অন্ধ স্কুলে ঘণ্টা বাজে

স্কুলে স্কুলে যা সব নারকীয় দুর্ঘটনার কথা শুনছি, মাথার ভিতরে সব তালগোল পাকাচ্ছে। খুব রাগ হচ্ছে ভিতরে কোথায়। এমন যদি হত আমার অত্যন্ত কাছের কোনও শিশুর ওপর? এমন যদি ঘটাত আমার অত্যন্ত কাছের কোনও ব্যক্তি? নির্যাতিত এবং অভিযুক্ত, সমস্যায় আছে উভয়পক্ষই। এখনই সময়, যতটা সম্ভব নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে বিষয়টা নিয়ে একটু অন্যভাবে ভেবে দেখার।

অনভিপ্রেত ঘটনার দায় কারও ওপর, কিছুর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ব্যক্তি তথা সমাজবদ্ধ মানুষের আদিম স্বভাব। সেই স্বভাববশে সে চায় প্রতিবিধান, শাস্তি। সভ্যতার আদিমকাল থেকেই। শাস্তির বিধান মনোমত হলে উল্লাস, না হলে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ এনে খেদ প্রকাশ।

এইসবের কিছু সংস্কার প্রয়োজন। উন্নতির চোখ ধাঁধানো বহ্বাস্ফোট ছেড়ে আধুনিকতা তবেই তো আসবে, অন্তরে অন্তরে।   

কিছু দিন আগে গুরুগ্রামের একটি স্কুলে, অবিশ্যি সেখানে যৌন কোনো অনুষঙ্গ ছিল না বলেই জানা গেল পরে, তবে যা হয়েছে তা অত্যন্ত মর্মান্তিক। সদ্য কলকাতার একটিতে, জানা যাচ্ছে এই স্কুলে বছর তিনেক আগেও এমনই কিছু হয়েছিল, শিশুকন্যার যৌন নির্যাতন। ধামাচাপা পড়ে গেছিল কীভাবে যেন! আবার কলকাতার আরেক স্কুলেও হয়েছিল, মাস তিনেক আগে, এমনই কিছু ঘৃণ্য। দিল্লির কাছেও কোনো এক স্কুলে দশ বছরের একটি ছাত্র বছর চারের এক ছাত্রীর সঙ্গে… থাক, সব লেখার দরকার কী? খবরে তো সবই ফলাও।   

জানাজানি হলে আমরা কী দেখি সাধারণত? প্রতিবাদ। এবং প্রতিক্রিয়া। প্রতিক্রিয়ার রকমফেরে চমকাতে হয়। কলকাতার স্কুলটির প্রেক্ষিতে আসুন দেখি কয়েকটা׃

১) কোনো কোনো মা ঈশ্বরের কাছে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন এই জানিয়ে যে, তাঁর মেয়ে না হয়ে ছেলে হয়েছে। কী অদ্ভুত! পুরুষের পুত্রকামনার্থে নারীগমনের ইতিহাসে এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণ এসে উপস্থিত!

উল্লেখ থাকুক এই লেখায়, শিশুপুত্র থেকে বালকরাও এমন জঘন্য নির্যাতনের শিকার হয়।

২) প্রতিক্রিয়া আসছে কবিতা-চেহারায়। ছেয়ে যাচ্ছে ভার্চুয়াল দুনিয়া। কে বা কারা লিখছেন সেসব আমার জানা নেই। কিন্তু এহেন বিষয় নিয়েও এমন দোলে-দোদুল কাঁচামিঠে ছড়া না লিখলেই কি হচ্ছিল না! যারা লিখছেন, আপনারা তো, যাকে বলে, রসের খনি!

৩) টিভি চ্যানেলের সান্ধ্য বৈঠকে চলছে বক্তব্য, তার পালটা, যুক্তি তক্কো। বাবার কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে যে তাঁর স্ত্রীর, মানে বাচ্চাটির মার এখন মনের অবস্থা কেমন? চড়চড়িয়ে উঠছে টিআরপি।

৪) খুব ছোটো মাপের জামাকাপড় পরিয়ে বাচ্চাদের টিভি চ্যানেলের রিয়েলিটি শো-তে অংশগ্রহণ করানো থেকে বিরত থাকাই ভালো বলে অনেকের মত উঠে আসছে। সেখানে চটুল নাচের তালে মোহময়ী দেহবিভঙ্গ, নিতান্ত কাঁচা বয়সে কিছুমাত্র না বুঝেই যৌনতার প্রদর্শন ইত্যাদি নাকি বাচ্চাকে ভুল দিশা দেখায়।

এর পালটা যুক্তিও ভরা বাজারে আছড়ে পড়ছে, ছোট্ট থেকেই তো বাচ্চাকে প্রতিযোগী মনোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। রিয়েলিটি শো-গুলো হল গিয়ে প্রতিযোগিতা শেখানোর মক্কা-মদিনা। না হলে যা দিনকাল আসছে, বড়ো হয়ে বাচ্চা সত্যিই প্রতিযোগিতা বিমুখ যোগী-সন্ন্যাসী হয়ে গেলে!

আর তাছাড়া বাচ্চা এটা-ওটা পারছে, তা চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ রেখে দিতে কোন মা-বাবা আর চান! প্রদর্শনকামিতা বলে একটা ব্যাপারও তো আছে।    

৫) যে দু-জনকে সম্ভাব্য অপরাধী বলে চিহ্নিত করা গেছে, তাঁদের উদ্দেশ্যে বিচারের আগেই চলে আসছে যাবৎ শাস্তিদানের মুখরোচক (পড়ুন লোমহর্ষক) তালিকা। কেউ সেসবের প্রতিবাদ করতে গেলে উদ্ধার হয়ে যাচ্ছে তারও ফরটিন জেনারেশন। প্রতিবাদে ফুটছে আমজনতা।

প্রতিবাদ হওয়াই উচিত। স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে বিচার ও শাস্তিদানও হওয়া উচিত। আর নিশ্চিত করা উচিত এমন যেন আর না ঘটে।  

এটুকুই মাত্র হওয়া উচিত? আর কিছু নয়?  

এইখানে ক্রমে আসে নৈঃশব্দ্য। একদিকে নির্যাতনের শিকার শিশুর পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসে না কোনো সমাজকল্যাণকারী সংস্থা বা কোনো ব্যক্তি বা কোনো ভার্চুয়াল অথবা পথে নামা প্রতিবাদী। সেখানে সবই একক লড়াই। সেই পরিবারের, সেই শিশুর। শিশুটির চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ, আচরণে গুটিয়ে থাকা ইত্যাদি যত দিন দেখা যায়, খবরেও থাকে। তার পরেও সঙ্গোপনে শিশুটির সঙ্গে থেকে যায় মানসিক এই আঘাত, বড়ো হওয়ার পথে পথে। তার খোঁজ আর কেউ রাখে না।

অপরদিকে, অভিযুক্তকে হাতের নাগালে পেলে পেড়ে ফেলতে উদ্যত ঘৃণাবর্ষণকারী, থুতু-ছেটানো শতসহস্র জনতা। তারই বা মনের খবর কে রাখে?

পিডোফিলিয়া শব্দটি খানিক পরিচিত হয় এমন খবর প্রকাশ্যে এলে। এ এক মানসিক ভারসাম্যহীনতা। অর্থাৎ এমন ক্ষেত্রে অপরাধটি যে ঘটাচ্ছে, সে জেনেবুঝে শিশুর ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে এমনটা ঠিক নয়। বোধের সেই পক্বতাই নেই। তার মানে তাকে দেখতে আলাদা, বা তার মেধা বা স্মার্টনেস থাকবে না, তা কিন্তু নয়। গড়পড়তা পক্বতা, মানে ম্যাচিওরিটি থাকলেই বাচ্চাদের দেখে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরা ইন্তু-মিন্তু, উলি-কুলি, ইলটি-পিলটি বলে কোলে-ক্যাঁকালে নিয়ে হাম্পিটাম্পি খেয়ে অস্থির হয়ে ওঠে।

সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে যা বাৎসল্যরস, অনেকের কাছেই তা নেহাতই বালখিল্য আচরণ, এটাও নিশ্চয়ই দেখেছেন। বাচ্চাদের সংস্পর্শে এসেও তারা নিজেদের গুরুগম্ভীর অবস্থান থেকে বেরোতে পারে না। হামলে জাপটে আদর করা তো অনেক দূর। তাদের মিচকে শয়তান বা দম্ভচূড়ামণি ভাবেন না কি? ঠিক তা নয়, সবই মানসিক গঠনের কারিকুরি। তেমনই পিডোফিলিকরাও।

মনোবিদ কর্তৃক কয়েক ধাপে কাউন্সেলিং এবং প্রাচীন টোটকা ধোপা-নাপিত বন্ধ (ভাবছেন রগড় করছি? তাহলে পরিভাষায় বলি, সোশ্যাল আইসোলেশন) করে কাজ হয়। অন্ধকার চোরাগলি থেকে আলোর সরণিতে ফেরে অনেকেই। না ফিরলে, আইনানুগ প্রথাগত শাস্তি প্রদানের বিকল্প তো থাকছেই।

স্বাধীন সাবালক একটি দেশে এমন ঘটনা, সোজা কথায়, নিন্দনীয়। আরও লজ্জার, এর প্রতিবাদে শুধুই কঠোর কঠিন শাস্তির খড়্গ-কোপ প্রত্যাশা করে যাওয়া।

যদি ধরেই নিই, গুরুগ্রামের এগারো শ্রেণির ছাত্রটিই ঘটিয়েছে ওই হত্যাকাণ্ড, ভাবুন কোন মানসিক পরিস্থিতি একটি আঠেরোর নীচের কিশোরকে আঠেরোর অনেক ওপরে তুলে এমন নির্মম ঘটনা ঘটিয়ে নির্লিপ্ত থাকতে দেয়! শুধুই শাস্তি খুঁজবেন? শুশ্রূষা খুঁজবেন না?

এই লেখাটির চরিত্রগুলি বিচারাধীন। আমার এই লেখা কখনোই কাউকে দোষী বা নির্দোষ সাব্যস্ত করছে না। তবে বক্তব্য পেশ করতে হলে, কিছু একটা অবলম্বন লাগে।

যে দুর্ঘটনাগুলি নিয়ে আলোচনা হল, সবই স্কুলের। স্কুল সেই জায়গা যেখান থেকে সকলে শিক্ষায় চেতনায় আলোকিত হয়। জ্ঞানের চোখ যদি নাই খোলে, অন্ধ স্কুলে শুধুই ঘণ্টাই বেজে যাবে। চেতনা জাগ্রত হবে না।    

এমনটা আশা করা কি খুব অনুচিত হবে — এমন ঘটনা ঘটলেই তা প্রকাশ্যে আসুক, আসামাত্রই আইনি পথে এগোনো হোক? ভাবুন, দোষ প্রমাণিত হলে কী হবে? কারাবাস। তার আধুনিক নাম কী? সংশোধনাগার। অর্থাৎ উন্নত কল্যাণকামী রাষ্ট্র আগে উদ্যোগ নিয়ে থাকে সংশোধন-পথেই। এবার আরেকটু বাড়তি দাবির কথা বলি। আইনি পথের পাশাপাশি কেন্দ্রস্তরের হোক, রাজ্যস্তরের হোক, সরকারি-অসরকারি মিলমিশে মনোবিদদের দক্ষ প্রশিক্ষিত টিম দেশের প্রতিটি কোনায় থাকুক, থানা-পুলিশের মতোই, তারাও এগিয়ে এসে অপরাধের উৎসে গিয়ে সেসবের সংশোধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিক।       

কেমন হয়?  

(ঋণ׃ কবি শ্রীমতী দেবারতি মিত্রর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কবিতার নাম এই লেখার শীর্ষক।)

Advertisements

2 COMMENTS

  1. অসাধারোন লাগল এই লেখা…অপরাধের কারণ কেউ খোঁযে না…প্রতিকারের পথ ও ভাবে না…শুধুই তৎক্ষণাৎ শাস্তি কি হবে সেটাই ভাবে । ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে সেটাও তো ভাবতে হবে।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.