‘সহজ পাঠের গপ্পো’র টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের রক্ত জল হয়ে গেছে : মানস মুকুল পাল 

ইদানিংকালে সবচেয়ে হইচই ফেলে দেওয়া বাংলা সিনেমার নাম সম্ভবতঃসহজ পাঠের গাপ্পো | দর্শক‚ সমালোচক নির্বিশেষে প্রশংসা‚জাতীয় পুরস্কার পাওয়া থেকে রিলিজের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বঞ্চনা‚ আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল সহজ পাঠের গাপ্পো | ছবির পরিচালক মানস মুকুল পাল-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় তন্ময় দত্তগুপ্ত |


‘সহজ পাঠের গপ্পো’র আগে আপনার সিনেমা করার অভিজ্ঞতা ছিল না।সিনেমাচর্চা ঠিক কবে থেকে শুরু হল?  

মানস মুকুল পালঃ চর্চা বলতে আমি আমার চারপাশের মানুষকে খুব ভালো করে দেখি।আমি গ্রাম শহর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরি।তাদের জীবনকে ভালো ভাবে দেখি।ফিল করি।এটাই আমার সব থেকে বড় চর্চা।সিনেমা আল্টিমেটলি মানুষের কথা বলে।সেজন্য চারপাশের মানুষকে দেখাটা খুব জরুরি।আমি বারাসাতের মানুষ।আমার জন্ম বসিরহাটে।সেই সুবাদে বছরে এক বার সেখানে যাওয়া হত।সেই আমার গ্রাম দেখা।আমি সব রকমের  ছবি দেখি।আমার দেখা প্রথম ছবি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’।সেখান থেকেই ভালো লাগার জন্ম।তখন খুবই ছোট।  

সেই ছবি দেখে কী মনে হয়েছিল?  

মানস মুকুল পালঃ আমি বাবাকে বলি বাবা তুমি গুপী বাঘাকে একদিন আমাদের বাড়িতে ডাক।বাবা বলে ওরা সত্যি নয়।আমি ভাবি এই তো ওদের দেখলাম।তালি বাজিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে।তাহলে সেটা সত্যি নয় কেন?এই সন্দেহ থেকে ভালো লাগার জন্ম।  

কবে ঠিক কোন জায়গা থেকে পরিচালক হবার ইচ্ছে হল?  

মানস মুকুল পালঃআমি মূলত অভিনয় করতে চেয়েছিলাম।সিনেমার কোনও ব্যাকগ্রাউণ্ড আমার ছিল না।কলেজে পড়ার সময় দৌড়াদৌড়ি করে কিছু অভিনয়ের সুযোগ পেলাম।কিন্তু আমি যে ধরনের অভিনয় করতে চেয়েছি,তেমন করতে পারছিলাম না।আমার মধ্যে বিরক্তি এবং হতাশা আসে।এখানে ব্যাকিং না থাকলে প্রথমেই ভালো সুযোগ পাওয়া মুশকিল।আমি অভিনয় বন্ধ করে দেই।দীর্ঘ তিন বছর আমি আর  অভিনয় করি না।সেই সময় আমি এন জি ওতে পড়াতাম।কিন্তু কোথাও সিনেমাকে মিস করতাম।হঠাৎ একদিন মনে হল দেখি না একটা সিনেমা বানানো যায় কিনা।ইনফ্যাক্ট ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ আমার লেখা প্রথম স্ক্রিপ্ট।  

ছবির সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত।যেমন টেকনিক্যাল দিক।টেকনিক্যাল দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।সে জ্ঞান হল কী করে?  

মানস মুকুল পালঃ আমার মনে হয় একটা ছবির সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল গল্প।টেকনিক্যালি উইক হলেও গল্পের জন্য মানুষ ছবি দেখবে। আমি কাদের কথা বলতে চাইছি,কেন বলতে চাইছি এবং কতটুকু বলতে চাইছি—এই তিনটে জিনিষ যদি আমার কাছে পরিষ্কার  থাকে, তাহলে একটা ছবি পরিচালনা করা যাবে।কারণ ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফি, এডিটিং, সাউণ্ড ডিজাইনিং তৈরী হয় ওই তিনটে জায়গা থেকে।আমার কাছে ওই তিনটে বিষয় খুব পরিস্কার ছিল।আমি ছোটু, গোপালের কথা বলতে চেয়েছি।আপনি শুনলে অবাক হবেন,সহজ পাঠের গপ্পো’র আগে আমি কোনদিন এডিটিং, ডাবিং, সাউণ্ড মিক্সিং ঘরে ঢুকিনি।  

বাবা এ তো মিরাকেল!তা এই মিরাকেল ঘটানোর জন্য কিছু তো টেকনিক্যাল সেন্স থাকা দরকার।সেই সেন্স কি কাজ করতে গিয়ে এলো?  

মানস মুকুল পালঃ আমি গোটা ছবির এডিট নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করেছি।শট ডিভিশন আমার পুরো অঙ্ক কষে করা।কারণ আপনি দেখবেনএই ছবির এডিট অন্য ছবির থেকে আলাদা।  

আপনার এই পরিমিতি বোধের পেছনে অতীতের দেখা কোনও ছবি বা সাহিত্যের সেন্স কাজ করেছিল?  

মানস মুকুল পালঃ এটা আমি অনেক ভেবে দেখেছি।ভেবে বুঝতে পেরেছি,যে ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ একদমই আমার ছবি।এবং স্বতন্ত্র।দেখুন কাজের মিল থাকতেই পারে।সিনেমা আজকের নয়।একশো বছরের পুরনো একটা মাধ্যম।সিনেমা ভালো লাগাটা এক বিষয়।ইনয়েফ্লুন্স অন্য আর একটা বিষয়।আমি কিন্তু কোনও ছবির দ্বারা প্রভাবিত নই।  

‘সহজ পাঠের গপ্পো’ কাশবন, রেলগাড়ি, আকাশে তুলোর মতো মেঘ ভীষণ ভাবে পথের পাঁচালীর কথা মনে করায়।কোথাও কি ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ আজকের সময়ের ‘পথের পাঁচালী’?  

মানস মুকুল পালঃ ‘পথের পাঁচালী’ এবং ‘সহজ পাঠের গপ্পো’র আত্মা কিন্তু এক।এই আত্মাটা হল গ্রামবাংলা।আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে যদি গ্রামবাংলা থাকে তাহলে এই রকমই থাকবে।তখন কেউ গ্রাম বাংলা নিয়ে ছবি করলে পথের পাঁচালী বা সহজ পাঠের গপ্পের সাথে মিল থাকবে।গ্রামে বৃষ্টি নামলে ওই ভাবেই নামবে।বাচ্চারা ভিজলে ওইভাবে ভিজবে।এবং কাশফুল একই রকম ভাবে সুন্দর থাকবে।  

আজকের সময় গ্রাম বাংলার চরিত্র বদলে যাচ্ছে।ওখানে মোবাইল ফোন প্রবেশ করেছে।ইন্টারনেট প্রবেশ করেছে।গ্রামের বৃষ্টির পাশাপাশি নেট খুলে যে কোনও দেশের বৃষ্টিও কোনও কোনও বাচ্চা দেখে বা দেখতে পারে।আমার প্রশ্নটা এখানেই।বিভূতিভূষণের ‘তালনবমী’ কি আপনার কাছে পিরিয়ড পিস নাকি ‘সহজ পাঠের গপ্পো ‘এই সময়ের গল্প?  

মানস মুকুল পালঃ ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ এই সময়ের গল্প।আপনি খেয়াল করে দেখবেন এক জায়গায় মিঠুন চক্রবর্তীর রেফারেন্স আছে।মিড ডে মিলের রেফারেন্স আছে।সেই দিক থেকে এটা এই সময়ের গল্প।  

এই ছবিতে দুজন শিশুর চোখ দিয়ে গ্রাম বাংলা দেখানো হয়েছে বলেই কি গ্রাম বাংলা অনেক সবুজ,অনেক সরল?  

মানস মুকুল পালঃ এই গ্রাম বাংলা এখনও আছ।আমি আলাদা করে কিছু ক্রিয়েট করিনি।শহুরে জীবনে থাকতে থাকতে আমিও হাঁপিয়ে উঠতাম।তখন গরমের ছুটির সময় গ্রামের বাড়িতে যেতাম।সেখানে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছি।আম বাগানে ছুটেছি।বৃষ্টিতে ভিজেছি। আমার মনে হয় সেই সবুজ,সৌন্দর্য আমার মধ্যে আছে।সহজ পাঠের গপ্পো’র আগে শেষ কবে বাংলা ছবিতে গ্রাম দেখেছি, মনে পড়ে না।  

একটা সিনেমা তৈরী করতে গেলে যেটা প্রাথমিক এবং প্রধান, সেটা হল অর্থ।সিনেমায় অর্থ লগ্নি , মার্কেটিং, পাবলিসিটি এই সমস্ত কাজ আপনি আগে করেন নি।কিন্তু প্রথম ছবিতেই বেশ ভালোভাবেই করে ফেললেন।প্রথম পরীক্ষায় হায়েস্ট মার্ক পেয়ে পাশ করার রহস্যটা কী?  

মানস মুকুল পালঃআমি একজন দর্শক হিসেবে ছবি দেখতে যাওয়ার সময় কতোগুলো জিনিস দেখতাম।দর্শকের জায়গা থেকে আমি শিক্ষা নিয়ে এগিয়েছি।যদিও আমার অর্থবল ছিল না।তার মধ্যেও আমি চেষ্টা করেছি।  

কিন্তু আমি শুনেছি আপনি ছবি করতে গিয়ে অনেক সময় নিয়েছেন।ভালো না লাগলে সেই শট বার বার নিয়েছেন।এডিটিংয়ে প্রচুর সময় দিয়েছেন। তাই কী?  

মানস মুকুলঃ হ্যাঁ, আমি ডাবিংয়ের পেছনে সাড়ে তিন মাস সময় দিয়েছি।  

এখানেই প্রশ্ন।আপনি বলছেন আপনাদের বাজেট ছিল সীমিত।কিন্তু সাড়ে তিন মাস ডাবিং করলে ঘন্টা পিছু টাকা যায়।বা প্যাকেজে কাজটা হয়।এর সঙ্গে যিনি সাউণ্ড মিক্স করছেন,তাকেও পারিশ্রমিক দিতে হয়।এখানেই তো আপনার বাজেট অনেক বেড়ে গেল। অন্যান্য প্রযোজকের থেকে এখানে তাহলে তো অর্থ লগ্নি হচ্ছে বেশি।তাহলে কি সহজ পাঠের গপ্পো বিগ বাজেটের ছবি?  

মানস মুকুল পালঃ আসলে আমি একটা লক্ষ্যে স্থির ছিলাম।মানে আমি ছবিটাকে যেমন দেখেছি তেমনই বানাবো।তার জন্য যা যা করার প্রয়োজন তাই করব।বিশ পঞ্চাশ বছর বাদে মানুষ যখন ছবিটা দেখবেন তখন ছবিটার মেরিট দেখবেন।বাজেট ক্রস করে গেছিল কিনা  সেটা দেখবে না।কিংবা ছবিটা কোন পরিস্থিতিতে পরিচালক তৈরী করেছিল সেটা কেউ ভাববে না।  

আপনি যেটা বলছেন,সেটা কিছুটা ঠিক।সবটা নয়। সত্যজিৎ রায় মিচেল ক্যামেরায় কতোদিন পথের পাঁচালী শুট করেছিলেন বা কোন  পরিস্থিতিতে পথের পাঁচালী করেছিলেন,সেটা নিয়ে একজন ফিল্মের ছাত্র এতো বছর পরেও ভাবিত।কিংবা কী নিদারুণ যন্ত্রণায় ঋত্বিক তার ছবিগুলি করেছিলেন,তার নিঁখুত হিসেব একজন ফিল্মের ছাত্র রাখেন।বা কেন জাঁ লুক গোদার অর্থের অভাবে জাম্প কাটের  ব্যবহার করলেন— এসব কিন্তু অনেকের নখদর্পণে।সেক্ষেত্রে আপনার প্রযোজক বন্ধু এই ব্যাপারে কতটা ওয়াকিবহাল ছিলেন?  

মানস মুকুল পালঃঅভিজিত আমার ছোট বেলার বন্ধু।কিন্তু সেও ছবির মানুষ নয়।স্ক্রিপ্ট করার পর আমি আমার পরিচিত মানুষকে শোনাই।তারা সবাই ভালো বলেছিল।আর বলেছিল বি ভেরি কেয়ারফুল,সহজ পাঠের গপ্পোর কনসেপ্ট যেন চুরি না হয়।আমি তখন দেখি আমার কোন বন্ধু এই ছবি প্রোডিওস করতে পারবে।ফাইনালি আমি অভিজিতকে বাড়িতে ডাকি।ও আসে।ওকে শোনাই। ওর শুনে ভালো লেগেছিল।অভিজিত সেদিন বলেছিল, সিনেমাটা আমরা বানাবো।তার জন্য যা করতে হয় করব।এর থেকে বড় সাপোর্ট আর কিছু হয় না।কলকাতায় খুব অদ্ভুত ভাবে ছবি হয়।এখানে দুদিনের মধ্যে গ্রেডিং কমপ্লিট করা হয়েছিল।সেখানে বড় বড় ছবির গ্রেডিং চলছে।দুজন আনকোরা ছেলেকে কেউ তেমন পাত্তা দেইনি।তারা বলে দুদিনের বেশি সময় দেওয়া যাবে না।যেটা আমার একেবারেই ভালো  লাগেনি।গ্রেডিং নিয়েও আমি সন্তুষ্ট ছিলাম না।সেই গ্রেডিং আমি ফেলে দিয়ে বম্বে চলে যাই।শুধু গ্রেডিং বলে নয়, কলকাতায় একটা প্রপার মিক্সিং স্টুডিও নেই।এই ছবির সাউন্ড ডিজাইনিং আমি নিজের হাতে করেছি।আমি দিনের পর দিন গ্রামে ঘুরেছি।বিভিন্ন শব্দ রেকর্ড  করেছি।ওই ছবি মন দিয়ে দেখলে সাউণ্ডের অনেক লেয়ার বুঝতে পারবেন।কলকাতায় সাউণ্ড মিক্স করার পর আমি সেই লেয়ারগুলো পাচ্ছিলাম না।আমি তাই বম্বেতে সুভাষ ঘাইয়ের স্টুডিওতে যাই।আমি আবার নতুন করে খরচা করে মিক্স করাই।আমার বন্ধুর সাপোর্ট  না পেলে সহজ পাঠের গপ্পো এই জায়গায় পৌছাতো না।


সহজ পাঠের গপ্পোর গ্রাম কি ওই দুই শিশুর চোখ দিয়ে দেখা গ্রাম?  

মানস মুকুল পালঃ যে গ্রাম আপনি দেখেছেন সেটা ওদের পারিপার্শ্বিক।  

বিভূতিভূষণের অপু,দুর্গা,সর্বজয়া,গোপাল —আজকের সময়ে এরা কেউ রিয়ালিটিতে বিলং করে না।এখন গ্রামের কোনও ছেলে বা মেয়ে কি এই ইনোসেন্স কনসিভ করে?নাকি গ্রাম -জীবনকে বিদায় দিয়ে শহরে চলে আসে?  

মানস মুকুল পালঃ এটা কষ্টের জায়গা।কিছু করার নেই।এখানে আমি আপনি সবাই হেল্পলেস।  

এখান থেকে মুক্তি বা অবলম্বনের রাস্তা কি ভালো চলচ্চিত্রে গ্রামজীবন দর্শন?  

মানস মুকুল পালঃ নিজের মধ্যে এই সারল্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।আবার এই সারল্য চেষ্টা করেও বাঁচিয়ে রাখা যায় না।এটা সম্পূর্ণ ভেতরের ব্যাপার।সিনেমা দেখে এটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না।  

এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসছি।চলচ্চিত্র নিঃসন্দেহে একটা শিল্প।আবার চলচ্চিত্র ব্যবসাও।পৃথিবীর সব ব্যবসার লেনদেন, হিসেব খরচ প্রয়োজনে চোখের সামনে হাজির করা সম্ভব।কোনও ছবি বাণিজ্যিক সাফল্য পেল কি পেল না,তার কোনও স্বচ্ছ ট্রানজাকশান পরিচালক প্রযোজক দর্শকদের দেখান না।শুধু মুখেই মারিতং জগৎ।এ্যকচুয়াল লাভ ক্ষতি কেউ জানতে পারে না।এটা নিয়ে কী বলবেন?  

মানস মুকুল পালঃ এখন সমস্যা হল, দুসপ্তাহ কোনও ছবি চললে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে গৌরবময় সপ্তাহ বলা হয়।বা ছবি হিট বলে নাচানাচি আরম্ভ হয়ে যায়।আমি জানি না এ্যাকচুয়ালি হিটের ডেফিনিশন কি!প্রচুর মানুষের ছবি ভালো লেগেছে বা যে টাকাটা ইনভেস্ট করা হয়েছে সেই টাকাটা উঠে এসেছে,এটা যদি হিটের সংজ্ঞা হয়, তাহলে সহজ পাঠের গপ্পো জেনুইনলি হিট ছবি।  

এখানে কি প্রোডিওসার ডিরেক্টরদের আরেকটু ট্রান্সপারেন্ট হওয়া প্রয়োজন?  

মানস মুকুল পালঃ প্রথম কথা হল, প্রযোজকের দেখা উচিত ছবির মেরিট।হিট ফ্লপের আগে তাকে বুঝতে হবে আদৌ কি ছবিটার আরকাইভাল ভ্যালু আছে।এর সঙ্গে আছে অর্থের প্রশ্ন | প্রযোজক যে টাকাটা ইনভেস্ট করলেন,তার কতটা ফেরত পেলেন,সেটাও দেখা  দরকার। বা সেই টাকা এখন না উঠে এলে ভবিষ্যতে কতোটা রিকভার করা যাবে।আর আপনার কথা অনুযায়ী প্রোডিওসার ঠিকঠাক পরিসংখ্যান দিলে অন্য প্রযোজক বা পরিচালক বুঝতে পারবে একচুয়াল মেথডটা।কিন্তু এটা কেউ করবে না।সে তার ঘনিষ্ঠ লোকজনকে বলতে পারে।কিংবা পরবর্তী প্রোজেক্টে নিজের ভুলগুলোকে রেক্টিফাই করতে পারে।কিন্তু কখনও পাবলিকলি তিনি বলবেন না যে তার ছবি ফ্লপ। 

কলকাতায় পরিচালকদের নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।কারণ ইস্টার্ন ইন্ডিয়ান মোশন পিকচারস এ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী বা ফেডারেশনের নিয়ম অনুযায়ী তাকে নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক টেকনিশিয়ান নিতেই হবে। ট্রলিম্যান না লাগলেও নিতে হবে।লাইট না লাগলেও  নিতে হবে।কেউ যদি কুড়ি লাখ টাকায় ছবি শেষ করতে চায়,তাহলে পারবে না।এই এত রকমের নিয়মকে আপনি কীভাবে দেখেন?  

মানস মুকুল পালঃনিউট্রালি উত্তর দিচ্ছি।যার কাছে শুধুমাত্র দশ লাখ টাকা পুঁজি,তার ক্ষেত্রে এটা সত্যি অসুবিধাজনক। কারন অপ্রয়োজনীয় কিছু মানুষকে নিলে তার একস্ট্রা খরচ হবে।এর মধ্যে আমিও পড়ি।আমিও খুব কষ্ট করে ছবিটা করেছি। আমি আমার প্রযোজক ধার দেনা করে ছবি করেছি।ব্যাক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়, ফিলমের সঙ্গে অনেক মানুষ জড়িত।ট্রলি সেটার, স্পট বয়,রিফ্লেক্টর ম্যান আরো অনেকে।এবার আমি আপনাকে প্রশ্ন করছি,ওই রুল যদি না থাকে তাহলে প্রত্যেকেই এই এ্যাডভান্টেজ নেবে।তখন টেকনিশিয়ানদের কি হবে?তাদের তো এই করেই জীবন চলে।এটা খুব নিউট্রালি বললাম।সহজ পাঠের গপ্পোর টাকা জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের রক্ত জল হয়ে গেছে।এই নিয়ম উঠে গেলে বিগ বাজেটের ছবিতেও তারা কাটিং করতে চাইবে।তখন একজনকে দিয়ে দুজনের কাজ হবে।  

সহজ পাঠের গপ্পো জাতীয় পুরস্কার পেল।আপনার কাছে এখন কাজ আসছে।পরের ছবি করার সময় আপনার কি সহজ পাঠের গপ্পোর  মতো এ্যাটিটিউড থাকবে নাকি একটু কম্প্রোমাইজের পথে হাঁটবেন? 

মানস মুকুল পালঃ আমি এখন অবধি ন’টা ছবির অফার ফিরিয়ে দিয়েছি।আগের অনেস্টি নিয়ে আমি আমার ছবি বানাব। 

টেকনিশিয়ানদের রেটের মতো গ্রেডেশন অনুযায়ী ডিরেক্টরদেরও কি রেট থাকা উচিত বলে মনে হয়?  

মানস মুকুল পালঃ এটা খুব ক ঠিন প্রশ্ন।এর মানদণ্ড কে ঠিক করবে? 

কেন ফেডারেশন বা ইম্পা ঠিক করবে।যারা টেকনিশিয়ান রেট ঠিক করছেন।আর এটা না হলে কি ধরে নিতে হবে সাউন্ড রেকর্ডিস্ট,বা যিনি  লাইট করছেন তিনি ক্রিয়েটর নন ।একমাত্র ক্রিয়েটর ডিরেক্টর ? 

মানস মুকুল পালঃ মেন টেকনিশিয়ান মানে সিনেমাটোগ্রাফার,মিউজিক ডিরেক্টর তারা কিন্তু ওই গিল্ডের রেট নেন না।তার থেকে অনেক বেশি নেন।এ্যাসিসটেন্ট ক্যামেরা ম্যান, এ্যাসিসটেন্ট এডিটর তাদের রেট গিল্ডের নিয়ম অনুসারে হয়। 

ডিরেক্টর প্রোডিওসারের কাছ থেকে কুড়ি লাখ টাকা রেমুনারেশন নিলেন।সেক্ষেত্রে ওই টাকা পাঁচ লাখ হলে ছবিটা অনেক কম বাজেটে শেষ হতে পারে।বা ওই টাকা প্রোডাকশনের অন্যান্য ক্রিয়েটিভ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারত।আপনার কখনও কি মনে হয় এই নিয়ম অসম নিয়ম? 

মানস মুকুল পালঃ প্রোডিওসার ছবির বাজেট জেনেই ছবি করতে আসেন।এখানে একটা কথা আছে।কোনও কোনও ডিরেক্টর বছরে তিন চারটে ছবি করেন।এবার ধরুন যে ডিরেক্টর তিন বছর ধরে একটা ছবি বানায়,তাকে যদি রেট চার্টে বাধা হয়,সে তো না খেতে পেয়ে মরবে। 

পরিচালক অঞ্জন দত্ত একটা কথা বলেছেন, ফিল্ম একমাত্র ডিরেক্টরদের সোর্স অফ ইনকাম হতে পারে না রোজগারের জন্য  ডিরেক্টরদের আরো অন্য কিছু করতে হবে। সত্যজিৎ রায় তার শেষ ছবির জন্য দশ হাজার টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন।এটা নব্বইয়ের দশকের কথা বলছি। এবার ওই সময়ে অন্যান্য ছবির পরিচালক অনেক বেশি পারিশ্রমিক পেতেন।কী বলবেন? 

মানস মুকুল পালঃ এই যে ছবি করা ছাড়া তাকে পাশাপাশি অন্য কিছু করতে হবে,এই সিস্টেমে আপনার মনে হয় না ছবির মান ক্রমশ  পড়ে যেতে পারে? 

একথা কেন বলছেন?সত্যজিৎ বাবু বছরে কটা ছবি করতেন?উনি এ্যাডের কাজ করতেন।সন্দেশ এডিট করতেন।গল্প লিখতেন,ইলাস্ট্রেশন করতেন কই ছবির মান পড়ল না তো!ঋত্বিক ঘটক এফ টি আইয়ের ভাইস চ্যান্সেলার ছিলেন, ছবিও করেছেন।কোথাও ছবির মান পড়ে গেছে বলে তো মনে হয় না।তাহলে এখনকার মেকারদের ছবির মান পড়ার কারণ কী?  

মানস মুকুল পালঃ সত্যজিৎ বা ঋত্বিকের সিনেমা বাদে অন্য কাজ করাটা কি শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য বলে আপনার মনে হয়? 

অর্থ তো একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। 

মানস মুকুল পালঃ এবার আপনি আমায় বলুন, একজন মানুষ শুধু ছবির জন্য একশো ভাগ দিতে চায় এবং বাঁচতে তার যা প্রয়োজন সেই  টাকাটা সে নিচ্ছে।এতে অন্যায় কোথায়? ভুলটা কোথায়?  

ভুল বা অন্যায়ের কথা নয়।আপনার কথাই বলছি,একজন মানুষ বছরে একটা ছবি করল।কুড়ি লাখ টাকা নিল।তার মানে তার মাসে আয় এক লক্ষ টাকার ওপর।একজন ছেলে নতুন প্রাইভেট ফার্মে চাকরী করলে এই টাকা তার কাছে সোনার পাথর বাটি পাওয়ার মতো। 
সারা বছর মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও সে এই টাকা রোজগার করতে পারে না।এবার আপনি বলুন এখনও কি আপনার মনে হচ্ছে না এই পারিশ্রমিক খুব লজিক্যাল নয়? 

মানস মুকুল পালঃপ্রথম কথা হল এই জায়গাটা আমি সমর্থন করিনা।আমি দু’বছরে একটা ছবি বানাব।এবং সেটা আমি ছবির মতো ছবি বানাব।এবং সেটা বানানোর জন্য আমি পৃথিবীর সমস্ত কিছু ভুলে যাব।সেই দিক থেকে আমার রাইট আছে আমার দুবছরের খরচার মতো রেমুনারেশন নেব।কিন্তু কুড়ি লাখ টাকা নিয়ে বছরে চারটে ছবি করা হল।একটা ছবির শুটিং চলছে তার পাশাপাশি পরের ছবির প্রি প্রোডাকশনের কাজ আরম্ভ করে দেওয়াটা সমর্থনযোগ্য নয়।এটা পয়সার জন্য করা হচ্ছে।আরেকটা কথা বলব। 

কী? 

মানস মুকুল পালঃ আমার পরের ছবির রিসার্চের জন্য আমি দু’বছর সময় নেব।তিন বছরের মাথায় আমার পরের ছবির কাজ শুরু করব।এবার ধরুন চার বছরের মাথায় আমি তো আর পয়সা রোজগারের জন্য আরেকটা ছবি করতে পারব না।তাহলে এই চার বছর আমার যাতে চলে, সেই ভাবনা ভাবতেই হবে।এমনও তো হতে পারে যে চার বছরের মাথায় গিয়ে আমার কোনও এ্যাক্সিডেন্ট হল। আমি আর ছবি বানাতেই  পারলাম না।চাকুরীজীবীদের থেকে আমাদের এই জায়গায় পার্থক্য থেকেই যায়। 

আপনি যে অনিশ্চয়তার কথা বলছেন,সে অনিশ্চয়তা সব ক্ষেত্রে আছে। 

মানস মুকুল পালঃ তা আছে।কিন্তু সরকারী চাকরীর ব্যাপারে সে সুবিধা আলাদা। 

আপনার পরের প্রোজেক্ট হল সবাধীনতা সংগ্রামী দীনেশ গুপ্তর জীবন।কেন এই বায়োপিক? 

মানস মুকুল পালঃ এই মানুষগুলোর কথা আমি ছোট থেকে পড়েছি।আজকের সময় আমরা প্রত্যেকেই স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি।আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি।আমরা নিজে বাঁচলেই হোল।পাশের মানুষ মরল কি বাঁচল আমাদের দেখার দরকার নেই।এমন সময় দাঁড়িয়ে এই মানুষগুলোর কথা  বলা দরকার।আজ ভালোবাসা আর অনেস্টি হারিয়ে গেছে।সব সমস্যার মূল কারণ এটাই।সবাধীনতা সংগ্রামীরা আমাদের জন্য এতো কিছু  করল, সেই মানুষগুলোর কথা আজকের জেনারেশন ভুলতে বসেছে। বিনয় বাদল দীনেশ বললে তবুও কেউ বোঝে।কিন্তু শুধু দীনেশ গুপ্ত বললে চিনতেই পারে না।এটা কতোটা প্যাথেটিক ভাবুন,এই মানুষগুলো দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে।আর এরাই বিস্মৃত।এখন তাও বিনয় বাদল দীনেশ  বললে কেউ কেউ চেনে।পরবর্তী জেনারেশন হয়ত জানবেও না।এটা আমার রাগের জায়গা বা কষ্টের জায়গা।সেখান থেকেই এই ছবি সম্পর্কে ভাবা।  


এই ছবির চরিত্র নির্বাচন নিয়ে কিছু বলুন।  

মানস মুকুল পালঃ আমি যা বলার বলেছি।এর থেকে এই ছবি সম্পর্কে এই মুহূর্তে আর বিশেষ কিছু বলার নেই।  

জীবনে আনন্দ যেমন থাকে কষ্টও থাকে।কষ্টের সময় কষ্টকে বিদায় জানান কী উপায়ে?  

মানস মুকুল পালঃ দেখুন কষ্ট না থাকলে আনন্দের মাহাত্ম্য বোঝা যায় না।সহজ পাঠের গপ্পো আজ সফল হয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে অনেক কষ্ট আছে।এই ছবি করতে গিয়ে আমাকে অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে।এই কষ্টের গুরুত্ব আছে।কষ্ট পাওয়ার একটা মূল্য আছে।  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here