শুধু মুখ নয়, চাই আগুন-ভরা বুক #MeToo

 

আগুন ভাল । যে আগুন মুখোশ খসায় , চামড়া পোড়ায় সে আগুন প্রকৃতঅর্থে ভাল ।

#মিটু আঁচের আগুন আসার নিদারুণ প্রয়োজন ছিল । আমরা সব হারিয়েও মরতে-মরতে প্রাণপণ যে জিনিসটাকে আঁকড়ে রাখি যথাসাধ্য সেটা হল ‘লজ্জা’ । এই লজ্জার দায় নেওয়ার তো কাণ্ডারি একজন চাই । #মিটু আমাদের সেই লজ্জার আগল ভেঙে মুখে ভাষা ফুটিয়েছে । স্পর্ধা দেখাতে শিখিয়েছে ।

 

 

এই পরিপ্রেক্ষিতেই দুটি ঘটনার কথা কল্পনা করা যাক ।

ঘটনা – ১

মেয়েটার সঙ্গে দেখা হল জানেন । আবছা আলো আর ঝিরিঝিরি হাওয়া । চোখের ভিতর জ্বলজ্বলে আগুন গোলা ।বছর পনেরো আগে থাকতেই চিনি । এখন সে অবশ্য নামজাদা অভিনেত্রী । ম্যানেজারের থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া চট করে দেখা পাওয়া সম্ভব নয় । আর বাকি অনেক মেয়ের মতনই এই মেয়েটিকেও ক্যারিয়ার শুরুর দিনগুলোতে এক বা একাধিক প্রযোজক-পরিচালকের অতি অন্যায্য আচরণ হজম করতে হয়েছিল । সে তো একপ্রকার বাধ্য হয়েই গোপন হেনস্থাকে দিনের পর রাত , রাতের পর দিন মেনে নিয়েছিলেন । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ‘যে বিষয়ে কিছু বলা যায় না , সে বিষয়ে চুপ থাকাই উচিত’ — দার্শনিক লুডউইগ একবার এ-কথা বলেছিলেন । সেই সময়ে দাঁড়িয়ে আজকের দাপুটে অভিনেত্রীটি সামর্থে ও ক্ষমতায় এতোটাই তুচ্ছ ছিল যে তার কথা লোকে গ্রাহ্যের মধ্যেও আনত না । বা প্রতিবাদ করার জন্য যথেষ্ট রসদ তার কাছে ছিল না । শুধু মেয়েটি মনে-মনে ঠিক করেছিলেন , সিনেমা-অভিনয় তার ধাতে সইবে না । এই কম্প্রোমাইজ করে আর নয় ।

মুখে কুলুপ এঁটে যে কাজ মেয়েটি শেষ করে সেই ছবিটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে । বাণিজ্যিক বোঝাপড়ার নিরিখেও ভাল মুনাফা হয় । সঙ্গে-সঙ্গে অন্য আরেকটি ছবিতে কাজের সুযোগ আসে । সেখানে ভাল মর্যাদায় কাজ করতে থাকেন । একের পর এক কাজের ক্রমাগত স্রোতে এবং মেয়েটির জীবন বদলে যায় । আসে লাইম-লাইট , রূপোলি জগতের চিরাচরিত চাকচিক্য । একজন তারকা হয়ে গেলে ক্রমশ যা হতে থাকে তাই ঘটছিল পর-পর । এমনকি যে প্রযোজক-পরিচালক তাকে হেনস্থা করেছিল সেও সম্ভ্রমের সঙ্গে অভিনয়ের জন্য ডেকে নেন । অর্থে , সম্মানে , প্রভাব-প্রতিপত্তিতে , সোনা-দানা , বাংলো , বিদেশ ভ্রমণে অতিসাধারণ মেয়েটি একটু-একটু করে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলেন ।

এবার এতদিন পর #মিটু আন্দোলনে মেয়েটিও সিদ্ধান্ত নেন , নিজের অভিজ্ঞতাকে বালিশ-কান্নায় আর ধামাচাপা নয় বরং জনসম্মুখে আনবে । যাতে একই পথে অন্য কেউ আর না-হেনস্থা হয় । সঙ্গে আরও একটি মোক্ষম কাজ করলেন — সেই প্রথম ছবি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যতদূর ব্যপ্তি হয়েছে , সেই উন্নতির শিখর থেকে প্রতীকী হিসাবে একটি দামী বিএমডাবলু গাড়ি , একটি এক্সিকিউটিভ এপার্টমেন্ট , ব্যাঙ্ক আকাউন্টে পাঁচ কোটি টাকার থেকে অন্তত এক কোটি টাকার চেক পনেরো বছর আগেকার ওই বিশেষ প্রযোজক-পরিচালকের মুখে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসলেন । শুধু মুখের কথা নয় , সোশ্যাল মিডিয়ায় চিৎকার নয় প্রতিবাদ হিসাবে এই সামগ্রীগুলোকে দান করে দিলেন ।

 

 

ঘটনা – ২

এক্ষুনি যার কথা বলছি , পি.এইচ.ডি করার সময় একাধিকবার তার প্রোফেসর-গাইডের কাছে যৌন কামড় ও উৎপাতের শিকার হতে হয়েছিল । মুখ বুজে থাকতে বাধ্য হয়েছে ভবিষ্যতের কথা ভেবেই । তা বোবা-মুখের গুণেই হোক বা মেধার জোরেই হোক মহিলাটি আজ সুপ্রতিষ্ঠিত । বিদেশে কর্মরতা । #মিটু প্রতিবাদে এই মহিলা আজ তার পি.এইচ.ডি সার্টিফিকেটটা গাইড-স্যারের মুখে ছিঁড়ে কুচি-কুচি করে দেন । মহিলা নিজেও কিন্তু এক চরম অনিশ্চয়তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন । সে জানেন না যে চাকরিটা তার থাকবে কিনা । তাও তিনি এই স্পর্ধা দেখাতে একবারও আগু-পিছু ভাবলেন না ।

অভিনন্দন । বিপ্লব এভাবেই আসে । সজোরে , সপাটে ধাক্কা হয়ে ।

মেয়েদের জামা ছিঁড়ে , চুল টেনে তাকে ‘অবলা’ আখ্যা দেওয়ার দিন ঘুচল । আর তাছাড়াও নির্যাতনের পাঠ কখনও নারী বনাম পুরুষের নয় । অন্যায় বনাম অধিকারের ।

তবে আজকে এই আন্দোলনের সততা বা শুদ্ধতা ঘিরে বারবারই প্রশ্ন উঠছে । নানা মহলে আজও চাপা গুঞ্জন থেকেই যাচ্ছে ।

#মিটু আন্দোলন তখনই শক্তিশালী হবে যখন কম্প্রোমাইজের পাল্টা বৈষয়িক-প্রাপ্তির সিকিভাগও অবলীলায় ত্যাগ করতে পারা যাবে । সম্পূর্ণ না পারি প্রতীকী হিসাবে ভগ্নাংশ তো ফেরত দেওয়া যেতেই পারে ? দশ বছরের ইনকামের টাকা ফেরত না দিতে পারি এক বছরেরটাও কি আমরা মোটে পারি না ?

আমি যৌন-হেনস্থাকে ঘৃণা করি । কিন্তু তার ফলে যে অর্থ , যে প্রাচুর্য আমাকে তারকা বানিয়েছে তাকে ঘৃণা করব না কেন ? সততার মুখে ছাই দিয়ে আমার কল্পিত-অভিনেত্রী তার বৈষয়িক-আয়ের কিছু অংশ ফেরত দিয়ে তো সঠিক সিধান্ত নিয়েছেন । তাহলে সেক্ষেত্রে অন্যদের এই সচেতন হিসেব কেন ?

এই ভারতবর্ষেই ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে কাতারে-কাতারে নারীপুরুষ আন্দোলনে নেমেছিলেন । সেদিন কিন্তু ব্রিটিশদের অপমান-হেনস্থার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন । দেশের লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন । সহায়সম্বলহীন দরিদ্র দেশবাসী একবারও ভাবেননি আহাঃ পরে কী হবে ! নারীপুরুষ নির্বিশেষেই স্যাক্রিফাইস করেছিলেন । এই কারণেই বিপ্লবের অপর নাম আত্মত্যাগ । শত-শত মহিলা ইংরেজের মার , গুলি , ফাঁসি , জেল সবটাকেই বরণ করে নিয়েছেন । দুইশ বছর সময় লেগেছে ঠিকই কিন্তু এ-কথা সত্যি যে ভারত আজ স্বাধীন । মুখ-বুঁজে ঘরে দোর দিলে এই স্বাধীনতা কি আসত ?

কাজেই , ‘আমি মুখ-বুঁজে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম’ — এ-কথা বলা মানে যারা মুখ-বুঁজে থাকেন না তাঁদের অপমান করা । তাতে ইতিহাস লাঞ্ছিত হয় । যৌন-উস্কানি কখনও ক্রয়যোগ্য পণ্য নয় , যে হুট বলতে বাজার থেকে কিনে বা ছিনিয়ে নিয়ে কামের জ্বালাকে তপ্ত করা যাবে । এটি একটি বিকৃত স্বভাব । যে স্বভাবের মুখে সজোরে লাথি কষাতে হয় । এই স্পষ্ট কথাটা বোঝার দিন আলবৎ এসেছে ।

সমাজে #মিটু আন্দোলনের প্রয়োজন একশবার আছে কিন্তু একই সঙ্গে আছে তার শুদ্ধতারও প্রয়োজন । যাতে আগুন-আঁচে মুখ-কালো নয় , আগুনের আহূতিই যেন নারী সম্ভ্রমকে করে তুলতে পারে আরও উজ্জ্বল ।

শুধু গ্ল্যামার-ওয়ার্ল্ড কেন যে মেয়েগুলো পাদপ্রদীপের নীচে আছেন , তাঁরা ! যারা আজও অন্ধকারে মুখ ঢেকে নেয় । তাঁদের যৌন নিগ্রহের হদিশ রাখে কয়জন ? তাঁদের কথা শুনবে কে ? জানবে কে ?

উপেক্ষার নীরবতা সেও কি একপ্রকার যৌন হেনস্থা নয় ? প্রতিবাদ করার জন্য শুধুই মুখ নয় দরকার আগুন-ভরা বুক ।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

3 Responses

  1. সুন্দর ভাবনা। তবে এই #MeToo লড়াই কেবল যৌন হেনস্থার বিরূদ্ধে নয়, একটি বিশাল শোষনতন্ত্রের বিরূদ্ধে স্বাধীনতা এবং সন্মান ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াই। আমরা যারা নিজেদের comfort zone ছেড়ে বেরোতেই ভয় পাই তাদের কাছে আত্মাহুতি দেওয়ার মতো বা আগুন হাত পোড়ানোর মতো কাজ নিশ্চিত দুঃসাধ্য। তবে ইচ্ছা থাকলে সব হয়। কেবল solidarity নয়, প্রোয়োজন সহযোদ্ধাদের।

  2. লেখিকাকে সাধুবাদ তার সুন্দর ভাবনা আরো সুন্দরভাবে প্রকাশ করার জন্য। তবে এই #MeToo movement নিছকই যৌন হেনস্থার বিরুদ্ধে মুখ খোলা নয় এ এক বিশাল শোষণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াই, নিজের সন্মান ও আত্মমর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে মাথা না নুইয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হ‌ওয়ার লড়াই, সামাজিক লজ্জাবোধ, ভয়ের উপরে উঠে সকল অন্যায় ও অস্বস্তির বিরুদ্ধে “চুপ করবনা” বলার লড়াই। যেকোনো সংগ্রামের মতন এই যুদ্ধ‌ও দাবী করে আত্মত্যাগ এবং আত্মাহুতি।
    কিন্তু আমরা অধিকাংশরাই তো নিজেদের চেনা পরিজন, চেনা চারদেওয়াল, চেনা গন্ডী তথা comfort zone ছেড়ে বেরোতেই চাইনা, সমাজের টেনে দেওয়া গন্ডীতে সুরক্ষা খুঁজতে চাই এবং অচেনা পথের কথা ভাবলেই আতঙ্ক বোধ করি। নিজেদের image এবং সামাজিক face loss এর ভয়ে অনেক আপোষ রোজ করি, অন্যের অনুমোদন পাওয়ার জন্য ন্যায় অন্যায় নিয়ে ভাবতে কুন্ঠা বোধ করি। এই অবস্হায় এমন লড়াইয়ের জন্য আত্মাহুতি দিতে বা আগুনে হাত পোড়ানোর জন্য আমরা কজন রাজি? ঠুনকো সামাজিক লজ্জার ঊর্দ্ধে উঠে শক্তিশালী শোষণকারীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হ‌ওয়ার সাহস কি আমরা সত্যিই বুকে ধারন করি? নাকি এখনো ঘরের কোনে বালিশ জড়িয়ে মেকী সুরক্ষার দোহাই দিয়ে “নাম নেবনা” বলাটাই অনেক বেশী comforting?
    #MeToo উচ্চারণ করে সহমর্মিতা প্রকাশকে নিশ্চিত কুর্নিশ জানাই কিন্তু অসুরতন্ত্র দমনের জন্য কেবল solidarity পর্যাপ্ত নয়, প্রোয়োজন লিঙ্গ-জাতি-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে আপোষহীন সহযোদ্ধাদের।

  3. অন্যায়ের প্রতিবাদ যেমন প্রয়োজন তেমনি এটার উৎপত্তির জড় থেকে নির্মূল করাও একই সাথে প্রয়োজন । এর কারণ স্বরূপ বলা যেতে পারে চট জলদি সাফল্য এর লোভ দেখিয়ে যারা কাজের প্রলোভন দেখায় তাদের সাথে কাজ না করা । কারণ এই প্রলোভন দেখানো টাই তাদের কাছে মূল অস্ত্র । অতএব নির্মূল এর প্রয়োজন শুধু এটাই ।

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই