ভাইদের মৃতদেহ খেয়ে জীবনধারণ করে বাবার হাড় থেকে পাশার ঘুঁটি বানিয়ে প্রতিশোধের খেলা খেলতে থাকেন শকুনি

7891

আমি যদি দুর্গার বিপরীত দিক অর্থাৎ দুর্গতি নিয়ে বলি ? আরও স্পষ্ট করে বললে‚ পুরাণে যাঁরা খলনায়ক তাঁদের নিয়ে বলি ? প্রত্যেক খলনায়কের উৎস কিন্তু একই‚ যেখান থেকে নায়কের সৃষ্টি | জগতে ভালমন্দ দুটো একই সৃষ্টিকর্তার বানানো | কারণ একদিক না থাকলে অন্যদিকের ভালত্ব বা মন্দ দিক পরিস্ফুট হয় না | অন্ধকার না থাকলে বুঝতে পারতেন আলো কাকে বলে ? 

যাই হোক কিছু পৌরাণিক নেগেটিভ চরিত্রকে নিয়ে লিখব মনস্থ করেছি | কংসের পরে এই পর্বে আর এক পৌরাণিক খলনায়ক মাতুল শকুনি |

পুরাণ বা মহাকাব্যে খলনায়ক মাতুল হিসেবে কংস যতটা আলোচিত‚ ততটা নন শকুনি | তাঁকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের জন্য দায়ী করা হয় ঠিকই | কিন্তু গান্ধাররাজের মূল শত্রু ছিলেন ভীষ্ম‚ ধৃতরাষ্ট্র এবাং পাণ্ডু | একমাত্র পাণ্ডবরা নন | শকুনি চেয়েছিলেন সমগ্র কুরু বংশ ধ্বংস করে দিতে | এই শত্রুতার বীজ লুকিয়ে ছিল গান্ধারীর বিয়েতে |

গান্ধারী এবং শকুনি ছিলেন গান্ধাররাজ ( বর্তমান আফগানিস্তান ) সুবলের সন্তান | জ্যোতিষী ছকবিচার করে বলেন‚ গান্ধারী স্বামীহীনা হবেন | সতর্কতা নিতে তাঁর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হ্য় এক ছাগলের | এরপর সেই ছাগটিকে মেরে ফেলা হয় | ধৃতরাষ্টের সঙ্গে বিয়ের সময় এই ঘটনা গোপন রাখা হয় |

পরে কুরু বংশে প্রকাশিত হয়ে পড়ে বিধবা অবস্থায় গান্ধারীর বিয়ে হয় ধৃতরাষ্টের সঙ্গে | এই কথা গোপন রাখার জন্য গান্ধার রাজ্য আক্রমণ করেন ভীষ্ম‚ ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডুর বিশাল বাহিনী |

যুদ্ধে পরাস্ত হন রাজা সুবল | বন্দি করা হয় শকুনি-সহ তাঁর শতপুত্রকে | তাঁদের প্রাণে হত্যা না করে অভূক্ত রাখা হয় | কারাগারে আটক কয়েকশো গান্ধার যুদ্ধবন্দি | কিন্তু খাবার দেওয়া হত একজনের | এইভাবে তিলে তিলে তাঁদের হত্যার পরিকল্পনা নেয় হস্তিনাপুর রাজপুরুষরা |

গান্ধার রাজবংশ তখন স্থির করে‚ বাঁচিয়ে রাখা হবে চতুরতম বংশধর শকুনিকে | তাই সবাই অনাহারী থেকে ওই সামান্য খাদ্য দেওয়া হত শকুনিকে | এইভাবে বন্দিদশায় একে একে মারা যান শকুনির সব ভাই | মৃত্যু হয় গান্ধাররাজ সুবলেরও | শুধু প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে জীবিত থাকেন শকুনি | প্রাণধারণের জন্য তিনি নাকি ভাইদের মৃতদেহ খেতেন | রীতিমতো কুকুর-শকুনের সঙ্গে লড়াই করে খাদ্য যোগাড় করতে হত গান্ধার-কুমারকে !

বেদব্যাসের মহাভারতে না থাকলেও এই মহাকাব্যের আঞ্চলিক রূপে আছে‚ সুবল তাঁর পুত্রকে পরামর্শ দেন তাঁর হাড় থেকে পাশার ঘুঁটি বানাতে | বলা হয়‚ সুবলের মৃত্যুর পরে তাঁর নিভে যাওয়া চিতা থেকে গোড়ালির হাড় সংগ্রহ করেন শকুনি | পিতা তাঁকে বলে গিয়েছিলেন গোড়ালির হাড় আগুনে পুড়বে না | এরপর ওই হাড় দিয়ে তৈরি হয় শকুনির পাশার ঘুঁটি | যা নাকি আদপে ছিল তাঁর ক্রীতদাস |

মহাভারতের বহু রূপে কথিত‚ সুবল বেঁচে থাকতেই তাঁর দেহ থেকে ওই হাড় সংগ্রহ করেন শকুনি | কোথাও বলা হয়‚ পিতার নয় | ওই হাড় শকুনির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার | অনেক স্থানে আবার বলা হয়‚ কোনও হাড় নয় | শকুনির পাশার ঘুঁটি নির্মিত হয়েছিল হাতির দাঁত দিয়ে |

যাই হোক‚ বন্দিদশা থেকে একদিন মুক্তি পেলেন শকুনি | একে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সঙ্গে দিদির বিয়ে তিনি মেনে নিতে পারেননি | তার উপর চোখের সামনে দেখেছিলেন পরিবারের সবার মৃত্যু | ফলে প্রতিশোধস্পৃহায় জ্বলতে থাকা শকুনি এসে উঠলেন দিদি গান্ধারীর কাছে |

গান্ধার সিংহাসন পড়ে থাকল শূন্য | শকুনি মন্ত্রণা দিতে লাগলেন ভাগনে দুর্যোধনকে | পুত্র উলুকাকে শকুনি বললেন‚ রাজ-ঐশ্বর্যের থেকে তাঁর কাছে অনেক বেশি প্রিয় প্রতিশোধ চরিতার্থ করা | ধ্বংসের খেলায় নেমে ধূর্ত শকুনি বুঝলেন দুর্যোধন মূর্খ এবং গোয়াঁড় | তাঁকেই তিনি ব্যবহার করলেন নিজের চালের দান স্বরূপ | শকুনির লক্ষ্য ছিল কৌরব-পাণ্ডবদের লড়িয়ে দিয়ে পুরো বংশ ধ্বংস করে দেওয়া | শকুনির মন্ত্রণাতেই অয়োজিত হয় পাশাখেলা | যেখানে একে একে সব কিছু হারান পাণ্ডব ভ্রাতারা | এই পাশা খেলার আসরই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতি |   

চরিত্রে তামসিক বৈশিষ্ট্যের আধিক্য থাকলেও সাত্ত্বিক শকুনি ছিলেন মহা শৈব | কেরলের কোল্লাম জেলায় পবিত্রেশ্বরমে শকুনির মন্দিরও আছে | কাছেই আছে মন্দির দুর্যোধনের নামে | দুটি মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ করে কুরুবার সম্প্রদায় | বলা হয় মহাভারতের এরাই কৌরবদের বংশধর | এই পবিত্রেশ্বরম সেই স্থান যেখানে কৌরবদের মধ্যে কুরুক্ষেত্র সমরের আগে অস্ত্র ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল | এই স্থানেই নাকি যুদ্ধের পরে ব্রহ্মত্ব লাভ করেছিলেন শকুনি | তাই এখানেই আছে তাঁর মন্দির |

প্রচলিত বিশ্বাস হল শকুনি হলেন স্বয়ং দ্বাপর যুগের প্রতীক | আর দুর্যোধন হলেন কলিকালের প্রতীক | ভারতের ইতিহাসেও শকুনির উল্লেখ আছে | গান্ধারের রাজা অম্ভি কুমার ছিলেন রামায়ণের ভরত এবং মহাভারতের শকুনির বংশধর | তক্ষশীলায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সহপাঠী ছিলেন অম্ভি | আলেকজান্ডার যখন ভারত অভিযানে আসেন‚ তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেন অম্ভি | পরে সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের হাতে নিহত হন তাঁর একদা সহপাঠী এবং শকুনির উত্তরসূরী অম্ভি কুমার |

(পুনর্মুদ্রিত ও ঈষৎ পরিবর্তিত)

Advertisements

1 COMMENT

  1. তথ্য গুলো ঠিক মিলছে না (রামায়ন , মহাভারত, এবং আলেকজান্ডার ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের, আন্ন দিকে মহাভারতের শকুনি, রামায়ণের ভরত, চন্দ্রগুপ্ত এবং আলেকজান্ডার) এর মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছি না।
    যদি কোনো ভুল না করি, তাহলে রামায়ন আগে ও মহাভারত পারে হয়, তাহলে শকুনির বংশধর ভরত কিকরে হয় ? ভারতের বংশধর শকুনির হবার কথা। কারণ রামায়ন হয়েছে ত্রেতাযুগে আর মহাভারত দাপরযুগে। রামের জন্ম ত্রেতাযুগে আর কৃষ্ণর জন্ম দাপরযুগে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.