মণিকর্ণিকা : ইনি কি ঝাঁসির রানি নাকি আমেরিকান কমিক স্ট্রিপের নায়িকা?

ছবি দেখতে বসে একদম শুরুর থেকেই মনে হচ্ছিল যে, এটা কাকে দেখতে হচ্ছে স্ক্রিনে? আদৌ ইনি ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই? নাকি আসলে ইনি আমেরিকান কমিক স্ট্রিপের সেই হিরোইন, বছর দুয়েক আগে যাঁকে নিয়ে জমজমাট সিনেমাও হয়ে গেছে একটা?

বুঝতেই পারছেন, বলছি ‘ওয়ান্ডার উওম্যান’-এর কথা। ২০১৭ সালের ছবি। আমার কথা বাড়াবাড়ি মনে হলে নতুন করে কেউ একটা সে ছবির টপ সিনগুলো চেক করে দেখুন প্লিজ।

দেখবেন এক হাতে ঢাল আর অন্য হাতে তরোয়াল নিয়ে গ্যাল গ্যাডোটের বেশিরভাগ অ্যাকশন মুভমেন্টগুলো খাপে খাপ এ ছবির কঙ্গনা রানাওয়াতের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে কিনা।  

ইতিহাস নিয়ে সিনেমা বানাতে গিয়ে বলিউড মাত্রাজ্ঞান রাখতে পারে না জানি। সম্রাট অশোকের ম্যানারিজম আর কথা বলার ভঙ্গী তাই হয়ে যায় শাহরুখ খানের মত। উত্তর প্রদেশের ব্রাহ্মণ মঙ্গল পাণ্ডে কথা বলেন আমির খানের স্টাইলে। আর আকবরকে দেখতে যে হৃত্বিক রোশনের মত ছিল, হজম করতে হয় সেটাও।

কিন্তু তাই বলে ঝাঁসির রানিকে কোনদিন এই রূপে দেখতে হবে, আন্দাজ করি নি আগে। শুরুতে মাপমত একটা ডিসক্লেমার ঠুকে দিলেই বুঝি ইতিহাসের মানুষজনকে দিয়ে যা খুশি তাই করানো যায় স্ক্রিনে?   

আজ থেকে বহু বছর আগে ঝাঁসির রানির প্রামাণ্য জীবন-চরিত লিখেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। রানির জীবন-উপাদান সংগ্রহ করতে ২৬ বছর বয়সে একা পৌঁছে গেছিলেন সেই সময়ের বিপদসংকুল ঝাঁসি! কথা বলেছিলেন রানির ভাইপো গোবিন্দ চিন্তামণি তাম্বে এবং রানির পোষ্যপুত্র দামোদর রাওয়ের ছেলে লক্ষ্মণ রাওয়ের সঙ্গে। দীর্ঘ রিসার্চ শেষে লেখা হয়েছিল জীবনী। প্রথমে ১৯৫৫তে সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকা ধারাবাহিক ভাবে ছেপে বের করে সেটা। পরের বছর ‘নিউ এজ পাবলিশার্স’ থেকে বই। ‘সিগাল বুকস’ থেকে ২০০০ সালে ইংরেজি অনুবাদও ছাপা হয়।

সিনেমাটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এরকম প্রামাণ্য সব জীবন-চরিত পড়ে দ্যাখার কথা কি আদৌ মনে হয় নি নির্মাতাদের কারুর? নাকি ইচ্ছে করেই পুরো ছবির ট্রিটমেন্টটা করাই হয়েছে ধুমধাড়াক্কা ফ্যান্টাসি ছবির মোডে? যে হিস্ট্রি-ফিস্ট্রি সরিয়ে রেখে গুছিয়ে একটা সুপারহিরো মার্কা কিছু নামিয়ে দিতে হবে!

ছবির শুরুতে তির-ধনুক দিয়ে তরুণী মণিকর্ণিকার বাঘ ঘায়েল করার দৃশ্য রয়েছে একটা। সিনটা দেখতে দেখতে আঁতকে উঠছিলাম আমি প্রায়। একে তো ভিএফএক্স দিয়ে তৈরি বাঘটা দেখতে খুব খারাপ। অনেকটা ‘অ্যাডভেঞ্চার্স অফ জোজো’র (২০১৮) বাঘের মত। তার ওপর জাস্ট একটা তিরের ঘায়ে সেই বাঘ যেভাবে মূর্ছা গেল, দেখে বুঝতে পারছিলাম না যে এটা আদৌ বাঘ নাকি বাঘের ছদ্মবেশে ছাগল-টাগল কিছু।

সবচেয়ে ডেঞ্জারাস ব্যাপারটা ঘটল এরপর। সংজ্ঞাহীন বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়ে মণিকর্ণিকা বোঝাতে লাগল যে বাঘটাকে না মেরে কেন ও জাস্ট অজ্ঞান করে দিল। বাঘ ও মারতে চায় না, কারণ অকারণে প্রানীহত্যায় নাকি মত নেই ওর কোন। তবে বাঘটাকে যাতে গ্রাম থেকে দূরে গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসা যায়, তাই ওকে তিরের আঘাতে অজ্ঞান করে দেওয়া!

এই ব্যাখ্যা শুনে আমার ভোঁ-ভোঁ করছিল মাথা। এই ভাষণ যিনি লিখেছেন, তিনি খোঁজ নিয়ে এটা দ্যাখেন নি যে, বাঘকে এভাবে আহত করে বনে ছেড়ে দেওয়া বড় রকমের ভুল। মানুষ বাঘের স্বাভাবিক আহার নয়। কিন্তু আহত বাঘের স্বভাবই হল অন্য শিকার ধরতে না পেরে ক্রমে ক্রমে মানুষখেকো হওয়া!

এবার অন্য একটা মজার কথা বলছি এখানে শুনুন। সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে যে, বাঘের শরীর তাগ করে তির ছুঁড়তে দেখেই মুগ্ধ হয়ে মণিকর্ণিকাকে ঝাঁসির রাজপরিবারের বধূ হিসেবে বেছে নিলেন দীক্ষিতজী (কূলভূষণ খারবান্দা)। আর এই বাঘের দৃশ্যে মণিকর্ণিকার ভূমিকায় আপনি অভিনয় করতে দেখতে পাবেন থার্টি প্লাস বয়সের কঙ্গনাকেই! কিন্তু ইতিহাস কী বলছে জানেন? কনে পছন্দ করার সময় ওই মণিকর্ণিকার বয়স ছিল সাড়ে সাত বছর মোটে!

উলটে দেখুন রানি-জীবনীর পাতা। ‘তাঁতিয়া দীক্ষিত (মণিকর্ণিকার) জন্মকুণ্ডলী পত্রিকা দেখে সবিশেষ আকৃষ্ট হলেন… মেয়েটিকে দেখবার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। মনুকে সেই ঘরে আনা হল। তাঁতিয়া দীক্ষিত কনে দেখলেন। সাড়ে সাত বছর বয়েস, কিন্তু বুদ্ধিতে উজ্জ্বল সপ্রতিভ চেহারা’। (‘ঝাঁসির রাণী’, মহাশ্বেতা ভট্টাচার্য, অধ্যায় চার)।

সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে, বিয়ের আগেই নাকি অস্ত্রবিদ্যায় তুখোড় এই মেয়ে। অসিযুদ্ধে সব্বাইকে হারিয়ে দিয়ে সবার মাথা টপকে টপকে উঠে যাচ্ছে বিরাট হাতির পিঠে! এবার ইতিহাসে সত্যি সত্যি কী হয়েছিল, সেটাও একটু শুনুন।

‘বৃদ্ধ বাজীরাও এই মা-মরা মেয়েটিকে স্নেহ করতেন।… বাজীরাও-এর প্রাসাদে মনু কিছু কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। ঘোড়া চড়বার সুযোগও দুই-একবার হয়েছিল।… একদিন নানাসাহেব, পাণ্ডুরং রাওসাহেব ও বালাসাহেব পেশবার একমাত্র হাতি চড়ে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। সেই হাতিতে চড়বার জন্য মনু বারবার জেদ করেন। নানা এবং রাও তাতে কান দিলেন না। মেয়ের অপমানে ক্ষুব্ধ হৃদয় মোরোপন্ত বললেন – তোর ভাগ্যে হাতি কোথায়? তুই সামান্য লোকের মেয়ে!’

জীবনী থেকে এই লাইনগুলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিনেমাটা যদি মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে থাকেন, বুঝতে পারবেন যে কেন লিখেছি এটা লক্ষ্মীবাই নাকি আমেরিকান কমিক স্ট্রিপের সুপারহিরো-হিরোইন বলে!

আট বছরের মনুর বিয়ে হয়ে গেল ঊনত্রিশ বছরের গঙ্গাধর রাওয়ের সঙ্গে। রক্ত আমাশায় ভুগতে ভুগতে এই গঙ্গাধর রাওয়ের মৃত্যু হচ্ছে প্রায় বছর দশেক পর, ঠিক যখন আঠেরো বছর পূর্ণ হচ্ছে মনু ওরফে লক্ষ্মীবাইয়ের। বালিকা-বিবাহের ব্যাপারে অস্বাভাবিক ব্যাপারও নেই কিছু, মহাশ্বেতা স্পষ্ট লিখেছেন ‘তৎকালীন মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণের ঘরে অষ্টম বর্ষে গৌরী-দানের প্রথা ছিল।’ কিন্তু এসব কিছুই ছেঁটে বাদ পড়ে গেছে পুরো। ত্রিশ বছরের কঙ্গনাই ছবির অল-ইন-অল!  

সিনেমায় দেখতে পাবেন, বরের পাশে দাঁড়িয়ে ইংরেজ প্রভুর চোখে চোখ রেখে কী ভাবে চোখা চোখা ডায়ালগ ছাড়ছেন রানি। রানির জীবনী কিন্তু স্পষ্ট বলছে, স্বামী জীবিত থাকার সময় তো দূরের কথা, স্বামী মারা যাওয়ার পরেও ইংরেজ প্রতিনিধির সঙ্গে বার্তালাপের সময় রানি থাকতেন অন্তরালবর্তিনী। আরে ভাই, এটা তো অ্যাট লিস্ট মনে রাখুন যে এসব ঘটনা হালফিলে নয় – ঘটে গেছে আজ থেকে ১৭৭ বছর আগে!

বিয়ের আগে তো ছেড়েই দিন, বিয়ের পরেও রানির জীবনে অস্ত্রচর্চার সূচনা ঘটে নি কোন। আবার চলুন জীবনী-গ্রন্থে। ‘রানির পরবর্তী জীবনের ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামের যদি কোন মানসিক প্রস্তুতি থেকে থাকে, সেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল এই সময় থেকে।… ক্ষুদ্র সামন্তরাজ্যের একেশ্বরী রানি লক্ষ্মীবাই বিধবা হলেন, রাজ্য হারালেন।… এই সময় প্রত্যহ তিনি প্রত্যূষে শয্যাত্যাগ করতেন। স্নানান্তে মাটি দিয়ে শিব গড়ে আটটা অবধি শিবপূজা করতেন।… আটটা থেকে এগারোটা অবধি অশ্বারোহণ করে ফিরে এসে পুনর্বার স্নান করতেন। তারপর আহার করে, সামান্য বিশ্রামান্তে, বেলা তিনটে অবধি ছোট ছোট কাগজে রামনাম লিখে, এগারশো কাগজ আটার মণ্ডে ভরে কুণ্ডের মাছকে খেতে দিতেন।… সন্ধেবেলা আটটা অবধি তিনি পুরাণ ও কীর্তন শুনতেন।’ (অধ্যায় আট)। রানির জীবন বিধবা হয়ে যাওয়ার পরেও বেশ কিছুকাল কেমন ছিল, বুঝতে পারছেন তো? শুনে রাখুন, রানির আত্মীয়দের থেকে তথ্য জেনে এই যে রানি-জীবনী রচনা করেছিলেন মহাশ্বেতা, এই হিন্দি ছবিতে সেই জীবনের কোন চিহ্নমাত্র নেই!

অমর চিত্র কথা

ছোটবেলায় ঝাঁসির রানির কাহিনী প্রথম জেনেছি ‘অমর চিত্র কথা’ পড়ে। এখন খুঁজে বের করে ফের পড়ে দেখলাম সেটা। হ্যাঁ, সেটাও কমিক্‌স-স্ট্রিপই বটে। আর ছোটদের কথা মাথায় রেখে খুব সংক্ষেপে সরল করে লেখা। কিন্তু একটা ব্যাপার দেখলাম যে, সেখানে কিন্তু রং চড়িয়ে ঢপ সাজানো কিংবা জোর করে রানিকে সুপারহিরো বানিয়ে দেওয়ার বেহায়া কোন চেষ্টা আদৌ নেই।

ফেরত আসুন ছবিতে। ছবিটা যে কতটা ‘ফেক’ – সেটার চিহ্ন দেখবেন পুরো ছবিতে রয়েছে ছড়িয়ে!  বেশ কয়েকটা সিনে যেমন দেখতে পাবেন, রানির পেছন পেছন হাওয়ায় প্রায় পতাকার মত উড়ছে ওঁর অতি-দীর্ঘ আঁচল। এখন এটা দেখে স্পষ্ট এটা বুঝতে পারবেন, উড়ন্ত ওই আঁচলখানা রিয়্যাল লাইফ শুট নয়, পরে গ্রাফিক্স বসিয়ে করা। এখন আমার প্রশ্ন হল, যেটা দেখে বোঝাই যাবে নকল জিনিষ বলে, সেটা শুধু শুধু ছবিতে ঠুসে লোক হাসানো কেন?

আর একটা কথা বলুন, অত বছর আগের ওই রানির চুলে খয়েরি শেড কেন? চুলে হরেক কালার করার হালের ট্রেন্ড কি তখনও ছিল নাকি?   

ছবির ক্রেডিট টাইটেলে দেখলাম ছবির গল্প আর চিত্রনাট্যের ক্রেডিট দেওয়া রয়েছে কে. ভি. ভিজয়েন্দ্র প্রসাদের নামে। কে বলুন তো ইনি? আরে – ‘বজরঙ্গী ভাইজান’ (২০১৫) বা ‘বাহুবলী’র (২০১৫, ২০১৭) মত সিনেমা তো এঁরই লেখা। শুধু এই দুটো সিনেমাই নয়, আরও বহু-বহু হিট সিনেমার জনক হলেন ইনি।

সেই তিনি লিখেছেন এই ছবির স্ক্রিপ্ট? মাফ করবেন আমায়, কিন্তু ‘মণিকর্ণিকা’র এই খাজা স্ক্রিপ্টটাও ওঁরই লেখা, সেটা মানতে আমার কিন্তু অসুবিধে আছে খুব।

হতে পারে যে মূল স্ক্রিপ্টটা হয়তো লিখে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তারপর তো নদী-নালা দিয়ে জল বয়ে গেছে ঢের। পরিচালক রাধা কৃষ্ণ জগরলামুদির বদলে পরিচালকের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়েছেন ছবির প্রধান অভিনেত্রী নিজে। অভিযোগ এও উঠেছে যে, নিজের স্ক্রিন প্রেজেন্স বাড়াতে গিয়ে ‘সদাশিব’ নামে অন্য একটি চরিত্রের দৈর্ঘ্য ১০০ মিনিট থেকে কেটে ৬০ মিনিটে নামিয়ে দিয়েছেন তিনি। আর এর প্রতিবাদে আবার ছবি থেকে নিজেকে পুরো সরিয়ে নিয়েছেন ওই চরিত্রের অভিনেতা সোনু সুদ। ফলে সোনু সুদের অভিনয় করা সব দৃশ্য ফেলে দিয়ে নতুন করে অন্য অভিনেতা দিয়ে ওঁর সিনগুলো শুট করে নিতে হয়েছে ফের।

এখন এই যে তুঘলকিভাবে কাটাছেঁড়া করা, ছবির শরীর থেকে সেই ক্ষতগুলো তো আর মুছে সাফ হয়ে যাবে না! এরপরে স্ক্রিপ্টের ক্রেডিট মূল লেখককে দেওয়ার কি আর মানে হয় কিছু নাকি?

এরকম মেগা স্কেলের একটা সিনেমা অথচ তার একটা সিনের সঙ্গে লিংক পাচ্ছি না পরের সিনের কোন! ভাবতে পারেন এটা?

ছবির ফার্স্ট হাফে ক্যাপ্টেন গর্ডনের ইনট্রো সিনটাই ধরুন। রানির সঙ্গে গরম-গরম ডায়ালগবাজি করতে দেখবেন ওঁকে। ঠিক এর পরেই দেখবেন খোলা প্রান্তরে ঘোড়া ছোটাচ্ছেন রানি। আপনি যখন টানটান হয়ে বসেছেন যে ইংরেজ ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ঝাড়পিট এবার শুরু হয়ে গেল বলে, তখন হঠাৎ দেখবেন রানি গিয়ে হাজির হয়েছেন গ্রামের মধ্যে দস্যু সংগ্রাম সিংহের কাছে। আর সেই দস্যু আবার রানিকে জ্ঞান ঝাড়ছে ‘ক্রান্তি’র প্রয়োজনীয়তা নিয়ে!

আমি তো এটা দেখে পুরো হাঁ। ক্যাপ্টেন গর্ডনের সিনের সঙ্গে দস্যুর সিনটা কী ভেবে যে জুড়ে দেওয়া হল, বুঝতে পারি নি সেটা। আর এরকম উদাহরণও এই একটা নয়, সিনেমা জুড়ে গণ্ডা-গণ্ডা আছে।

ইন্টারেস্টিং সব চরিত্র আছে ছবিতে। আছেন তাঁতিয়া টোপি (অতুল কুলকার্নি), ঝলকারি বাই (অঙ্কিতা লোখান্ডে) বা রানির অন্যতম সহযোগী গোলাম ঘৌস খান (ড্যানি)। আছেন বাজীরাও পেশবা (সুরেশ ওবেরয়) বা কাশীবাই (মিষ্টি চক্রবর্তী)। কিন্তু স্ক্রিপ্টে এঁদের ভূমিকা যেন দুয়েক লাইন করে! চোখের সামনে এঁদের দেখেও তেমন কোন অভিঘাত তাই আদৌ আসে না মনে!  

ইতিহাস নিয়ে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ সিনেমার কথা ভাবতে গেলে প্রথমেই তো মনে এসে যায় ‘বাজিরাও মস্তানি’ (২০১৫) বা ‘পদ্মাবত’-এর (২০১৮) নাম। এই নামগুলো তো এখন প্রায় বেঞ্চমার্কের মত! এবার ইতিহাস নিয়ে ছবি করবেন, কিন্তু ওই লেভেলটা টপকাবেন না, তা’ কী করে হয়? ভিউয়ার যে এসে আপনাকে দুয়ো দিয়ে যাবে ভায়া!

সলিড সলিড ড্রামার মোমেন্টগুলো এ ছবির থেকে হাওয়া! ঝাঁসির রানির বিদ্রোহের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহের ঘটনা ছবিতে শুধু একটা লাইন ফুটনোট দিয়ে সারা!

আর একটা কথা না লিখে পারছি না যে, খুব খারাপ লেগেছে আমার রানির স্বামী গঙ্গাধর রাওয়ের ভূমিকায় যীশু সেনগুপ্তকে দেখে। বলিউডের ছবিতে একের পর এক এই যে যীশু কাজ করছেন, কেরিয়ার গ্রোথের কথা ভাবতে গেলে এটা হয়তো ভাল। কিন্তু সব ছবিতেই ওঁর রোল কি এমন ছোট আর অবমাননাকর হবে?

‘মর্দানি’তে (২০১৪) দাপুটে পুলিশ অফিসারের মিইয়ে থাকা বর। এমন বর, যার মুখে কালি লেপে দ্যায় দুষ্কৃতীরা এসে। ‘পিকু’ (২০১৫) ছবিতে নায়িকার অফিস-কলিগ হিসেবে এক অকিঞ্চিৎকর রোল। তারপর আবার এই ‘মণিকর্ণিকা’য় (২০১৯) এমন এক রাজা, যিনি নিজেই নিজেকে না-মর্দ ভেবে চুড়ি পরে থাকেন হাতে!

বাংলা ইন্ডাস্ট্রি যাঁকে হিরো বলে ভাবে, বলিউডে তিনি এই!

ছবির সেকেন্ড হাফে অনেকগুলো যুদ্ধ-দৃশ্য আছে। একলা নারী তুমুল শৌর্যে শত্রুপক্ষের হাঁড়ির হাল করে ছাড়ছেন, এটা সত্যি কিংবা অতিরঞ্জন যেটাই হোক না কেন, দেখতে দেখতে গায়ে কিন্তু কাঁটা দিয়ে যায় বেশ!

বুঝতে নিশ্চয় পেরেছেন যে, এ ছবির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হল এটাই। ভারতের ইতিহাস থেকে কাউকে ‘ওয়ান্ডার উওম্যান’ হয়ে উঠতে দ্যাখা!

ছবি দেখতে গিয়ে এটাও খুব মনে হচ্ছিল যে, সব সাজানো গিমিক ছেঁটে ফেলে দিয়ে শুধু হার্ড-কোর হিস্ট্রি নিয়ে যদি এবারে কেউ ‘ঝাঁসির রানি’ বানান, তবে কেমন দেখতে হবে সেটা? শ্যাম বেনেগালের ‘ভারত এক খোঁজ’-এর (১৯৮৮) মতো?

এমন কোন ছবি তৈরির খবর নেই ঠিকই। তবে ‘মণিকর্ণিকা’ অমন একটা ছবি দেখার ইচ্ছেটা তো জন্ম দিয়ে গেল! প্রাপ্তি হিসেবে সেটাই বা কম কী হল, বলুন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here