২৭৭ বছরের প্রাচীন অভিজাত-নর্তকীর ব্যর্থ ত্রিকোণ প্রেম এখন ঘিয়ে ভাজা মুচমুচে রুটি

3645

মুচমুচে পাউরুটি বাখরখনি স্তরে স্তরে মশলাদার | এই খাবারের স্বাদে মুগ্ধ ভারত‚ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ | এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার এক অভিজাত মুসলিম‚ আগা বকর খানের নাম | জড়িয়ে আছেন আর এক সুন্দরী‚ খনি বেগম | তাঁকে সারাজীবন চেয়ে এসেছিলেন আগা বকর | কিন্তু পাননি শেষ অবধি | এই দুজনের নাম মিলিয়েই খাবারের নাম বাকরখনি বা বকরখনি |

এখন কলকাতার পুরনো অংশে বাছাই দোকানে পাওয়া যায় এই খাবার | তবে এর জন্ম কিন্তু প্রাচীন বাংলা-ই | বলা ভাল নবাবি বাংলার রাজধানী | যা ছিল মুকসুদাবাদ | পরে মুর্শিদকুলি খাঁ-এর নাম থেকে মুর্শিদাবাদ | তাঁর স্নেহধন্য আগা বকর খানের কথায় আসার আগে মুর্শিদকুলি খানের প্রসঙ্গে আসা যাক | 

সুবিখ্যাত ঐতিহাসিক স্যর যদুনাথ সরকার মনে করেন মুর্শিদকুলি খানের জন্ম দক্ষিণ ভারতের হিন্দু পরিবারে‚ ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে | যাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল অভিজাত পার্সি পরিবারে | সেখানে তার নতুন নাম হয় মহম্মদ হাদি | মালিকের সঙ্গে পারস্য গিয়েছিলেন তিনি | ভারতে ফিরে এসে বিদর্ভের দেওয়ান নিযুক্ত হন ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে |

প্রশাসনিক হিসেবে হাদির দক্ষতার কথা পৌঁছয় মুঘল সম্রাট অওরংজেবের কানে | তিনি হাদি খানকে ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন | ততদিনে আগা বকর খানও পরিণত যথেষ্ট | এই আগা বকরকে হাদি বা মুর্শিদকুলি খান পেয়েছিলেন পারস্যে | তিনি তাঁকে নিয়ে ভারতে আসেন | হয়ে ওঠেন মুরুব্বি বা অভিভাবক | অস্ত্র ও প্রশাসনিক শিক্ষায় দক্ষ করে তোলেন |

তারপর তাঁকে পাঠান যেখানে‚ সেটা আজকের চট্টগ্রাম | আরবীয় ও পারসিক ভাষায় দক্ষ আগা বকর সেখানে দেওয়ান নিযুক্ত হলেন | সেখানেই তিনি মুগ্ধ হন খনি বেগমে | ঢাকার কাছে আরামবাগে খনি ছিলেন ডাকসাইটে সুন্দরী নর্তকী | তাঁর উপর নজর ছিল স্থানীয় পুলিশ বা কোতোয়াল জয়্নুল খানের | কিন্তু খনি বেগম মন দিয়েছিলেন আগা বকর খানকেই | ইতিমধ্যে বেপাত্তা হয়ে গেলেন জয়নুল | রটিয়ে দেওয়া হল‚ তাঁকে খুন করেছেন আগা বকর খান |

বিচারের জন্য মামলা গেল মুর্শিদকুলি খানের কাছেই | তিনি তখন বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব | তিনি কিন্তু পক্ষপাতিত্ব দেখালেন না | স্নেহধন্যকে মৃত্যুদণ্ড দিলেন | ক্ষুধার্ত বাঘের খাঁচায় ফেলে দেওয়া হল আগা বকর খানকে | কিন্তু অত্যাশ্চর্য ! সেই বাঘকে মেরে খাঁচা থেকে অক্ষত বেরিয়ে এলেন আগা বকর |

এদিকে জয়নুল তো আদৌ মারা যাননি | তিনি সুযোগ বুঝে গোপন আস্তানা থেকে বেরিয়ে এলেন | খুন করলেন খনি বেগমকে | মুর্শিদাবাদ থেকে আগা বকর খান ফেরার আগেই জয়নুলের ষড়যন্ত্র সফল হল | অন্যদিকে বকর খান বিধ্বস্ত অবস্থায় আবার প্রশাসনিক দায়িত্ব নিলেন | এ বার তিনি জায়গিরদার | ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি যে অংশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তা আজকের বাংলাদেশের বরিশালে | বড় একটি পরগণার নাম তাঁর নামে হয়‚ বকরগঞ্জ বা বাখরগঞ্জ | আগা বকরের সুশাসনে এই এলাকা খ্যাতির শিখরে যায় | সুদূর আর্মেনিয়া ও পারস্য থেকেও আসতেন ব্যবসায়ীরা |

আগা বকর ছিলেন খাদ্যরসিক | তাঁর নির্দেশে তৈরি হয় বিশেষ রুটি‚ খনি বেগমের নামে | পরে এর নাম হয় বাখরখনি | ছড়িয়ে পড়ে এর সুখ্যাতি | তবে খাদ্য ঐতিহাসিক ও গবেষকরা বলেন‚ বাকরখনি মোটেও আগা বকর খানের মস্তিষ্কপ্রসূত নয় | এই খাবার অনেক আগেই মধ্য এশিয়া থেকে এসে ঢুকে পড়েছিল মুঘল প্রাসাদে | হয়তো আগা বকর খান কিছু সংযোজন ও পরিবর্তন করেছিলেন |   ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত হন আগা বকর খান | ততদিনে বাকরখনি দক্ষিণ এশিয়া জয় করে ফেলেছে | বর্তমানে ভারতের অন্য অংশের সঙ্গে এটি জনপ্রিয় কাশ্মীরেও |

সেরকম প্রমাণ না থাকলেও ধরা হয় বকরগঞ্জে যাওয়া কাশ্মীরি ব্যবসায়ীরা এই খাবারকে নিয়ে যান ভূস্বর্গে | ভারত সফরের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টাতে থাকে তার আকার ও স্বাদ | কোথাও উপকরণে আসে চিজ | তো কোথাও শুকনো ফল আর সেমাই | কোথাও আবার শুধুই খাঁটি ঘিয়ে ভাজা বিস্কুট | তবে এই খাবার আভিজাত্য হারিয়েছে বেশ খানিক | আগে যা ছিল ধনীদের খাবার‚ এখন সাধারণের নাগালে | কাশ্মীর ও হায়দ্রাবাদে মুসলিম পরিবারে বিয়েতে বাখরখানি মাস্ট |

তবে বাখরখানি এখন অস্তিত্বের সংগ্রামে লড়ছে | এখন কলকাতা‚ রাজশাহী‚ ঢাকা‚ চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট সামান্য কিছু জায়গায় এই রুটির বেকারি আছে | লখনৌ আর পাটনায় এই রুটি তৈরি হয় শুধু রমজানের সময় | পাটনায় এটা বানান হিন্দু কারিগররা | কলকাতার মোমিনপুর রোডে ছোট্ট আলি বেকারিতে রোজ সকালে পাওয়া যায় বাখরখানি | আজ থেকে ২৭৭ বছর আগের ব্যর্থ ত্রিকোণ প্রেমের দাম এখন দু’ টাকা করে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.