মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত এই আসামিদের শেষ কথাগুলো আজও রহস্য‚ কী বলার ইচ্ছে ছিল ?

মানুষের অন্তিম ইচ্ছে বড়ই অদ্ভুত | এতে তার মানসিকতার নানা স্তরের নানা বৈশিষ্ট্য জড়িয়ে থাকে | কাউকে মেরে ফেলার ইচ্ছে থেকে হাস্যকর কোনও চাহিদা পূরণের দাবি  এমন অনেক কিছুই রয়েছে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অপরাধীদের অন্তিম বাক্যে |



১৯৮৯ সালে বিলি ওয়েন কবল নিজের স্ত্রীর বাবা মা ও ভাইকে খুন করেছিল | ২০১৯ সালের মার্চের ১ তারিখ তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় | ৭০ বছর বয়সে তার ইলেকট্রোকিউশনের ঠিক আগে তার বলা অন্তিম বাক্যে বোকা বনে যেতে হয় অনেককেই | কারণ মৃত্যুর ঠিক আগে বিলি বলে   স্যার‚ আপনার হল পাঁচ ডলার | আমি তোমাকে ভালবাসি‚ আমি তোমাকে ভালবাসি‚ এবং আমি তোমাকে ভালবাসি | মাইক‚ আমি তোমাকে ভালবাসি | নেলি কোথায়? আমি তোমাকে ভালবাসি | এটা হল পাঁচ ডলার | ভাল থেকো |   তার শেষ কথার অর্থ তারই সঙ্গে সঙ্গে তার কবরে প্রবেশ করে | 

ইউনাইটেড স্টেটসের ওকলাহোমার থমাস জে. গ্রাসোকেও মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত  করা হয়েছিল | ১৯৯০ সালে ৩২ বছরের থমাস হিল্ডা জনসন নামে ৮৭ বছরের একজন মহিলার গলায় ক্রিসমাস ট্রির আলোর তার জড়িয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করেছিল | ১৯৯১ সালে লেজলি হল্টজ নামেও আরেক ব্যক্তিকে খুন করে সে | ১৯৯৫ সালের মার্চের ২০ তারিখে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় | খুনের দিক থেকে বিরাট ভয়ানক কোনও সাক্ষর না রাখলেও থমাসের শেষ বিবৃতিগুলি ছিল অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক |

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার দিনে আঞ্চলিক সময় ৩ টের সময় থমাস বিবৃতি দেয় “What we call the beginning is often the end, and to make an end is to make a beginning. The end is where we start from.”অর্থাৎ আমরা যাকে শুরু বলে মনে করি তাই বেশিরভাগ সময় শেষ এবং শেষ করা মানেই শুরু করা | শেষ থেকেই আমরা শুরু করি |

সেইদিনেই আঞ্চলিক সময় ৮ টা বেজে ২৫ মিনিটে সে দ্বিতীয় বিবৃতি দেয় “For most of us, there is only the unattended moment, the moment in and out of time. And right action is freedom from the past and future also.” অর্থাৎ আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই সঙ্গহীন মুহূর্ত‚ সময়ের ভিতর ও বাইরের কিছু মুহূর্ত | অতীত ও ভবিষ্যতের থেকে স্বাধীনতাই সঠিক কাজ | দ্বিতীয় বিবৃতিটির প্রথম অংশটি টি. এস. এলিয়টের দ্যা ড্রাই স্যালভেজেস বইয়ের থেকে উদ্ধৃত |

মারা যাওয়ার প্রায় তিন ঘন্টা আগে সে আরেকটি কবিতা লিখে দেয় যার নাম ছিল “A Visit with Mystery” | এবং সে খেতে চেয়েছিল কিছু খাবার‚ যার বিস্তৃত তালিকাও সে দিয়েছিল | তালিকায় ছিল দুডজন স্টিমড মাজেলস‚ দুডজন লেমন ফ্লেভারড স্টিমড ক্ল্যামস‚ বার্গার কিঙের একটি ডবল চিজ বার্গার‚ আধ ডজন বারবিকিউড স্পেয়ার রিবস‚ দুটি স্ট্রবেরি মিল্ক শেক‚ হুইপড ক্রিম ও ডাইসড স্ট্রবেরি দেওয়া অর্ধেক পাম্পকিন পাই এবং মিটবলস সহ স্প্যাগেটিওসের একটি ক্যান | তালিকা মিলিয়ে খাবার আনতে  ঘাম ছুটে গিয়েছিল জেলের কিচেন স্টাফদের | কিন্তু খেদ জানিয়ে  থমাস বলে তাকে স্প্যাগেটিওসের জায়গায় স্প্যাগেটি দেওয়া হওয়ায় সে ক্ষুব্ধ | এ যেন মৃত্যুর সঙ্গে এক আশ্চর্যরকমের মস্করা !


আমেরিকার প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার হিসেবে কথিত এইলিন য়ুয়োরনোস ১৯৮৯এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০এর সেপ্টেম্বরের মধ্যে ছজন মানুষকে খুন করে বলে জানা যায় | সে দাবি করেছিল সে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করার সময়ে এই ছজন ব্যক্তি জোর করে তার সাথে যৌনতা করার চেষ্টা করছিল | নিজেকে তাদের হাত থেকে বাঁচাতে তাদেরকে গুলি করে খুন করেছিল সে | ২০০২ সালে লেথাল ইঞ্জেকশন দিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার ঠিক আগে সে ইন্ডিপেনডেন্স ডে সিনেমার প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু হেঁয়ালিপূর্ণ কথা বলে | সে বলে‚“I’d just like to say I’m sailing with the rock, and I’ll be back like Independence Day with Jesus June 6. Like the movie, big mother ship and all. I’ll be back.” অর্থাৎ আমি পাথরের সাথে জলে ভেসেছি  এবং ইন্ডিপেনডেন্স ডের মত জুন মাসের ৬ তারিখে আমি যিশুখ্রিস্টের সঙ্গে ফিরে আসব | 

সশস্ত্র ডাকাতির অপরাধে জর্জ হ্যারিসকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল | সে একটি লোকের মুখে গুলি করে নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করেছিল | কানসাস সিটিতে তার মত ভয়াবহ সশস্ত্র ডাকাত খুব কমই ছিল | নিজের আইনজীবীর প্রতি ক্ষুব্ধ জর্জ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঠিক আগে বলেছিল ” আইনজীবীকে খুন করা দরকার |”

আঠেরো শতকে ইংল্যান্ডে নিজের বাবা ফ্রান্সিস ব্ল্যান্ডিকে খুন করার অপরাধে মারি ব্লেন্ডির মৃত্যুদন্ড হয় | আর্সেনিক মেশানো এক মিশ্রণ খাইয়ে বাবা ফ্রান্সিসকে চিরকালের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল সে |  উইলিয়াম হেনরি ক্র্যানস্টাউন নামে একজন বিবাহিত সেনাধিকারিকের সঙ্গে মারির প্রণয়সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল | মারি নিজের বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে সে মনে করেছিল আর্সেনিক মিশ্রিত ওই মিশ্রণটি খেলে তার বাবা তার সম্পর্ক মেনে নেবে | তাই সে ওই মিশ্রণ বাবাকে খাওয়ায় যার ফলে বাবার মৃত্যু ঘটে | ১৭৫২ সালের ইস্টারের সকালে যখন তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরী হয় তখন সে বলে “For the sake of decency, gentlemen, don’t hang me high.” অর্থাৎ ভদ্রতার দোহাই আপনাদেরকে‚ আমাকে বেশি উঁচুতে ঝোলাবেন না | কারণ তার মনে হয়েছিল তাকে বেশি উঁচুতে ঝোলানো হলে পুলিশের আধিকারিকরা তার স্কার্টের ভিতরের অংশটি দেখতে পাবেন ! মারা যাওয়ার থেকেও বেশি নিজের মরদেহের আব্রু রক্ষার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল মারি |

১৬৯২ সালে ম্যাসচুসেটসে যে তিনজন মহিলাকে ডাইনিজাদুবিদ্যা প্রয়োগের জন্য অভিযুক্ত করা হয় তাদেরই মধ্যে একজন ছিল সারা গুড | নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করার বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আরও চারজন ডাইনিজাদুবিদ্যা প্রয়োগকারী মহিলার সঙ্গে সারাকেও মৃত্যুদণ্ডিত করা হয় | মৃত্যুর আগে বিচারককে  সারা বলে‚ “I’m no more a witch than you are a wizard, and if you take away my life God will give you blood to drink.” যার মানে আমি যতটা না ডাইনি তার থেকে অনেক বেশি জাদুকর তুমি নিজে এবং তুমি যদি আমার প্রাণ নাও তবে ঈশ্বর তোমায় রক্ত পান করতে দেবেন | এই ঘটনার ঠিক পঁচিশ বছর পর রেভ নিজেরই রক্ত পান করতে গিয়ে গলায় আটকে মারা গিয়েছিল | অর্থাৎ সারার ভবিষ্যৎবাণী সত্যি হয় |

লুইসিনিয়ার এক বৃদ্ধ দম্পতিকে ১৯৮২ সালের বড়দিনে খুন ও লুঠ করার অপরাধে জিমি গ্লাস ও তার পার্টনারইনক্রাইম জিমি উইঙ্গোকে গ্রেপ্তার করা হয় | সুপ্রিম কোর্টে মৃত্যুদণ্ড  প্রথাটি নিষ্ঠুর ও অসাংবিধানিক বলে দাবি করে জিমি | এবং মৃত্যুর ঠিক আগে তার বক্তব্য ছিল‚ “I’d rather be fishing”. অর্থাৎ এর থেকে আমি মাছ ধরলে ভাল কাজ করতাম!

১৯৯১ সালে ফিনিক্সে মার্ক হোনসকে লুঠ করে খুন করার অপরাধে রবার্ট চার্লস টাওয়ারির মৃত্যুদণ্ড  হয়েছিল | ২০১২ সালে লেথাল ইঞ্জেকশন দিয়ে মৃত্যু কার্যকর হওয়ার আগের মুহূর্তে রবার্ট কান্নায় ভেঙে পড়ে | জানায় জীবনে সে একের পর এক ভুল করে গেছে এবং নিজের ও হোনসের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইতে বলে‚ “I love my family. Potato, potato, potato.” তিনবার আলু কথা বলে রবার্ট কী বোঝাতে চেয়েছিল তা জানাতে তার আইনজীবী জানান তার মৃত্যুদন্ডের সময় সাক্ষী থাকা তার ভাইকে সে এইভাবেই বোঝাতে চেয়েছিল যে সব ঠিক আছে |


জার্মানির সিরিয়াল কিলার পিটার কার্টেনকে বলা হত ভ্যাম্পায়ার অফ ডাসেলডর্ফ বাডাসেলডর্ফ মনস্টার | কারণ মানুষ খুন করার পর সে মৃতদেহগুলির সঙ্গে নৃশংস আচরণ করত বা মৃতদেহের রক্ত পান করত | নিজেই স্বীকার করেছিল খুন করে রক্ত বেরোনো দেখে একরকম যৌন তৃপ্তি অনুভব করত সে | নটি খুন করার জন্য ১৯৩১ সালে তাকে গিলোটিনে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেওয়া হয় | মৃত্যুর আগে তার শেষ কথায় সে বুঝিয়ে দিয়েছিল কেমন অমানবিক বিকৃতমনস্ক ঠান্ডা মাথার খুনি সে | বলেছিল‚“After my head is chopped off, will I still be able to hear, at least for a moment, the sound of my own blood gushing from the stump of my neck? That would be the pleasure to end all pleasures.” | অর্থাৎ‚ আমার মাথা কাটা যাওয়ার পরেও কয়েকমুহূর্তের জন্য আমার শোনার শক্তি থাকবে‚ এক মুহূর্তের জন্য হলেও আমি শুনতে পাব আমার কাটা ঘাড় থেকে আমার নিজের রক্ত বেরিয়ে আসার শব্দ | জীবনের যাবতীয় সুখ শেষ করার জন্য এর থেকে বড় সুখ আর কি হতে পারে !

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here