প্রেম, ভূত ও চুমু

কলকাতার এখন গণ হাগা-হাগি উৎসব চলছে। কে বা আগে ভাগে করিবেক হাগ তারই লাগি ভাগাভাগি। খুল্লমখুল্লা হাগিলেই মিডিয়ায় ছবি পাক্কা। এর আগে একটা গণ হামা-হামি উৎসব হয়েছিল। সেটাও সুপারহিট হয়েছিল। মাঝে মাঝেই এমন জমজমাট নট্ট কোম্পানির ঝননঝনাৎ না শুনলে বেঁচে আছি বোধটাই হারিয়ে যায়। বয়স চড়চড়িয়ে বেড়ে যায়। এই এখন যেমন চতুর্দিকে সবাই রে রে করে তেড়ে চলেছে। বেশ একটা চনমনে ভাব অনুভূত হচ্ছে।

গোটা ফেসবুক দুনিয়া হাগ-পন্থী আর বেহাগ-পন্থীতে দ্বিধাবিভক্ত। বেহাগের দল বলছে মেরেছে ঠিক করেছে। ছেলেটাকে খুন করে মেয়েটাকে রেপ করতে হত। খাপ পঞ্চায়েতে ফেলতে পারলেই কেসটা খাপে খাপ পঞ্চার বাপ হয়ে যেত। তখন ব্যাটাচ্ছেলে টের পেত। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, যতদূর জানি লাদেনও বেহাগ জানত। তালিবানি কিংবা বজরঙ্গ দলীরাও জানে নিশ্চয়ই। আর একদল বলছে শ্লীল-অশ্লীল মানি না। যেখানে ইচ্ছে হবে সেখানেই জড়িয়ে ধরব, চুমু খাব তাতে কার দাদুর কী? সুনুদা মেয়ে রাইকে নিয়ে প্রতিবাদের দিন মেট্রোয় চড়েছিল। প্রবীণ নাগরিকের সিটে বসেছিল সুনুদা আর রাই সামনেই দাঁড়িয়েছিল। পোস্টার হাতে ছেলে মেয়েরা জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে সুনুদাকে বলে গেছে, ‘কী কাকা, কিছু বলবেন নাকি?’ রাইয়ের বয়সী একটি মেয়ে বলে গেছে, ‘বেশি চাপ নেবেন না দাদু’। সুনুদা নিজে কী দোষ করেছিল বুঝতে পারে নি। কিন্তু বাপ মেয়ে সারা রাস্তায় আর কথা বলতে পারে নি। এ নিয়ে কথা বললেই সমাজে পিছিয়ে পড়তে হয় যে। সব চাপ চেপে যেতে হবে।

আসলে এখন অত মান-সম্মান নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই। কারও ইচ্ছে অনিচ্ছে নিয়েও ভাবার সময় নেই। অন্যপক্ষের যুক্তি শোনারও কথা নয়। লড়াই বেঁধে গেছে যে। এখন যুদ্ধু-যুদ্ধু খেলা। দু’পক্ষ যেন সিপিএম-তৃণমূল কিংবা বিজেপি-কংগ্রেস বা নিদেন পক্ষে সত্তর দশকের ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান। হয় তুমি এপক্ষে নয় বিপক্ষে। বুড়ো আর জোয়ানে, বাপে আর ছেলেতে যুদ্ধ লেগে গেছে। সব দেখে শুনে রীতিমত কনফিউসা খেয়ে গেছি। সব্বাই এক্সট্রিমে খেলছে। পুরো এনএফএস সুপার লিগ। স্পিড ধরতে পারছি না।

তা এমন কনফিউসা ব্রেন নিয়ে পাড়ায় বেড়িয়ে পড়েছি। দেখি প্রগতিশীল আর সমাজবাদীদের সভা চলছে দু’দিকে। জাতীয় স্তরের এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে দু’পক্ষই চোখা চোখা বাক্যবাণ ছুঁড়ে দিচ্ছে বিপক্ষের উদ্দেশে। দু’মিনিট শুনলেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। দুটো সভার ঠিক মাঝখানে জগার চায়ের দোকান। দেখি ফটকে সেখানে বসে চা খাচ্ছে। আমিও গিয়ে বসলাম। ফটকের একটা খুব জটিল ভাল নাম আছে, সেটা এখন মনে পড়ছে না। চেহারায় বেশ একটা উৎফুল্ল ভাব। আমাকে দেখে বলল, ‘বুঝলে কাকা, মরাল পুলিশিং চলবে না। ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মানছি না, মানব না’।

এ তো রীতিমত স্লোগান দিচ্ছে! আমি চমৎকৃত হলাম। বললাম, ‘তুইও আছিস না কি?’

ফটকের আঁতে লাগে, ‘কী বলছ কাকা? এমন কথা বলছ যেন আমার এসবে থাকতে নেই। কলকাতার বুকে প্রেমিক প্রেমিকাকে ক্যালানো হবে তবুও আমি চুপ থাকব! আমিও তাই প্রতিবাদে সামিল হয়েছি’।

আমি থমকাই, ঢোক গিলে বলি, ‘তা তোর মরালটা কী?’

‘কাকা, অত বেশি বুঝি না, আমি যাকে ভালবাসি তাকে সক্কলের সামনে জাপটে ধরব, হামি খাব তাতে কার বাপের কী? তুমিই বল’। এক্কেবারে হক কথার এক কথা। এ ডায়লগটা হাগ-পন্থীদের। সেটাই মুখস্থ ঝাড়ছে।

বুঝলাম মরাল নয়, ফটকের মরালীর দিকে ঝোঁক। তা মরাল মরালী যে ভাবে পাবলিক প্লেসে ধামসাচ্ছে তাতে ফটকের আর দোষ কী? গোটাটা বুঝুক আর না বুঝুক ও হাগানোর তালে আছে। ফাউল করলেই রেফারি হুইসিল বাজাবে আর কার্ড দেখাবে সে খেলা খেলতে রাজি নয়।

এ প্রসঙ্গে অনেক দিন আগে শোনা একটা গল্প মনে পড়ল। এ গল্প কোথায় শুনেছি, কার কাছে শুনেছি তার ফিরিস্তি দিতে পারবুনি, তবে গল্পের নির্যাসটুকু দিতে পারি। গ্রামের ছেলে নবীন কলকাতায় চাকরি করে। বাড়ি কালনার কাছে একটা গ্রামে। গ্রামের বাড়িতে বিয়ে থা সেরে গম্ভীর মুখে ফিরে এল চাকরিতে। ফুলশয্যার পর বর-বউ দুজনার মধ্যেই একটা স্বাভাবিক নব-আনন্দ টাইপ জৌলুস দেখা যায়। অথচ নবীনকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এক পাহাড় দুঃখ আর দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে ফিরেছে। অফিসের দাদারা আর ডেঁপো ছেলেরা চেপে ধরল, কী ব্যাপার, বিয়ের পর এত গম্ভীর কেন? মেয়ের কোনও দোষ না কি নিজের? প্রথমে তো নবীন রা কাড়ে না। তারপর অনেক চাপাচাপির শেষে জানা গেল, ভূতের উপদ্রব। ব্যাপার কী? না, নবীন বউকে জাপটে ধরে চুমু খেতে গেলেই কে যেন ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় ধমকাচ্ছে, অ্যাই, কী হচ্ছে এসব।

অফিসের কলিগরা ব্যাপারটাকে কোনও ফাজিল বৌদি কিংবা জামাইবাবুর কাজ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নবীন একশ ভাগ নিশ্চিত এটা ভূতের কাজ।

দীপেনদা অফিসের যে কোনও নব্য বিবাহিতকে ক্রিয়াভিত্তিক জ্ঞান বিতরণ করে। এক্ষেত্রেও চুপ থাকল না, ‘চুমু খেতে গেলে ধমকাচ্ছে কিন্তু তার পরের কাজ গুলোতেও ধমকাচ্ছে কি?’

জানা গেল ভূতুড়ে ধমক খেয়ে থরহরি কম্পমান নব-দম্পতি আর সাহস করে ‘পরের কাজ’ পর্যন্ত এগোতে পারে নি। দীপেনদা নিদান দিল, ‘তুই আজই আবার দেশের বাড়ি ফিরে যা। এবার ভূত তোকে বারণ করলেও থামবি না। বউকে জড়িয়ে ধরে স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যা। দেখবি ভূত লজ্জায় পালিয়ে যাবে’।

শেষ পর্যন্ত নবীনের দাম্পত্য জীবনে কী হয়েছিল জানা নেই তবে এমন ভূতের দল এখন সারা দেশ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সর্বত্র জ্যাঠামো করছে। এটাই স্বাভাবিক, ভূত বর্তমানকে মানে কী করে? আবার নবীনদেরও অভিযোজন ঘটেছে। আজকের নবীনরা অত কাঁচা নয়। তালব্য’শর ল আর খণ্ড’তর মূর্ধণ্য জুড়ে যুক্তি সাজাচ্ছে। বিকিনি পরে যদি সি-বিচে ঘোরা যায় তবে গড়িয়াহাটের মোড়েও ঘুরে বেড়ানো যায়। পোষাক তো! শুধু প্রথম প্রথম হাতে একটা পোস্টার লাগবে, হোক বিকিনি।

ওদিকে যারা মরাল পুলিশিং করতে চাইছে তাদেরও বলিহারি। পুলিশের মরাল কোনওকালেই ছিল না কিন্তু মরালের পুলিশ ভীষণ কঠিন। এরা আবার হুইসিল বাজিয়েই থামছে না। ভ্যালেনটাইনস ডে তে প্রেমিক প্রেমিকা হাতে হাত ধরে ঘুরে বেড়ালে চোখ টাটাচ্ছে। প্রথমে ধমকাচ্ছে, তাতে কাজ না হলে আঁচড়াচ্ছে কামড়াচ্ছে, সুযোগ পেলে যথেচ্ছ পেটাচ্ছে। এ তো আর নবীনের গ্রামের সেই হাবাগোবা ভূত নয় যে লজ্জা পেয়ে রণে ভঙ্গ দেবে। এরা সব জাতির চরিত্র রক্ষার্থে নিয়োজিত হনুমানের দল। হনুমান বিয়ে করে নি, তাই জীবনে কোনও মহিলাও নেই, কোনও লাফড়া নেই। হালকা করে একটা হাফ বিয়ে করে যদি বউকে ত্যাগ করতে পারত তাহলে হনুমান শিওর রামরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হত। কিন্তু ওপথ মাড়ায় নি। চরিত্তির এক্কেবারে সাফ। পুরো সাফ এক্সেল। চরিত্তিরের এক্সেল ভাঙার কোনও চান্স নেই। গড়গড়িয়ে চলবে। হনুমান চালিশায় সব লেখা আছে। আমাদের জীবনের লক্ষ তাই ধাপে ধাপে হনুমানত্ব অর্জন করা।

আসলে চরিত্রটা ঠিকঠাক রাখাটা খুব জরুরি। ব্যক্তি চরিত্রের মধ্যে দিয়েই তো জাতির চরিত্র তৈরী হবে। ছেলে মেয়ে প্রেম করবে চুমু খাবে এসব বাওয়া আমাদের কালচার নয়। দেখুন রাধাকেষ্ট নিয়ে বারবার বলবেন না তো। ও অন্য রকমের প্রেম। ওতে শরীরটা প্রতিকী ব্যাপার। সম্ভোগ ফম্ভোগের ব্যাপার নেই। ওদের সেই ব্রাহ্মমুহূর্তে গায়ে জামাকাপড় ছিল কিনা সেটাও বিচার্য নয়। রাধার বর আয়ান ঘোষই সেসব নিয়ে মাথা ঘামায় নি তো আমরা বলার কে? সব ঘেঁটে দেবেন না।

আমরা সেক্স নিয়ে কখনই খুল্লমখুল্লা কথা বলি না। নেতাজির বিয়ে হয়েছিল বললেও রে রে করে তেড়ে যাব। বিবেকানন্দের সম্বন্ধে তো ওসব প্রসঙ্গ তুললেই ক্যালানি বাঁধা। একমাত্র রবিদাকে নিয়ে হালকা সুড়সুড়ি চলতে পারে। সেক্সের জন্য বাঙালি চরিত্র খারাপ করে নি। সেক্স আর সেনসেক্স এ দুটো বিষয়ে বাঙালি কখনই বিশেষ মাথা ঘামায় নি। তাই তো বাঙালির চরিত্রে কোনও কালি নেই।

চরিত্র অত্যন্ত ভাইটাল ব্যাপার। তাই বলে আবার ভাববেন না যে ঘুষ খেলে চরিত্র নষ্ট হয়, কিংবা ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিলে ওতে দাগ পড়ে। ওগুলো আলাদা কেস। তারপর ধরুন খাবারে ভেজাল কিংবা ভাগাড়ের মাংস খাইয়ে দেওয়া। ওগুলোও আলাদা কেস। ওতে চরিত্র টসকায় না। মেট্রোয় ছেলে মেয়ে ঘনিষ্ট হলেই কেলিয়ে দিন কিন্তু খবরদার ভাগাড়ের মাংস খাওয়ালে সে কেস নিজে টেক আপ করবেন না। তার জন্য সরকার আছে। সরকারের উন্নয়ন তো আজকাল রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে আছে। তাদের খবর দিন।

ভাগাড়ের মাংসের কথায় খেয়াল হল আজ সকালেই দীপুদার সঙ্গে দেখা হল। আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘বুঝলি, সব ভাগাড়ের মাংস খাওয়ার ফল’।

আমি বাজারের থলি হাতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ‘বল কী?’

দীপুদা মুচকি হেসে বলল, ‘সব্বার হরমোনের গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দিয়েছে। তাই তো কেউ নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। শরীরে শরীরে যখন হরমোন হরমোন খেলা চলবে তখন অত নিয়ম কানুন স্থানমাহাত্ম্য দেখলে চলবে? ঝাড়াই বাছাই করতে করতেই তো হরমোনের খেল খতম হয়ে যাবে। আবার হরমোনের চাপে মাথা গরম হয়ে গেলে সেটাও ঠাণ্ডা করা যাচ্ছে না। কেউ আকুলি-বিকুলি কোলাকুলি করছে তো কেউ দুমদাম ক্যালাকেলি শুরু করে দিচ্ছে। এক্সাইটেড হয়ে গেলে আর থামতে পারছে না, বুঝলি?’

‘সেকি! একদল রেগে যাচ্ছে আর একদল প্রেম করছে। এরকম দুটো বিপরীত মুখী কার্যকলাপে তো দুরকমের হরমোন লাগে। একই ভাগাড়ের মাংসে দুটোই পাচ্ছে?

‘ওরে পাগল, অ্যাড্রিনালিন আর টেস্টোস্টেরনের খেলায় রাগ আর সেক্স দুটোই জাগে। খুনেও লাগে প্রেমেও লাগে। সব ভাগাড়ের মাংস খাওয়ার ফল’।

এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে দীপুদা এমন গভীর ভাবে ভেবেছে জেনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। মনে মনে দীপুদার ভাবনার মৌলিকতাকে তারিফ করতে করতে বাজার চলে গেলাম। বাজার থেকে ফিরে খবর পেলাম দীপুদাকে মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে। ওখানে শুনেছি প্রচুর বেড এখনও খালি পড়ে আছে।

পুনশ্চঃ প্রেমটুকু বাদে গোটাটাই কাল্পনিক। স্বপ্নাদিষ্ট।

Advertisements

1 COMMENT

  1. a s a d h a r a n.ammo babhchilam keu prabal bege hagche keu ba haga bilkul bandha korte chaiche byaperta ki? lekhaker mato swapno dekte parer sadhya nei bole karanta dharte perchilam na.asadharan legeche bhagarke melano. pradip babur emon swapnodosh jeno ghana ghana ghate.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.