ট্রাজেডি কুইন মীনা কুমারী, ১৮-য় কমল আমরোহীকে বিয়ে‚ ধর্মেন্দ্রর সঙ্গে প্রেম‚ ৩৮-এ মৃত্যু !

আসল নাম মহাজবীন বানু‚ অভিনয়ের পাশাপাশি মীনা কুমারী নাজ ছদ্মনামে কবিতাও লিখতেন | উনি ট্রাজেডি কুইন-এর আক্ষা পেয়েছেন | আর পাবেন নাই বা কেন? ৩৮ বছরের জীবনে কম দুঃখ সহ্য করতে হয়নি ওঁকে | একের পর এক কিংবদন্তী ছবি যেমন সাহেব বিবি অওর গুলাম‚ পরিণীতা‚ ফুটপাত-এর মত ছবিতে অভিনেয় করেছেন উনি | কিন্তু এর মাঝেই এমন এক মীনা কুমারী ছিলেন যিনি ভালবাসার কাঙালি ছিলেন | আসুন আজকে ট্রাজেডি কুইন‘-এর গল্প শোনাই আপনাদের |

জন্ম থেকেই দুর্ভাগ্যের শিকার হন মীনা কুমারী | জন্মের পর ওঁর বাবার কাছে ডাক্তার কে দেওয়ার মত অর্থ ছিল না | তাই উনি মীনা কে একটা বাড়ির দরজায় রেখে পালিয়ে যান | কিন্তু কয়েক ঘন্টা পরে আবার উনি সেই জায়গা থেকে ফিরিয়ে আনেন মীনা কে | অভিনেত্রীর আত্মজীবনী লেখক বিনোদ মেহতা‚ লেখেন আমার মনে হয় এই ঘটনা মীনা কুমারীর অবচেতনে রয়ে যায় | মীনা কোনদিনই আনন্দ পায়নি | সুখী হয়নি | জন্মের সঙ্গেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছিল ওকে সারা জীবন দুঃখ সহ্য করতে হবে | ওর আসলে ভাগ্যটাই খারাপ ছিল |

কিশোর কুমারের দাদা অশোক কুমার মীনা কুমারী কে প্রথম ফিল্মমেকার কমল আমরোহীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন | পরে কমল মীনা কে ওঁর একটা ছবিতে নেন | কিন্তু ছবির শ্যুটিং আরম্ভ হওয়ার আগেই মীনা এক পথ দুর্ঘটনার শিকার হন | দিনটা ছিল ২১ মে ১৯৫১ | বহুদিন ওঁকে হাসপাতালে থাকতে হয়  | হাসপাতালে থাকাকালীন খুবই মনমরা হয়ে যান উনি | একমাত্র কমল ওঁকে দেখতে এলে উনি খুশী অনুভব করতেন | ফলে কমল নিয়মিত হাসপাতালে ওঁকে সঙ্গ দিতে উপস্থিত হতেন | এমনকি এইসময় ওঁরা একে অপরকে নিয়মিত চিঠি ও পাঠাতেন | বলে রাখা ভালো সেইসময় কমল কিন্তু বিবাহিত ‚ এবং তিন সন্তানের বাবা ছিলেন উনি |

চারমাস হাসপাতালে থাকতে হয় মীনা কুমারী কে | হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর‚ কমল এবং মীনা কুমরীর ঘনঘন দেখা হতে থাকে | রাতে দুজনেই ঘন্টার পর ঘন্টা একে অপরের সঙ্গে গল্প করতেন | এর কিছুদিনের মধ্যেই কমল পরিচালিত মীনা কুমারীর ছবির শ্যুটিং আরম্ভ হওয়ার কথা ছিল | কিন্তু ছবির প্রযোজকের ব্যবসার ক্ষতি হয়ে যাওয়ায় উনি আর ছবির জন্য অর্থ ব্যায় করতে পারলেন না | ফলে ছবি বন্ধ হয়ে যায় | এর মাঝেই আঠেরো বছরের মীনা ৩৪ বছরের কমল আমরোহী কে বিয়ে করে নেন | ওঁদের নিকাহ তে উপস্থিত ছিলেন মীনার বোন মহলিকা | দিনটা ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি‚ ১৯৫২ |

মনের মানুষের সঙ্গে বিয়ে হলেও কিন্তু সুখী হলেন না মীনা | সেইসময়কার সাংবাদিক আলি পিটার জন‚ লেখেন কমল আমরোহী কোনদিনই ভালো স্বামী হতে পারেননি | এছাড়াও মীনা কুমারী যেখানেই যেতেন হয় কমল না হলে ওঁর ঘনিষ্ট বন্ধু বাকর ওঁর সঙ্গে যেতেন এবং ওঁর ওপর নজর রাখতেন | বন্দীর মত থাকতে হত মীনা কুমারী কে | 

মীনা কুমারী গোঁড়া মুসলিম পরিবারের মেয়ে ছিলেন | উনি ভেবেছিলেন কমল আমরোহী কে বিয়ে করলে ওঁর বাবার কড়া শাসনের থেকে মুক্তি লাভ করবেন উনি | কিন্তু তেমনটা হল না | কমল ও বিভিন্ন বিধি নিশেধ জারি করলেন ওঁর স্ত্রী মীনার ওপর | সন্ধ্যে ৬.৩০ পর বাইরে থাকতে পারতেন না মীনা | কারুর ওঁর মেক আপ রুমে ঢোকার অনুমতি ছিল না | উনি একমাত্র কমলের আয়োজন করা গাড়িতেই উঠতে পারতেন | এখানেই শেষ নয় কমল মাঝে মধ্যেই মীনা কুমরীর গায়ে হাত তুলতেন |

কমলের শাসনে অতিষ্ট হয় গেছিলেন মীনা কুমারী | এর ফলে উনি আবার ধীরে ধীরে ডিপ্রশনের শিকার হয়ে পড়েন | অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে ১৯৬৪ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় মীনা কুমারী ও কমল আমরোহীর | কিন্তু কিছুতেই মানসিক অবসাদ কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না মীনা | এইসময় ডাক্তার ওঁকে কম পরিমাণে ঘুমের ওষুধ হিসেবে ব্রান্ডি খাওয়ার পরামর্শ দেন | কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই উনি মদের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন এবং মদ্যপ হয়ে ওঠেন |

এর ফলে শরীর ভেঙে গেছিল মীনা কুমারের | ১৯৬৮ সালে উনি লন্ডন এবং সুইজার্ল্যান্ডে চিকিৎসাও করাতে যান | সেখানে গিয়ে উনি জানতে পারেন ওঁর লিভার সিরোসিস হয়েছে | ডাক্তাররা ওঁকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন | কিন্তু উনি তাঁদের কথা না শুনে মুম্বাইতে ফিরেই পুরোদমে অভিনয় শুরু করেন |

ডাক্তাররা স্পষ্ট মীনা কুমারী কে জানিয়ে দিয়েছিলেন উনি যদি আর একটুও মদ পান করেন উনি মারা যাবেন | তাই কিছুদিনের জন্য নেশা পরিত্যাগ করেন উনি | ফলে একটু সুস্থও হন | এইসময় কমল আবার ফিরে আসেন ওঁর জীবনে | তবে এইবার একজন সিনেমা পরিচালক হিসেবে উনি মীনার কাছে যান | ওঁর বহুদিনের ইচ্ছা ছিল পাকিজাবনানোর | কিন্তু মীনার সঙ্গে বিবাহ বিচ্চদের ফলে ত পিছিয়ে গেছিল | মীনা কুমারী এই ছবি করতে রাজি হন | উনি পারিশ্রমিক হিসেবে মাত্র এক গিনি দাবি করেছিলেন এই ছবির জন্য | 

ছবি মুক্তির পর তা সুপারহিট হয় | এর ফলে মীনা আর কমল কাছকাছিও আসেন আরো একবার | কিন্তু এক মাস বাদে মীনা কে সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতলে ভর্তি করা হয় | দুদিন কোমাতে থাকার পর মাত্র আটত্রিশ বছর বয়েসে ৩১ মার্চ‚ ১৯৭২তে মৃত্যু হয় ওঁর |

কমল আমরোহীর থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রিতে একাধিক অভিনেতার সঙ্গে নাম জড়িয়েছে মীনা কুমারীর | তারমধ্যে সব থেকে জনপ্রিয় নাম হল ধর্মেন্দ্রের | এমনকি আজও ধর্মেন্দ্র স্বীকার করেন উনি যে খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তা সম্ভব হয়েছে মীনা কুমারীর জন্য | ধর্মেন্দ্র যখন ওঁর অভিনয় জীবন আরম্ভ করেন সেইসময় ইতিমধ্যেই মীনা কুমারী একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী ছিলেন | ওঁদের ঘনিষ্টতা সম্পর্কে বিনোদ অভিনেত্রীর আত্মজীবনীতে লেখেন শোনা যায় মীনা আর ধরমের নাকি তিন বছরের জন্য ঘনিষ্টতা ছিল |কিন্তু ভেতরের খবর ৬ মাসের বেশী ওঁদের সম্পর্ক ছিল না |

ওঁদের প্রেমের গভীরতা বোঝা যায় দুটো ভিন্ন ঘটনা থেকে | একবার দিল্লিতে একটা ছবির প্রেমিয়ারে গেছিলেন ধর্মেন্দ্র | সেখানে উনি প্রচন্ড মদ পান করেন | মুম্বাইতে ফেরার সময় বিমানবন্দরে ওঁকে আটকানো হয় | সেইসময় নাকি ধর্মেন্দ্র চিৎকার করে বলেছিলেন আমাকে যেমন করেই হোক ফিরতে হবে | অমাকে যেতেই হবে কারণ মীনা আমার জন্য অপেক্ষা করছে |

বলাই বাহুল্য এই খবর চারিদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে | অন্যদিকে একদিন বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিক করতে গেছিলেন মীনা | ধর্মেন্দ্রও ছিলেন ওঁদের সঙ্গে | ফেরার সময় মীনা ভুল করে অন্য একটা গাড়িতে উঠে পড়েন |সেই গড়িতে ধর্মেন্দ্রে কে দেখতে না পেয়ে উনি হিস্টিরিয়াগ্রস্ত হয়ে পড়েন উনি আতঙ্কের সঙ্গে চিৎকার করে বলে ওঠেন ধরম কোথায়? ধরম কে দেখতে পাচ্ছি ন কেন? ও কোথায়?

এই ছিল ট্রাজেডি কুইন মীনা কুমারীর গল্প | সত্যিই কেমন ভাবে জীবন কাটিয়েছেন উনি তাই না? জন্মের সময় বাবার হাতে প্রত্যাখ্যাত থেকে পরবর্তীকালে অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে মৃত্যু‚ অল্প বয়েসেই জনপ্রিয়তা লাভ করা থেকে স্বামীর হাতে অত্যাচিরিত হওয়া সবই সহ্য করতে হয়েছে ওঁকে | মীনা কুমারীর কিন্তু কোনো অনুশোচনা ছিল না | একজন বীর যোদ্ধার মতই সব কিছু সহ্য করে জীবন কাটিয়েছেন উনি |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here