উগ্রপন্থা নয়‚ কাশ্মীরে চলছে স্বাধীনতা সংগ্রাম!?

কাশ্মীর, কবির ভাষায় যাকে এই মুহূর্তে বলা চলে, ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। যা নিয়ে আর কাব্যি আসে না, যা সত্যিই এই মুহূর্তে রূপরসহীন গদ্যে পরিণত হয়েছে। কাশ্মীর, যাকে আমরা গর্ব করে ‘প্যারাডাইস অন আর্থ’ বলি, আজ তা ‘প্যারাডাইস লস্ট’এ পরিণত । মানুষই পারে প্রকৃতির রূপরস অনুধাবন করতে। আজ সেটা করতেও আমাদের কষ্ট হয়। কষ্ট হয় সেখানকার মানুষগুলোর জন্য। মানুষকে বাদ দিয়ে প্রকৃতি যে কিছুই নয়। তাই জানতে ইচ্ছে করে কেমন আছে তারা? কেমন আছে
বাকি ভারতীয়দের তুলনায়? বাকি ভারতীয়দের নিষ্ঠুর সমালোচনায় বিদ্ধ হতে তাদের কেমন লাগে? কেমন লাগে ঝিলমের সুরেলা আওয়াজের পরিবর্তে দিবারাত্র তাদের যখন ভারী বুটের শব্দ, গুলি-গোলা-বন্দুক আর মৃত্যুর হৃদয় বিদীর্ন করা হাহাকার শুনতে হয়? আমরা কতশত আখ্যা দিই তাদের। তারা নাকি রাষ্ট্রদ্রোহী, পাকিস্তানপন্থী! জেনে রাখা ভাল, পরিস্থিতির চাপে তারা আজ রাষ্ট্রদ্রোহী হতে পারে কিন্তু পাকিস্তানপন্থী নয়।

এক্ষেত্রে বহু পরিচিত কাশ্মীরের ইতিহাসটা আবার একটু আলোচনা করা যাক। কারণ একটা জনজাতির ইতিহাসই সেই জনজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট, তাদের লড়াইয়ের প্রামান্য দলিল হিসাবে থাকে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় ব্রিটিশ ভারতের করদ রাজ্য ছিল কাশ্মীর। সেসময়কার রাজা হরি সিং ভারত বা পাকিস্তান কোন পক্ষই না নিয়ে নিজেরা স্বতন্ত্র ও স্বাধীন থাকবে সেরকম সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। যা আজও তাদের মুখ্য দাবি। সেই বছরেরই অক্টোবর মাসে পাকিস্তান তাদের দেশের পাঠান উপজাতিকে দিয়ে কাশ্মীরে সশস্ত্র অনুপ্রবেশের আয়োজন ঘটায় এবং পিছু পিছু তারাও ঢুকে পড়ে কাশ্মীরের বেশ কিছুটা অংশ জবরদখল করে নেয়। তাতে রাজা হরি সিং কিছুটা ভীত হয়ে ভারতের সাহায্য চান। এতে ভারতও সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে তাদের সাহায্য করে। আর সেই সুযোগটাই তৎকালীন ভারত সরকার নিয়েছিল। কাশ্মীরকে রক্ষা করবে তার বদলে কাশ্মীরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। তাতে হরি সিং-ও রাজি হয়ে যান তবে একটা চুক্তির মাধ্যমে।

১৯৪৭ সালের সেই ‘অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে’ বলা হয়, কাশ্মীরের স্বতন্ত্র সংবিধান নিয়ে চলার অধিকার থাকবে, সেখানে পুরানো আইন বজায় থাকবে এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ন বিষয় ছিল, কাশ্মীর যখনই তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে তখনই সেখানে একটা গণভোটের আয়োজন করা হবে আর সেই গণভোটই কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারন করবে। এমনকি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুও এব্যাপারে সম্মত হয়ে একটি রেডিও বার্তায় প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর ১৯৫৩ সালে সংবিধানের ৩৭০নং ধারায় যখন প্রথম ঘোষিত হল ‘কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ ঠিক তখন থেকেই কাশ্মীরিদের ভারতের প্রতি মোহভঙ্গ হতে শুরু করল। তৎকালীন কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা যিনি কিনা নেহেরুর ভাল বন্ধুও ছিলেন তিনি সংবিধানের এই ধারার প্রবল বিরোধিতা করলেন যার ফল স্বরূপ নেহেরু তাকে জেলবন্দি করলেন। তার ফলে কাশ্মীরিরা যে বিক্ষোভ শুরু করল নেহেরু তাকে প্রবল দমন পীড়নের দ্বারা রোধ করলেন। যা একটু একটু করে হতে থাকা মোহভঙ্গকে তরান্বিত করেছিল।

আসলে কাশ্মীরিদের লড়াইটা ঠিক কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে তা হয়তো বাকি ভারতীয় এখনও ঠাহর করে উঠতে পারেনি। অনেকে মানেন, তারা সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন আর তাই তারা পাকিস্তানকেই নিজেদের দেশ বলে মনে করে। তারা ভারত থেকে আলাদা হয়ে পাকিস্তানে গিয়েই ভিড়তে চায়। আর ঠিক এখানেই ভুল। আরামকেদারায় বসে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে কাশ্মীরিদের নিয়ে যারা গপ্পো করতে ভালবাসেন তারাই বোধহয় এধরনের কথা বলতে পারেন। দুর্ভাগ্য এটাই যে আজকের পরিপ্রেক্ষিতে এমন কথা বলার মানুষই সবথেকে বেশী। তাই আবার একটু পিছনে ফেরা যাক। ব্রিটিশ এবং ডোগরা রাজাদের অত্যাচারে ১৯৩১ সালে কাশ্মীরিরা একটি সংগঠন গড়েন, যার নাম দেওয়া হয় ‘জম্মু-কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স’। যেখানে সব ধর্মের কাশ্মীরিরাই ছিলেন। কিন্তু যেহেতু এই সংগঠন সর্বধর্মসমন্বয় দ্বারা গঠিত তাই শেখ আব্দুল্লা নিজে দায়িত্ব নিয়ে এই সংগঠনের নাম বদলে রাখেন ‘জাতীয় কনফারেন্স’ বা ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স’। মুষ্টিমেয় কিছু লোক সেই মুসলিম কনফারেন্সে থেকে যেতে চাইলেও বেশীরভাগ মুসলিমই সেখান থেকে বেরিয়ে ন্যাশনাল কনফারেন্সে যোগ দেয়। কারণ তারা জানত তারা যে লড়াইটা লড়ছিল সেটা কখনোই ধর্মীয় লড়াই নয়। হিন্দু, শিখ, মুসলিম এবং আরও যেসব ধর্মের মানুষ সেখানে ছিল তারা প্রত্যেকেই তাদের স্বাধীনতার, স্বতন্ত্রতার লড়াইটাই লড়ছিল। সেই সময় বাকি ভারতীয়রা যেখানে শুধুমাত্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়ছে সেখানে প্রত্যেকটা সাধারণ কাশ্মীরি ব্রিটিশ ছাড়াও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধেও লড়াই চালাচ্ছে। আসলে কাশ্মীরি ডোগরা বংশীয় রাজারা ছিল মারাত্মক অত্যাচারী। যে রাজাদের অন্যতম প্রতিভু ছিল রাজা হরি সিং। তারা আরও একটা জিনিস বুঝেছিল, একদিক থেকে নেহেরু, হরি সিং আর অন্যদিক থেকে মহম্মদ আলি জিন্না এই তিন শক্তির সঙ্গে তাদের লড়তে হবে। তারা এটাও বুঝেছিল ঠিক যেভাবে ভারত চায় কাশ্মীর কব্জা করতে একইরকম নির্লজ্জ পদ্ধতিতে পাকিস্তানও চায় কাশ্মীর কব্জা করতে। আর ঠিক এইসময়েই জিন্না এবং তার মুসলিম লিগ কাশ্মীরে এলে এই কাশ্মীরিরাই বারামুলায় জিন্নাকে জুতোর মালা পরিয়ে অপমান করে কাশ্মীর থেকে বের করে দেয়। আর এ থেকেই বোঝা যায়, তারা এদিক ওদিক কোনদিকেরই নয়। তারা এক স্বতন্ত্র, স্বাধীনতাকামী জাত। তাদের লড়াই কোনকালেই সাম্প্রদায়িক লড়াই ছিল না, তাদের লড়াই ছিল স্বাধীনতার, স্বতন্ত্রতার।

এবার একটু বর্তমান বা প্রাক বর্তমানে ফেরা যাক। বর্তমানের এই চাপানউতোরের রাজনীতিতে দাঁড়িয়ে, শাসক থেকে সাধারণ মানুষ যেখানে বদলার খেলায় মত্ত, ৪০জন সেনার মৃত্যুতে ন্যায্য শোকপালনের সঙ্গে সঙ্গে ৪০০জন জঙ্গি খতম করা গেছে বলে উল্লাসে ভেসে যাওয়া। আচ্ছা, এতকিছুর মধ্যে আমরা যেন কীরকম কাশ্মীরিদের কথাই ভুলে গেছি বলে মনে হয় না? আসলে প্রতিহিংসা, প্রতিশোধের খেলায় মত্ত হয়ে আমরা ভারতীয়রাও যেমন ভাবি কাশ্মীর আমাদের তেমন পাকিস্তানীরাও ভাবে। কিন্তু এত সবকিছুর মধ্যে কাশ্মীরিদের কথা আমরা বেমালুম ভুলে যাই। এই টানাপোড়েনের মধ্যে তারাও থাকতে চায় না বলেই হয়তো তারা নিজেরা নিজেদের একটা স্বাধীন স্বতন্ত্র দেশের স্বপ্ন দেখে। একটা সময় ছিল যখন আমিও ভাবতাম কেন কাশ্মীর বেহাত হবে? কত আদরের সুন্দরী রাজ্যটি আমাদের। তখনও কিন্তু কাশ্মীরের ইতিহাস আমি জানতাম না।

তখনও কোনান-পোশপোরার প্রত্যেকটি মেয়ের ওপর সেনার পৈশাচিক অত্যাচারের কথা তাদের গুমরে গুমরে কাঁদার কথা আমি শুনিনি। তখনও সেনা কর্তৃক কাশ্মীরিদের কথায় কথায় অন্তর্হিত করে দেবার কথা শুনলেও বিষয়টাকে খুব সরলীকরণ করে ফেলতাম। তখনও জানতাম না প্রত্যেকদিন সেখানকার পুলিশ ফাঁড়ি, সেনা চৌকিতে শয়ে শয়ে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে শুধুমাত্র কারোর বাবা, কারোর স্বামী, কারোর ছেলে, কারোর ভাই যে যার নিজের প্রিয় মানুষগুলোকে খুঁজে পাবার আশায়। জানতাম না, সেখানকার বিবাহিত মেয়েদের মধ্যে ‘হাফ উইডো’র মতো নির্মম এক প্রথার ব্যাপারে। এখানেই প্রশ্ন জাগে, আমাদের জানা, বোঝা বা ভুল জানা আমাদের বোধবুদ্ধিগুলোকে এমনই লোপ পাইয়ে দেয়, যেখানে আমরা সমস্ত মিথ্যার দ্বারায় প্রভাবিত হয়ে নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে পাশের মানুষটাকে অহেতুক বিচার করে ফেলি। বুঝি না, আমাদের এই জানা বা বোঝার বাইরেও মানবিক অনুভুতি নামক একটা জায়গা আছে। আর রাষ্ট্রের এই জোর করে দেখানো মিথ্যার কাছে নিজেদের সমর্পন করে সেই অনুভূতিগুলোকেই মেরে ফেলি।

একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে, আমাদের সংবিধানে যা আছে তার কিছুই প্রায় মেনে চলা হয় না। আমাদের দেশের মাথারা তো বোধহয় সবথেকে বেশী অবমাননা করেন। তাই অনায়াসেই একটা সেক্যুলার দেশকেও তারা বিশেষ একটা ধর্মের নিয়ন্ত্রনাধীনে করে ফেলতে পারে। একইরকমভাবে আমরা বলতে পারি, কাশ্মীর প্রসঙ্গেও সংবিধানে যা লেখা আছে তা ঠিকঠাক চলছে এমন দাবি বোধহয় অতি বড় কাশ্মীরিবিরোধীও করতে পারবে না। অথবা এভাবেও বলা যায়, কাশ্মীর অধ্যায়টা সংবিধানে আনাই উচিৎ হয়নি। যা হয়েছে তার পুরোটাই বিশ্বাসঘাতকতা। কাশ্মীর ভারতের জোর করে ধরে রাখা একটি রাজ্য তাই কাশ্মীরিরাও নিজেদের কখনই ভারতীয় বলে মনে করেনি। তারা ভারত পাকিস্তান দু’দেশ থেকেই আজাদি চায়। আর তার জন্য নিজেদের জীবনপন করে তারা লড়াই চালাচ্ছে। বছরের পর বছর আমাদের মহান দেশ আর সেদেশের শাসকগোষ্ঠী ও সেনারা মিলে তো কম হিংসা, অত্যাচার চালায়নি তাদের ওপর। কাশ্মীরি ছেলেমেয়েদের ইট-পাটকেলের জবাবে ভারতীয় সেনারা চালিয়েছে ছররা গুলি। আট থেকে আশি কেউ রেহাই পায়নি। সারাজীবনের জন্য অন্ধ হয়ে গেছে কত ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। আজ তারাও যদি তাদের প্রাপ্য স্বাধীনতার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নেয় তাতে ক্ষতি কিসের?

দেশ, দেশের মানুষ, সংবিধান, বিচারব্যাবস্থা সবকিছুই এদের বিপক্ষে। কারণ রাষ্ট্রশক্তির কাছে ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণের চেয়ে সমাজের ভাবাবেগটাই বেশী গুরুত্ব পায়। একজনের ভাবাবেগ কি বলল তার থেকে মেজরিটি প্রাধান্য পায় বেশী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বলা যায় হয়তো জোর দিয়েই বলা যায় জঙ্গি হয়ে কেউ জন্মায় না, দেশ সমাজ পরিস্থিতি তাকে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য করে। এখানেই রাষ্ট্রশক্তির সহনশীলতা, নমনীয়তার প্রশ্ন আসে। আজও রাষ্ট্র যদি সহনশীল না হয় তাহলে খুব বেশী দেরী নেই যেদিন কাশ্মীরও আই এস বা তালিবানিদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠবে।

Advertisements

7 COMMENTS

  1. Madam sob e to bujhlam but 90’s ar kashmiri pandit der sathe jeta hoy seta r explanation din please

  2. Totally bullshit article without any historical information. Kashmir was well known for its Kashmiri Shaivism and Shankaracharya established Kashmir as one of the corners of India long before the Muslims and British arrived. Please stop writing biased articles to appease certain sections of people. Also, as the other comment is pointing out, why have you not mentioned the perspective of the Kashmiri pandits and the residents of Jammus/Ladakh?

  3. Samosto rajje kichu bicchonotabadi sangothon aache, sabari dabi mene Nile akhondo bharot rokkhai desh bartho hobe, kashmire

  4. eeirokom analysis!! my god….jodi sotti kashmiri ra india , pakistan kauke chaito na then sudhu pakistan er flag okhane ore ki kore?? any logical answer please?? problem ta eto tao easy noi jotota wirter apni bhabchen…..okhan theke mere hindu ter tariye deoa hoyeche anekdin aage….

  5. অসামান্য বিশ্লেষণ ! এ লেখা লিখতে বুকের খাঁচায় দম লাগে। তবে ওখানকার জনগণ যদি কাশ্মীরি পন্ডিতদের স্বভূম থেকে উচ্ছেদ না করে তাদেরও এই লড়াইয়ের সঙ্গে জুড়ে নিতে পারতেন তাহলে এই সংগ্রাম আরো ব্যাপক, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতপাতহীন বিপ্লবের আকার ধারণ করতো। কারন এ সংগ্রাম আসলে কাশ্মীরি জাতিসত্ত্বার আত্মনিয়ন্ত্রনের সংগ্রাম আর কাশ্মীরি পণ্ডিতরাও এই জাতিসত্ত্বার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর সেটা করতে পারলে সীমান্তের দুদিকে দুই ধান্দাবাজ, সাম্প্রদায়িক, জাতপাতের কারবারি শাসকের বোলতি বন্ধ করে দেয়া যেত অতি সহজেই, যারা কাশ্মীরকে পৈত্রিক সম্পত্তি আর দেশের মানুষকে দিনের পর দিন বোকা বানিয়ে রাখতে চায়।

  6. Baje lekha, mone hoy ganja kheye likhechhen. Indian History ta bhalo kore janun, tarpor likhben. Pakistan er history pore likhben naa.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.