ব্রাত্যর সেই সাহসটা কি কমলেশ্বরে নেই?

২০ মার্চ ২০০৯ সালে ব্রাত্য বসুর জীবনের সবচেয়ে সাড়া ফেলা নাটকটির অভিনয় হয় | ‘রুদ্ধসঙ্গীত’ | সারা নাটক জুড়ে স্রস্টার সে কী ভায়ানক মস্তানি দেখেছিলাম সেদিন, বাপ রে বাপ | সত্যি-মিথ্যের বোধকে ঘুলিয়ে দিয়ে একটা সময়ে নাটকের পর নাটকে উৎপল দত্ত যেমন একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের সপক্ষে প্রোপাগান্ডার ঝড় তুলতেন, প্রায় তার কাছাকাছি স্টাইলেই জন্ম নিয়েছিল সেই ব্রাত্যজনের ‘রুদ্ধসঙ্গীত’ | আর সেই নাটকে শুধু দেবব্রত বিশ্বাসকেই নয়, তাঁর জীবনের সঙ্গে মাখামাখি হয়ে থাকা, মিথ হয়ে যাওয়া অন্য মানুষগুলোকেও স্ব-নামে স্ব-পরিচয়ে নিয়ে এসেছিলেন পরিচালক | নাটকের গোটা শরীর জুড়ে তাই জর্জ বিশ্বাসের পাশাপাশি দাপিয়ে বেরিয়েছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, শন্ভু মিত্র, সন্তোষ কুমার ঘোষ, মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার, জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, সুচিত্রা মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, তৃপ্তি মিত্র, আর হ্যাঁ, অতি অবশ্যই ঋত্বিক ঘটক | ব্রাত্যর সৌজন্যে সেই প্রথম বোধহয় বাঙালি দেখলো, ঋত্বিকের ভূমিকায় অভিনয় করছেন অন্য কেউ একজন, আর কাল্ট-মিথ হয়ে যাওয়া বাংলার অন্যতম ছন্নছাড়া এই সংস্কৃতিকর্মী ক্রমে জীবন্ত হয়ে উঠছেন চোখের সামনে |

সেদিন সেই ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন থিয়েটার-অভিনেতা সত্রাজিৎ সরকার | আর তার চার বছর পরে ঋত্বিকের জীবন ঘেঁটে যে ছবিটা তৈরি করল শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস, সেই ‘মেঘে ঢাকা তারা’-য় সেই ভূমিকায় রইলেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় | মজার ব্যাপার হল, ‘রুদ্ধসঙ্গীত’ নাটক নির্মাণ করতে গিয়ে কোথাও ব্রাত্যকে বলতে হয়নি, এই নির্মাণ কল্পনামাত্র, এরসঙ্গে বাস্তবের যোগসূত্র নেই | এই দুরন্ত সাহসটা কিন্তু আদপেই দেখাতে পারলেন না ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় | শুরুর সাবধানী ডিসক্লেমারটার কথা বাদই দিন, বাস্তব আর পরাবাস্তবের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই ছবির সব চরিত্রই কিনা মুখ লুকলো ছদ্মনামের আড়ালে | ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’-কে অনুসরণ করে ঋত্বিক, তাঁর স্ত্রী আর তাঁর সন্তান হয়ে গেলেন নীলকন্ঠ বাগচি, দুর্গা আর সত্য | এর পাশাপাশি পাল্টে গেল বাকি সব চরিত্রগুলোর নাম, এমনকি ঋত্বিক বা সত্যজিতের ছবির নামগুলো | তাই নীলকন্ঠ বাগচি ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ না বানিয়ে বানান ‘ঘরছাড়া’ (সেটাকে আবার ফুটনোট দিয়ে দেন শিশুসাহিত্য বলে), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ না বানিয়ে বানান ‘মেঘের আড়ালে’ | ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ না বানিয়ে বানান ‘মালোপাড়া’ | তাঁর সমসময়ে পরিচালক অরিজিতের ছবি ‘পথের গান’ (নামটা বেশ দুর্বল) বিদেশে পুরস্কৃত হয়, পরের ছবি ‘অপরাজেয়’ও সর্বত্র সাড়া ফেলে | এই সব লুকোচুরি খেলতে গিয়ে যেটা হল, এক ঋত্বিক ছাড়া আর বাকি চরিত্রগুলোকে অনেকসময় চেনাটাই দুষ্কর হয়ে উঠছিল | আইনক্সে আমার সামনের আসনে থাকা এক প্রবীণ দর্শক কাউকে একটা চিনতে পারলেই প্রায় লাফিয়ে উঠছিলেন আর গোটা সময়টা জুড়ে আমি শুনে আসছিলাম ‘আরে এইটে সত্যজিৎ’, ‘এইটে সলিল চৌধুরী’, ‘এইটে অনিল চ্যাটার্জ্জী’, তিনি অব্দি ফেল মেরে গেলেন, বুঝতে পারলেন না, মিনু নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অভিনেত্রী বেনু (সুপ্রিয়া দেবী) কিম্বা ‘জঠর’ নামের উপন্যাসের লেখকটিকে (‘বিবর’-লেখক সমরেশ বসু) |

সোজাসাপ্টা সোজা কথা বলার জন্য বিখ্যাত বা কুখ্যাত পরিচালকের জীবন-মন্থন করতে গিয়ে এতটা রহস্যময়তা, এতটা চোরাবাঁকের সামনে পড়ব, বুঝতেই পারিনি | চোরাবাঁক মানে? আরে, গোটা সিনেমাটায় গল্প বলে একটানা কিচ্ছু নেই যে | ইচ্ছেমতো ফ্ল্যাশ ব্যাক আর ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড করে ঋত্বিক জীবনী যেন ডি-কনস্ট্রাক্ট করতে গেছেন কমলেশ্বর | সিনেমা দেখতে যাওয়ার আগে তাই খুব ভালো করে ঋত্বিকের জীবন যদি না পাঠ করে যান, দু ঘন্টা চল্লিশ মিনিটের এই সিনেমার মাঝবরাবর পৌছে অতল ঘুমে তলিয়ে যাওয়া, কিম্বা মাথা-যন্ত্রণা আপনার নিয়তি হবেই হবে | কিন্তু আপনি যদি সিনেমার মুগ্ধ প্রেমিক হন? তাহলে এই ছবি আপনাকে দেবে অবশ্যম্ভাবী রোমাঞ্চ | শেষদৃশ্যটি বাদে আগা-গোড়া সাদা-কালো এই ছবির সারা শরীর জুড়ে ঋত্বিকের সবকটি ছবির ইমেজারি সুকৌশলে পুরে দিয়েছেন পরিচালক, এমনকি কোথাও কোথাও ঝিকিয়ে উঠছে ঋত্বিকের প্রিয় আন্তর্জাতিক ছবিগুলোর ফ্রেম | ঠিক যেন মনে হচ্ছে তাঁর সবকটা প্রিয় ছবির চরিত্ররা তাঁদের আত্মা নিয়ে সহবাস করছে ঋত্বিকের সঙ্গে, আর এভাবেই ক্রমে তাঁর শরীর থেকে সৃজিত হচ্ছে নতুন নির্মাণ | আম-দর্শক যতই ‘কী লম্বা ছবি রে বাবা’, বলে ঘনঘন ঘড়ি দেখতে থাকুক, যিনি সেলুলয়েডকে পাঠ করতে পারেন, তাঁর গায়ে এরপরেও কাঁটা না দিয়ে পারে?

এককথায় ২০১৩-র জামাই ষষ্ঠীর বাজারে এই নতুন রিলিজ হলো একদম সেই ছবি, যে ছবি আক্ষরিক অর্থেই গভীর জলের ফিশ | পাবলিক যার নাম দিয়েছে, না খোকা চারশো বিশ নয়, আঁতেল বই | তা না হয়, আঁতেল বই বানালোই কেউ একজন এতগুলো দিন পরে, ক্ষতি কী? নিজের পয়সায় তো আর বানায় নি রে বাবা | বানিয়েছে ‘পাগলু’, ‘চ্যালেঞ্জ নিবি না শালা’, ‘লাভেরিয়া’-খ্যাত বাংলার নাম্বার ওয়ান প্রযোজকের টাকায় | ভাবা যায়? ঋত্বিক নিজে সারাটাজীবন তাঁর ছবির জন্য প্রযোজক খুঁজে বেরিয়েছেন, বিশেষ কেউ তখন তাঁকে পাত্তা দিত না | আর আজ তাঁর মৃত্যুর ৩৭ বছর পরে তাঁর জীবন-খ্যাপামি-মাল খাওয়া আর পাগলা গারদে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো অতি-ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো নিয়ে গবেষণা করে তৈরি হচ্ছে এহেন নতুন সেলুলয়েড-পণ্য, ভাবা যায়! বাজি ধরেই বলছি, ঋত্বিক নিজেও ভাবতে পারেননি |

গত শতক হলে এরকম আঁতেল ছবি হয়তো রিলিজই হতো না | কিন্তু এই শতকে মার্কেট আর মার্কেটিং-এর সব অঙ্ক অন্য লেভেলে পৌছে গেছে কিনা | তাই বাজারের সবচেয়ে বাণিজ্য-সফল প্রোডিউসার এই ছবি বানিয়ে হল-রিলিজের আগেই সেটা পাঠিয়ে দেন জাতীয় পুরস্কারের মহল্লায় | সেখানে ব্যর্থ হলেও কুছ পরোয়া নেই | মিডিয়া শুরু করে ছবির গুণকীর্তন ( এমনি এমনিই কি!!) | ছবি নিয়ে আপনার আগ্রহটা তৈরি করতে হবে না? যে প্রযোজকরা মূলত ‘রোমিও’, ‘১০০% লাভ’ বা ‘ফান্দে পরিয়া বগা কান্দে রে’-র মতো ব্লকবাস্টার বানিয়ে বাংলা কাঁপিয়ে দেন, এখন যে এর পাশাপাশি তাঁরা এমন তথাকথিত ব্রাত্যজীবনকেও আলোয় নিয়ে আসার কথা ভাবছেন, বাঙালির সাংস্কৃতিক টোপোগ্রাফিতে সেটা একটা বড়রকম বদল তো বটেই!

২০১১-য় কমলেশ্বরের প্রথম ছবি ’উড়ো চিঠি’ দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম | পৃথিবী জোড়া রিসেশন নিয়ে এমন মর্মস্পর্শী ছবি কোনও বাঙালি পরিচালকের হাত থেকে বেরবে, ভাবতেই পারিনি | আর এই ’মেঘে ঢাকা তার’ দেখার পর টের পাচ্ছি কমলেশবরের ছবি আর শুধু ছবি নয় | ফিল্ম স্টাডিজ সিলেবাসের এক অপ্রিহার্য উপাদানও বতে | এ লেখার শুরুতে লিখেছিলাম, ব্রাত্যর সাহসটা কমলেশ্বরে নেই | এবার বলি, না, ব্রাত্যর সাহসটা কমলেশ্বরেও আছে, একটু অন্যভাবে আছে, আরে না হলে এই আগাপাস্তলা লুম্পেন-সময়ে এমন একটা অনেস্ট ছবি তিনি নামালেন কী করে? উল্টে মজা হলো, ব্রাত্যর সেই সাহসটা এখন বোধহয় খোদ ব্রাত্যরই আর নেই, ওর নতুন নাটকটা দেখে অন্তত সেটাই মনে হলো |

’মেঘে ঢাকা তারা’ ছবিতে সমস্ত কলাকুশলীরাই অসাধারণ | টবে সেই তালিকা দিয়ে আর কথা বাড়ালাম না | গতে বাঁধা সেই প্রশংসা তো বাজারি পত্রিকাতেই পড়তে পারেন, তার জন্য আর বাংলালাইভ কেন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here