চালচিত্র শূন্য করে মহাপ্রস্থানে ভারতীয় চলচ্চিত্রের পদাতিক

145

পরিচালক হওয়া তো দূরের কথা, চলচ্চিত্র জগতে তাঁর আসাটাই নাকি একটা দুর্ঘটনা! একটি সাক্ষাত্কারে এমনটা নিজেই বলেছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৫৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নীল আকাশের নীচে’ বা ১৯৬০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবি দেখার পর এ কথা কি কেউ বিশ্বাস করতে পারবেন! হ্যাঁ, ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম পরিচালক মৃণাল সেনের কথাই বলছি।

মাধুরী মুখোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্রে ‘মাধবী’ হয়ে গেলেন এই ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবির পর থেকেই। এ কথা আমরা সকলেই জানি যে, মৃণাল সেন পরিচালিত ‘মৃগয়া’ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদেই জীবনের প্রথম রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার আসে বলিউড কাঁপানো ডিস্কো ডান্সার মিঠুন চক্রবর্তীর ঝুলিতে। যখন ‘মৃগয়া’ ছবির জন্য তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন মৃণাল সেন তখন চলচ্চিত্র জগতে নবাগত মিঠুন চক্রবর্ত্তী । কিন্তু কথায় বলে, জহুরি জহর চেনে! বলিউডে পরবর্তীকালে যেভাবে অভিনয় দক্ষতায় নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন মিঠুন চক্রবর্ত্তী তা আর বলার বাকি রাখে না।

১৪ মে, ১৯২৩ বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম মৃণালের। হাইস্কুলের পড়া শেষ করে কলকাতায় আসেন। পদার্থবিদ্যা নিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াশোনা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি মার্কসবাদ-এর সঙ্গে যুক্ত। সমাজতন্ত্র নিয়ে তাঁর যাবতীয় ভাবনাতেই কমিউনিজমের প্রভাব দেখা গিয়েছে বহুবার, কারণ সেই ভাবনারই সফল প্রকাশ তাঁর ছবি।

আজীবন বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সাংস্কৃতিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৫-এ ‘রাত ভোর’-এর মাধ্যমে পরিচালনা শুরু করেন মৃণাল। উত্তম কুমারের সঙ্গে সেই ফিল্ম তাঁকে সেভাবে সাফল্য এনে না দিলেও  তারপরের ছবি ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘বাইশে শ্রাবণ’ তাঁর পরিচালনা দক্ষতা কে ফুটিয়ে তোলে। কিংবদন্তী এই পরিচালকের ঝুলিতে রয়েছে ১৮টি জাতীয়, ১২টি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার। মস্কো, বার্লিন, কান ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হন তিনি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন মৃণাল সেন। শুধু বাংলা নয়, হিন্দি, ওড়িয়া, তেলেগু ভাষাতেও ছবি বানিয়েছিলেন পরিচালক মৃণাল সেন। সত্যজিৎ রায়কে যেমন সারা দুনিয়া ‘পথের পাঁচালী’র জন্য চেনে, তেমনি ‘ভুবনসোম’, ‘কোরাস’, ‘মৃগয়া’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘পুনঃশ্চ’, ‘পরশুরাম’, ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘চালচিত্র’ সহ  অসামান্য সব ছবির জন্য মানুষ মৃণাল সেনকে মনে রাখবে। ইনি এমনি একজন পরিচালক, যিনি বিশ্বাস করতেন সিনেমা শুধুই বিনোদনের জন্য নয়, সিনেমার মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষিত করে তোলাও যায়।

১৯৮১ সালে তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হন তিনি। সাহিত্য ও শিল্পে অনস্বীকার্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘কম্যান্ডার অফ দ্য অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস’ (Ordre des Arts et des Lettres ) সম্মানে সম্মানিত করেছিল ফরাসি সরকার। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান হল এই ‘কম্যান্ডার অফ দ্য অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস’। ২০০৫ সালে বিনোদন জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে অ্যাওয়ার্ডও পান তিনি। তাছাড়া তেলুগু ছবি ‘ওকা উরি কথা’-র জন্যও তিনি জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও ২০১৭ সালে তাঁকে অস্কার অ্যাকাডেমির সদস্যপদে সম্মানিত করা হয়। অন্যদিকে ‘কোরাস’, ‘পরশুরাম’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘একদিন অচানক’ তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্মান। ভেনিস, কায়রো, থেকে কান ফিল্ম ফেস্টিভালে সম্মানিত হয়েছে এই ছবিগুলি।  ২০০২ সালে ‘আমার ভুবন’ তাঁর পরিচালনা করা শেষ ছবি।

৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সাল বাংলার মৃণাল পাড়ি দিয়েছেন অন্য এক জগতে। বছর শেষে বাংলার চলচ্চিত্র মহল শূন্য করে পরলোকগমণ করলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম পরিচালক। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সকাল সাড়ে ১০ টা নাগাদ ভবানীপুরের বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন বিশ্ব বরেণ্য পরিচালক। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন সকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পারিবারিক চিকিত্সক জানিয়েছেন, মৃণাল সেন-এর ইচ্ছে অনুযায়ী কোনও মাল্যদানের ব্যবস্থা থাকবে না। একমাত্র ছেলে কুণাল সেন তাঁর মরদেহে মাল্যদান করবেন। বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন ছেলে কুণাল। ২ জানুয়ারি শিকাগো থেকে কলকাতা ফিরছেন তিনি। তারপরই মৃণাল সেনের অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.