মনমর্জিয়া : শরীরের অবাধ্য কামনাকে কি পোষ মানানো যায়?

যে করে হোক সেক্স করার জন্যে ক্ষেপে উঠেছে মেয়েটা। কলেজে ক্লাস নিতে গিয়ে পড়াচ্ছে যে ছেলেটাকে, রাত নামলে গিয়ে উঠছে সোজা সেই ছেলেটারই খাটে। ‘তোমার বুঝি এটা প্রথমবার? আচ্ছা দাঁড়াও, আমি শিখিয়ে দিচ্ছি তোমায়’ একুশ বছরের তেজসের খাটে শুয়ে ওকে আদর করতে করতে বলছে তার কলেজ ম্যাডাম কালিন্দী!

কেন এরকম করছে কালিন্দী? স্বামীর থেকে সুখ-টুখ কিছু পায় না নাকি আর? এরপরের একটা সিন থেকে জানতে পারবেন যে, ওর বর মিহির ওর থেকে বয়সে বারো বছরের বড়। মিহিরের সঙ্গে বিয়েটা যখন হয়, তখন কালিন্দীর ছাব্বিশ বছর বয়স। মিহিরের তার আগে অনেকগুলো রিলেশন কমপ্লিট আর কালিন্দীর তখন ওইটা দিয়েই শুরু। আর এই বিয়েটা যে ওর কাছে কী ছিল, সেটা ওর মুখেই শুনুন, ‘ইয়ে মেরে লিয়ে অ্যাডভেঞ্চার থা। এক বারা সাল বড়ে ল্যাড়কে কে সাথ শাদি।’

মিহির এত অনেস্ট যে, নিজের সব অ্যাফেয়ারগুলোর কথা ডিটেলে বলে দিয়েছিল ওকে। এটা নিয়ে কালিন্দী কী বলছে দেখুন। ‘উসকে পাস ইতনে আচ্ছে আচ্ছে স্টোরিস হ্যায়। কি উয়ো অ্যায়সে কহি গ্যয়া থা। এক লেড়কি থি। উনোনে এক দুসরে কো দেখা। ঔর বাত করনে লাগে। ঔর কুছ হুয়া।… ইটস লাইক ফিল্মস। ইটস লাইক্‌স বুক্‌স।’ কালিন্দীর জীবনে এরকম কোন ‘স্টোরি’ এর আগে ছিল না বলে, সেই অভাব মিটিয়ে দিতে একরকম বরের কথা শুনে একের পর এক রিলেশন করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ও।

কখনও স্টুডেন্ট তেজস, কখনও কলিগ নীরজ। নীরজ কেন করতে বেশি সময় নেয়, কিংবা তেজস কেন ক্লাসফ্রেন্ড নাতাশাকে নিয়ে একেক সময় ফুর্তি করতে থাকে, সেটা নিয়ে মন ভাঙাভাঙি বা কুরুক্ষেত্র তো আছেই আছে পরে।

ঠিক ধরেছেন, কলেজ টিচার আর তার স্টুডেন্টের সেক্সলীলার এই গল্পটা আর যাই হোক ‘মনমর্জিয়া’ নয়। তবু এটা ডিটেলে এমন লিখলাম কেন জানেন?

অনুরাগ কাশ্যপকে ‘মনমর্জিয়া’র মতো সিনেমা বানাতে দেখে ভিরমি খাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের জন্যে দরকার ছিল এটা। যে, অনুরাগ মানে কিন্তু শুধু ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’-এর ঠাঁই-ঠাঁই-ঠাঁই গুলি ছোঁড়াছুঁড়ি নয়। অনুরাগ মানে এরকম তীব্র তীক্ষ্ণ যৌনকথনও বটে। এতক্ষণ লেখা এই গল্পটা অনুরাগেরই তৈরি ছবি ‘লাস্ট স্টোরিজ’ (২০১৮) থেকে নেওয়া।

চারটে ছোটগল্পকে পরপর সাজিয়ে তৈরি সিনেমা, নেটফ্লিক্সে রিলিজ হয় এ বছরেরই ১৫ জুন তারিখে। তার মধ্যে প্রথম গল্পটা ছিল অনুরাগের, সেটা এই কালিন্দী নামে মেয়েটার গল্প। এমন একটা মেয়ে, যে সাফ সাফ নিজের আত্মকথনে এটাও শুনিয়ে দিচ্ছে যে, ‘কোই কিসিকে সাথ অনেস্ট নেহি হোতা – আই অ্যাম টেলিং ইউ। মেরে মা বাপ ভি এক দুসরে কে সাথ অনেস্ট নেহি থে। কোই চুতিয়া দুনিয়া মে কিসিকে সাথ অনেস্ট নেহি হোতা।’

পাশাপাশি রেখে দেখুন ‘লাস্ট স্টোরিজ’ আর ‘মনমর্জিয়া’। বুঝতে পারবেন, ‘মনমর্জিয়া’র কোর কনসেপ্টটা লুকিয়ে ছিল জাস্ট ক’দিন আগে তৈরি ‘লাস্ট স্টোরিজ’-এর ওই ছোট গল্পটার মধ্যে। ওখানে উদ্দাম সেক্স দিয়ে শুরু হচ্ছে কালিন্দীর স্টোরি, এখানে উদ্দাম সেক্স দিয়ে শুরু হচ্ছে রুমি’র (তাপসী পান্‌নু) গল্প। ওখানে কালিন্দীকে তেজসের সঙ্গে দোর দিতে দেখে হাঁ হয়ে যাচ্ছে পাশের ঘরের বৃদ্ধা প্রতিবেশী, এখানে রুমিকে পাঁজাকোলা করে তুলে ধরে চিলেকোঠায় খিল দিতে দেখে বাক্যি হরে যাচ্ছে রুমির বাড়ির লোকের।

ফারাক বলতে এটুকু শুধু যে নেটফ্লিক্সের বাজেট বোধহয় তুলনায় একটু কম ছিল, তাই সেটার প্রোডাকশন ভ্যালু যেন ঈষৎ লো। সেখানে ঘরের মধ্যে টুনি বাল্ব ঝিকমিক করছে, আর কালিন্দী এক ধাক্কায় তেজসকে ঠেলে শুইয়ে দিচ্ছে খাটে। আর এখানে, সুবৃহৎ পাকশালে রান্না করতে করতে রুমির বাড়ির লোক দেখছে দেওয়ালে বিশাল করে এসে পড়া রোদের মধ্যে ভিকির (ভিকি কৌশল) কোলে চেপে রুমির চলে যাওয়ার ছায়া-ছবি। এই সিনটা লিখে ঠিক বোঝাতে পারলাম না জানি, শুধু এটুকু বলে রাখি, এর বুনো ইমপ্যাক্ট যে কী অমোঘ, সেটা বুঝতে গেলে সিনেমা হল-এ গিয়ে আপনাকে দেখে আসতে হবে সেটা।

যখন-তখন সেক্স করছে দুজনে, কখনও দূরে মাঠে ক্ষেতের মধ্যে, কখনও ছোট্ট কোন খুপরি ঘরের মধ্যে। ‘ফাক’ আর ‘অ্যাফেয়ার’, ‘ফ্লেয়ার’ আর ‘ফায়ার’ – এই সবকটা শব্দ মিশিয়ে এই সিনেমায় চমৎকার একটা নতুন শব্দ তৈরি করা হয়েছে, ‘ফাইয়ার’। ডায়ালগের মধ্যে অনেক জায়গায় এত পাঞ্জাবি শব্দ ঠাসা যে সব জায়গায় মানে বুঝতে পারছিলাম না ঠিক করে, কিন্তু এটা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে, একটা সিনে তুমুল ঝগড়া করতে করতে ভিকি রুমিকে বলছে যে, রুমির মধ্যে এমন বারুদ ঠাসা আছে যে, দিনে দু’বার অন্তত ওর সঙ্গে ‘ফাইয়ার’ না করলে ও সারা অমৃতসরে আগুন জ্বালিয়ে দেবে।

সিনেমার হিরোইন এখন আর সতী-লক্ষ্মী টাইপ হয় না জানি। কিন্তু এত সোজাসাপটা ভাবে তার সঙ্গমের ইচ্ছেগুলো ভারতের খুব কম ছবিতেই আসে।   

সরাসরি সেক্স করার সিন দেখতে পাবেন না এখানে, দ্যাখানর দরকারই হয় নি কোন। ইন ফ্যাক্ট অনুরাগ এটা বুঝিয়ে দিলেন যে লোককে তাতিয়ে দেওয়ার জন্যে খুল্লাম খুল্লা সব কিছু দ্যাখানর দিন শেষ। হালকা হালকা হিন্ট ছাড়লেই যথেষ্ট কাজ হয়। এই যে ধরুন আধো অন্ধকার ঘর, দুপুরবেলা দরজা দিয়ে দুজন মিলে শুয়ে। একঝলক দেখতে পেলেন যে, নিম্নাঙ্গের খোলা কাপড় টেনে তুলে গিঁট বাঁধছে মেয়ে। ছেলেটার ঊর্ধ্বাঙ্গে কোন পোশাক নেই, আলগোছে সে এবার ভর রাখছে মেয়ের গায়ের ওপর। এখন এই একটা সিন দ্যাখার পর এর আগের পুরো ইভেন্ট কি আর না-দ্যাখা থাকে, বলুন?

এই যে দিনের পর দিন লুকিয়ে চুরিয়ে দুজনের এমন সঙ্গমরত থাকার ইভেন্ট, সেটাই হঠাৎ করে ধরা পড়ে গেল বাড়ির লোকের চোখে। তারপর গল্পে রাজবীর ভাটিয়া, মানে রবির (অভিনয়ে অভিষেক বচ্চন) এন্ট্রি। বিস্তর ড্রামাবাজির পর শান্ত, ভদ্র রবির সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল রুমির। কিন্তু শরীর জুড়ে ওর যে অত সেক্সের খিদে, হিংস্র ক্ষ্যাপা সেক্স, সে সব কিছু শান্ত করা কি অবোধ রবির কাজ?

এখনও অবধি ছবির যে কটা রিভিউ দেখতে পেয়েছি, সবাই দেখছি ভিকি-রুমি-রবির এই ত্রিকোণটাকে তুলনা করছে ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ (১৯৯৯) ছবির সঙ্গে। কিন্তু সেই ছবি তো কাব্যি করা প্রেমের ছবি ভাই। এই রগরগে সেক্স হাঙ্গার সেখানে তো ছিটেফোঁটাও নেই!

রবির সঙ্গে বিয়ের পর কাশ্মীরে হানিমুনে যায় রুমি। শরীরে তখন আগুন ফুটছে, কিন্তু আগুন নেভানোর লোক নেই। সেই চাপা সেক্সের চাপটা আপনি বুঝতে পারবেন, যখন দেখবেন আর কিছু জুটছে না বলে, হোটেল রুমের টিভি খুলে পশুদের মেটিং সিজন দেখতে থাকছে রুমি। হানিমুনের জন্যে রাখা বিছানাতে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে রাখা। রুমি যখন হাঁ হয়ে দু’চোখ দিয়ে সেক্স গিলছে পশুর, রবি তখন আলগোছে সব পাপড়ি নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলছে। বাঁদরের প্রজনন ঋতু কখন হয়, তখন তারা দিনে ঠিক ক’বার ক’রে করে – টিভি চ্যানেলে এসব দেখে ভেতরে ভেতরে আরও তেতে উঠছে রুমি।

পরের দিকের একটা সিনে দেখতে পাবেন যে ভেতরে ভেতরে আগুন লেগে এত ফুটছে রুমি যে নিজের মাথা-শরীর ঠাণ্ডা করতে ফ্রিজার খুলে নিজের মাথা চেপে ধরছে সেই ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে। তাই তো – এই না হলে ‘ফাইয়ার’!

এখন আপনি যতই এটাকে ‘হাম দিল দে চুকে’ মার্কা পট্টি পরাতে চান না কেন, আমার কাছে তো এটা শুধুই ‘লাস্ট স্টোরিজ’, ভাই!

হানিমুন হাফ-ডান করে ফিরে আসছে রুমি। ছিলা ছেঁড়া ধনুর মতো ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ছে ভিকির কাছে যেন। ক্ষিপ্ত হয়ে একের পর এক ঠাসিয়ে শুধু চড় মারছে ওকে।

এখান থেকে কাট টু আসুন ‘লাস্ট স্টোরিজ’-এর সিনে। লুকিয়ে লুকিয়ে নাতাশার সঙ্গে শুতে শুরু করেছে তেজস, বুঝতে পেরে ক্ষ্যাপা বাঘের মতো কালিন্দী এসে ঢুকছে সোজা তেজসের সেই রুমে। ফেলে-ছিঁড়ে ভাঙচুর করে তছনছ করছে সব। উলটে দিচ্ছে বইয়ের র‍্যাক, ভাঙতে যাচ্ছে টিভি। মারতে যাচ্ছে ওকে। এখানে এই তেজস-কালিন্দী আর ‘মনমর্জিয়া’য় ভিকি-রুমি। কেমিস্ট্রি বা সিন-স্ট্রাকচার হরে-দরে প্রায় একই কিনা, মিলিয়ে দেখুন প্লিজ।

এখানে আপনি দেখবেন ইন্সটাগ্রামে তেজস-নাতাশা’র চুমু খাওয়ার দেখে খুন চেপে যাচ্ছে কালিন্দীর মাথায়। ওখানে আপনি দেখবেন বিয়ের ঢের আগে থেকেই রুমির ফেসবুক ফলো করে রবি জানতে পেরে যাচ্ছে রুমির রিলেশনটার কথা।

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটগুলো যে দুটো গল্পেই কী রকম ইনটিগ্রাল ভাবে আছে, নিজে না দেখলে সেটা পুরো লিখে বোঝানো সম্ভব না। 

আরও দেখুন কাণ্ড। ‘লাস্ট স্টোরিজ’-এ তেজস আর নাতাশা যখন বিছানায়, তখন দুজনকে হাতে-নাতে ধরার জন্যে ফোন করছে কালিন্দী। ‘মনমর্জিয়া’য় দুপুরবেলা চুপিচুপি বৌ কোথায় যাচ্ছে, সেটা দ্যাখার জন্যে বৌয়ের পিছু নিচ্ছে রবি।

রিয়্যালিটি চেক করতে নেমে কালিন্দী সত্যি বুঝতে পারছে, তেজস শুয়ে আছে নাতাশার সঙ্গে। আর এই গল্পের রবি? সে নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছে লুকিয়ে লুকিয়ে ওর বৌ গিয়ে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে পুরনো প্রেমিক ভিকির। রুমির কাছে জানতে চাইছে ভিকি যে, যখন বরের সঙ্গে করার জন্যে খাটে ওঠো, তখন কি চোখ বন্ধ করে বরের জায়গায় আমার কথা ভাব, নাকি চোখ খুলে বরকে দেখতে থাকো?

আড়াল থেকে এই কথাটা শুনতে পেয়ে যেন ইলেকট্রিক শক খাচ্ছে রবি। রবির তখন কী মনে পড়ছে জানি না, কিন্তু আমার তখন ফট করে মনে পড়ে গেল, রবির সঙ্গে সেক্স করতে যাওয়ার সময় রুমি সত্যি এটা আগেই বলেছিল, হয় লাইট নিভিয়ে অন্ধকার কর ঘর, নাহলে চোখ বুঁজে থাকব আমি।

ওই কমেন্টটা হজম করতে পারছে না রবি, আর পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে আসছে পথে। এর সঙ্গে তেজস-নাতাশাকে একসঙ্গে দেখতে পাওয়ার পর সেই কালিন্দী ম্যামের রিয়্যাকশনগুলো মিলছে কিনা মিলিয়ে দেখতে পারেন।

দুটো ছবিতে স্টোরির মধ্যে মোবাইল ফোনের ইউজগুলোও খেয়াল করে দেখুন। তেজসের সঙ্গে কথা হচ্ছে কালিন্দী ম্যামের, তখন ঘন ঘন নাতাশার ফোন। কল না ধরে বারবার ফোন কেটে দিচ্ছে তেজস। কালিন্দী ম্যাম বলছে, কী হল, কাটতে হবে না, ধর না ফোন, কিছু মনে করব না আমি। একদম কাট-পেস্ট এই সিকোয়েন্স ‘মনমর্জিয়া’তেও আছে, যখন রবির সঙ্গে কথা বলার সময় একের পর এক ফোন আসছে ভিকির। আর রবি বলছে, কার ফোন? ধরে নাও না ফোন, কিছু মনে করব না আমি।

দুটো ছবির কোনটাতেই অবশ্য সেই ফোনগুলো ধরার ধক হচ্ছে না কারুর।

আরেকটা মজার ব্যাপার হল, রুমির সঙ্গে রবির বিয়েটা যখন ভেঙে প্রায় যায়-যায় দশা, তখন নতুন একটা পাত্রী দেখতে এক রেস্তোরাঁয় পাত্রীর মুখোমুখি বসে রবি। এখন আপনি কী ভাববেন জানি না, কিন্তু এই সিকোয়েন্সটা দেখতে বসেও আমার কিন্তু মনে হয় যে, ভীষণ ভাবে ‘লাস্ট স্টোরিজ’ ছবি থেকে ইন্সপায়ার্ড এটা। ওটা অবশ্য অনুরাগের নয়, ছিল করণ জোহরের তৈরি সেই গল্পটা, যেটা হল পরশ আর মেঘার। সেই যে, যে গল্পটায় ঘরের বৌ নিজের মধ্যে ভাইব্রেটর ঢুকিয়ে দিয়ে মাস্টারবেট করে। সেই গল্পের শুরুতে আর শেষে এক রেস্তোরাঁয় বসে যখন মুখোমুখি হয় পরশ এবং মেঘা – ইচ্ছে হলে শুধু সেই সিকোয়েন্স নয়, তার ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল পর্যন্ত মিলিয়ে দেখতে পারেন এই ‘মনমর্জিয়া’র সিকোয়েন্সটার সঙ্গে।

সাবাশ অনুরাগ, সাবাশ। কী ভাবে ওয়েবের জন্যে তৈরি ছোট মাপের ছবি থেকে বড় পর্দার বড় মাপের ছবির জন্ম হয়, এ যেন তার হাতে গরম ক্লাস। ভারতীয় নারীর দেহেও যে ‘ফেয়ার’ করার জন্য অবাধ্য সব কামনা জাগে, খোলাখুলি বিগ স্ক্রিনে তা ক’জন আর বলতে পেরেছেন আগে? হানিমুনে গিয়ে বাড়ির মাসি-পিসিকে ফোনে চিৎকার করে ঘরের বৌ শুনিয়ে দেবে যে, কনডোম আনতে ভুলে গিয়েছে বর – এই গরম মশলা দেওয়ার ধক বলুন আর কার আছে?

কাহিনীর বুনোট থেকে শুরু করে, ছবিতে সেটা ফুটিয়ে তোলার স্টাইল, লা-জবাব সব। একটা তার বলছি এখানে, শুনুন।

ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুই যমজ মেয়েকে খুব ইন্টারেস্টিংলি ইউজ করতে দেখবেন এই ছবিতে। গল্পের মধ্যে এরা ডিরেক্ট কোথাও নেই, কিন্তু না থেকেও লেয়ারে লেয়ারে কী চরমভাবে আছে। কোথাও গানের মধ্যে এদের এক তাল, এক ছন্দের নাচে ফোকাস করছে ক্যামেরা, কখনও রাস্তার ধার দিয়ে আইস ক্রিম খেতে খেতে চলে যাচ্ছে এরা, আর সেটা এসে জুড়ে যাচ্ছে রুমির জীবনের ক্রুশিয়াল মোমেন্টগুলোর সঙ্গে। কাউকে কাউকে বলতে শুনছি, এটা নাকি অনুরাগের একটা কেত মাত্র, তার বেশি কিছু না।

এখন কোনটা ঠিক কোনটা ভুল, সে বিষয়ে তো আলাদা করে বলার কিছু নেই। তবে আমার ইন্টারপ্রিটেশন এমন যে, পুরো গল্পটা তো আসলে এক থেকে দুই, মানে রুমি থেকে রুমি-ভিকি বা রুমি-রবি হয়ে ওঠার গল্প। দুইয়ের কোন কম্বিনেশনটা ওয়ার্ক করল বেশি, এটা নাকি ওটা? এক থেকে দুই হয়ে ওঠার এই স্ট্রাগলটার পাশাপাশি ইচ্ছে করে কনট্রাস্টের মজা দেওয়ার জন্যে সত্যি সত্যি এমন একটা ইমেজ রাখা হল, যেটা আগের থেকেই পুরো পারফেক্ট দুই হয়ে আছে। আর সেই সূত্র ধরেই ছবির আগাপাস্তলা ওই যমজ কন্যার ইউজ। তবে, ওই যে বললাম, এগুলো সব আমার ধারণামাত্র, তার বেশি কিছু না।

এর আগে তাপসী পাননুর অন্য ছবিও দেখেছি। কিন্তু এ ছবিতে সো-কল্‌ড অসতী নারীর ফটোফ্রেমে ফিট করে গ্যাছেন এমন, যে বায়াস্‌ড মেল গেজ দিয়ে মহিলাকে দেখতে দেখতে নিজের মধ্যে যা-তা সব ফিলিংস আসছিল তখন।

এ ছবি নিয়ে আরও হাজার হাজার শব্দ লিখতে পারি। যেমন ধরুন একটা লেখার বিষয় এটা হতেই পারে, ভিকি কৌশলের চুলের ছাঁটের রকম – ছবির শুরু থেকে শেষ অবধি কোন সিনে কী ভাবে তার একটু একটু করে বদল হল। আর তার সঙ্গে রুমির থেকে ঝাড় খেয়ে খেয়ে কী ভাবে পালটাল তার মন। কিন্তু থাক – অত কথা যদি লিখতে থাকি, তাহলে তো আপনার নিজে দ্যাখার আর খুঁজে পাওয়ার সব মজাটাই মাটি!

তবে, ছবি নিয়ে আমার কিছু কমপ্লেনও আছে স্যর। বিয়ে হয়ে গেছে, এরপরেও নিজের ফোনে আশিকের ফোন নাম্বার কি আর কেউ তার নিজের নামে সেভ করে রাখে নাকি? রুমি দেখলাম, ভিকির নাম্বার সেভ রেখেছে ভিকির নাম দিয়েই, তারপর সর্বক্ষণ সেটা আবার লুকিয়ে রাখতে ব্যস্ত! এটা একটু কেমন কেমন না? নামটা পালটে অন্য কিছু লিখে দিতে পারত তো! তাহলে ঝুপঝাপ ধরা পড়ার ভয় থাকত না অত! আর হ্যাঁ, ছবির শেষ দিকে খুব ইম্পরট্যান্ট একটা লোকের হুট করে ওই অস্ট্রেলিয়ায় চলে গিয়ে বাকি স্টোরির হ্যাপি এন্ডিং বানিয়ে দেওয়াও ঠিক পছন্দ নয় আমার!

তবে এ হল এমন ছবি, যে এটুকু খটকা পাত্তা-টাত্তা না দিলেও চলে যাবে।

এর আগে গত তিন বছরে বড় পর্দায় অনুরাগের ছবির সংখ্যা দুই। প্রথমে ‘রামন রাঘব ২.০’ (২০১৬)। দেখে মনে হয়েছিল, এ আর নতুন কী ভাই, এমন ভায়োলেন্স আর একবগগা মার্ডার স্টোরি তো অনুরাগের আগের ছবিগুলোয় গণ্ডা গণ্ডা আছে। পুরো ২০১৭-তে কোন ছবি নেই। এরপর ‘মুক্কাবাজ’ (২০১৮) এল। সেটা দেখে তো মুষড়ে পড়ি খুব, পার্সোনালি এত ঝুল লেগেছিল যে মনে হচ্ছিল অনুরাগ সিনেমা বানাতে ভুলে-টুলে গেল নাকি।

তারপর একের পর এক এ বছর ‘লাস্ট স্টোরিজ’, ‘স্যাক্রেড গেমস’ আর এই ‘মনমর্জিয়া’র পালা। কী বলব বলুন আমি, পরপর তিন সিক্সার মেরে অনুরাগ ফের অবশ করে দিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here