অসিতবরণ তাঁর ছেলেবেলার বন্ধু ‘কালো’? ডাকাত সর্দার মিষ্টি খাইয়েছিল ভারতী দেবীকে!

চারের দশকের মানুষ একুশে বিরল। হাতে গোনা যে ক’জন এখনও আছেন তাঁদের কাছে একবার নায়িকা ভারতী দেবীর নাম করবেন। দেখবেন, কেউ বলবেন ‘ডাক্তার’, ‘শাপমুক্তি’তে অভিনয় করেছেন না? কেউ আবার চোখের পলকে স্মৃতির সরণি বেয়ে কেমন পৌঁছে যাবেন ‘প্রতিশ্রুতি’, ‘কাশীনাথ’, ‘চন্দ্রশেখর’ বা ‘নার্সদিদি’ ছবির যুগে। এমনই ক্যারিশমা ছিল নায়িকা ভারতী দেবীরপরে তিনি নায়িকা ছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

ভারতী দেবী যেমন ঘরোয়া অভিনয় গুণে জমিয়ে দিতে পারতেন যে কোনও ছবি, তেমনি মানুষটিও খুব জমাটি ছিলেন। শুটিংয়ের অনেক মজার গল্প ছিল তাঁর ঝুলিতে। ‘ডাক্তার’ ছবির প্রথম দিনের শুটিংয়ের কথাই ধরুন—‘ছবির নায়ক জ্যোতিপ্রকাশ। নায়িকা আমি। পরিচালক ফণি মজুমদার। দৃশ্যটা ছিল নায়ক এসে কড়া নাড়বে। কিন্তু আমি ছোটো ভাই এসেছে ভেবে দরজা খুলে যেই জিভ ভেঙিয়েছি, দেখি ভাই নয় প্রেমিক দাঁড়িয়ে দরজায়। আমি তখন লজ্জায় মরি। দৃশ্যটা বোঝানোর পর বললেন, আমি যেভাবে বলব তুমি সেভাবে অভিনয় করবে। পর্থম শটে ওকে হয়ে গেলেই তুমি একটা প্রাইজ পাবে। উপহার পাব শুনেই তো আমি উত্তেজনায় টানটান। এমনিতেই আমার নার্ভাসনেস কম ছিল। বরং জ্যোতি বেচারা একটু নার্ভাস হয়ে পড়ছিল। যাই হোক, আমি এক শটেই ওকে। ফণীবাবু তখুনি আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে হাতে নেস্টলের এত্তো বড়ো একটা ক্যাডবেরি বার ধরিয়ে দিলেন। সেই শুরু। ক্যাডবেরির লোভে আমি এক শটেই ওকে হই। আর পরিচালক উপহার দেন।’

সেই সময় ভারতী-অসিতবরণ ছিলেন জনপ্রিয় রোম্যান্টিক জুটি। সেখানেও গল্প মজুত। অসিতবরণ নাকি ভারতী দেবীর মেয়েবেলার খেলার সঙ্গী ‘কালো’! ‘একদিন সঙ্গীত পরিচালক রাইচাঁদ বড়াল নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওয় একজন নবাগত নায়কের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমায় দেখে ওই যুবক প্রথমে খুব অবাক হলেন। তারপর খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠে বললেন, আমায় চিনতে পারছ? আমি চিনতে না পারার অস্বস্তি ঢাকতে মাথা নেড়ে ‘না’ বললাম। তখন তিনি আবার বললেন, ভালো করে দেখে বল তো, কালোকে মনে পড়ছে কিনা! কালো নামটা শুনতেই আমার ফেলে আসা ছেলেবেলা একছুটে যেন সামনে এসে দাঁড়াল। খুশি মুখে বললাম, কতদিন বাদে দেখা! কেমন আছ? সেই যে একসঙ্গে কাজ শুরু করলাম, তারপর অনেক ছবি করেছি। আমরা দু’জনে দু’জনকে পার্টনার বলে ডাকতাম। আমাদের জুটি যখন হিট তখন আচমকাই গুজব ছড়াল, ভারতী অসিতবরণের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কথাটা কানে আসতেই প্রথম ধাক্কায় হতবাক। তারপর রেগে আগুন তেলে বেগুন আমি। অসিত তখন সেই বাচ্চাবেলার বন্ধুর মতো করে বোঝাল, আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রিতে তো কতই রটনা রটে। তাতে কান দিলে চলে? খারাপ লাগলে কান বন্ধ করে কাজ করে যাও।’

অসিতবরণ ছাড়াও উত্তমকুমারের দুটো ছবি ‘সহযাত্রী’, ‘মনের ময়ূর’-এর নায়িকা ছিলেন ভারতী দেবী। কেমন ছিলেন তখন উত্তম? নায়িকার বর্ণনায়, ‘‘উত্তম তখন নবাগত। রোগা-পাতলা। অভিনয়ের বাইরে সারাক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে বসে থাকত। কোনও মেয়ের দিকে তাকাত না! সেই দেখে আমি বললাম, এভাবে রোম্যান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করবে কী করে? ইন্ডাস্ট্রিতে কল্কে পাবে না যে! একবার ডায়মন্ডহারবারে আউটডোর শুটিং করতে গেছে ‘মনের ময়ূর’-এর টিম। উত্তম ছাড়াও আমার সঙ্গী সহ-অভিনেত্রী সুপ্রভা মুখোপাধ্যায়। শুটিংয়ের মাঝপথে হঠাত ডাকাত পড়ল! আমি তো ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সুপ্রভাকে নিয়ে গাড়ির সিটের নীচে লুকিয়েছি। আমাদের মুখে রংচং মাখা। ল্যাগব্যাগে উত্তম ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’তে কোথায় পালিয়েছে, কে জানে! কিন্তু তাতেও রেহাই নেই। ডাকাত দল ঠিক খুঁজে বের করল আমাদের। ‘কৌন হ্যায়’ বলে হাঁক পাড়তেই আমরা ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে এলাম। ততক্ষণে পুলিশ হাজির হয়েছে ঘটনাস্থলে। পরিচালক চুপিসারে কখন যেন থানায় গেছিলেন। সেযাত্রা রক্ষা পেল ইউনিট।

পরে শুনলাম, আমাদের তাড়াতেই নাকি যে বাড়িতে শুট হচ্ছিল তার মালিক ডাকাতদের ডেকে এনেছিলেন! কেন? আমরা নাকি দল বেঁধে এত হুল্লোড় করছিলাম যে উনি টিঁকতে পারছিলেন না! এই শুনে আমরা তো তাজ্জব। এদিকে তখন আরেক কাণ্ড। আমরা শুটিং করতে এসেছি জানতে পেরে আমাদের অভিনয় দেখার জন্য ডাকাত সর্দারের সে কী কাকুতিমিনতি! নিজে মিষ্টি আনাল ইউনিটের সবার জন্য। শ্যুটিং দেখল। তারপর হাতকড়া পরে পুলিশের সঙ্গে থানায় গেল!’’

ঋণ স্বীকার: আশিসতরু মুখোপাধ্যায়, ‘তারাদের কথা’

    

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here