পুলওয়ামার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের অনন্য নজির গড়লেন মহারাষ্ট্রের গ্রামবাসীরা

106
tribute to pulwama martyrs

বিগত চার মাস ধরে নাগপুর জেলা পরিষদের কর্মীরা পুলওয়ামা সন্ত্রাসী হামলার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নীরবে পরিশ্রম করে চলেছেন। এ এক স্বতন্ত্র শ্রদ্ধাজ্ঞাপন যার কোনও রকম প্রচারও চান না তাঁরা। পুলওয়ামায় সন্ত্রাসে নিহত ৪০ জন শহিদদের বেশিরভাগেরই জন্ম কোনও না কোনও গ্রামে | এবং তাঁদের পরিবারের অধিকাংশেরই পৈতৃক পেশা কৃষিকাজ | দেশ জুড়ে বাড়তে থাকা জলের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিকাজ | সহায় সম্বল হারিয়ে প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনও না কোনও অংশে আত্মহত্যা করছেন কৃষকরা | তাই যখন নাগপুর জেলা পরিষদের কর্মীরা হামলায় নিহত শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার কথা ভাবেন তখন ঠিক করেন প্রাকৃতিক উপায়ে জল সংরক্ষণ হতে পারে তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের উদ্দেশ্যে উপযুক্ত শ্রদ্ধার্ঘ |

গ্রামবাসী আর জেলা পরিষদের কর্মীরা মধ্যরাত অবধি ফ্লাডলাইটের আলোয় পরিশ্রম করে, ঘাম ঝরিয়ে মাটি কেটে তৈরি করছেন ছোট ছোট খাল‚ আলপথ ও ছোট ছোট গর্ত । সপ্তাহের শেষে ছুটির দিনগুলিতে নিয়ম করে নারখেদ তালুকের প্রতিটি গ্রামে হাজির থাকছেন জেলা পরিষদ কর্মীরা | গ্রামবাসীদের হাতে হাতে মিলিয়ে বুনে চলেছেন সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন | । নারখেদ তালুক অঞ্চল থেকে ৪০ টি গ্রাম বেছে নিয়ে এই কাজ তাঁরা করে চলেছেন জল সংরক্ষণ করার শপথ নিয়ে।

জেলা পরিষদ সিইও সঞ্জয় যাদব জানান, পুলওয়ামা হানার পর গ্রামবাসীরা তাঁদের স্মৃতি রক্ষার্থে কী করতে পারে এ বিষয়ে আধিকারিকদের মধ্যে আলোচনা হয়ে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেইমত ক্যাম্পেইন করা হয়। স্বেচ্ছাশ্রম দিতে এগিয়ে আসেন প্রচুর সংখ্যক মানুষ। ‘যেহেতু, বেশিরভাগ সেনাই ছিলেন গ্রামাঞ্চল থেকে আসা আর তাঁদের পূর্ব পুরুষ চাষবাস করতেন, তাই কৃষকদের উপকারে আসবে এমন কিছু আমরা করতে চাইলাম। জলের সমস্যা উত্তরোত্তর বেড়ে যাওয়ায় চাষিরা বেজায় সংকটে পড়ছেন, আর তাই বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে রাখার প্রকল্প চালু হয়েছে নানা জায়গায়। আমাদের এই ছোট্ট প্রয়াসটি জলের সমস্যা কিছুমাত্র হলেও মেটাবে আশা করা যায়’ জানান সঞ্জয় বাবু। নারখেদ তালুক জেলাটি বেছে নেওয়া হয়েছে এই কারণে যে এই অঞ্চলেই রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জলকষ্ট। রাজেন্দ্র ভুঁয়ার, জেলা পরিষদের ডেপুটি সিইও বলেন গ্রামাঞ্চলে গ্রামের মানুষদের নিয়ে কাজ করাটাই তাঁর সংস্থার সবচেয়ে বড় বল। ‘প্রত্যেক গ্রামেই অন্তত একজন করে হলেও জেলা পরিষদ কর্মী আছেন। এটাই অঞ্চল নির্বাচন করতে সাহায্য করেছে। কাজগুলি ভাগ করে দেওয়াও গিয়েছে খুব সহজে। ব্লক উন্নয়ন অফিসার, শিক্ষা দপ্তরের ব্লক আধিকারিক সকলেই সাহায্য করেছেন। তাঁদের প্রশাসনিক ক্ষমতা কাজটিকে দ্রুততার সঙ্গে শুরু করতে সহায়ক হয়েছে এবং মার্চ মাসে কাজটি পুরোদমে শুরু করা গেছে’ জানান ডেপুটি সিইও।

জেলা পরিষদ কর্মীরা প্রথমে নিজেদের মধ্যেই লাখ খানেক টাকা তোলেন। পরে মন্ত্রী চন্দ্রশেখর বাওয়াঙ্কুলের কাছ থেকে কিছু বিশেষ তহবিলে টাকা আসে, আর কিছু জেলা পরিষদ স্কিম থেকেও টাকা পান জেলা পরিষদ কর্মীরা। গ্রামে গ্রামে শহিদদের ছবি নাম সহ ব্যানার টাঙানো হয়। ‘গ্রামের মানুষরা এভাবে উদ্দীপিত ও আবেগতাড়িত হয়ে নিজে থেকেই প্রকল্পটিতে কাজ করতে এগিয়ে আসে’। গ্রামবাসীদের নিয়ে জেলা পরিষদ কর্মীরা একটি দুর্দান্ত দল গঠন করেছেন। খাল কাটার মত কঠিন কাজ চলছে দ্রুততার সঙ্গে। শ্রী ভুঁয়ার জানান, গ্রামবাসীরা তো প্রতিদিন আছেনই। তাছাড়া একশ’র বেশি জেলা পরিষদ কর্মী প্রতি সপ্তাহান্তে পৌঁছে যান যেখানে যেখানে কাজ চলছে সেসব জায়গায়। তাঁরাও হাত লাগান গ্রামবাসীদের সঙ্গে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে কাজ কেন না, শেষ করতে হবে বর্ষা ঢোকার আগেই। গরমের প্রচণ্ড দাবদাহে দিনের বদলে রাতের দিকটাকেই বেছে নেওয়া হয়। তাই মধ্যরাত অবধি চলে কাজ। শ্রী ভুঁয়ার জানান, ‘বেশির ভাগ দিনই ভোর তিনটে অবধি কাজ চলে। গ্রামবাসীরা সাংঘাতিক সহযোগিতা করছেন, তাঁরা বেশ বুঝতে পারছেন, এ কাজে তাঁদেরও মঙ্গল হবে’। লোকসভা নির্বাচনের ভোট গণনার আগের দিন অর্থাৎ ২৩ শে মে খোঁড়ার কাজটি শেষ হয়েছে। পরের পর্যায়টি পরিকল্পনা করা হয়েছে বর্ষা আসার পরে। ‘আমরা বৃষ্টির অপেক্ষায় আছি। আমাদের কেটে রাখা খালে বৃষ্টির জল এসে ভর্তি হলে তবেই পরবর্তী পর্যায়ের কাজ শুরু করা যাবে’। জেলা শিক্ষা আধিকারিক চিন্তামন জানান, ‘আমরা প্রার্থনা করছি, বৃষ্টির দেবতা যেন এ’ বছর প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি ঝরান, আমাদের প্রার্থনা আর শহিদদের আশীর্বাদ নিশ্চয়ই ফলপ্রসূ হবে’।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.