কোমল অঙ্গে বের হল কর্কশ লোম‚ দেখা দিল লেজ‚ শাপগ্রস্ত অপ্সরা পরিণত হলেন কুরূপা বাঁদরীতে

2036

বেশ অনেকদিন হয়ে গেল হিন্দু পুরাণের অভিশাপ নিয়ে লিখছি | নতুন বছরে আর এই বিষয় নয় | অন্য কিছু নিয়ে লিখব বলে মনস্থ করেছি | তার আগে চৈত্র মাসের অন্তিম লগ্নে অন্তিম অভিশাপ কথন | একঘেয়েমি দূরীভূত হলে আবার পুনরায় প্রত্যাবর্তন করা যাবে এই বিষয়বস্তুতে | ইত্যবসরে হনুমানের জন্মদাত্রী অঞ্জনার অভিশাপগ্রস্ত হওয়ার আখ্যান | তিনি ছিলেন স্বর্গের অপ্সরা | পদস্খলনে বাঁদর হয়ে জন্ম দিলেন হনুমান সন্তানের |

কোন উৎস থেকে এই অভিশাপ এল তা নিয়ে একাধিক মত আছে | কোনও সূত্র অনুযায়ী তিনি ছিলেন মহা ঋষি গৌতমের কন্যা | মাতা অহল্যার অভিশাপে বানর রূপ লাভ করেছিলেন | আবার কোথাও উল্লেখিত হয়েছে ইন্দ্রের সভায় নৃত্যরত অপ্সরা পুঞ্জিকস্তলাকে শাপগ্রস্ত করেছিলেন দেবরাজ নিজেই | তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী যা উল্লেখিত‚ সেটা নিয়েই আমি বলব |

একদিন স্বর্গের অপ্সরা পুঞ্জিকস্তলা মর্ত্যে আগমন করে ইতস্তত ভ্রমণ করছিলেন | সে সময় তাঁর চোখে পড়ে বৃক্ষতলে ধ্যানরত এক ঋষি | তিনি তপস্যামগ্ন | কিন্তু তাঁর রূপ অতি বিকট | তিনি বাঁদররূপী | অপ্সরা পুঞ্জিকস্তলার কাছে তা অত্যন্ত বিসদৃশ ও হাস্যকর বোধ হল | তিনি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন | 

সেই হাসিতে ঋষির তপস্যাভঙ্গ হল না | কিন্তু এখানেই নিবৃত্ত হলেন না অপ্সরা | নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলেন | বাঁদর ভেবে পাথর এবং ফল ছুড়তে লাগলেন ঋষির উদ্দেশে | একটি পাথর এসে লাগে ঋষির কপালে | আহত ধ্যানভঙ্গ ঋষি রোষানলে দৃষ্টিপাত করলেন পুঞ্জিকস্তলার দিকে | অভিশাপ দিলেন‚ অপ্সরা নিজেও পরিণত হবেন কুদর্শন বাঁদরীতে | 

এতক্ষণে ভ্রমভঙ্গ হল অপ্সরা পুঞ্জিকস্তলার | তিনি ভূলুণ্ঠিত হলেন ঋষির পদযুগলে | বারংবার ক্ষমা প্রার্থনা করলেন অনুতপ্ত অপ্সরা | তাঁকে দেখে ঋষি উপলব্ধি করলেন অপরাধে প্রকৃতই অনুতপ্ত অপ্সরা | তিনি ঈষৎ নম্র হয়ে বললেন‚ অভিশাপ তো ফেরাতে পারবেন না | তবে প্রভাব কিছুটা হ্রাস করতে পারবেন | অপ্সরা পুঞ্জিকস্তলাকে মহাদেবের পুজো করতে হবে | যেদিন তিনি মহাদেবের অবতারের জন্ম দেবেন সেদিন অভিশাপমুক্ত হয়ে অপ্সরারূপ ফিরে পাবেন |

এই বলে অদৃশ্য হয়ে গেলেন ঋষি | ততক্ষণে অপ্সরার কোমল অঙ্গ আবৃত বড় বড় কর্কশ লোমে | বেরিয়ে এসেছে লেজ | তিনি তখন কুরূপা বাঁদরী | দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে লাগলেন তিনি | কোথায় যাবেন‚ কী করবেন কিছু জানেন না | উদভ্রান্ত হয়ে প্রবেশ করলেন ঘন অরণ্যে | সেই অরণ্য অতিক্রম করে কখন উপস্থিত হলেন এক ঋষির আশ্রমে‚ নিজেও টের পাননি |

সেই তপোবনে গিয়ে এলিয়ে পড়লেন শ্রান্ত অবসন্ন বাঁদররূপী অপ্সরা | তাঁকে কিন্তু সেখানে কেউ পরিহাস করল না | পরম মমতা আর স্নেহে তাঁকে আপন করে নিলেন আশ্রমিকরা | নতুন নামকরণ হল অঞ্জনা | তপোবনের আবাসিক হয়ে দিবারাত্রি শিবপার্বতীর ধ্যান করতে লাগলেন তিনি |  

ইতিমধ্যেই শাম্বসদন নামে এক ভীষণদর্শন রাক্ষস আক্রমণ করল ওই তপোবন | অঞ্জনা সঙ্কল্প করলেন তিনি লড়াই কবরেন রাক্ষসের বিরুদ্ধে | তপোবনের কল্যাণ চেয়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন হর পার্বতীর কাছে | একদিন শুনলেন দৈববাণী | নিজের রক্তেই বিনাশলাভ করবে শাম্বসদন | 

ইতিমধ্যে তপোবনে আগত হলেন রাজা কেশরী | তিনি বানররাজ ছিলেন | ওই তপোবন ছিল তাঁর শাসনাধীন অঞ্চলের মধ্যেই | তপোবনকে রাক্ষসদের অত্যাচার থেকে রক্ষার্থে এসেছিলেন তিনি | তাঁর সঙ্গে শাম্বসদন নিধনে উদ্যত হলেন অঞ্জনাও | 

কিন্তু নৃপতির কেশরীর কোনও শরেই সেভাবে আহত হল না রাক্ষস | তার হাত পা থেকে রক্তপাত হল | কিন্তু প্রাণ বিনাশ হল না | এক্ষণে স্মরণে এল অঞ্জনার | ভূমিতে পড়েছিল রাক্ষসের রক্ত | তাতে শর সিক্ত করে নিক্ষেপ করলেন তিনি | এ বার লুটিয়ে পড়ল রাক্ষস | উপলব্ধি করলেন কেশরী | তিনি ওই রক্তে সিক্ত করে একের পর এক শরনিক্ষেপ করে বধ করলেন রক্ষসকে | 

রক্ষা পেল তপোবন | ইতিমধ্যেই একে অপরের প্রেমে মগ্ন হয়ে ছিলেন কেশরী ও অঞ্জনা | এবার তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন করলেন ওই তপোবনের ঋষি |  

এদিকে ওই সময়ে অযোধ্যায় পুত্র্যেষ্টি যজ্ঞ করছিলেন রাজা দশরথ | যজ্ঞের পরে মহাপ্রসাদ পায়স খাবেন তাঁর তিন রানি | কৌশল্যা ও কৈকেয়ী হাতে ধরে আছেন পায়সপূর্ণ পাত্র | তিন জনে একসঙ্গে চুমুক দেবেন | কিন্তু ছোট রানি সুমিত্রার হাত থেকে এক লহমায় পায়সপূর্ণ পাত্র নিয়ে চলে গেল এক বায়স | এরপর কৌশল্যা ও কৈকেয়ী নিজেদের পাত্র থেকে অর্ধেক পায়স দিলেন সুমিত্রাকে | ফলে তিনি জন্ম দেন যমজ পুত্র লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্নর |  

যাই হোক‚ সেই বায়স সুবর্চলাও এক শাপগ্রস্ত অপ্সরা | পরমান্ন পূর্ণ পাত্র ঠোঁটে ধরে সে উড়তে লাগল | এদিকে রাজা কেশরী ও রানি অঞ্জনা সকালের প্রার্থনা সেরে সবে বিশ্রাম নিচ্ছেন | এমন সময় সেই পরমান্ন পূর্ণ পাত্র অঞ্জনার হাতে ফেলল বায়স সুবর্চলা | বলল‚ ওই পরমান্ন স্বয়ং মহাদেবের আশীর্বাদধন্য | তাই অঞ্জনা যেন কালবিলম্ব না করে তা ভক্ষণ করেন | 

বায়স সুবর্চলার ঠোঁট থেকে পতন কালে এক দমকা বাতাস স্পর্শ করে যায় ওই পায়সের পাত্রকে | প্রকৃতপক্ষে তা ছিল বায়ুদেব বা মরুতের আশীর্বাদ | পায়স ভক্ষণের ফলে জন্ম হল হনুমানের | যিনি একাধারে পবনপুত্র এবং অন্যদিকে মহাদেবের অবতার | পুত্রের জন্মদানে এতদিনে অভিশাপমুক্ত হলেন অঞ্জনা | ফিরে পেলেন পুরনো অপ্সরা নাম ও রূপ | 

ভিন্ন পৌরাণিক সূত্র বলছে‚ রাজা কেশরী ও রানি অঞ্জনা নিজেদের পুণ্যবলে পেয়েছিলেন মহাদেব ও মরুতের আশীর্বাদ | সেই আশীর্বাদেই জন্ম নেন হনুমান | পবনপুত্র ও মহাদেবের অবতার | একাধারে বাঁদর ও অন্যদিকে মহাদেবের অবতার‚ এই দুয়ের সম্মিলিত বৈশিষ্ট্যধারী জাতকের জন্ম দিয়ে ঋষির দেওয়া শাপমুক্ত হলেন অপ্সরা পুঞ্জিকস্তলা | এছাড়াও হনুমানের জন্ম এবং তাঁর নররূপী জন্মদাত্রীর পরিচয় নিয়ে বহু প্রচলিত কিংবদন্তি‚ লোককথা‚ আলেখ্য আছে | একটির সঙ্গে অন্যটির তথ্যগত সাদৃশ্য নাও থাকতে পারে | মহাসাগরসম পুরাণ থেকে আমি এক গণ্ডুষ জল তুললাম মাত্র |

Advertisements

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.