মুখে যতই বলি, বয়স একটা সংখ্যা মাত্র, জীবন কিন্তু অন্য গল্প শোনায়| বয়স যত সামনের দিকে গড়ায় তত জমে থাকা নানা স্মৃতি মনকে ধূসর করে| সেই যন্ত্রণা চাপতে গিয়ে কেউ হারিয়ে ফেলেন সৌজন্যের মাত্রা বোধ| কেউ সরিয়ে নেন, গুটিয়ে নেন সবার থেকে| সব কিছু থেকে| জীবনের সায়ান্হে পৌছে এই সমস্যা কি আপনারও? আপনার মত আরও যাঁরা এই ধরনের সমস্যায় জেরবার, মন বিশ্লেষক পারমিতা মিত্র ভৌমিক রয়েছেন তাঁদের পাশে—

Banglalive

ঘটনা ১: জগদীশ সান্যাল| ৭৩ বছরের এই বৃদ্ধের বাড়ি দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত এলাকায়| মাসখানেক আগে এক বীভত্স গাড়ি দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি| প্রাণে বাঁচলেও মাথায় বড় ধরনের চোট পান| সেই থেকেই যত গণ্ডগোল| আমার কাছে বাড়ির লোকেদের (স্ত্রী এবং মেয়ে) নালিশ, এক্সিডেন্ট-এর পর থেকেই বদলে গেছেন ভদ্র মানুষটি| চুড়ান্তু অভদ্রতা করছেন বাড়ির সবার সঙ্গে| সব থেকে বড় সমস্যা, যৌন খিদে বেড়েছে তাঁর| সেই চাহিদা মেটাতে হাতের কাছে যাঁকে পাচ্ছেন তাঁকেই ধরে টানাটানি করছেন| তাঁর এই আক্রমণের শিকার হয়েছেন চেনা-অচেনা অনেকেই|

এখানেই শেষ নয়| যৌন খিদে মেটানোর পাশাপাশি অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করছেন| সারাক্ষণ যেনতেনপ্রকারেণ সবার মনোযোগের আকর্ষণের চেষ্টা তাঁর| সেটা না পেলেই চিত্কার-চেচামেচি| প্রচন্ড রেগে গেলে দেখভাল করার নার্সকে মারধর করেন| কামড়ে দেন| পরিবারের কাউকে বিশ্বাস করেন না| জগদীশবাবুর বাড়ির লোকেদের একটাই প্রশ্ন, কোনদিন কি আর সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন তিনি?    

কী হয়েছে, কেন হয়েছে— ডাক্তারি পরিভাষায়, দুর্ঘটনা থেকে মাথায় ফ্রন্টাল লোবে চোট পাওয়ায় এই বাজে পরিবর্তন এসেছে জগদীশবাবুর মধ্যে| মাথার এই বিশেষ অংশ কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলে এরকম নানা সমস্যা দেখা দেয়| মনের এই সমস্যা থেকে জগদীশবাবুকে বের করে নিয়ে আসার জন্য তিনি মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন| তাঁর কথা মেনে দুর্ঘটনার ঠিক ১ মাস পরেই স্ত্রী ও মেয়ে যোগাযোগ করেন আমার সঙ্গে|     

সমাধান— চোট-আঘাতের জন্য যেহেতু জগদীশবাবু শয্যাশায়ী, তাই অভিজ্ঞদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হয়েছিল| প্রথমদিন ভদ্রলোকের মুখোমুখি হয়েই বুঝলাম, এত সমস্যার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তিও তাঁর সঙ্গে শত্রুতা করছে| তিনি অল্প সময়ের মধ্যে সব ভুলে যাচ্ছেন| মাঝে মাঝে নিজের লোকেদের চিনতে পারছেন না| সেই সঙ্গে দানা বেঁধেছে একরাশ সন্দেহ| বাড়ির লোক, দেখভাল করার লোক তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করছে| ওঁরা ভুল পথে চালিত করছে ওকে|

স্মৃতিশক্তি পুনরুদ্ধার এবং সেই শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি রিহ্যাবিলিটেশন মেথড-এর সাহায্য নিয়ে মস্তিষ্ককে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলাম|পাশাপাশি চলতে লাগলো মেডিটেশন আর ফিজিওথেরাপি|

দু’মাসের মাথায় জগদীশবাবু আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করলেন| মেডিটেশনের জোরে তাঁর যৌন খিদেও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলো| এবার শুরু হলো সাপোর্টিভ থেরাপি| থেরাপিস্ট গিয়ে তাঁর সঙ্গে অনেকটা করে সময় কাটিয়ে, কথা বলে তাঁর সমস্যা বোঝার চেষ্টা করেন| এবং মনের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ, রাগ, সমস্যা এবং মানসিক অবসাদের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করেন| একইসঙ্গে বাড়ির লোকেদের শিখিয়ে দেওয়া হয়, কীভাবে জগদীশবাবুর রাগ বা অসংযত আচরণ প্রাথমিকভাবে সামাল দেবেন|

টানা ৬ মাস এই চিকিত্সা চলার পর রোগীর অসংযত আচরণ, যৌন খিদে, অশ্লীল ভাষা বন্ধ হয়ে যায়| ভুলে যাওয়ার পরিমাণও কমতে থাকে| মনোযোগ আকর্ষণ করার বদ অভ্যাস কমে যায় অনেকটাই|

এবার আমরা ঠিক করি, কগনিটিভ থেরাপির জন্য মাসে একবার রোগীকে ক্লিনিকে আনার ব্যবস্থা করতে হবে| এছাড়া, থেরাপিস্ট মাসে ২-৩ বার বাড়ি গিয়ে যেভাবে তাঁর ট্রিটমেন্ট করছিলেন সেটা চালু থাকবে| এভাবে ১ বছর আমাদের সংস্পর্শে থেকে আগের জীবনে অনেকটাই ফিরে গেছেন জগদীশবাবু| হাসি ফুটেছে বাড়ির সবার মুখে|   

যোগাযোগ: ৯৮৩০০-২১৫৬৭      

আরও পড়ুন:  বর্ষাকালে ত্বক ভালো রাখতে চাই এক্সট্রা কেয়ার‚ জেনে নিন কিছু জরুরী বিষয়

NO COMMENTS