে যেতে ইচ্ছে করছে | আজ‚রবিবার জানার পর আরও বেশি ইচ্ছে করছে যেতে | কিন্তু তার আগে সাহানা কী বলে একবার শুনে নেওয়া যাক | সাহানাকে ফোন করল গর্বী | সাহানা বলল ‘হ্যাঁ তিনিশ এসেছে|’ তারপরই গলা নামিয়ে বলল‚ ‘তুই থাকিস শুনে কত প্রশ্ন‚ ‘হাউ ক্যান শি স্টে হিয়ার ? তুমি কী করে গেস্ট রাখতে পারো ? কম্পানিকে জানিয়েছো ?’

আমিও বলেছি‚ ‘কম্পানিকে জানাতে হবে কেন ? আমার বাড়িতে আমার বন্ধু এসে থাকবে‚ কতদিন থাকবে এগুলো কম্পানিকে জানাবার কী আছে?’ আমাদের থেকে ও অনেক বড় বয়সে | থার্টি আপ হবে | এর সঙ্গে আমাদের একদম বনিবনা হবে না গর্বী’ |

সে বলল‚ ‘আমি যোধপুর পার্কেই পেয়িং গেস্ট অ্যাকোমোডেশন পেয়ে যাব‚ মুভ করে যাব‚ তুই চিন্তা করিস না |’

‘এক‚ যদি তুই কলকাতা ছাড়িস বা আমাকে কলকাতা ছাড়তে হয় তাহলে জানিনা‚ আদারওয়াইজ আমরা একসঙ্গে থাকব গর্বী | টাকা পয়সার তো অসুবিধা নেই‚ ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্ট রেন্টে নিয়ে নেবো যাদবপুরের দিকে |’

সে বলল‚ ‘আমি ভেবেছিলাম তুই আর আমি কেউ কারও নই সাহানা | কেউ কারও হলেই সম্পর্কের মধ্যে একটা কমিটমেন্ট তৈরি হয় | আমাদের সম্পর্কে কোনও কমিটমেন্ট নেই | এতদিন আমাদের একসঙ্গে থাকাটা জাস্ট নানা কারণে ঘটে গেছে|’

‘আমরা কেউ কারও নই? ও‚ আমি জানতাম না |’ অভিমান ঝরে পড়ল সাহানার গলা থেকে |

‘যশের সঙ্গে গণ্ডগোল হল আজ | ‘ফ্রিমেন’ ছেড়ে দিলাম‚ সাহানা |’

ফোন ছাড়তেই ফোন এল নির্মিতির‚ ‘যশের সঙ্গে কথা হল গর্বী | ও তো তোমার খুবই প্রশংসা করল | বলল‚ ‘ওইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে‚ ওর সঙ্গে আমার আবার টার্মস কী? তোমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব হলে নিশ্চয়ই নেবে তুমি ওকে | তাহলে তুমি বলো কবে জয়েন করবে? কালই চলে এসো‚ অবশ্য আমি তোমাকে ছয় সাতের বেশী দিতে পারব না |’

গর্বী বলল‚ ‘না থাক নির্মিতি | যশের কথায় আমাকে নেওয়া‚ না নেওয়াটা যখন ঠিক করবে বললে তুমি তখনই আমি ডিসাইড করেছি তোমার ওখানে যাব না | ডিগ্রি শেষ হওয়ার পর হয় আমি বিদেশে যাব‚ নয় তো আমার কাছে জব অফার আছে‚ মিডিয়ায় |’

‘তাহলে তো চিন্তার কোনও কারণই নেই |’ ফোন ছেড়ে দিল নির্মিতি |

গাছে গাছে অনেক ফুল ফুটে আছে রাস্তাটায় | কৃষ্ণচূড়া‚ রাধাচূড়া — ঝলমল করছে চারপাশটা | বেশ একটা খোলা মনে ফাঁকা বাসে উঠে বসল গর্বী | রঘুবীরকে এস এম এস করল‚’আমি আসছি |’

রঘুবীর লিখলেন‚ ‘হিতৈষণা এসেছে |’

শরীরটা হঠাৎ প্রেশার কুকারের মত ফেটে যাবে মনে হল গর্বীর | মোবাইলের স্ক্রিন সেভারে তার রঘুবীরের ছবি‚ চুল কেটে ফেলেছেন রঘুবীর‚ মুখটা দেখা যাচ্ছে পুরো‚ চশমাটা ঝুলে আছে নাকের ওপর — হাসছেন !

এমনিতে রঘুবীর খুব ভাল আছেন‚ এখন রঘুবীর খুব ভাল আছেন | হাসির মধ্যে সূক্ষ্ম যে বিষাদ লক্ষ করে দেখলে ধরা পড়ে‚ সেটা ভ্রমরের জন্য | ভ্রমরকে রঘুবীরের সর্বক্ষণ মনে পড়ে আজকাল | যদি সম্ভব হত ভ্রমরকে বাঁচিয়ে তুলতেন রঘুবীর | সেই ঝড় বৃষ্টির রাতে রঘুবীরকে জড়িয়ে ধরার জন্য ভ্রমরের বুভুক্ষু হৃদয়ের কান্না শুনতে পান তিনি স্পষ্ট |

ভ্রমরের কণ্ঠস্বর মনে পড়ে যায় তাঁর | নরম‚ রিনরিনে গলা তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে | চক্রাকারে ঘুরতে থাকে রঘুবীরের চারপাশে | রাত হলে আজকাল ছাদে উঠে যান রঘুবীর | বসে থাকেন চুপচাপ | সেই সময় গর্বী ফোন করলে আক্ষেপ ঝরে পড়ে রঘুবীরের কথায় | সে যদি বলে‚ ‘রঘুবীরদা‚ ভ্রমর অ মৃত‚ভ্রমর মৃত!’ রঘুবীর হাহাকার করে ওঠেন‚ ‘আমি শুনতে চাই না‚ আমি শুনতে চাই না |’

বাস থেকে নামে গর্বী চার নম্বর গেটের সামনে‚ তারপর রাস্তা পার হয়ে বেঙ্গল ল্যাম্পের ঠেকের দিকে হাঁটতে থাকে | আর রাস্তা পার হওয়াটা কঠিন মনে হয় তার কাছে | সে এগিয়ে যায়‚ পিছিয়ে যায় | রবিবার রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অনেক কম হওয়া স্বত্তেও এমনটা হয় তার | মনে হয় যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও গাড়িই তাকে পিষে দিয়ে যেতে পারে নিষ্ঠুরের মত | প্রতিটা গাড়িকেই তার রাক্ষসের হাঁ করে তেড়ে আসছে মনে হয় | কিছু যে ঘটছে না — অ্যাক্সিডেন্ট — এতদিন যে ঘটেনি এটা একটা চান্স | নিজের শরীরটার জন্য ভয় হতে থাকে তার ভীষণ |

যারা ইউনিভার্সিটির হস্টেল গুলোয় থাকে রবিবার সকাল থেকেই তাদের দেখা পাওয়া যায় ক্যাম্পাসের আশেপাশে‚ আনাচে কানাচে | যারা থাকে না তাদেরও অনেকে রবিবার সকাল হলেই জড়ো হয় এখানে | চায়ের স্টলগুলো‚ খাবের স্টলগুলো রবিবারও জমজমাট | বেঙ্গল ল্যাম্পের ঠেকে পৌঁছে রিপনকে পেয়ে যায় গর্বী | ঘুগনি‚ পাঁউরুটি খাচ্ছে বসে বসে | খবরের কাগজ মেলে বসে সিগারেটের ভেতর গাঁজা ভরছে | তাকে দেখে রিপন বলে‚ ‘তুই?’ সে বলে‚ ‘তুই চারশো টাকা ধার চেয়েছিলিস | এই নে |’ ব্যাগ খুলে টাকা দেয় সে রিপনকে | টাকাটা পকেটে ঢোকায় রিপন | ঘুগনি আর পাঁউরুটি চেয়ে নেয় গর্বী‚ মাসির কাছ থেকে |

গাঁজা ভরা সিগারেটটা নিয়ে নেয় রিপনের হাত থেকে | ধরায়‚ টানে| মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে তার | রিপন বলে‚ ‘ ‘ক্যারাভানের’ জন্য লেখাটা দিয়ে দিস!’

‘সামিরা মাখমালবাফ’কে নিয়েই লিখবে ঠিক করেছে গর্বী ‘ক্যারাভানের’ জন্য | এখানে নিজের চিন্তা ভাবনা লিখতে পারবে সে আলাদা করে | পেপারে সেটা পারবে না | হয়ত সামিরা মাখমালবাফ‚ আব্বাস কায়রোস্তমি‚ সামিরার বাবা মহসিন মাখমালবাফ, জাফর পানাহি — ইরানের নিউ ওয়েভ ফিল্ম মেকারদের সবাইকে নিয়েই একটা লেখা দাঁড় করাবে |

বেলা তিনটে চারটে অবধি গর্বী ঠেকেই বসে বসে নেশা করে ‚ রঘুবীর ফোন করলে ফোন ধরে না | তখন এস এম এস পাঠান রঘুবীর‚ ‘ আই থিংক ইউ নিড স্পেস ! ঠিক আছে ‚ যখন কথা বলতে ইচ্ছা হবে কথা বোলো |’ সে হাসে হূ হূ করে ‚ কান্নার মতো ‚ রিপনরা তাকায় তার দিকে ! এক সময় উঠে বাড়ির পথ ধরে গর্বী |

যে ঘরটা আগে তার ছিল ‚ সেটা এখন তিনিশের | ফ্ল্যাটে ঢুকতেই গর্বী দেখে ঘরটার দেয়াল ভাঙাভাঙি হচ্ছে‚ একটা স্প্লিট এসি লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে ঘরটায় কম্পানি থেকে তিনিশের জন্য | ছোট গোল গর্ত করা হয়েছে দেয়ালে‚ যে দুজন লাগাতে এসেছে এসি-টা‚ তারা বারবার ছাদে যাতায়াত করছে | সাহানা সাহানার ঘরে | দরজা বন্ধ | ডাইনিং টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটা পিৎজার ডালা‚ খোলা অবস্থায়‚ খাওয়া হয়েছে কিছুটা ‚ কিছুটা বাকি |

স্বাস্থ্যবতী লম্বা চওড়া একটা মেয়ে ঘুরে বেড়াছে এদিকে ওদিকে ফ্ল্যাটের | এরকম মেয়ে দেখলে ভয়ের দিনগুলোয় ভীষণই মুষড়ে পড়তেন রঘুবীর ‚ বলতেন কী ভারী একটা উপস্থিতি ‚তাই না ? চেপে বসছে বুকের ওপর !’ তাকে দেখে তিনিশ বলল ‚

রঘুবীর ফোন করলে ফোন ধরে না | তখন এস এম এস পাঠান রঘুবীর‚ ‘ আই থিংক ইউ নিড স্পেস ! ঠিক আছে ‚ যখন কথা বলতে ইচ্ছা হবে কথা বোলো |’ সে হাসে হূ হূ করে ‚ কান্নার মতো ‚ রিপনরা তাকায় তার দিকে ! এক সময় উঠে বাড়ির পথ ধরে গর্বী |

যে ঘরটা আগে তার ছিল ‚ সেটা এখন তিনিশের | ফ্ল্যাটে ঢুকতেই গর্বী দেখে ঘরটার দেয়াল ভাঙাভাঙি হচ্ছে‚ একটা স্প্লিট এসি লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে ঘরটায় কম্পানি থেকে তিনিশের জন্য | ছোট গোল গর্ত করা হয়েছে দেয়ালে‚ যে দুজন লাগাতে এসেছে এসি-টা‚ তারা বারবার ছাদে যাতায়াত করছে | সাহানা সাহানার ঘরে | দরজা বন্ধ | ডাইনিং টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটা পিৎজার ডালা‚ খোলা অবস্থায়‚ খাওয়া হয়েছে কিছুটা ‚ কিছুটা বাকি |

স্বাস্থ্যবতী লম্বা চওড়া একটা মেয়ে ঘুরে বেড়াছে এদিকে ওদিকে ফ্ল্যাটের | এরকম মেয়ে দেখলে ভয়ের দিনগুলোয় ভীষণই মুষড়ে পড়তেন রঘুবীর ‚ বলতেন কী ভারী একটা উপস্থিতি ‚তাই না ? চেপে বসছে বুকের ওপর !’ তাকে দেখে তিনিশ বলল ‚ কাকে চাই ?

নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মুহুর্মুহু পৃথিবীটার দিক বদল ঘটে যাচ্ছে‚ ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে মাথা তোলার চেষ্টা করতে করতে বলে‚ সাহানাকে একটু ডেকে দেবেন ? তিনিশ ভুরু কুঁচকে তাকায় ‚ তুমি কি সাহানার বান্ধবী ? যে এখানে থাকে ?

সে মাথা নাড়ে |

সাহানাকে আমি কেন ডাকতে যাব ? তুমি ডাকো গিয়ে | গর্বী বুঝতে পারে তিনিশ ভীষণ জেদি ‚ একগুঁয়ে ধরনের মেয়ে কিন্তু তার কানের মধ্যে ঝংকার তোলে তিনিশের মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠস্বর ‚ এরকম কণ্ঠস্বর‚ রেগে উঠলে মনে হয় সূঁচের মত বিধছে অন্যকে | এই কণ্ঠস্বরে আর্তি ভীষণ ভাল ফোটে |

সে বলে ওঠে ধীরে ধীরে ‚ আপনি তো আমার এখানে থাকা নিয়ে বিস্তর আপত্তি জানিয়েছেন ‚ তার ওপর এখন ‘কাকে চাই’ বললেন বলে আমি সাহানাঝেই ‚ চাইলাম | এটা সত্যি আমার নিজের জায়গা নয় যে গটগট করে ঢুকে যাব ‚ আমার নিজেকে কোথাও চাপিয়ে দিতে ভাল লাগে না ! যদিও রঘুবীর চৌধুরী সম্পর্কে আমার মনোভাব আদৌ এরকম নয় ! রঘুবীরকে আমার জাপটে ধরে থাকতে ইচ্ছে করে |

‘তুমি কি নেশাগ্রস্ত ?’

‘হুঁ |’ বলে সে |

‘ঢুকে এসো | তোমার মুখটা কেমন কালো হয়ে আছে ‚শরীর খারাপ লাগছে তোমার ? ‘

‘নাহ |’

‘দাঁড়াও‚ আমি সাহানাকে ডাকছি | ‘

গর্বী দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ‚ দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয় তার ‚ সাহানাকে ডাকতেই হাফ প্যান্ট আর স্প্যাগেটি টপ পরা সাহানা বেরিয়ে আসে |

তিনিশ বলে ‚ ‘তোমার বন্ধুকে সামলাও | শি ইজ ড্রাংক |’

‘ড্রাংক না‚ ও ডোপ করেছে |’ বলতে বলতে রাগত চোখে তাকায় সাহানা তার দিকে | হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে ফিসফিস করে‚ ‘আজই তোকে এটা করতে হল ?’

সাহানার বিছানার কাত হয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে ছেড়ে দিতে দিতেই গর্বী বুঝতে পারে সে ঘুমিয়ে পড়ছে এবং তীব্রতা থেকে ক্রমশ ফেড আউট করে যায় তিনিশের কণ্ঠস্বর তখন ‚ তিনিশ সাহানার ঘরের দরজা থেকে বলছে ‚’সাহানা তোমরা দুই বন্ধু একসঙ্গে থাকতে অভ্যস্ত | এই ঘরের অ্যাটাচড বাথটা তোমার শেয়ার করো | প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড | ওক্কে, আমাকে বাইরের টয়লেটটা ছেড়ে দাও‚ আমায়’ | তিনিশের পেলব কণ্ঠস্বর লেগে থাকে তার মনে —গ্লুড !

ঘুম ভাঙে যখন গর্বীর তখন রাত দশটা | ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই সে দেখে তিনিশ আর সাহানা আরাম করে বসে মুভি দেখছে টিভিতে ‚ তিনিশ তাকে দেখে হাসে | সাহানা বলে ‘খুব তো ঘুমোলি‚ কফি খাবি ? আমরা খেলাম একটু আগে | তিনিশ বলছিল বাইরে খেতে যাবে‚ চল লেটস গো আউট | পার্ক স্ট্রিট যাওয়া যেতে পারে |’

নীল কাফতানে মনোরম আলোয় খুবই চার্মিং দেখায় তিনিশকে ‚ সোফায় পা তুলে বসে আছে | দেখে মনে হয় না আজই এখানে এসেছে | তিনিশ বলে ‚ ‘মুভিটা শেষ হলেই বেরোবো | ট্যাক্সি পাওয়া যাবে তো ?’

হিচককের ‘ব্ল্যাকমেল’ হচ্ছে ওয়ার্ল্ড মুভিতে | কিন্তু সে বসতে পারে না ওদের সঙ্গে | ঘরে ফেরৎ যায় | ফোন বের করে ঝোলা থেকে | একটাও মিসড কল নেই | রঘুবীরের একটাও এস এম এস নেই | বরং যশযাল্যর একটা এস এম এস এসে বসে আছে |

যশমাল্য খুব বড় মেসেজ লিখেছে একটা | ‘ শেষ দৃশ্যে নন্দিনী ঘুরে তাকাবে কি তাকাবে না‚ এই নিয়ে তোর সঙ্গে অনেক তর্ক হয়েছিল আমায় | ভুই আপত্তি করেছিলিস—-তাকাবে না ! আমি বলেছিলাম‚ একবার ঘুরে তাকাতে কী লাগে ? ঘাড় ঘোরানোর মতো একটা মুভমেন্ট‚ সেটা কী এমন বড় ব্যাপার ? স্পেশালি যেখানে ওদের মধ্যে মিলন বা বিচ্ছেদ দুটোর কোনটাই ঘটছে না ? শি ক্যান ইজিলি ডু ইট | কাঁধের আঁচল ঠিক করতে গিয়ে কাঁধের ওপর দিয়ে একটা শ্লথ ‚ নির্লিপ্ত চাউনি ? আজ কিন্তু আমার মনে হচ্ছে‚ অ্যাট টাইমস্‚ আমাদের প্রতিটা মুভমেন্ট কাউন্টস | কখনও কখনও জাস্ট পিছন ঘুরে তাকানোটা ভীষণই কঠিন | তাই চেঞ্জ করলাম | তোরটাই থাকল ‚ জানিয়ে ছিলাম তোকে | টয়লেটে গিয়ে মুখে শব্দ না করে কাঁদে গর্বী‚ রঘুবীর একটাও ফোন করল না ? একটাও না ? সে বুঝতে পারে সে একজন নিষ্ঠুর মানুষের জন্য কাঁদছে | তার স্বাধীনতার বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে যে তার জন্য কাঁদছে | সে এও বুঝতে পারে এক্ষুণি কান্না থামাতে হবে তাকে ‚নইলে কাঁদতে কাঁদতে অচিরেই আত্মসমর্পণ করবে চারদিকে অবিরল বয়ে যাওয়া ভয়ের স্রোতের মধ্যে | তার বিশ্বাস জন্মায়‚ প্রত্যাশা তৈরি হওয়ার থেকে ভয়ের কিছু হয় না !

গর্বী ভয়ের হতে থেকে বাঁচার মরিয়া চেষ্টায় স্নান করতে শরু করে যেন | শ্যাম্পু করে ‚ সমস্ত শরীরে সাবান ঘষে ফেনা তৈরি করে জীবনের দীর্ঘতম স্নান সেরে বেরিয়ে আসে সে | দেখে সাহানা তৈরি হচ্ছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে | জিনস-এর ওপর শিফনের ফুরফুরে টপ পরে কাজলে টাজল পরে প্রায় রেডি | সাহানা বলে ‘বাহ ! তোকে ফ্রেশ দেখাচ্ছে শিগগিরি ড্রেস পর | ‘

পনেরো মিনিটের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ে তিনজনে | ঝড়ের গতিতে পৌঁছে যায় পার্কস্ট্রিট | অট্রিয়ামে ঢুকে স্যুপের অর্ডার দেওয়া হয় প্রথমে | স্যুপ আসতে লাগে দশ মিনিট | যে-ই খাবার মুখে তুলতে যায় গর্বী‚ অমনি ফোন বেজে ওঠে তার ‚ চমকে ওঠে সে | রঘুবীর ‚ নিশ্চয়ই রঘুবীর | যদি রঘুবীর হয় তাহলে গর্বী এখনই ‚ আজ রাতেই ছুটে যাবে রঘুবীরের বাড়ি ‚ দরকার হলে জুঁইয়ের ছবি ছিঁড়ে ফেলার জন্য ক্ষমা চাইবে রঘুবীরের কাছে |

কিন্তু ফোনটা রঘুবীরের নয় ‚ শমীকদার | শমীকদার কাছে কাল সকালেই যাওয়ার কথা ছিল | শমীক দা বলেন‚ তুমি কাল এসো না‚ পরশু এসো |

তিনিশ বলে ‘তুমি অন্য কারও ফোন এক্সপেট করছিলে‚ তাই না ?’

সাহানা তার চোখে চোখে রাখে—-‘স্যুপটা খা তো’! প্রতিরোধের কাঁচা দেওয়াল ভেঙে যাওয়ার পর গর্বীর মনে হয় দুটো হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো তার | সেই অবস্থায় স্যুপ গলাধঃকরণ করে যে | আর তিনিশ হঠাৎই জানতে চায়‚ ‘রঘুবীর কে ?’

প্রশ্ন শুনে গর্বীর মনে হয় তার জীবনের শেষ ভাল দিনটা চলে গেছে | তার মনে হয় তিনিশ তাকে নয় ‚ সে-ই রঘুবীরকে প্রশ্ন করছে ‚ ‘হিতৈষণা কে ? অলিভিয়া কে ? ভ্রমর কে ?’

এরপর গভীর রাতে ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফেরার সময় তিনিশ প্রায় ব্যক্তিগত দুঃখ ব্যক্ত করার মত গাঢ় জর্জরিত কণ্ঠে বলে ওঠে ‘ মেন আর লাইক দ্যাট ! ভীষণ স্বার্থপর |’ গর্বী বাধা দেয় তিনিশকে ‚ ‘ বোলো না বলো না এ কথা | যে-ই তুমি এ কথা বিশ্বাস করবে‚ অমনি দেখবে অন্তহীন একটা ভয়ের স্রোতে ডুবে যাচ্ছো | অমনি দেখবে তোমার পৃথিবীতে প্রতি পদক্ষেপে নরখুলির চিহ্ন আঁকা বোর্ড | তাতে লাল দিয়ে লেখা ডেঞ্জার জোন ! তুমি ভাববে তুমি তো পুরুষের সামনে দিয়ে দিব্যি বেঁচে আছো ‚ কিন্তু তোমার জীবন হবে একটা অ্যাবরশনের রক্তমাখা‚ পিছল সুড়ঙ্গের মতো‚ ভয় পাবে আর নিঃসাড়ে ভয়ের গর্ভপাত ঘটাবে !’

তিনিশ রাস্তা দেখে‚ ‘ আমি বিয়ে করেছিলাম‚ জানো তো ? ভীষণ খারাপ একটা বিবাহিত জীবন | তথার পাশে ঘুমোতে পারতাম না ভাল করে | শুধু মনে হত রাতে ঘুমের মধ্যে ও আমার গলা টিপে দেবে |

সাহানা বলে‚’ প্রেম ভালবাসা‚ বিশ্বাস এসব ভীষণ হাল্কা জিনিস | মাথাটা খালি করে দেয় | মাধ্যাকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায় পৃথিবীর | ঘৃণা আর অবিশ্বাস এত ভারী যে আকাশ ওড়ার সময়ও পৃথিবীর উপর পা পোঁতা থাকে |’

এসব কথাবার্তার মধ্যে গর্বী ঘনঘন মাথা নেড়ে বলতে থাকে ‘ না ‚ না‚ ভয় পেলে চলবে না‚ ভয় পেলে চলবে না ‚ সুকৌশলে ভয়কে সরিয়ে ফেলতে হবে |’

কে বলতে পারে সময় পেছনের দিকে যায় না ? ভবিষ্যৎ আসলে অতীত এবং অতীতই অজানা ? কে বলতে পারে সূর্য অস্ত গেলেই শুরু হয় না দিন ? গর্বীর ক্ষেত্রে সব উল্টে পাল্টে যায় | কারণ সে কখন ঘুমোতে যায় ‚ কখন ঘুম থেকে ওঠে‚ কিছুই ঠিক থাকে না আর | ধানুকা প্রোডাকশন জয়েন করার পর সময়ের হিসেব কিছু মাত্র রাখতে পারে না সে | ফ্লোরে এতগুলো ডেলি সোপ রয়েছে ধানুকাদের যে এক্সিকিউটিভ প্রডিউসারের সহকারী হয়ে তাকে ছুটে বেড়াতে হয় দিনরাত | তার মধ্যেই ফোর্থ সেমেস-এর জন্য তৈরি হয় | পেপারটা শেষ হলে দিয়ে আসে ডিটিপি করতে | এ সবের মধ্যে রঘুবীরের সঙ্গে দেখা হলে সে বুঝতে পারে সে একটা ঘোরের মধ্যে বাস করছে |রঘুবীরের মুখের দিকে তাকালেই ঘোরটা কেটে যায় তার | তখন শিথিল হয়ে যায় শরীর | হাঁটু কাঁপে | ঝাঁঝালো রকম ভয় পায় সে‚ রঘুবীরকে | বন্ধুদের আড়ালে লুকিয়ে পড়ার চেষ্টা করে | গাছের পিছনে সরে যায় | আর এভাবেই কেটে যায় কতদিন | তারপর একদিন হঠাৎ রাতে বজ্র বিদ্যুৎ-সহ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলে তিনিশ তাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলে‚ ‘চল‚ ছাদে যাই | ‘ দারোয়ানের থেকে চাবি চেয়ে এনে ছাদে উঠে যায় তিনজনে |

সাহানা‚ তিনিশ আর সে | শঙ্কিল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে তিনিশ বলে‚ ‘ গর্বী ছোট ! দৌড়ো ! আমাকে ধরতে দিস না তোকে কিছুতেই |’ আর সে পরিত্রাহি দৌড়োতে থাকে‚ পালাতে থাকে বিশাল খোলা ছাদের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত | পড়ে থাকা জিনিসপত্র লাফিয়ে টপকে যায় সে | তিনিশ ছুটে আসতে আসতে কিছু বলে চিৎকার করে | লক্ষ কোটি বৃষ্টি পতনের শব্দে শোনা যায় না তিনিশের কথা |

ঘেঁটে যায় শব্দগুলো আর তার ফোন বেজে ওঠে | সে দেখে রঘুবীর ! গর্বী দাঁড়িয়ে পড়ে | দম নেয় | ফোন বাজতেই থাকে | অগুনতি বার বাজতে থাকে ফোন | ফ্ল্যাটে ফিরে যায় তিনজনে | ধীরে সুস্থে ফোনের গা থেকে জল মুছে এবার ফোনটা ধরে গর্বী‚ ‘ বলুন রঘুবীরদা ‘!

রঘুবীর কাঁদতে থাকেন‚ ‘এ কি সম্ভব গর্বী ? এ কি সম্ভব ? ভ্রমরের ফোন আসা কি সম্ভব ? ভ্রমর যেন ফোনের মধ্যে দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরতে চাইছিল ! ফোনটা ছুঁড়ে ভেঙে ফেলেছি আমি গর্বী ! বেরিয়ে এসেছি বাড়ি থেকে | এই বাড়িতে আমি আর ফিরতে পারব না | আমি তোমার বাড়ির দিকে আসছি’ |

সে চুপ করে থেকে বলে‚ ‘আপনি আসুন‚ আমি নামছি’| সে আরও বলে‚ ‘আপনি ভুল করেছেন রঘুবীরদা — এ ভাবে কাউকে ডাকলে সে আসবে না‚ বলুন ?’

কথা বলতে বলতে গর্বী বুঝতে পারে অতি প্রাচীন এক পদ্ধতিকে অনুসরণ করছে সে ! আ ভেরি ওল্ড সিসটেম |

রঘুবীর বলেন‚ ‘তোমার বাড়ির গেটের সামনে অসংখ্য কুকুর’ | ওঃ‚ ওঃ‚ করে কাঁদতে থাকেন রঘুবীর |

ভিজে পোশাক পালটে নেয় সে | সাহানা আর তিনিশ যে যার ঘরে শুতে চলে যায় | চাবি হাতে সে নামতে থাকে সিঁড়ি ভেঙে‚ সময় নিয়ে | একটা ছাতাও সঙ্গে নেয় গর্বী | রঘুবীরকে বাড়ি পৌঁছে দেবে | হয়তো রাতটা থেকে যাবে ওখানেই | —-এবং রঘুবীরকে সে কিছুতেই মাছি হয়ে যেতে দেবে না !

(সমাপ্ত)

গত পর্বের লিঙ্ক: http://www.banglalive.com/Magazine/Dharabahik/9752

Advertisements

1 COMMENT

  1. লেখাটা শেষ হলে বাঁচা যায় । নিরভেজাল বটতলা মার্কা লেখা ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.