প্রায় তিন দশক ধরে জনশূন্য গোলাপি দ্বীপে একাই আছেন এই বৃদ্ধ

1629

এ দ্বীপের সৌন্দর্যের কাছে হেরে যায় শহরের কোলাহল। ভূমধ্যসাগরীয় মাদ্দালিনা দ্বীপপুঞ্জের সাতটি দ্বীপের মধ্যে একটি বুদেল্লি আইল্যান্ড। অনন্য সুন্দর এ দ্বীপকে বলা হয় গোলাপি দ্বীপ। গোলাপি রং-এর বালির কারণে দ্বীপটির সৌন্দর্য একেবারেই ভিন্ন।  বুদ্দেলি রাজ্জোলি এবং সান্তামারিয়া আইল্যান্ড থেকে একশো মিটার দক্ষিণে অবস্থিত এটি। এই দ্বীপে নিঃসঙ্গ ভাবে জীবনযাপন করছেন আটাত্তর বছর বয়সী মওরো মোরান্ডি। প্রায় ঊনত্রিশ বছর ধরে এই দ্বীপে একাকী বাস করছেন তিনি।

১৯৮৯ সালে একটি কাঠের ভগ্নপ্রায় নৌকায় ভাসতে ভাসতে এই দ্বীপে পৌঁছন মোরান্ডি। তিনি জানতে পারেন, সেখানকার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কেয়ারটেকার দু’দিনের মধ্যে অবসর নিচ্ছেন। তার পরিবর্তে এই দ্বীপের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে কে নেবে তখনও তা নির্ধারিত হয়নি। এমন একটি সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাননি মোরান্ডি। নিজের নৌকাটি বিক্রি করে লেগে পড়েন জনশূন্য দ্বীপ দেখাশুনার কাজে। আর সেই থেকেই গোলাপি বালির দ্বীপে শুরু হয় তাঁর একা জীবনযাপন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে ইতালির সরকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই দ্বীপে পর্যটকের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এমনই এক জনমানবহীন দ্বীপের নীরবতায় কাটতে থাকে মোরান্ডির জীবন। নিজের হাতে তৈরি একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করেন মোরান্ডি। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিককে মোরান্ডি জানিয়েছেন, মানুষ মনে করে তারা পৃথিবীকে শাসন করছেন। কিন্তু আসলে প্রকৃতির কাছে আমরা ক্ষুদ্র একটা মাছির সমান।

বই পড়তে খুবই ভালবাসেন তিনি। দিনের বেলায় দ্বীপের পাথুরে অঞ্চলে ঘুরে, গাছপালা দেখাশোনা করে, নীলচে জলরাশির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আহরণ করেই সময় কাটে তাঁর। আর রাতের বেলায় বই পড়ে, ধ্যানে মগ্ন থাকেন তিনি। মোরান্ডি জানিয়েছেন, বুদেল্লি আইল্যান্ডের নির্জনতা ও নিঃশব্দ পরিবেশের প্রেমে পড়ে গেছেন তিনি। বিভিন্ন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে কেটেছে বহু সময়। তবুও এই দ্বীপ ছেড়ে কখনোই তিনি চলে যেতে চাননি। দুই সপ্তাহ পরপর একজন ব্যক্তি এসে তাকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও বইপত্র দ্বীপে পৌঁছে দিয়ে যান। এই নিয়মেই নির্জন দ্বীপে কেটে যাচ্ছে মোরান্ডির দিন।

তবে আচমকাই মোরান্ডির শান্তিপূর্ণ এই জীবনে ২০১৬ সালে শুরু হয় এক ঝামেলা। নিউজিল্যান্ডের এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আইনি সমস্যা শুরু হয় এই দ্বীপের মালিকানা নিয়ে। পিটিশনে স্বাক্ষর করে প্রায় আঠারো হাজার মানুষ সেদিন মোরান্ডির পক্ষ নেয়। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় এই দ্বীপটি আর কারও নয়, দ্বীপের একমাত্র রক্ষণাবেক্ষণকারী মওরো মোরান্ডি-র। তাকে সেখান থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না কোনওভাবেই।

বুদেল্লি আইল্যান্ড-কে ভালবেসে প্রকৃতিপ্রেমী মোরান্ডিও এ দ্বীপ ছেড়ে কোথাও যেতে চান না। তাঁর মতে তিনি মনেপ্রাণে এই দ্বীপকে ভালবাসেন বলে, প্রকৃতিও চায়নি তিনি এই স্থান ত্যাগ করুক।  ঈশ্বরই এর ব্যবস্থা করেছেন। মোরান্ডি ইচ্ছে তাঁর মৃত্যুর পরও যেন তার ভস্ম বুদেল্লি দ্বীপের বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর সব শক্তিই এক। সবাইকেই এক সময় প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে হবে যেখান থেকে সে এসেছে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.