নন্দিতা দাশের ‘মান্টো’ : কিশোরী মেয়েকে বেশ্যা বানানোর গল্প দিয়ে শুরু!

যদি মান্টো ভালভাবে পড়ে থাকেন, এই গল্পটা মিস করেন নি নিশ্চয়! বছর পনেরোর একটা মেয়েকে বেশ্যাবৃত্তিতে তালিম দিচ্ছে তার মা। ঘটনাস্থল বোম্বে। বস্তিতে থাকে দুজনে, মেয়েটার বাবা মারা গেছে বেশ কিছুদিন হল। তাই রোজগারপাতি চালিয়ে যাওয়ার একমাত্র উপায় এখন এটাই। তবে মেয়েটাকে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হয় না এখনই, কারণ দালালের সঙ্গে সেটিং রয়েছে ভাল। বড়লোক খদ্দের পেলে তাদের নিয়ে সোজা সেই বছর পনেরোর মেয়েটির বাড়ি পৌঁছে যায় দালাল।

নন্দিতা দাশের ‘মান্টো’ ছবি এই গল্পটা দিয়েই শুরু।

‘সরিতার বয়স পনেরো হতে চলল, কিন্তু তের বছরের বালিকার মতোই ওর হাবভাব’। গল্পে এই লাইন লিখেছেন মান্টো। এই বালিকা মেয়েকে বড়লোক বাবুর হাতে তুলে দিয়ে টাকা বুঝে নেয় দালাল, আর তার ভাগ পায় মা। হাতে হাতে পয়সা মেলে মেয়েরও। মান্টো লিখছেন, ‘বস্তির সবাই, মোটামুটি জেনে গেছে, যে, সরিতার মা তার কচি মেয়েটাকে বেশ্যাগিরি করতে পাঠায়’।

গল্প শুরু হলে দেখতে পাবেন, হায়দরাবাদ থেকে আসা তিনটে লোক গাড়ি চেপে এসে এক বেলার জন্যে তুলে নিয়ে গেল সরিতাকে। সরাসরি কোন যৌনদৃশ্য না লিখে মান্টো শুধু এটুকু লেখেন, ‘গাড়িতে ওঠা থেকে ওর হোটেলের দরজায় নামা পর্যন্ত কতটুকু-ই বা সময়। হোটেলের ঘরে চার দেয়ালের মধ্যে বিশ্রী লাগে ওর। ঘরগুলোতে দুটো করে লোহার খাট পাতা থাকে। যেগুলোর একটাও ওর ঘুমনোর জন্য নয়।’

গল্পের নাম ‘দশ রুপি’। তিনটে দামড়া লোকের সঙ্গে একটা সন্ধে কাটিয়ে উঠে সরিতা দশ টাকা বখশিস পায় হাতে। তবে সে টাকাটাও সে তারপর ফিরিয়ে দেয় কেন, ইচ্ছে করলে পড়া শেষ করে তার হাজার একটা ইন্টারপ্রিটেশন ভাবতে পারেন আপনি।

লেখকের নিজের লেখা গল্প দিয়ে লেখকের জীবন-কথা শুরুর এই স্টাইলখানা বেশ। যে ভাবে একটা বাচ্চা মেয়েকে তিনটে হাঙর এসে তুলে নিয়ে গেল, স্ক্রিনে সেটা দেখতে গিয়ে শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। তারপর একসময় এটা মনে হতে থাকে যে, দাদা কিংবা বাবার বয়সী লোকের কোলে চড়ে আদর খাওয়ার ব্যাপার বোধহয় কিশোরী ওই মেয়ের কাছে নিছক কোন পুতুলখেলার মত।

মান্টোর লেখার মত সিনেমাতেও সরাসরি কোন যৌনদৃশ্য নেই। কিন্তু এমন চালে গল্পখানা বলা, মনে হবে যেন, বাচ্চা মেয়েকে এই বোধহয় ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে ওরা। কিংবা ওভাবে খাওয়া-দাওয়া সব শেষ। এখন তার বাকি পড়ে থাকা রেশ উপভোগের পালা।

সবে দিন তিনেক আগে ‘লাভ সোনিয়া’ দেখে উঠেছি। সেটা দ্যাখার পরে ‘মান্টো’র এই গল্পখানা দেখতে বসার এফেক্ট কেমন জানেন? কোনটা সেই আদ্যিকালের মান্টো আর কোনটা হালের এই ‘লাভ সোনিয়া’ –সব তখন একসঙ্গে গুলিয়ে যেতে থাকে! হবে না কেন, বলুন? ‘লাভ সোনিয়া’ তো মেয়ে বেচার এই স্টোরিটাই আরও গ্রাফিক ডিটেলে দ্যাখায়! কিশোরী মেয়েকে মুম্বইয়ের যৌনপাড়ায় বেচে দিচ্ছে বাবা। তারপর কী করে তাকে ট্রেনিং দিয়ে বেশ্যা বানানো হল। তার সামনের ‘সিল’ অক্ষত রেখেও কী ভাবে তাকে দিনের পরে দিন ধরে লুটে ভোগ করে নেওয়া গেল। 

‘মান্টো’র সঙ্গে ফারাক শুধু এইটে যে, ‘লাভ সোনিয়া’য় আপনি পাবেন সরাসরি সব নির্যাতনের সিন। আর ‘মান্টো’ যেন হাসতে হাসতে মুখের মধ্যে বিষের পুঁটুলি ঢুকিয়ে দেওয়ার মত।

শুরুর এই গল্পটা থেকে কাট টু এবার মান্টো-জীবনে আসুন। ঠিক যে ভাবে এই সিনেমাটা এল।  ১৯৪৬ সালের বোম্বে। শহরের সিনেমা পাড়ায় টাকার খোঁজে চরকিপাক দিয়ে বেড়াচ্ছেন গল্পলেখক সাদাত হাসন মান্টো (নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি)। এদিকে পরিশ্রমের পেমেন্ট দেবেন যিনি, ছবির সেই প্রোডিউসার তো সর্বকালে, সর্বযুগে এক। হয় পোস্ট ডেটেড চেক, না হলে নির্দিষ্ট টাকার চেয়ে অনেক কম টাকা।

এখানে এক ফিল্ম প্রোডিউসারকে নিয়ে যে সিনটা তুলেছেন নন্দিতা, সেটা আরও ইন্টারেস্টিং মনে হল কেন জানেন? দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, সিনটা যেন পরিচালক নন্দিতা নিজের অভিনেত্রী-জীবন থেকে ছিঁড়ে তুলে এনে দিলেন!

কী সেই সিন, শুনুন। সিনেমার জন্যে নায়িকা বাছাইয়ের সিন। যাকে স্ক্রিন টেস্ট বলা হয়। স্ক্রিন টেস্ট না কচু, নন্দিতা দ্যাখাচ্ছেন, সেটা আসলে পোশাক খুলে কে কতটা গতর দ্যাখাবে, সেটা মাপার সিন।

বড় একটা হল ঘরে পাশাপাশি দুই নায়িকা টেস্ট দেওয়ার জন্যে রেডি। একটি মেয়ে ফর্সা, আর অন্যজন একটু ডার্ক রঙের। একদম সোজাসাপটা নন্দিতা এটা দেখিয়ে দিলেন, দুটো মেয়েই প্রোডিউসারের (এই ভূমিকায় ঋষি কাপুর) অর্ডার মতো বুকের কাপড় সরিয়ে দ্যাখাতে তৈরি। আর প্রোডিউসারও দ্যাখার জন্য চনমনে দিল্‌ খুব। কিন্তু যা ধরেছেন তাই, টেস্ট-ফেস্ট নেওয়ার পরে সিলেকশন সেই ফর্সা মেয়েরই হল! ‘গোরিকো ফাইনাল কর্‌’ অ্যাসিস্ট্যান্টের দিকে তাকিয়ে নিদান দিলেন হুজুর। অন্য মেয়েটা স্কিন টোনের কারণেই ওই প্রোডিউসারের কাছে তখন ‘নমকিন’ টেস্টওয়ালা!

নন্দিতা আন্ডারলাইন করে দেখিয়ে দেন নি কিছু, তবু এটা দেখে মনে পড়ছিল, নন্দিতার নিজের জীবন-কথা। বিগ বাজেটের এক বাংলা ছবিতে ফর্সা এক মেয়ের কাছে আপনিও হেরে গেছিলেন না?

রীতিমত কেলেঙ্কারি কেস হয়েছিল সেটা। ছবির কাস্ট হিসেবে প্রথমে আপনার নামই ঘোষণা করা হয়। তারপর, ওয়ান ফাইন মর্নিং, এর-ওর মুখে জানতে পারেন, আপনি আর সেই ছবিতে নেই। বদলে অন্য কোন কাঁচা রঙের মোম-সুন্দরী আছে। প্রোডিউসারের তরফ থেকে কথাটা কেউ আপনাকে জানানোর দরকারও বোধ করে নি আদৌ! মনে হচ্ছিল, মান্টোর লাইফ দ্যাখাতে গিয়ে সেখানে খুব নীরবে যেন এ ছবিটায় নিজের জীবন মিশিয়ে দিলেন আপনি।

ছবিতে এক ঝলক দেখা যাবে ইসমত চুঘতাইয়ের (অভিনয়ে রাজশ্রী দেশপাণ্ডে) মুখ, তাঁর অল্প কিছু কথা। বেশ্যাদের নিয়ে গল্প লিখে মান্টো যেমন কুখ্যাত খুব তখন, প্রায় সেই রকমই হাল তখন এই লেখিকার – লেসবিয়ানিজম নিয়ে লিখতে থাকার জন্যে।

ছোট্ট একটু সময় ইসমতকে ভাল লাগল বেশ, তবে এর সঙ্গে একটা কথা জানার আছে আমার। এই যে ইসমতের মুখে এরকম একটা কথা বসালেন আপনি, যে ‘লেসবিয়ানিজম নিয়ে আমার সব লেখা পড়ে যাদের মনে অশান্তি হয়, তাদের মনে অশান্তি দিতে পারলে আমার বড় শান্তি হয়’ – এটা কি সত্যি সত্যি ইসমতেরই কথা? কোন ইন্টারভিউতে পেয়েছেন? নাকি এটা আসলে আপনার মনের একটা কথা, জাস্ট এনে বসিয়ে দিলেন ইসমতের মুখে?

এটা এই কারণে বলছি যে, ইসমত কথাটা ১৯৪৬ সালে বসে বলছেন ঠিকই। কিন্তু শুনছি তো আমি এটা এই ২০১৮ সালে বসে। চোখ-টোখ সব বন্ধ করে কথাটা শুনি যদি, তো মনে হচ্ছে, এটা আজকের কোন এমন লোকের কথা, ক্ষিপ্ত লোককে ক্ষেপিয়ে দিয়ে সমাজে গোলমাল ফেলে যে করে হোক ফেম লোটা যার ফোকাস। ইসমত তো তেমন ছিলেন না, না? লেখায় যে আগুনটুকু দিতেন, তাও তো যেন যত্ন করে বরফ দিয়ে মোড়া, ন্যূনতম কোন সেনসেশলিজম নেই। তাই আবার করে জানতে চাইছি, অশান্তি ছড়িয়ে বড় শান্তি পাই আমি, কথাটা কি সত্যি সত্যি ইসমতেরই বলা?

নন্দিতার স্টাইল হল, কিছুটা করে মান্টোর জীবন, তারপর আবার মান্টোর লেখা টুকরো একটা গল্প। মান্টো-জীবন একটু দেখিয়ে এরপর যে ছোটগল্পটা, সেটা হল মান্টোর লেখা ‘শ ক্যান্ডেলপাওয়ার কা বাল্ব’। ও হ্যাঁ, ছবিতে এই গল্পের নামগুলো স্পষ্ট করে বলা হয় নি ঠিকই, তবে মান্টোর গল্প যদি পড়া থাকে তো, ধরতে অসুবিধে হবার কথা নয় কিছু।

এ গল্পটাও এক বেশ্যা (অভিনয়ে তিলোত্তমা সোম) আর তার দালালের (পরেশ রাওয়াল)। ক্রিয়েটিভ ফ্রিডম নিয়ে এটাও আপনি ভাবতে পারেন যে, এই বেশ্যা এবং তার দালাল আসলে প্রথম গল্পের মানুষদুটিই ফের। শুধু ঘটনা ঘটছে কয়েক বছর পর, মেয়েটি যখন রীতিমত পেশাদার হয়ে গেছে।

গল্পে আপনি দেখতে পাবেন, রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে ব্যবসা করছে মেয়েটা। মরিয়া হয়ে এবার একটু শুতে আর ঘুমোতে চাইছে ও। কিন্তু দালাল ফের খদ্দের ধরে আনে। আর পেরে না উঠে মেয়েটা এবার দালালটিকেই খুন করে বসে সোজা। আর এমন স্টাইলে নন্দিতা এই গল্প ছবিতে ফিট করেছেন যে, দেখে মনে হবে, গল্প লেখার আগে বোধহয় মান্টো নিজেই খদ্দের হয়ে মেয়েটির কাছে যান।

নেহাত মন্দ লাগে না দেখতে, কিন্তু এভাবে এক ঝলক ঋষি কাপুর, একটা ঝলক পরেশ রাওয়াল, পরে আবার কয়েক সেকেন্ড জাভেদ আখতার, দেখতে গিয়ে মনে হয়, এদের জন্যে আরও বড় রোল কি যেত না ভাবা? এ তো ক্যামিও রোলের লাইন লাগল, দাদা!

এবার চলুন এখন থেকে বছর দশেক আগে। গুজরাটের দাঙ্গা তখনও দগদগে এক ক্ষত। নন্দিতা তৈরি ‘ফিরাক’ (২০০৮) নামের ছবি। ডিরেক্ট কোন দাঙ্গার দৃশ্য ছিল না সেখানে ঠিকই, কিন্তু দাঙ্গা কী ভাবে একটা গোষ্ঠীর মনে ক্ষোভ আর ত্রাসের জন্ম দ্যায়, কী চমৎকার দেখিয়েছিলেন সেটা। এবার মজাটা হল, এখন নতুন করে ‘ফিরাক’ দেখে তারপর যদি ‘মান্টো’ দেখতে বসেন, দেখবেন মনে হবে যে, কিছু কিছু সিন একেবারে সোজা যেন ওই ‘ফিরাক’ থেকেই নেওয়া।

একদিকে ‘স্বাধীন’ হচ্ছে দেশ আর অন্যদিকে মুসলিমদের মেরে তাড়াতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে হিন্দু গুণ্ডা এসে। সদর দরজায় গুণ্ডা এসে ধাক্কা দিলে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাচ্ছে মান্টো, সঙ্গে মুসলমান অন্য সাথীরা। কিম্বা প্রাণের দায়ে ছদ্মবেশ নেওয়ার জন্যে এক সেট হিন্দু টুপি আর এক সেট মুসলিম টুপি কিনে রাখছেন তিনি। এবার সাল-তারিখ পালটে দিয়ে দ্যাখেন যদি, আপনি বলুন, এটা একেবারে ‘ফিরাক’ সিনেমা না?

‘ফিরাক’ ছবির সমীর শেখ যেভাবে দাঙ্গা-ত্রাসে গুজরাত ছেড়ে পালিয়ে দিল্লি যাওয়ার প্ল্যান করতে থাকে, ‘মান্টো’ ছবির মান্টোও কি ঠিক একই রকম না?

ঘোর অভিমানে ভারত ছাড়ে মান্টো। পাকিস্তানে হাজির হয় এসে। ’৪৮ সাল। গান্ধী হত্যার খবর আসে দেশে। কে মারল গান্ধীকে? রাস্তার লোক চেঁচিয়ে বলে, ‘কিসি হিন্দু নে। সিনে মে তিন গোলি। ধাঁই ধাঁই ধাঁই।’ কোথাও যেন নিরুচ্চারে এটাও বলে দেওয়া হল বেশ, দেখলে তো, মুসলিমদের তাড়িয়ে দিচ্ছ ঠিকই, গুলি কিন্তু হিন্দুর হাতেই ছুটছে!

ভয়ংকর দাঙ্গার এই আবহ বোঝাতে এবার মান্টোর আরেকটা ছোটগল্পে ঢুকে যান নন্দিতা। গল্পটা তো চেনেন আপনি, বিখ্যাত সেই ‘খোল দো’।

বাংলা ছবি ‘রাজকাহিনী’র শুরুতে এই গল্পটা আগেই দেখেছেন আপনি। তবে তার সঙ্গে নন্দিতার ট্রিটমেন্ট মিলিয়ে দেখলে বুঝতে পারবেন, কোনটা হল গামবাট এক দ্যাখানেপনা, আর কোনটা হল ওই জীবনের রিয়্যাল লুক অ্যান্ড ফিল।

আরেকটা কথা বলছি এখানে শুনুন। পুরো ‘মান্টো’ ছবিটা দ্যাখার পর কী মনে হচ্ছে, জানেন? মান্টোর ওই সময়ের চেয়েও আজকের এই যুগটা বোধহয় হিংস্র অনেক বেশি। তাই মান্টো তাঁর কলম দিয়ে যত শক আর অস্বস্তিই চান না কেন দিতে, আজকের নিরিখে তাঁর গল্পের শক গুলো যেন আর তেমন শক থাকে না, ভাই! এই ‘খোল দো’ গল্পটাই বলুন। একটা যুবতী মেয়ে দাঙ্গার সময় গ্যাং রেপ হয়েছে, আর জানলা খুলতে ‘খোল দো’ বললেও খুলে দিচ্ছে নিম্নাঙ্গের পোশাক, এটা সেই যুগে হয়তো একটা শকের মতো ছিল। কিন্তু আজ এটা পড়ে তত বেশি আর ঝাঁকুনি লাগে কি?

এখন তো ধারে-কাছে যুদ্ধ কিংবা দাঙ্গা-ফাঙ্গা তেমন কিছু নেই। তবু তো কাগজ খুললেই একের পর এক রেপের স্টোরি পেতে থাকছেন আপনি। আশি বছরের বৃদ্ধাকে অবধি রেপ করে যাচ্ছে লোক। কলেজ গার্লকে রেপ করে তার বডি চিরে দিয়ে দুই টুকরো করে ফেলে রাখছে তেপান্তরের মাঠে। এসবের কাছে কোথায় লাগে মান্টোর ‘খোল দো’ স্টোরি বলুন?

ওটা ছিল এমন একটা সময়, যখন সেক্সুয়াল অ্যাসল্টগুলো মনে ধাক্কা মেরে ক্ষত করে দিত দ্রুত। বোল্ড স্টোরি ছাপতে চাইত না কেউ। আর এখন? গলা কেটে ফেলার সিনও তো ফেসবুক থেকে হজম করছে লোকে!

মান্টোর লেখা ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ যেমন। ম্যাগাজিন থেকে ফিরিয়ে দিল খুব ‘গরম স্টোরি’ হয়ে গেছে, পত্রিকায় ক্যারি করা যাবে না তাই, বলে। আর সাহস করে শেষ অবধি ছাপল যাঁরা, পত্রপাঠ তাঁদের নামে পাকিস্তানের পেনাল কোড ২৯২ ধারায় মামলা অবধি শুরু!

এটা শুনে ইচ্ছে হয় না জানতে যে, কী এমন অশ্লীল ভাই ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ স্টোরি?

শুনুন তাহলে সেটা। ‘ফিরাক’ যেমন দেখিয়েছিল, লুঠতরাজ আর দাঙ্গা করে আসার পরেও কী রকম রিল্যাক্সড আর ক্যাজুয়াল মুডে থাকতে পারে সঞ্জয় আর দেবেনের মতো হিন্দু কিছু লোক। ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ তেমন দ্যাখায়, দাঙ্গা করতে নেমে খুন আর রেপ করার পরে কী রকম হাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে জনৈক শিখ ঈশ্বর সিং-এর।

একটা বাড়ির ছ’জন লোককে খুন করে ফেলে সেখান থেকে সুন্দরী মেয়ে উঠিয়ে আনে ও। তারপর ঝোপের মধ্যে নিয়ে গিয়ে রেপ-টেপ সব করার পরে বুঝতে পারে, মেয়েটা আসলে মেয়ে নয়, অনেকক্ষণ আগে থেকেই সেটা নিছক একটা লাশ!

গল্পটা শুরু হচ্ছে এর পর থেকে। মান্টো দ্যাখান, ডেড বডির ওপর ঝাঁপিয়ে পরে রেপ করার পরের এফেক্টটা ঠিক কী।

এফেক্ট হল এটা যে, বাড়ি ফিরে নিজের বৌ কুলবন্তের সঙ্গে চেষ্টা করেও সেক্স করতে পারে না আর ও। ধর্ষণ নিয়ে পুরো গল্পে একটার বেশি দুটো শব্দ নেই, কিন্তু নিজের বৌয়ের সঙ্গে সেক্স করার মরিয়া চেষ্টার গ্রাফিক ডিটেল স্টোরি জুড়ে লিখতে থাকেন মান্টো। ‘ঈশ্বর সিং… কুলবন্তের ওপরের ঠোঁট, কানের লতি কামড়াতে লাগল, ভারী বুক দোমড়াতে-মোচড়াতে লাগল, পাছায় নাগাড়ে চাপড় মারতে থাকল। জোর করে চুমু খেতে লাগল, স্তন চুষতে চুষতে লালায় ভিজিয়ে তুলল।… কিন্তু এত সব সুরত ঈশ্বর সিংয়ের কামনায় আগুন জ্বালাতে পারল না। পরাজিত মুষ্টিযোদ্ধার মত সব চেষ্টা চালিয়েও সে ব্যর্থ।’ আর নিজের বৌয়ের সঙ্গে রিলেশনের এসব কথা লেখার ‘অপরাধে’ স্টোরির ওপর অশ্লীলতার ছাপ পড়ে গেল দ্রুত।

ভাবতে পারছেন ভাই?

‘মান্টো’ ছবির সেকেন্ড হাফ। আপনি দেখতে পাবেন, উকিল-টুকিল কোথাও কিচ্ছু নেই। ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’ নিয়ে নিজের মামলা নিজেই লড়ছেন মান্টো। বিস্তর যুদ্ধ করে কোনমতে নিজের লেখাকে সাহিত্য পদবাচ্য বলে প্রমাণ করতে পারছেন তিনি ঠিকই, কিন্তু অশ্লীলতার দোষটা আর কাটানো গেল না শেষে। তিনশো টাকা জরিমানা হয়েই যাচ্ছে তাঁর।

জেলে যাওয়ার দুঃস্বপ্নে কেঁপে উঠছেন রাতে। মদ খেয়ে টাল হয়ে উলটে পড়ছেন ঘোরে। ফাইনালি ঠাঁই হচ্ছে পাগলখানায় গিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেও তখন বেরিয়ে আসছে ‘টোবা টেক সিং’-এর মতো লেখা। ভারত-পাক ভাগ হয়ে যাওয়ার পরে দুই দেশের পাগলখানার পাগলদেরও ধর্ম-টর্ম হিসেব করে রি-অ্যালোকেট করে নেওয়ার মর্মান্তিক স্টোরি।

এই গল্পটা দ্যাখানর পর ঠিক এই জায়গায় এসে শেষ হচ্ছে ছবি।

এখানে একটা কথা সোজাসুজি বলে রাখি যে ছবিতে চরম চরম সব নাটকের মশলা আছে ঠিকই, কিন্তু সেকেন্ড হাফে ছবিটা যেন দিশা হারিয়ে ফেলে। একটা সময় মনে হচ্ছিল, মান্টোর জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনা আর ফাঁকে ফাঁকে একটা করে মান্টোর লেখা স্টোরি, শুধু এটা দ্যাখানোই কি ডিরেক্টরের প্ল্যান? আর কোন কথা নেই?

২০১২ নাগাদ পাকিস্তানে ‘মান্টো’ নামে গোটা কুড়ি এপিসোডের একটা টেলিসিরিয়াল হয়। মান্টোর ভূমিকায় অভিনয় করেন সারমাদ খুসাত, ডিরেকশনও তাঁর। পরে সেই সিরিয়াল এডিট করে দু’ঘণ্টায় নামিয়ে এনে তার একটা মুভি ভার্সনও হয়। কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে একবার দ্যাখানও হয় সেটা। মজার ব্যাপার কী জানেন? সেখানেও গল্প বলার প্যাটার্ন কিন্তু এক্কেবারে এক। মানে কিছুটা করে মান্টোর লাইফ, আর তারপরে একটা করে মান্টোর লেখা স্টোরি!

এই ‘মান্টো’ দেখতে বসে মনে হচ্ছিল, নন্দিতা দাশ কি তাহলে আসলে সেখান থেকেই ইন্সপিরেশন পেলেন? তবে সেটা যদি পেয়েও থাকেন, তাহলেও এটা মানতে হবে যে, সারমাদ সুলতান খুসাতের থেকে তাঁর ছবির ট্রিটমেন্ট অনেক বেশি তুখোড়।

জানেন তো নন্দিতার প্রথম ছবি ‘ফিরাক’-এও কিন্তু অন্যতম মেন রোলে এই নওয়াজউদ্দিন আছেন। সেখানে তাঁর চরিত্রের নাম ছিল হানিফ। দশ বছর আগে তৈরি সেই ছবিতে তাঁর নাম রয়েছে এন্ড ক্রেডিটে, ভিড়ের সঙ্গে মিশে, ঈষৎ ভুল বানানে ছোট্ট করে ‘নোয়াজ’ বলে লেখা। আর দশ বছর পরের এই ছবিতে সেই লোকটাকেই আপনি পাবেন টাইটেল রোলে, আর ছবির শুরুতে সবার আগে নাম। দশ বছরে নেহাত মামুলি লুকের এই লোকটা নিজের অভিনয় দিয়ে কোথা থেকে আজ কোথায় এল, শুধু সেটা বুঝতেও ‘মান্টো’ দেখতে পারেন!  

উইক-এন্ডে মাল্টিপ্লেক্সে ‘মান্টো’ দেখতে জনা দশেক লোক। ছবির বক্স অফিস কী হতে চলেছে, এখান থেকেই বুঝতে পারবেন সেটা। তবে আজকের এই ‘সহিষ্ণু’ দেশে এমন ছবি বানিয়ে সেটা রিলিজ করাও তো চাট্টিখানি নয়। নন্দিতাকে সেই ক্রেডিটটা না দিয়ে আপনি যাবেন কোথায়, বলুন? ছবির রিসার্চ করতে পাকিস্তানের লাহোর গিয়ে মান্টোর স্বজনদেরও তো খুঁজে খুঁজে বের করেছেন তিনি!

আর হ্যাঁ, এর সঙ্গে খুচরো আরও একটা কথা না বলে দিলেই নয়। জানেন কী না জানি না, ‘মান্টো’কে নিয়ে নন্দিতার এটা কিন্তু প্রথম ছবি না। গত বছর মান্টোকে নিয়ে একটা শর্ট ফিল্মও বানিয়ে ফেলেছেন তিনি। ‘ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম’ (২০১৭) সেটার নাম। ডিজিটালে রিলিজও হয়েছে সেটা। ফিচার লেন্থের ‘মান্টো’ অবশ্যই দেখবেন, কিন্তু তার আগে ইউটিউব থেকে ৬ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের ওই ছবিটাও দেখে নিন একবার, প্লিজ। সেখানেও মান্টোর ভূমিকায় এই নওয়াজউদ্দিনকেই পাবেন!

আর দ্যাখার পর মনে হবে যে, ওই শর্ট ফিল্মটা যেন এই বড় ছবির প্রিলিউডের মতো।

লেখায় ব্যবহৃত মান্টোর গল্প থেকে নেওয়া উদ্ধৃতিগুলো ‘সদত হসন মন্টো রচনা সংগ্রহ’ থেকে নেওয়া। ভূমিকা ও সম্পাদনা রবিশংকর বল, দে’জ পাবলিশিং-এর বই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here