মলমূত্রের বিনিময়েও পাওয়া যায় টাকা-খাবার‚ জানে পরিযায়ীরা

সে প্রায় দশ কোটি বছর আগের কথা। একটু একটু করে পৃথিবীর স্থলভাগ আর জলভাগ সরতে থাকল,
হিমালয় থেকে অন্যসব পাহাড়পর্বত, সাগর মহাসাগর থেকে দেশ মহাদেশ রচিত হল; দেখতে দেখতে
বদলে গেল পরিবেশ আবহাওয়া। এর মধ্যে হু হু করে বেড়ে গেল পাখিদের সংসার, এল নানা অভ্যাস,
বৈচিত্র। শুরু হল লেটস গো- কারও ডিম পাড়া, তা দেওয়া, বাচ্চা ফোটানো, কারও বিশেষ সময়ে
খাদ্যাভাব, কারও আবার বেআক্কেলে আবহাওয়া। কিন্তু উড়ে যাওয়া ফিরে আসা ক্যালেন্ডারের
তারিখ ধরে।

এই পরিযানে আছে থমসন’স গাজেল (হরিণ), ওয়াইল্ডবিস্ট। যারা প্রতি ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে
তানজানিয়ার দক্ষিণ সেরেঙ্গেটি থেকে পাড়ি জমায় কেনিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব মাসাইমারায়। প্রায় ৮০০
কিমি এই যাত্রাপথে ডাঙায় সিংহ আর জলে কুমির। কিন্তু চোয়াল ভরে কচি ঘাস পাতা, টলটলে জলে
গলা ভেজানো এসব জৈবিক চাহিদা মেটাতেই মাইলের পর মাইল হেঁটে চলে পশুগুলি ।

পশু বা পাখিরাই কি কেবল ঋতু অনুসারে এ দেশ বা অঞ্চলে কয়েকটি মাস ওখানে কয়েকটি মাস বসতের ঠেক ঠিকানা তৈরি করে ? কমপক্ষে দু’হাজার প্রজাতির পাখি ছাড়াও পরিযানের পথনির্দেশ বেছে নেয় মাছ, চিংড়ি, কাকড়া, প্রজাপতি এমনকি মানুষও। পরিযায়ী এমন মানুষের কাহিনি রয়েছে এদেশেই।

কর্নাটক রাজ্যের উত্তর মধ্যভাগের মালভূমি অঞ্চলের প্রকৃতি বৃষ্টিপাতের ব্যাপারে খুবই কৃপণ। বৃষ্টিহীন ধারোয়ার, বিজাপুর, গুলবর্গা, রাইচুর প্রভৃতি অঞ্চলে বাস করে কুরুবা জনগোষ্ঠী । জীবন নির্বাহের জন্য অল্পস্বল্প চাষাবাদ করলেও আদতে তারা পশুপালক । একেই বৃষ্টির জন্য হাপিত্যেশ করতে হয় প্রতি বর্ষায় তার ওপর পাথুরে জমি গ্রানাইটের ঢিবি আর টিলাতে ভরতি। সেই পাথুরে জমির ফাঁকফোকরে কতটুকু বা চাষাবাদ হতে পারে !

অমন জমিতে চাষ করতেও বছরভর জল থাকে এমন একটা নদী থাকা দরকার। কিন্তু তিন মাস বর্ষায় নদীর জল যেটুকু মেলে তাতে জোয়ার বাজরার মতো ফসল ফলাতে ওদের দম ছুটে যায়। তাতে সারা বছরের সংস্থানও হয় না। তাই ভেড়া ছাগল প্রতিপালন করে ওরা । দুধ ছাড়াও ভেড়ার লোম থেকে কম্বল বানিয়ে বিক্রি আর উদ্বৃত্ত পশু-মাংস কারবারিদের কাছে বিক্রি করাটাই কুরুবাদের আসল জীবিকা ।

কিন্তু পালিত পশুদের খাবারদাবারেরও তো অভাব । বর্ষার ছিটেফোঁটা জল পেয়ে আনাচেকানাচে যেটুকু ঘাসপাতা মাথা চারা দেয়, শরৎকাল যেতে না যেতেই সেসব আবার শুকিয়ে উধাও হয়ে যায় । তাই খেতের জোয়ার বাজরা গোলায় তুলে কুরুবারা বেরিয়ে পরে ওদের নিয়ে । বর্ষায় প্রকৃতির দান যেটুকু মেলে সেটুকু কাজে লাগিয়ে শরতকাল ফুরোবার আগেই ফসল ঘরে তুলে, সারাবছরের যতরকম সামাজিক ক্রিয়াকর্ম, বিয়ে-শাদি এমনকি নিজেদের মধ্যেকার যত ঝগড়াবিবাদ, অপরাধ তার বিচারকার্য সেরে ফেলে।

যেহেতু নিজেদের সমাজের বাইরে তারা যায় না তাই তাদের সমস্যা, অসুবিধা, আইন, বিচার, আদালত তারা নিজেরাই মেটায় । অন্য জাতের বিচারালয়ের দরজায় তারা এখনও পর্যন্ত পা রাখেনি ।গাঁওবুড়োদের নিয়ে তৈরি আদালতই তাদের সুপ্রিম কোর্ট। তবে এই পরিযানে কেবল পুরুষ কুরুবারাই যাত্রা করে তাদের পোষা ছাগল ভেড়ার দল নিয়ে । মেয়েরা বা বাচ্চারা যায় না বললেই চলে। ভেড়া ছাগল ছাড়াও থাকে কয়েকটি গাধা । ওদের পিঠে চাপানো থাকে ভেড়ার লোমে বোনা কম্বল, রাতের বিছানা আর মাথার আচ্ছাদন । পরিযায়ী দলে থাকে দুতিনটি সারমেয়; ওদের নেওয়া হয় সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে।

পশ্চিম মুখো যাত্রায় তাদের লক্ষ্যস্থল হল পশ্চিমঘাট ও সংলগ্ন মালভূমি এলাকা । কারণ বর্ষায় আরবসাগরের জল ভরা মৌসুমি বাতাস হালকা হতে পশ্চিমঘাটের ওপর যতখানি সম্ভব বৃষ্টি ঝরিয়ে
দিয়ে যায়। তারপরই ওই অঞ্চল সবুজে ভরে ওঠে। ইতিমধ্যে মাঠের ফসল উঠে গোলায় চলে গেলে
ঘাসপাতায় ভরে যায় ওই মালভূমি এলাকা। পশুপালের পেট ভরা খাবার আর পুষ্টির জন্য এমন আদর্শ
স্থান কুরুবা বসতির ধারে কাছে আর কোথায় !

কিন্তু জমির মালিক তার জমিতে পশুরপালকে অবাধ বিচরণের জন্য ছেড়ে দেবেই বা কেন। জমির
মালিকদের সঙ্গে কুরুবা পশুপালকদের রফা হয় কোন কোন জমির কোথায় কোথায় ছাগল ভেড়ার খোয়ার হবে আর কোথায় হবে কুরুবাদের রাত কাটানোর আস্তানা । শর্ত অদ্ভুত- পশুদের খোঁয়াড় বা পশুপালকদের আস্তানা বাবদ জমি মালিকরা কোনও টাকা পয়সাই নেয় না, উল্টে তারাই প্রতিরাতে পশুদের জন্য কিছু টাকা আর পশুমালিকদের জন্য মাথাপিছু জোয়ার বাজরা জাতীয় খাদ্যশস্য দেয়। কারণ অতগুলো প্রাণীর মলমূত্র সারারাত ধরে জমিতে পড়বে, চাষের জমির জন্য এর থেকে ভাল সার আর কী আছে !

এছাড়া ছাগল ভেড়াগুলোকে শিয়াল নেকড়েদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য সারমেয় পাহারাদার থাকলেও খোঁয়াড়ের চারধারে বাবলা কাঁটার বেড়া দিয়ে দেয় । কুরুবা পশুপালকরা এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরতে থাকে। বিক্রি হতে থাকে ভেড়ার লোমের কম্বল আর গাধার পিঠে জমতে থাকে রোজগার করা শস্য, কোমরের বটুয়াও ভরে যায় কম্বল আর শস্য বিক্রির পয়সায় । তারপর যখন গ্রীষ্মের চাকা ঘুরে বর্ষা প্রায় আগত তখন তাদের ফেরার তাড়া। বছরের পর বছর ধরে ঘুরে চলেছে এই পরিযান চক্র।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

7 Responses

  1. একটি চমৎকার লেখা, সেই সঙ্গে জানার মতো বিষয়।

  2. পরিযায়ী মানবগোষ্ঠীর কথা শুনেছিলাম এবার নির্দিষ্ট করে সেই গোষ্ঠীর কথা বিস্তারিতভাবে জানা গেল এই লেখাটির মাধ্যমে। লেখাটিও খুব সুন্দর।

  3. পরিযায়ী পাখি সেই সঙ্গে পরিযায়ী মানুষ নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটি পড়ে নিজেও বেশ কিছুটা সমৃদ্ধ হলাম। লেখাটি পড়তেও ভাল লাগলো। লেখক এবং প্রচারিত মাধ্যমকে ধন্যবাদ।

  4. ভারত এবং আরো কয়েকটি দেশে কুরুবাদের মতো পরিযায়ী মানব গোষ্ঠী রয়েছে যারা বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে তাদের নিজেদের মাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় জীবন ও জীবীকার কারণেই তাদের কথা কি জানাতে পারেন?

  5. আগে জানা ছিল না ঠিকই তা না হলেও একটা সত্যিকারের ভাল লেখা এবং খুবই দরকারি লেখা।এ ধরনের লেখা খুব কমই চোখে পড়ে, কিন্তু এধরনের লখাই বেশী বেশী করে দরকার।

  6. এক কথায় অনবদ্য একটি লেখা তার সঙ্গে যেসব তথ্য পাওয়া গেল সেগুলি এর আগে এমন করে পরিবেশিত হয় নি, তার ফলে য়ামার মতো পাঠক খুবই উপকৃত হল।

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Illustration by Suvamoy Mitra for Editorial বিয়েবাড়ির ভোজ পংক্তিভোজ সম্পাদকীয়

একা কুম্ভ রক্ষা করে…

আগের কালে বিয়েবাড়ির ভাঁড়ার ঘরের এক জন জবরদস্ত ম্যানেজার থাকতেন। সাধারণত, মেসোমশাই, বয়সে অনেক বড় জামাইবাবু, সেজ কাকু, পাড়াতুতো দাদা