চেনা RJ‚ অচেনা LOVE এবং অদেখা CRUSH

161

প্রেম সম্বন্ধে যাহা জানো বলো | প্রশ্নের পূর্ণমান নির্দিষ্ট কিছু ছিল না | তবুও‚ উত্তর দিলেন কলকাতার তিন জনপ্রিয় রেডিও জকি | কে কত পেলেন ? বিচার করবেন পাঠক এবং তাঁদের অগণিত ভক্ত |

*********

আর জে রায়ান, (91.9 ফ্রেন্ডজ এফ এম)

“বেহিসেবি প্রেমের দিনগুলো মিস করি”

পড়তাম মিশনারি স্কুলে | পড়াশোনা‚ বন্ধুবান্ধব‚ গল্পের বই‚ ছবি আঁকার জন্য ক্লাস টেন অবধি আমার জীবনে প্রেম সেঁধোতে পারেনি | মাধ্যমিকের পরে কিশোর সাহিত্য ছেড়ে হাতে উঠল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা বই | মনে গজাল প্রেম | এবং এই যে এতদিন সে আসতে পারেনি জীবনে‚ তার শোধ তুলল এসে | এতবার প্রেমে পড়েছি‚ নিজেরই মনে নেই |

আমার প্রথম ক্রাশ অবশ্য এক নায়িকার প্রতি | ‘দিল হ্যায় কি মাংতা নেহি’ দেখে তখন পূজা ভাটের জন্য আমার মন উথালপাথাল | এন্তার জমিয়ে যাচ্ছি পোস্টার আর ছবি | জীবনে এই প্রথম আর এই শেষ‚ কোনও নায়িকার জন্য এত পাগলামি করেছি |

প্রেমের পাত্রীরা পাল্টে গেল‚ যখন মিশনারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে পা রাখলাম কো এড কলেজে | আমাদের কলজের পরিবেশ এত সুন্দর ছিল‚ মন থেকেই ইচ্ছে হত প্রেমে পড়তে | আর একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম‚ কলেজ ক্যান্টিনে গান করলে সহজেই প্রেমিকা জুটে যায় |

আমি আবার ‘ না’ বলতে পারতাম না | শেষে এমন হল‚ কলেজে কোনও বান্ধবী নেই | সবাই প্রেমিকা | তখন তো ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিল না | নামটা শুধু জানতাম | পালন টালন করতাম না | তবে ভি ডে মানে যদি‚ প্রেম উদযাপন হয় | তাহলে কিন্তু আমাদের জীবনে এরকম দিন অনেক ছিল | সেগুলো ছিল কলেজ ফেস্টের দিন | সুন্দরীদের দেখে টপাটপ প্রেমে পড়তাম |

আর ছিল প্রেম পত্র লেখা‚ উপহার দেওয়া | পকেট ফ্রেন্ডলি উপহার ছিল গানের ক্যাসেট | আমি আবার একই উপহার প্রচুর পেতাম | সেগুলোই আবার দিয়ে দিতাম | উপহারের রিসাইক্লিং হত আর কী! তবে বুদ্ধি করে দিতে হত | যাতে এমন না হয়‚ যে বান্ধবী উপহার দিল‚ তাকেই আবার সেই উপহার দিয়ে দিলাম !

তবে এখন ফিরে দেখলে মনে হয়‚ সেইসব দিনের অভিজ্ঞতা আমাকে ঋদ্ধই করেছে | এখনও প্রেমের প্রস্তাব পেতে মন্দ লাগে না | আর যে পেশায় এখন আছি‚ এগুলো আমার কাজের বাই প্রডাক্টস | আমার স্ত্রী খুব পজেসিভ | তবে এগুলো ও মেনে নিয়েছে | জানে‚ একজন আর জে হিসেবে ওঁর স্বামীকে এগুলো হ্যান্ডল করতেই হবে |

তবে এখন আর আগের মতো বেহিসেবি প্রেমে পড়তে পারি না | তাই‚ সেইদিনগুলো খুব মিস করি | যখন অত সাত পাঁচ না ভেবেই প্রেমে পড়তাম |

এখনকার প্রজন্ম দেখি ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে খুব মাতামাতি করে | আমি এর সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারি না ঠিকই | কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী‚ প্রেমের উদযাপন দেখতে মন্দ লাগে না |

************************************************************************

আর জে মানালি‚ (104 ফিভার এফ এম)

“স্ট্রেস দূর করতে প্রোপোজের থেকে ভাল আর কিছু নেই”

১৯৯৬ তে ভারতীয় দলে সৌরভ গাঙ্গুলির সুপার্ব কামব্যাক হল | আর আমারও হৃদয়ে ক্রাশের অভিষেক ঘটল | এখন‚ ক্রিকেট থেকে সৌরভ অবসর নিয়ে নিয়েছেন | কিন্তু এত বছর পরেও‚ আমার মনে তাঁর প্রতি সেই ক্রাশ আজও ব্যাটিং করে চলেছে | সৌরভের জন্য এমনই পাগল ছিলাম ‚ বাড়ির সবাই মজা করে সৌরভকে বলত ছোট জামাই |

তবে এটা ভাববেন না যে আমি ক্রিকেট বুঝতাম না | চুটিয়ে এবং সিরিয়াসলি ক্রিকেট দেখতাম |আর সেইসঙ্গে চলত সৌরভকে নিয়ে পাগলামি | একবার কবিতা টবিতা লিখে ‚ অনেক কারুকার্য করে মহারাজকে একটা চিঠি পাঠালাম | টেলিফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে বের করলাম ঠিকানা | তারপর বাবাকে বললাম পোষ্ট করে দিতে | নিজের পকেটমানি থেকে টাকা দিলাম ‚ স্ট্যাম্প কিনতে (তখন থেকেই স্বনির্ভর থাকার চেষ্টা করতাম ) | পোস্ট অফিস থেকে ফিরে বাবা বলল ‚আরও তিনটাকা দে | খুব ভারী হয়েছিল খামটা |

এত পাকা ছিলাম ‚ চিঠিতে সৌরভকে লিখে দিয়েছিলাম আমি তোমার অন্য ফ্যানের মতো নই | আমাকে উত্তর দিতে হবে না | জানি না সেই চিঠি সত্যি সত্যি সৌরভের হাতে গিয়েছিল কি না |

যদি ক্রাশের কথা বলা হয় তাহলে একমাত্র সৌরভ | সে জায়গা কেউ কোনওদিন নিতে পারবে না | কিন্তু হিরোকে সামনে থেকে দেখে ওই গদগদ ন্যাকামি আমার পোষায় না | তাই আর জে হয়ে যখন সৌরভকে ইন্টারভিউ করলাম ‚ তখন কিন্তু এতসব কথা ওকে বলিইনি | এমনকী ‚ ইন্টারভিউ-এর পরেও না | যাই হোক ‚ আমি সৌরভ এবং তাঁর পরিবারের সব্বাইকে খুব‚ খুব ভালবাসি |

আর যদি প্রেমের কথা বলো ‚তাহলে সলিড প্রেম গোটা তিনেক করেছি | ক্লাস নাইন থেকে শুরু | প্রতিটা প্রেম বছর পাঁচ-ছয় করে টিকেছিল | আর আমি ব্যালেন্স করতে‚ অ্যাডজাস্ট করতে খুব ভালবাসি | প্রতিটা সম্পর্ককে সময় দিই | এরকম নয় ‚ যে ভালবাসার মানুষকে পাল্টানোর চেষ্টা করি |বরং মানাতে না পারলে‚ ভাল না লাগলে‚ আমিই সেখান থেকে সরে আসি |

এত প্রেম করেছি কিন্তু প্রেম পত্র টত্র বিশেষ লিখিনি | বরং আড্ডা দিতে আমার ব্যাপক লাগত | আর ভ্যালেন্টাইনস ডে সেভাবে পালন করিনি | বিশেষ দিনে গিফট দেওয়া টেওয়া নয় সারা বছরই উপহার দেওয়া যেতে পারে ‚ আর ফুল চকোলেট দেওয়ার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস দিতেই আমি বেশি ভালবাসি |

সত্যি কথা বলছি ‚ প্রেম-প্রস্তাব পেতে এখনও হেভি লাগে | স্ট্রেস দূর করার জন্য প্রোপোজের থেকে ভাল কিছু হতে পারে না | কিছুদিন আগে একটা ছেলে ‚ বয়সে আমার থেকে ৫‚৬ বছরের ছোটই হবে‚ এগিয়ে এসে আমার সঙ্গে আলাপ করল | সে নাকি রোজ আমার অফিস যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকে | তো‚ তাকে আমি বললাম‚ ভাই তুমি যা ভাবছ ‚ তা তো আর হওয়ার নয় | আমি সেই সময়টা পেরিয়ে এসেছি | কিন্তু ওর সঙ্গে কথা বলার মুহুর্তটা যে কী ভাল লাগল কী বলব !

তবে হ্যাঁ বস ! যে কোনও সিরিয়াস সম্পর্কের প্রতি আমি খুব ডেডিকেটেড | একবার যদি মুখ ফুটে বলে দিই‚ ওই তিনটে অমোঘ শব্দ ‚ তো ব্যস, আমার প্রতি সে পূর্ণ আস্থা রাখতেই পারে | আর হ্যাঁ‚ ওসব শাঁখা সিঁদুর মঙ্গলসূত্র‚ মানে কোনও চিহ্নতে কিছু এসে যায় না | রেজিস্ট্রেশনের কাগজও কাউকে বেঁধে রাখতে পারে না | দুজনের সঙ্গে দুজনের থাকতে ভাল লাগলে তবেই সম্পর্ক টিকে থাকে | সম্পর্ক তো আর জেলখানা নয় | দিনের শেষে সবাই ঘরে ফিরতে চায় | জেলখানায় নয় |

************************************************************************

আর জে সায়ন, (104 ফিভার এফ এম)

“এক বান্ধবীকে এক বার পঞ্জিকা গিফ্ট করেছিলাম”

আমার জীবনে প্রেম এসেছে বার বার | আমি রোজই একবার করে প্রেমে পড়ি… কোনও সুন্দরী মহিলা দেখলেই মনটা আনচান করে ওঠে | এই জন্যেই মনে হয় এখন অবধি সেরকম ‘সিরিয়াস’ প্রেম করা হল না অমার | অবশ্য আমার ইমেজের সঙ্গে বোধহয় ‘সিরিয়াস’ কিছুই যায় না!

যাইহোক আজকে আমার প্রথম প্রেমের কথা বলতে বসে বহু মেয়ের মুখ ভেসে উঠছে | তবে আমার ‘ফার্স্ট ক্রাশ’ কিন্তু জুহি চাওলা | ওঁর ‘হাম হ্যায় রাহি প্যার’ কে দেখে ‘I immediately fell in love with her’ | আমার চারিপাশ তখন শুধু ‘জুহিময়’ | উফ! কত কী যে ভেবেছি ওঁকে নিয়ে | তবে জুহি চাওলাকে আমি কোন দিন বাস্তবে পেতে চাই না | ওই যে বলে না ‘সব পেলে ব্যর্থ এ জীবন’ | অনেককেই দেখেছি বয়েসের সঙ্গে তাঁদের রুচি বদলেছে কিন্তু আমার কাছে জুহি চাওলা‚ আগে যা ছিল এখনও তা-ই আছে আর ভবিষ্যতেও তা-ই থাকবে |

জুহি চাওলাকে ছেড়ে এবার একটু বাস্তবে ফেরা যাক… আমার জীবনের প্রথম প্রেম আমার পোষা একটা টিয়া পাখি | আমি তখন বেশ ছোট | আমার ঠাকুমার শেখানো ‘হরে কৃষ্ণ’ বুলি টিয়ার মুখে যে কী মিষ্টি লাগতো কী বলব | কিন্তু সেই প্রেম বেশিদিন টিকল না | একদিন আমার কাকা ওকে চান করতে গিয়ে একটু অসতর্ক হয়ে যান আর সেই সুযোগে আমার জানেমন টিয়া পাখি ফুরুৎ | বড্ড কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন |

আর আমি একজনকে প্রচন্ড ভালবাসি তাঁকে আমার প্রথম প্রেম বললেও ভুল হবে না | সে আমার ঠাকুমা | ছোটবেলায় আমি খুব দুষ্টু ছিলাম | সব রকমের অত্যাচার আমার ঠাকুমা কিন্তু হাসি মুখে মেনে নিতেন | আমার দাদুকে আমি খুব ঈর্ষা করতাম | একদিন তো প্রায় ঠিক করেই ফেলেছিলাম দাদুকে একটা বস্তায় ভরে দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসব | তাহলে ঠাকুমা শুধু আমার হয়ে যাবে এই ভেবে | আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি তখন আমার দাদু মারা যান | উনি মারা যাওয়ার পরে বুঝতে পারলাম ওঁর মূল্য | আমার প্রেমিকা বল‚ বা ভাল বন্ধু‚ বা ছোট বোন‚ সব কিছুই আমি আমার ঠাকুমার মধ্যে পেয়েছি |

আমি কিন্তু এই সব ‘প্রেম দিবস’ মানি না | প্রেমের জন্য কোনও একদিন ফিক্স করা যায় নাকি? অবশ্য স্কুলে পড়ার সময় বা কলেজে অন্যদের মতই আমিও কিন্তু আমার সেই ‘স্পেশাল’ জনের সঙ্গে ‘ভ্যালেনটাইন্স ডে’ পালন করেছি | বান্ধবীদের চকোলেট ও বিভিন্ন উপহার ও দিয়েছি | একবার একজন বান্ধবীকে পঞ্জিকাও গিফ্ট করেছিলাম, কেন করেছিলাম তা কিন্তু ঠিক মনে নেই | এখন অবধি আমি অনেক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছি ‚ কিন্তু কারওর সঙ্গে এখন অবধি থিতু হতে পারিনি | আসলে আমি পলিগ্যামিজমে বিশ্বাস করি | একজনের সঙ্গে এনগেজড থাকা মানে এই নয়‚ যে অন্য কোনও মেয়ের দিকে তাকাতে পারব না | বা অন্য কোনও মেয়েকে আমার ভাল লাগবে না | আবার এও নয় যে আমার প্রেমিকা আমার সঙ্গে আছে বলে অন্য কোন ছেলেকে ঝারি মারতে পারবে না | আমি মনে করি যে কোনও সম্পর্কে একে অপরকে ‘স্পেস’ দেওয়াটা খুব জরুরি | এখনও সেরকম কাউকে পাইনি যার আমার মতই ভাবনা চিন্তা | তাই কদিন প্রেম করার পরেই বোধহয় প্রেম ভেঙে যায় আমার | আমি সব কিছুই সময়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছি | ঠিক সময় এলে আপনা আপ আমার সেই স্পেশাল জনকে খুঁজে পাব এই টুকু বিশ্বাস আছে আমার |

আমার রেডিও শো ‘happy to disturb এ আমি বহু মানুষকে ফোন করে বিরক্ত করি কিন্তু আমার প্রাক্তন বান্ধবীদের কোনও দিন ফোন করে তা করতে ইচ্ছা করে না | আসলে আমার সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীন আমি ওঁদের যা বিরক্ত করেছি‚ তা আর বলার নয় |

সব শেষে আমার আরও একটা দিক না বললে আমার প্রেমিক সত্তাকে ঠিক চেনা যাবে না | আমি নিজে একজন প্রকৃতিপ্রেমী | পাহাড়ে ঘুরতে যেতে খুব ভালবাসি | যখনি পারি আমার বাড়ির চারপাশে গাছ লাগাই | চায়ের কাপ বা চিপসের প্যাকেট সব সময় ডাস্টবিনে ফেলি, রাস্তায় বা পাবলিক প্লেসে কখনও হিসি করি না বা থুতু ফেলি না | পরিবেশ যতটা পারি পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করি |

(অনুলিখন : অর্পিতা রায় চৌধুরী,শাম্ভবী কবি গাঙ্গুলি‚ )

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.