কিন্তু সান্তাদাদু‚ আমার যে মোজা নেই…একটা মোজা ছিল‚ সেটা বড্ড ছিঁড়ে গেছে বলে মা ফেলে দিয়েছে…

842

ওগো সান্তাদাদু‚

ইশকুলে দিদিমণির কাছে শুনলাম‚ আজ রাত্তিরে তুমি নাকি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে | তাই তাড়াতাড়ি চিঠি লিখতে বসেছি | একটু পরেই ঘাড়ে ব্যাগ ঝুলিয়ে পিওনদাদা চলে আসবে | তার হাতে চিঠিটা দিয়ে দিতে হবে তো ! দিদিমণি বলেছিল‚ চিঠি লেখার কোনও দরকার নেই | তুমি নাকি এমনিই আসবে |

কিন্তু তা কখনও হয় ? তারপর তুমি যদি আমাদের বাড়িটাই চিনতে না পার | যদি ভুলু ওরাওঁ-এর বাড়ি কোনটা তোমাকে কেউ দেখিয়ে না দেয় তখন কী হবে ? দিদিমণিকে অনেক করে বুঝিয়ে বলতে অবশ্য বুঝল | ছোট একটা কাগজের টুকরোয় তোমার ঠিকানাটাও লিখে দিয়েছি | আমি তো এখনও ইংরেজি ভাল পড়তে পারি না | এ-বি-সি-ডি পারি | কিন্তু অত শক্ত শব্দ বলতে পারি না | কী যেন কথাটা‚ শুনতে ভারি সুন্দর | মনে পড়েছে‚ হেভেন | দিদিমণি বলেছে সেখানেই তুমি থাক | সেখানকার ঠিকানাটাই লিখে দিয়েছে আমায় | বলেছে চিঠি লেখা শেষ হলে‚ খামের ওপর গোটা গোটা করে লিখে দিতে | তাহলেই পোস্টাপিসের লোকেরা চট করে তোমায় পৌঁছে দেবে |

আচ্ছা‚ এবার তোমাকে আমাদের বাড়িতে কেমন করে আসবে ভাল করে বলে দিই | ওই যে কালো কুচকুচে বড় রাস্তা‚ যেখান দিয়ে বাস চলে‚ সেটা কিন্তু আমাদে বাড়ি থেকে অনেক দূর | পায়ে হেঁটে আমি যেতে পারি না | বাবার সাইকেলের পিছনে বসে যেতে হয় | দিদিমণি বলেছে তোমার নাকি একটা হরিণটানা গাড়ি আছে‚ সেটা হাওয়ার মতো চলে | তাহলে তোমার বেশি সময় লাগবে না | পিচ রাস্তা থেকে গড়গড়িয়ে একটু নামলেই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে মোরামের পথ | দুধারে কত গাছ | এখন তো শীতের দিন‚ আমরা বলি জাড়ের কাল‚ এখন গাছে পাতা নেই বেশি | কিন্তু যেই শীত শেষ হবে‚ গরমের দিন আসবে অমনি গাছ সব পাতায় ভরে যাবে | কত ফুল ফুটবে তখন | লাল-হলুদ অনেক রঙের | আমার ইশকুলের আঁকার খাতায় আমি অমন একটা ছবি এঁকেছিলাম্‚ জানো ? দিদিমণি খুব ভাল বলেছিল‚ জানো ?

আমাদের ক্লাসঘরের দেওয়ালে সেটা টাঙানো আছে | তুমিও একবার গরমের সময় আমাদের গ্রামে এলে দেখতে পাবে কেমন সুন্দর একটা জঙ্গলের মধ্যে থাকি আমরা |  এবার বলি শোনো‚ সেই মোরামের রাস্তা দিয়ে এলে আমাদের গ্রাম কুসুম পুর | চারধারেই জঙ্গল | তবে তোমার তো হরিণগাড়ি‚ তাই খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না | গ্রামের ভিতর দিয়ে রাস্তা | সেই রাস্তা দিয়ে গেলে দেখবে মস্ত একখানা পাতকুয়ো | তারই ডানহাতিতে আমাদের ঘর | লোকে বলে বিশু ওরাওঁ-এর বাড়ি | আমার বাবা গো | জন খাটে মাঠে | মা কেন্দুপাতা তোলে | আমাদের বাড়ি থেকে এট্টুসখানি গেলেই ইশকুল | ক্লাসঘরের পাশে যে ছোট্ট দুটো কুঁড়ে | সেখানেই দিদিমণিরা থাকে | ওর পাশেই তো আমরা গোশালা সাজিয়েছি | সেখানে মা মেরির কোলে ছোট্ট যিশু | কী সুন্দর দেখতে গো | খুব ভাল লেগেছে আমার |

দিদিমণি বলেছে ওই যিশুর জন্মদিনের জন্যই নাকি তুমি আসবে আমাদের উপহার দিতে | বলেছিল‚ ঘুমোনোর সময় মাথার কাছে মোজা রাখতে‚ তার মধ্যে তুমি নাকি অনেক কিছু ভরে দেবে | কিন্তু সান্তাদাদু‚ আমার যে মোজা নেই | কী হবে তাহলে ? একটা মোজা ছিল‚ কিন্তু সেটা বড্ড ছিঁড়ে গেছে বলে মা ফেলে দিয়েছে | আচ্ছা‚ আমি যদি একটা শালপাতার দোনা রেখে দিই‚ তাহলে তুমি তাতে আমার জন্য উপহার রাখতে পারবে না ? মা বলেছে‚ একটা সুন্দর দোনা বানিয়ে দেবে |

তুমি আমার জন্য যা আনবে‚ ওটাতেই রেখো কেমন ? আমি ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্য ঘরের দাওয়ায় বসে থাকব | কিন্তু বড্ড ঠান্ডা তো | সন্ধে লাগতেই ঘুম পেয়ে যায় | বাঁশের মাচায় মা মোটা করে খড় বিছিয়ে দিয়েছে | খড়ে তো খুব গরম | তার ওপরেই কাঁথা গায়ে দিয়ে শুই আমি | আজকাল তো মাঝে মাঝে রাত্তিরে ভাত রাঁধে মা | ভাত খেলেই আমি আর চোখ খুলে রাখতে পারি না | তবে দোনাটা আমি ঠিক মাথার কাছেই রাখব | তুমি ঘরে ঢুকেই দেখতে পাবে | মাকে বলেছি‚ দরজার আগল আলগা রাখতে | তোমার ঢুকতে অসুবিধা হবে না |

তুমি আমার জন্য কী উপহার আনবে দাদু ? শুনলাম নাকি আমি মনে মনে যা চাইব‚ তাই তুমি শুনতে পাবে | কিন্তু যদি শুনতে না পাও ? যদি অন্য কিছু এনে ফেল ? তাই চুপিচুপি বলছি শোনো‚ সারাদিন জন খেটে এসে আমার বাবার রোজ হাঁপের টান ওঠে | ডাক্তার নাকি বলেছে এরকম হলে বাবা আর বেশিদিন জন খাটতে পারবে না | বাবা যদি জন খাটতে না পারে‚ তাহলে তো আমরা খেতেই পাব না | হাসপাতাল থেকে একরকম ফুশফুশ করা নাকে টানা নল কিনতে বলেছে | কিন্তু তার তো দাম অনেক | তাই আমরা কিনতে পারিনি | তুমি বাবার জন্য একটা ওইরকম ফুশফুশ করা নল এনো দাদু | আর মায়ের জন্য একটা গরম জামা | সকালে উঠে কুয়োতলায় যেতে মায়ের বড় শীত করে তো | আমার জন্য চারটে মার্বেলগুলি আনবে কিন্তু | বড় বড়‚ লাল-নীল-হলুদ আর সবুজ রঙের | আর বোনের জন্য একটা লজেনচুস | দোনাতে যখন উপহারগুলো রাখবে তখন কিন্তু খেয়াল রেখো |

তোমার জন্যও উপহার রেখেছি আমি | কলাপাতায় মুড়ে রেখেছি খরগোসের মাংস | দুপুরে মা খেতে দিয়েছিল | আমি লুকিয়ে তোমার জন্য রেখে দিয়েছি | আর আছে চারটে ময়ূরের পালক | নিয়ে যেতে ভুলে যেও না যেন |

পিওনদাদার আসার সময় হয়ে গেল | এবার তাহলে শেষ করি | যদি ঘুমিয়ে না পড়ি‚ তাহলে তোমার হরিণগুলোকে অনেক আদর করব |

ইতি‚
ভুলু ওরাওঁ
কুসুমপুর

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.