বসন্তের মাদকতার অন্যতম অনুঘটক মহুয়া অরণ্যচারীদের কাছে খুবই পবিত্র

বিয়ার-হুইস্কি-শ্যাম্পেনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে গিয়েও হারায় না মহুয়া | ভারতের প্রাচীনতম এই সুরা যুগ যুগ ধরে টিকে আছে নিজস্ব মদীরতায় | 

মহুয়া গাছ ( বৈজ্ঞানিক নাম (Madhuca Longifolia) উৎস এই মাতাল করা নেশার | মহারাষ্ট্র‚ মধ্যপ্রদেশ‚ ছত্তীসগড়‚ ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় বঙ্গে পর্যপত পরিমাণে হয় মহুয়া গাছ | যেখানে এই গাছের বিচরণভূমি সেখানে আদিবাসীদের জীবন ও অর্থনৈতিক দিকে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে মহুয়ার | 

মধ্য ভারতের ছোট নাগপুর মালভূমিতে বসবাস গোন্ড উপজাতিদের | কয়েকশো বছর ধরে তাদের কাছে মহুয়া হল জীবনের গাছ | তাদের নিজস্ব পুরাণে রয়েছে জীবনবৃক্ষ মহুয়া ফুলের কথা | প্রাচীন গোন্ড বিশ্বাস‚ এই ফুল কোনওদিনও শুকিয়ে যায় না | বরং তা শাশ্বত | যতই শুকিয়ে যাক না কেন‚ একফোঁটা জল পেলেই আবার তাজা হয়ে ওঠে | বিশ্বাস‚ উপজাতিদের |

গোন্ড উপজাতির গণনায় নতুন বছর শুরু হয় চৈত্রমাস থেকে | এই সময় তারা পালন করে চৈত্র মহাপরব | পারবণে বিশেষ ভূমিকা থাকে মহুয়া ফুলের | এরপর বর্ষায় আবার পালিত হয় মহুয়ার উৎসব | ফুল থেকে সুরা তৈরির আগে হয় সেই বিশেষ পার্বণ |

প্রাচীন কালে সেদ্ধ মহুয়া ছিল আদিবাসীদের প্রাত্যহিক খাবার | তাদের সব উৎসবে মহুয়া লতার উপস্থিথি ছিল আবশ্যিক | গুঁড়ো‚ সেদ্ধ‚ ফুটিয়ে‚ রস‚ বিভিন্ন রূপে মহুয়া সেবন করে থাকে আদিবাসীরা | কোয়া প্রজাতির আদিবাসীরা মহুয়া কাঠকেও খুব পবিত্র বলে মনে করে | তাদের অন্ত্যেষ্টিতে থাকবেই থাকবে মহুয়া কাঠ |

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে রচিত চরক সংহিতায় বিশদ বিবরণ আছে মহুয়ার | বলা হয়েছে‚ মহুয়া নির্যাসের গুণ অপরিসীম | আয়ুর্বেদ ঐতিহাসিক সি.পি খাড়ে তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন সর্দিকাশি ব্রঙ্কাইটিস ঘটিত অসুখে মহুয়ার কার্যকারিতার কথা | 

আনুমানিক ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে‚ তখন উত্তর ভারতে হর্ষবর্ধনের শাসন‚ ভারতে এসেছিলেন চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েনসাং |  তিনি উল্লেখ করেছেন ভারতে সুরাপানেও শ্রেণীবৈষম্য আছে | ক্ষত্রিয়রা মূলত পান করে ফুল বা ফল থেকে পাওয়া রসের সুরা | বৈশ্যরা পছন্দ করে আরও কড়া পরিস্রুত সুরা | তবে ব্রাহ্মণরা বেশি পান করে ফলের রস | ফুলের রস থেকে তৈরি নেশা মহুয়ার কদর কিন্তু নতুন করে ফিরে আসছে সুরামোদীদের মাঝে | যা ছিল একদা অন্ত্যজ আদিবাসীদের মাদকতা‚ তা এখন পাল্লা দিচ্ছে বিশ্ববন্দিত টাকিলা‚ ভদকা বা স্কচের সঙ্গে |

মহুয়া শব্দটিতে যতই আদিবাসী অনুষঙ্গ থাকুক না কেন‚ উৎপত্তি  কিন্তু সংস্কৃত  মধুকা থেকে | অর্থ‚ মিষ্টি | মহুয়া গাছ ফুলে ভরে থাকে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল অবধি | পুরো বসন্ত জুড়ে | ফল পাকে জুন থেকে অগাস্টের মধ্যে | নেশা ছাড়াও মহুয়া ফলের বহু কার্যকারিতা আছে | এর বীজ থেকে তেল পাওয়া যায় | তা দিয়ে রান্না‚ প্রদীপ জ্বালানো তো হয়ই | লাগে সাবান তৈরিতেও | ফুল শুকিয়ে তা দিয়ে আচারও বানানো হয় | মহুয়া ফলের বীজে শাঁস থাকে | তা থেকে তৈরি হয় মহুয়া মাখন | 

বসন্ত কালে ভোর হওয়ার আগেই টুপটাপ ঝরে পড়ে মহুয়া ফুল | সেগুলো তুলে সংগ্রহ করেন আদিবাসী মহিলারা | তারপর তা গেঁজিয়ে তৈরি হয় কড়া মদ | মহুয়া ফুল‚ কাঁচা বা রোদে শোকানো‚ পুষ্টির উৎস আদিবাসী সমাজে | 

মহুয়াসক্ত বলে দুর্নাম আছে ভালুক বা শ্লথ বেয়ারের | তবে হরিণ আর বাঁদররাও এই রসে বঞ্চিত নয় | কিন্তু ভালুকের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া মুশকিল | গভীর রাতে তারা বেরোয় মহুয়া অভিসারে | ভরপেট মহুয়ার ফুল আর পাতা খেয়ে মাঝে মাঝে এমন হয়‚ নড়াচড়ার ক্ষমতাও লোপ পায় |

উল্লাস !

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here