আবার উপত্যকায় একটা বিস্ফোরণ। আবার প্রায় পঞ্চাশজন জওয়ানের ছিন্নভিন্ন লাশ। আবার দোষারোপ আর পাল্টা দোষারোপ। চ্যনেলে, সংবাদপত্রে, সোশ্যাল মিডিয়ায় বসে গেছে তরজার আসর। চলছে চুল চেরা বিশ্লেষণ। কার দোষ? কার অবহেলা? কার গাফিলতি? ইন্টেলিজেন্স ফেল কেন? সেনা না পুলিশ, কার দায়িত্ব ছিল ?

আমি আপনি এইসব শুনব পড়ব আর ক্রমশ তলিয়ে যাব ওই ভাবনায়। কার দোষ? সত্যিই তো। নিশ্চয়ই কেউ কোথাও ফাঁকি দিয়েছে। তার শাস্তি চাই।ক্রমশ মস্তিষ্ক গ্রাস করবে আরও একটা ভাবনায়। নিশ্চয়ই শাসক দলের গাফিলতি। ওরাই তো ক্ষমতায়। সামনে ইলেকশন। সুকৌশলে কেউ কেউ ভাবিয়ে দেবেন, এই সময় বিরোধীরা জোট বাঁধছে। অতএব নজর ঘুরিয়ে দিতে করিয়ে দাও একটা ব্লাস্ট। দিয়ে দাও কোন উগ্রবাদী দলের নাম। এইসব ভাবনায় পৌঁছতে পেরে কেউ কেউ আমরা নিজেদের অসাধারণ কূটবুদ্ধি সম্পন্ন ইন্টেলেকচুয়াল ভাবতে বসব কেউ কেউ। ভাবব, কি সুন্দর ভাবে ধরে ফেলেছি এইসব চক্রান্ত ! কী প্রবল ভাবে বিকশিত হচ্ছে আমার রাজনৈতিক চেতনা। হু হু বাবা, আমাকে ঢপ দেওয়া অত সহজ ?

বদলা নেওয়ার দাবি প্রবল হতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেইচলছে দোষারোপ। পাল্টা দোষারোপ। আবার হয়ত নির্মম হবে প্রশাসন। ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে এলাকা। তুলে নিয়ে যাওয়া, হদিশ না পাওয়া পুরুষ আর ধর্ষিতা নারীর সঠিক সংখ্যাটুকুও হয়ত জানা যাবে না ঠিকমতো।

যদি আমার এই সামান্য লেখা এতদূর অবধি কেউ পড়েনও তাদের ভেতর একটা বৃহৎ সংখ্যার পাঠক নিশ্চিত খুঁজবেন এই লেখকের রাজনৈতিক আইডেন্টিটিটা ঠিক কী? এ কোন দলের চামচা? এ কি শাসক দলের সমর্থক? হিন্দুত্ববাদী? ইসলাম বিরোধী? নাকি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীর দালাল? না কি, ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোত্রের একজন ফাঁপা আঁতেল?কেউ কেউ ভাববেন এ ব্যাটা নিশ্চয়ই উগ্রপন্থীদের সমর্থক। বিচ্চিন্নতাবাদী। আজাদ কাশ্মীরের সমর্থক। সেনা বিরোধী। কই, এর আগে এত সেনার এত রক্ত ঝরল এই লোক তো কিছু তখন কিছু লেখেনি। এখন উগ্রপন্থীদের বাঁচানর জন্য কলম খুলেছে। নয়তো ব্যাটা চরম ন্যাশনলিস্ট। আর্মির গায়ে হাত পড়তেই চিড়বিড় করে উঠেছে।

Banglalive-8

দলীয় রাজনীতির গন্ধ খোঁজার এই যে জঘন্য অভ্যাস, আমাদের সুকৌশলে মজ্জাগত করে দিয়েছে রাজনীতিক দলগুলি, মিডিয়া এবং এলাকার নেতারা। ওরা কিন্তু অনবরত লক্ষ্য রাখছে আপনি কোন কোন বিষয়ে চুপ করে আছেন। তাহলে আপনার পরিচয় উন্মুক্ত করবার জন্য ওই সব বিষয় তুলে তুলে এখন তুলোধোনা করা যাবে আপনাকে। এই ফাঁদে পা না দেওয়ার এক পাল্টা অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। সেটাই হোক আপনার, আমার রাজনীতি।

Banglalive-9

দলীয় কূটতর্ক আপনাকে ভুলিয়ে দেবে যে, লাহোর বাজারে যখন বিস্ফোরণ হয়, বা কাবুলে গাড়িবোমা ঢুকে পড়ে আদালতে তখন যে মানুষগুলোর দেহ ছিন্নভিন্ন হয় তারা কেউ হয়ত মেয়ের জন্য বাজারে এসেছিল একটা পুতুল কিনতে। সব্জি বেচতে এসেছিল একজন চাষি । ট্রেড সেন্টারে যে লোকটা ঝলসে মরেছে নামতে না পেরে, তার মেয়েরও জন্মদিন ছিল সেইদিনই। উপহার কিনে তারও বাড়ি ফেরবার কথা ছিল দিনের শেষে। রেস্তোরাঁর নরম আলোয় যে মেয়েটি তুলে নিয়েছিল প্রেমিকের হাত নিজের হাতে, ঠিক বিস্ফোরণের আগের মুহূর্তেই সে কিন্তু মনে মনে ভাবছিল তার মধুর আগামী জীবনের কথা।

দলগুলো আরও ভাবাবে যে, একটা বিশেষ ধর্মের মানুষ মরলে তাই নিয়ে ভাবার বা লেখার দরকার নেই। কারণ ওই মৃতরা একটা আলাদা ধরণের ‘টেররিষ্ট’ ধর্মের মানুষ। বা, মারো ওদের, কারণ ওর বাবা বা কাকা একসময় আমাদের বানানো মসজিদ ভেঙেছিল। মারো ওদের কারণ হাজার বছর আগে ওদেরই কেউ এসে আমাদের মন্দির লুঠেছিল।

তারপর, রাষ্ট্রীয় শক্তি যখন বদলা নিতে ঢুকবে এলাকায়, যখন পুরুষটিকে খুঁজে না পেয়ে রমণীটিকে ধর্ষণ করবে তার পলাতক স্বামী পুত্রের সন্ধান জানতে চেয়ে, সেই ধর্ষণে মারা যাবে তার জরায়ুজ ভ্রূণ, অথবা সে গর্ভবতী হবে একটি শুক্রাণুর নিষ্ঠুরতম মালিকের দ্বারা, তখন দলীয় রাজনীতিবিদরা দলে দলে, সারা দুনিয়া জুড়ে ক্যামেরার সামনে বসে বসে আপনাকে সমানে বোঝাবে যে এই আক্রমণ কত জরুরি এবং/ অথবা এই বদলাও ছিল কত জরুরি।

কোন কোন রাজনৈতিক দলীয় কর্মী বা নেতা আপনাকে আর্কাইভ খুলে খুলে দেখাবে কবে কোন মহারাজা, জমিদার বা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপ্রধান কোন নিভৃত মহলে, কোন নিবিড় অরণ্যের পান্থশালায় বা কোন শৈলশহরে ঠাণ্ডা ঘরে বসে বসে, কোথায় কোথায় সই করে বলে গিয়েছিল যে এই ভূখণ্ড আপনার। এই রাজ্য আপনার। এই দেশ আপনার। এই আপনার সীমান্ত। এই আপনার কাঁটাতারের বেড়া। যার ওপারের একই ধানজমির, একই শহরের, একই ভাষার মানুষ আপনার শত্রু। আপনার জন্য নির্দিষ্ট রাজ্যের প্রজাদের যে কোন রকম ‘অবাধ্যতা’ দমন করতে আমরা, শাসকরা, যা খুশি করতে পারি

আপনাকে আরও বোঝাবে, এইসব দুর্বিপাকের জন্য আসল দায়ী হাজার হাজার মাইল দুরের কোন কোন মহাশক্তিধর রাষ্ট্র। তাদের দুনিয়াব্যাপী শোষণ প্রক্রিয়ার জন্যই এত রক্তপাত। ওরা ধ্বংস হলে তবেই পৃথিবী পরিণত হবে এক স্বর্গরাজ্যে। অতএব আসুন ওই সব মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পতনের জন্য রাস্তা অবরোধ করি চলুন। বাস ট্রাম পোড়াই। রেল রুখি। কিন্তু এই যে সদ্য রক্তপাত, এই নিয়ে স্পিকটি নট থাকুন মশাই। কী দরকার সব বিষয়ে কথা বলবার? ইস্যু বোঝেন? ইস্যু?

কিন্তু এখন আমার প্রশ্ন, তাহলে, এখন , এই মুহূর্তে আমার কী করনীয়? উত্তর আসবে, ভোট দিন। সামনে নির্বাচন। সঠিক শাসক নির্বাচিত করুন। তাহলেই আপনার দায়িত্ব শেষ।

আর আপনাদের দায়িত্ব কী? মানে, আপনারা, যারা গনতন্ত্রে বিশ্বাসী বলে দল বানিয়েছেন? যারা দাবি করেন আপনারা পরমতকে সম্মান করেন? সংখ্যালঘুকে রক্ষা করবার শপথ নিয়েছেন। যারা বিশ্বাস করেন আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান নিহিত? যারা আজও মাথার পেছনে গান্ধীর ছবি ঝুলিয়ে পোজ দেন? আপনাদের কি কিছুই করবার নেই এই মুহূর্তে?

নাকি সব মৃত্যুই আপনাদের কাছে সংখ্যা মাত্র, ভোটের অঙ্কমাত্র, দাবার বোড়ে মাত্র?

আপনারা কি পারেন না সবাই মিলে একবার রাস্তায় নামতে? পারেন না এই ধরণের সমস্ত আতঙ্কবাদের বিরোধিতার বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল করতে, মানববন্ধন অন্তত করতে পারেন তো একটিবার, এক মুহূর্তের জন্য? দলমত নির্বিশেষে ?

আমরাও কি পারি না ‘গণতান্ত্রিক’ বলে দাবি করা দলগুলোকে বলতে, চলুন, বিশ্লেষণ বন্ধ রেখে আগে রাস্তায় নামি? অন্তত সোশ্যাল মিডিয়াতেও কি লিখতে পারি না আমরা এইসব কথা?

মানবাধিকার কর্মীরাও এগিয়ে আসুন নাআপনারা তো সব দলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, বলেনআপনারাও কি ডাক দিতে পারেন না মহামিছিলের?

ভোট তো আসবে। আজ না হয় কাল না হয় পরশু। ততদিন আমরা কী করব? বসে থাকব হাত পা গুটিয়ে!!! নাকি পথে নামব?

ইতিহাসের পাতায় পাতায় কত রাজা এল কত রাজা গেল। কত অস্ত্র, কত বোমা। কেউই তো চিরস্থায়ী নয়। স্থায়ী কেবল মানুষ। মানুষের মিছিলের চেয়ে শক্তিশালী কোন রাষ্ট্রীয় শক্তি তো আজও নেই। আপনাদের ডাকেই তো মানুষের ঢল বারবার নেমেছে রাস্তায়।

চলুন না, সব দল মিলে, সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একবার, অন্তত একবার, পথে নামি।

আরও পড়ুন:  শুধুমাত্র পতাকার ছবি দিয়ে দেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন বিগ-বি

2 COMMENTS

  1. ভারী কথা, ভারী বিষয় নিয়ে নির্মাল্যদার নির্মেদ গদ্য। পথে নামবে সবাই, ভোটের মুলো সামনে ঝুলছে যে! কিন্তু তারপর? তবুও, পথে এবার নামো সাথী…

  2. “কত হাজার মরলে তবে – মানবে তুমি শেষে, বড্ড বেশী মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে . .”