একচোখে দৃষ্টিহীন‚ মুখ ক্ষতবিক্ষত বসন্তে‚ জীবনযুদ্ধে দগ্ধ পদ্মাবৎ-কবি নাকি শেষ দিনগুলোয় বনে বাঘ হয়ে ঘুরতেন !

যাঁর রূপকধর্মী বা অ্যালেগোরিক্যাল রচনা নিয়ে এত বিতর্ক সেই সুফীকবি মালিক মহম্মদ জয়সীর জন্মসাল অবধি জানা যায় না | ইতিহাস মনে রেখেছে তাঁর চলে যাওয়ার বছরকে‚ ১৫৪২ খ্রিস্টাব্দ | তার দু বছর আগে তিনি শেষ করেন পদ্মাবৎ বা পদুমাবৎ কাব্য রচনা | অওয়ধি ভাষায়‚ কিন্তু পারসিক নাশ্তালিক হরফে | তিনি আরও রচনা করেছেন | কিন্তু সে সব মুখ লুকিয়েছে পদ্মাবৎ-এর খ্যাতির আড়ালে | 

# জয়সীর জীবন নিয়ে বেশিরভাগ তথ্যই কিংবদন্তি নির্ভর | আজকের উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরের কাছে ছিল জয়স গ্রাম | মধ্যযুগে সুফী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র | তার থেকেই মালিক মহম্মদের পদবী জয়সী | তবে তিনি ওই গ্রামেই জন্মেছিলেন নাকি সুফীবাদে আকৃষ্ট হয়ে ওখানে এসেছিলেন‚ অত স্পষ্ট নয় |

# কিংবদন্তি ও লোককথা বলে‚ খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন তিনি | তার কয়েক বছর পরে মৃত্যু মায়েরও | সুফী ফকিরদের আশ্রয়ে ভবঘুরে জীবনেই বড় হন জয়সী | ততদিনে হারিয়েছেন এক চোখের দৃষ্টি | সারা মুখ ক্ষতবিক্ষত জলবসন্তের আক্রমণে |

# বিয়ে করেছিলেন জয়সী | বাবা হয়েছিলেন সাত ছেলের | কিন্তু একে একে সবাইকে হারাতে হয় | কথিত‚ তিনি এক সুফী পীরের আফিমের নেশাকে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন পোস্তিনামা | 

# ক্ষুব্ধ পীরের অভিশাপে ধসে পড়ে জয়সীর বাড়ির ছাদ | তিনি রক্ষা পেলেও প্রাণ হারান স্ত্রী ও সাত ছেলে | এরপর জয়সী গৃহীজীবন ছেড়ে নিজেকে উৎসর্গ করেন সুফীসাধনায় | 

# জয়সীর রচনায় দুই সুফী সাধকের প্রভাব লক্ষ করা যায় | একজন সৈয়দ আশরফ জাহাঙ্গীর সিমনানি চিস্তি এবং অন্যজন সৈয়দ মুহম্মদ | 

# সুফীসাধনার সঙ্গেই চলতে থাকে জয়সীর সাহিত্যচর্চা | ১৫২৯-১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে তিনি রচনা করেছিলেন আখিরি কলম | তখন দিল্লির মসনদে প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর |

# তবে যখন পদ্মাবৎ লিখছেন তখন দেশ শাসন করছেন পাঠান শাসক শের শাহ সুরী | তাঁর দাপটে দেশছাড়া বাবরপুত্র হুমায়ুন |

# কিছু লোককথা বলে আমেথির তৎকালীন রাজপুত রাজা রাম সিং আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন জয়সীকে | তাঁর সভাসদ হওয়ার জন্য | কারণ এক চারণকবির কাছে পদ্মাবৎ কাব্য শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি |

# আবার অন্য এক উপকথা বলে‚ সুফীসাধক জয়সীর আশীর্বাদে সন্তান লাভ করেন রাজা রাম সিং | কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি সভাকবি হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন জয়সীকে |

# কিন্তু রাজ-আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জয়সী | জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি কাটিয়েছিলেন আমেথির কাছেই এক জঙ্গলে | কথিত‚ তিনি নিজেকে বাঘে রূপান্তর করতে পারতেন |

# একবার শিকারে গিয়ে বাঘরূপী জয়সীকে হত্যা করে রাজার শিকারিরা | মৃত্যুকালে প্রকাশ হয়ে পড়ে তাঁর আসল রূপ | অর্থাৎ মালিক মহম্মদ জয়সীর চেহারা | 

# অনুতপ্ত রাজপুত রাজা নির্দেশ দিলেন মালিক মহম্মদ জয়সীর শেষকৃত্য যেন যথাযোগ্য ভাবে হয় | 

# মৃত্যুর ১০০ বছরেরও বেশি সময় পরে চারদিকে প্রচারিত হয় জয়সীর গুণকীর্তি | পরবর্তী কালের কবিদের দৌলতে |

# জয়সীর মোট ২৫ টি কাব্যের খোঁজ পাওয়া গেছে | সবথেকে বিখ্যাত অবশ্যই পদ্মাবৎ | উল্লেখ্য হল‚ তিনি শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে রচনা করেছেন কাহ্নাবৎ কাব্যও | 

আমেথি থেকে ৩ কিমি উত্তরে রাম নগরে আছে এই সুফীকবির সমাধি | পোশাকি নাম জয়সী স্মারক | আজ বড়ই অবহেলিত | স্থানীয় কয়েকজন ছাড়া কেউ খোঁজই রাখে না | অনাদরে শেষশয্যায় ঘুমিয়ে আছেন পদ্মাবৎ-এর কবি | ইহজীবনে দগ্ধ হয়েছিলেন দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা আর দারিদ্র্যে | মৃত্যুর পরেও তাঁর সমাধির জন্য তুলে রাখা হয়েছে শুধুই বিস্মৃতি | 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here