কে এই অনুরাধা? যাকে ৯ মাস নিজের বাড়িতে রেখেছিলেন পরিচালক হৃষিকেশ মুখার্জী?

সময়টা সম্ভবত ছয়-সাতের দশক | পরিচালক হৃষিকেশ মুখার্জী-র নামে তখন বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত | অমিতাভ বচ্চন থেকে ধর্মেন্দ্র— হৃষি-দার সেটে এসে টুঁ শব্দ করতেন না | সেলেব সুলভ হাঁকডাক তো অনেক দূরের গপ্পো | আর হৃষিকেশ মুখার্জী-ও ওদের জন্য একদম অন্য স্বাদের গল্প বাছতেন | ভাবতে পারেন, যে ধরম-এর বেশির ভাগ ছবির কমন ডায়লগ ছিল ‘এক এক কো চুন চুন কে মারুঙ্গা’ তিনি হৃষি-দার পাল্লায় পরে সোনামুখ করে ‘চুপকে চুপকে’-তে কমেডি করেছেন! তার থেকেও বড় ব্যাপার, তিনি বাংলার ‘ছদ্মবেশী’-র উত্তমকুমারের জুতোয় পা গলাতে বাধ্য হয়েছিলেন হৃষি-দার চাপে পড়ে!

পরিচালক হৃষিকেশ মুখার্জী এমন শক্ত খোলের মানুষ ছিলেন | কিন্তু নারকেলের নরম শাসের মত তার ভিতরটা কি ভীষণ তুলতুলে ছিল, সে খবর রাখেন ক’জন? বরাবরই সেলেবরা সিনেমার পাশাপাশি সমাজসেবা করেন | কেউ জানিয়ে করেন | কেউ না জানিয়ে | হৃষি-দা এমনভাবে করেছিলেন যে তার বাঁহাত টের পায়নি ডান হাত কী করছে!

১৯৭৫ সাল | হৃষিকেশ মুখার্জী তখন ছবি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত | এই সময় একটি চিঠি আসে তার কাছে | চিঠির লেখক অনুরাধা | এমন নাম হৃষি-দা জীবনে শোনেননি | এমন কাউকে তিনি কস্মিনকালে চিনতেনও না | যাই হোক, চিঠি খুলে পড়তে লাগলেন | পড়া যত এগোতে লাগলো দাদার মুখ তত গম্ভীর হতে থাকলো | চিঠি পড়া শেষ হতেই মনে হলো, কেউ যেন তার গোটা মুখে কালি ঢেলে দিয়েছে | কী লেখা ছিল চিঠিতে?

কলকাতার মেয়ে অনুরাধার বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হবে | মেয়েটির বয়স মাত্র ১৬ | আর সে সময় অনুরাধাকে দিয়েই দেশের প্রথম বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট হবে | এর জন্য মেয়েটি আর তার বাড়ির লোককে মুম্বই যেতে হবে | তাদের কাছে মুম্বই বিদেশের সমান | কোনো দিশা দেখতে না পেয়ে শেষে অনুরাধা হৃষিকেশ মুখার্জী-কে চিঠি লিখেছিল | কেন? কারণ, হৃষি-দা কলকাতা লোক | অনুরাধাও কলকাতার | বিদেশ-বিভুঁইয়ে তাকে বড্ড আপনার মনে হয়েছিল মেয়েটির |

বছর ১৬-র অনুরাধার অনুরোধ শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারেননি হৃষিকেশ | অচেনা অনুরাধা আর তার বাড়ির লোকেদের জায়গা দিয়েছিলেন নিজেদের বাড়িতে | অপারেশনের দিন সারাক্ষণ হাসপাতালে ছিলেন | অনুরাধাকে বেড-এ দেওয়ার পর বাড়িতে আসেন | শুধু কি এই? টানা ৯ মাস নিজের বাড়িতে রেখে চিকিত্সা করিয়েছিলেন মেয়েটির | পুরো সুস্থ হওয়ার পর কলকাতায় ফেরার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন |

একদম অন্য ধারার মানুষ ছিলেন পরিচালক হৃষিকেশ মুখার্জী | কলকাত্তাইয়া আন্তরিকতা বুকে নিয়ে গিয়েছিলেন মুম্বই-তে | ছবি তৈরির আগেই মাথায় আঁকা হয়ে যেত, কীভাবে শুট করবেন | তাই তাঁর ছবি তৈরিতে বাড়তি সময় লাগত না | বেশি টাকা খরচ হত না | তাই মনমোহন দেশাই-এর মতো পরিচালকও তাঁর হাতে ছবির এডিটিং করতে দিতেন নিশ্চিন্তে | ২৭ অগাস্ট ছিল হৃষি-দার ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী | এইদিন এলেই নতুন করে মনে পরে অনুরাধার গল্প | সারাজীবন কাউকে না বললেও ভাগ্গিস তিনি ঘটনাটা লিখেছিলেন আত্মজীবনীতে! নাহলে মানুষ হৃষিকেশ মুখার্জী-কে এভাবেও কি জানা যেত?                     

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here