বিষকন্যা যখন একনায়কদের প্রেমিকা-রক্ষিতা-অবৈধ সন্তানের মা‚ পরিণামে আমাজনের দুর্গম অরণ্যে নির্বাসন

বিষকন্যা যখন একনায়কদের প্রেমিকা-রক্ষিতা-অবৈধ সন্তানের মা‚ পরিণামে আমাজনের দুর্গম অরণ্যে নির্বাসন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

প্রথম দর্শনের হৃদকম্পন অনুভব করেছিলেন মারিতা লরেনজ। ছিপছিপে চেহারার সেনার পোশাক পরা তরুণ, গালে দাড়ি—এমন পুরুষকে দেখে যে কোনও নারীরই যে যৌবন সাড়া দেয়, এ তো স্বাভাবিকই ! তার ওপর যদি সেই মানুষটি হয় একটি দেশের জনপ্রিয় নেতা, তার সম্মোহন ক্ষমতায় তো আলাদা। প্রথম দর্শনের তেত্রিশের ফিদেল কাস্ত্রোর প্রেমে পড়ে গেলে উনিশে পৌঁছনো মারিতা। সালটা ১৯৫৯।

মারিতারা আমেরিকার বাসিন্দা। যদিও মারিতার জন্ম আমেরিকায় নয়। ছোট থেকে সে বড় হয়েছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত জার্মানিকে। বাবা জার্মান, জাহাজের ক্যাম্পেটন। আর মারিতার মা আমেরিকান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মারিতার মা ব্রিটিশ এবং ফরাসির সেনার হয়ে গুপ্তচর ছিলেন। ধরা পড়ে যান। এরপর তাঁর ঠাঁই হয় বার্গেন-বেলসেন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। মারিয়ার তখন পাঁচ বছর বয়স। আশ্চর্যের বিষয়, গোটা পরিবারটাই বেঁচে যায়। যুদ্ধ শেষে গোটা পরিবারটাই আমেরিকার বাসিন্দা হয়।

বাবার বিলাসবহুল জাহাজে চাকরি নেন মারিতা। তখন তাঁর বয়স মাত্র উনিশ।  হাভানার বন্দরে জাহাজ পৌঁছলেই তাঁদের অভ্যর্থনা জানাতে হাজির হন ফিদেল কাস্ত্রো। ফিদেলকে দেখে একেবারে ফিদা হয়ে যান মারিতা। সে বর্ণণা তিনি নিজে হাতে লিখেছেন—“I was standing on the bridge, and in the distance I could see this launch coming toward us. It was filled with around 27 men, all with the same beard. One was taller than the others. He was standing on the bow, and he had a rifle… The tall one yelled out, ‘I want to come aboard.’ I asked who he was, and he started laughing and flashing a lot of teeth. ‘Yo soy Cuba,’ he said. ‘Comandante Fidel Castro.’”

দুরন্ত একটা সম্পর্ক তৈরি হয় মারিতা এবং ফিদেলের। কিউবার বসন্তে উত্তাল প্রেম। যার পরিণতিতে সন্তানসম্ভবা হন মারিতা। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৯ সালের অক্টোবর মাসে সাত মাসের গর্ভবতী মারিতা লরেনজ। এরপর আর তার সন্তানকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মারিতা বলেছিলেন, হাভানায় খুব তাড়াহুড়ো করে গর্ভপাত করানোর পর তিনি ফিরে আসেন নিউ ইয়র্কে। সেখানে তাঁকে আবার গর্ভপাতজনিত চিকিৎসা করাতে হয়। এ ঘটনার প্রায় চৌত্রিশ বছর পর মারিতা জানিয়েছিলেন, ফিদেল এবং তাঁর একটি সন্তান ছিল। সে সন্তানের জন্মের পরই মারিতাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়। হাভানার হাসপাতালে যখন তাঁর ঘুম ভাঙে তখন তাঁকে জানানো হয়, তাঁর সন্তানকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ফিদেলের এই ভালবাসা-প্রেমকে ঘিরে আসরে নামেন মারিশার মা অ্যালিস এবং তাঁর সহকর্মী অ্যালেক্স রুরকে। তাঁরা এই গল্প তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেন—”Fidel Castro Raped My Teenage Daughter.” আমেরিকার মানুষের লোকজনের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে এই গল্প। শুধু তাই নয় ফিদেলের বিরুদ্ধে তাঁরা আনেন অমানবিক অত্যাচারের অভিযোগও। মারিতা অবশ্য এমন অভিযোগ কোনওদিন করেননি। তাহলে কেন এমন করতে গেলেন অ্যালিস এবং অ্যালেক্স ? অর্থের লোভ ? নাকি অন্য কিছু ? এই অভিযোগ তোলার দুটি উদ্দেশ্য ছিল—(এক) ফিদেল এবং মারিতার সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া, (দুই) মারিতার জন্য একটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত করা।

কিউবার নেতার বিরুদ্ধে আমেরিকানদের মধ্যে নেগেটিভ সেন্টিমেন্ট গড়ে তুলতে অ্যালিস এবং অ্যালেক্সের পরিকল্পনা সফল হয়েছিল। মারিতা-ফিদেলের সম্পর্কটাও তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হয়ে যায়। অ্যান্টি ফিদেল সেন্টিমেন্ট তৈরির জন্য মারিশার একটা ভাল চাকরিও জুটে যায়। পৃথিবীর বৃহত্তম গুপ্তচর সংস্থা CIA-তে গুপ্তচরের চাকরিটা পেয়ে যান মারিতা।

ফিদেলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা কাজে লাগিয়ে, তাঁকে দিয়েই ফিদেলকে খুন করাতে উদ্যত হয় আমেরিকা। এর জন্য তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় কয়েকটি বিষ ক্যাপসুল। অনেক কষ্টে ভালবাসার মানুষটিকে খুন করতে হাভানা যাত্রা করেন মারিতা। সেখানে পৌঁছতেই এগিয়ে আসেন তরুণ নেতা। পরনে সেই সেনা পোশাক, সেই দাড়ি। আবারও হৃদকম্পন অনুভব করেন মারিতা। মস্তিষ্ক আর কাজ করেনি। সব কিছু ওলট পালট হয়ে যেতে থাকে। ফিদেলকে খুনের পরিবর্তে তাঁর সঙ্গে সুন্দর একটি রাত কাটান আমেরিকান এই তরুণী। আর বিষ ক্যাপসুলগুলিকে তিনি নষ্ট করে দেন। ভেস্তে যায় CIA-র পরিকল্পনা।

CIA থেকে আরও একটি অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয় মারিতাকে। এবার মিশন ভেনেজুয়েলার একনায়ক মার্কোস পেঁরেজ জিমেঁনেজ। অসম্ভব সুন্দরী এই তরুণীকে দেখে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি বিবাহিত একনায়ক। মারিতাকে তিনি চাপ দিয়ে রক্ষিতা করেন। শারীরিক সম্পর্কের ফলে তাঁদের একটি কন্যাসন্তান হয়, মনিকা। দীর্ঘদিন পর্যন্ত মারিতা এবং মনিকার জন্য অর্থের ব্যবস্থা করেছিলেন মার্কোস।

CIA-এর চাকরিটা খোওয়ান মারিতা। জেলবন্দি হন একনায়ক মার্কোস। তাঁকে দেখতে ভেনেজুয়েলায় যান মারিতা। অদৃষ্টের নিষ্ঠুর পরিহাস। মারিতাকেও জেলে পুড়ে দেওয়া হয়। জেল থেকে যখন ছাড়া পান তিনি, তখন দুজন অফিসার মারিতা এবং মনিকাকে ছেড়ে দিয়ে আসেন অ্যামাজনের জঙ্গলে। সেখানে আদিবাসীদের সঙ্গে ন-নটা মাস কাটাতে হয় মার্কিন সুন্দরীকে।

আমেরিকায় ফেরার পর FBI এবং মার্কিন পুলিসে গুপ্তচরের চাকরি জোটে মারিতার। চাকরি করতে করতেই তাঁর পরিচয় হয়ে যায় গ্যাংস্টার এডি লেভির সঙ্গে। মারিতার গর্ভে আবার সন্তান আসে। এবার এডি লেভির। এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন মারিতা। নাম রাখেন মার্ক। প্রথম দিকে অবশ্য কেচ্ছার ভয়ে মার্কের বাবা হিসেবে এক পুলিস অফিসারকে দেখিয়েছিলেন মারিতা। পরবর্তী তিনিই পরিষ্কার করে দেন, মার্কের আসল পিতা কে।

১৯৮১ সালে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছিলেন মারিতা। সন্তানদের নিয়ে ফিরে যেতে চেয়ে ছিলেন ফিদেলের ছাতার তলায়। সেই মত কিউবার এমব্যাসিতে যোগাযোগ করেন তিনি। সুযোগও সামনে চলে আসে। কী অপেক্ষা করে আছে—আহ্বান নাকি প্রত্যাখ্যান? ফিদেল কি এবারও হাভানা বন্দরে তাঁর জন্য অপেক্ষা করবেন? নাকি তাঁকে এবার খুনের ষড়যন্ত্র করবেন এক সময়ের সেই ভালবাসার মানুষটা, যাঁকে তিনি খুনের চেষ্টা করেছিলেন? বুঝে উঠতে পারছিলেন না মারিতা।

চমকটা বোধহয় অপেক্ষায় করছিল। হাভানার বিমানবন্দরে নামতেই এক তরুণ এগিয়ে আসে মারিতার দিকে। হাত বাড়িয়ে দেন। নাম অ্যান্ড্রে, পেশায় ডাক্তার। তরুণের মুখে দিকে অপলক চেয়ে থাকেন মারিতা—হুবহু তার মত ঠোঁট, তার মত চাহনি। ফিদেল কাস্ত্রোর মত নাক, গায়ের রঙ এবং কোঁকড়ানো চুল। আর বুঝতে অসুবিধা হয় না মারিতার। এ তো তার আর ফিদেলের সেই সন্তান। মারিতা শুধু মনে মনে বলেন, ‘It’s nice, Fidel. You did a beautiful job.’

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

pandit ravishankar

বিশ্বজন মোহিছে

রবিশঙ্কর আজীবন ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রতি থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল। আর বারে বারে পাশ্চাত্যের উপযোগী করে তাকে পরিবেশন করেছেন। আবার জাপানি সঙ্গীতের সঙ্গে তাকে মিলিয়েও, দুই দেশের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার করে নিরীক্ষা করেছেন। সারাক্ষণ, সব শুচিবায়ু ভেঙে, তিনি মেলানোর, মেশানোর, চেষ্টার, কৌতূহলের রাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। এই প্রাণশক্তি আর প্রতিভার মিশ্রণেই, তিনি বিদেশের কাছে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের মুখ। আর ভারতের কাছে, পাশ্চাত্যের জৌলুসযুক্ত তারকা।