জয়পুরের জঙ্গলে

জুলাই মাসের বৃষ্টির মরশুমে তিন বন্ধু মিলে বিষ্ণুপুরে উইকেন্ড কাটাতে এসেছি | বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বিষ্ণুপুরের যাবতীয় মন্দির দেখে আসার পর সবে গরম চা নিয়ে বসেছি | এমন সময় দেবাশিস সখেদে বলে উঠলো “এই বৃষ্টিতে যদি একটা জঙ্গলে রাত কাটানো যেত, তাহলে এই চায়ের স্বাদটাই আলাদা লাগত |”

“বর্ষায় জঙ্গল ভ্রমন?” চায়ের কাপ নামিয়ে একটা আলস্য ভরা হাই তুলে বলল অনির্বান | “ব্যাপারটা একটু সোনার পাথর বাটির মত শোনাচ্ছে না? এই বর্ষায় সব জঙ্গলে সাধারন জনগনের প্রবেশ নিষেধ |”

“একটা জঙ্গল আছে | সেখানে সব ঋতুতেই অসাধারন এবং সাধারন জনগনের প্রবেশ অবাধ |” একটা
সবজান্তা হাসি হেসে বললাম আমি | “আর সেটা এখান থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দুরে |”

“বিষ্ণুপুরের কাছে জঙ্গল?” দেবাশিস একটু অবাক হয়ে তাকাল “চেঁচুরিয়া ইকো পার্কের কথা বলছ নাকি?”

“একদম না | আমি একদম সত্যিকারের জঙ্গলের কথা বলছি | এই জঙ্গলে হরিন আছে, হাতি দেখা যায় – আর নানারকম পাখির কলতান শোনা যায় | একটা ওয়াচ টাওয়ারও আছে জঙ্গলের মধ্যে | এছাড়া পাশের গ্রামে দুটো ১৯শ শতাব্দীর মন্দির আছে |”

“বাহ… বেশ গুছিয়ে পরিবেশন করেছ তো | বিষ্ণুপুরে এসে জঙ্গলে যাওয়া যায় এ তো জানা ছিল না |” হেসে বলল দেবাশিস “ তা .. কি নাম এই জঙ্গলের ?”

Joypur_Jungle
জয়পুর জঙ্গল (ছবি : লেখক)

“জয়পুরের জঙ্গল | জঙ্গলের পাশের গ্রামের নাম জয়পুর | অনেকে তাঁতিপুকুরের জঙ্গল বলে | ওখান থেকে ১.৫ কিলোমিটার দুরে গোকুলনগর বলে একটা ইনটারেস্টিং জায়গা আছে |”

সেদিন সন্ধে হয়ে গিয়েছিল | পরের দিন সকালে আমার পরিচিত ড্রাইভার ধনঞ্জয় গাড়ি নিয়ে হাজির | আজ আকাশ মেঘলা, কিন্ত বৃষ্টি নেই |

যারা শান্তিনিকেতন থেকে ইলমবাজার গিয়েছেন, তারা সেই পথের ধারের জঙ্গলের সাথে জয়পুরের জঙ্গলের মিল খুঁজে পাবেন | একসময় মুল সড়ক থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে ধনঞ্জয় ডান দিকের একটা কাঁচা রাস্তায় ঢুকলো | কিছুটা ঢুকে সে স্টার্ট বন্ধ করে গাড়ি দাঁড় করাল | আমার দুই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল “আগের দিন বিকেলবেলায় এখানে এক পাল হরিন দেখেছিলাম |” অনির্বান আর দেবাশীষ গাড়ির জানালা খুলে সতর্ক ভাবে এদিক ওদিক হরিন দেখার চেষ্টা করতে থাকলো |

“ইদানিং এদিকে হাতি দেখেছ কি?” আমি ধনঞ্জয়কে প্রশ্ন করি |

“এটা তো জংলি  জানোয়ার দেখার সিজন নয় স্যার | তবে এই এরিয়াটা এলিফ্যান্ট করিডর, বলা যায় না যে কোনো সময় তেনারা দেখা দিতে পারেন |” কথাগুলো বলে ধনঞ্জয় আমার দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল “স্যার জায়গাটা চিনতে পারছেন ? তাঁতিপুকুর বাসস্টপ থেকে একটু এগিয়ে সেই ডান দিকের রাস্তা | এখানেই তো সেবার আপনি সেই টাওয়ারটা…!”

আমি ইশারায় ধনঞ্জয়কে থামতে বললাম | কিন্ত দেবাশীষ কথাটা খেয়াল করেছিল | ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল “টাওয়ার ? কিসের টাওয়ার ? তুমি যে ওয়াচ টাওয়ারের কথা বলছিলে, সেইটা ?”

ধনঞ্জয়কে উত্সাহিত হয়ে বলল “ওয়াচ টাওয়ার তো আরও আগে স্যার | জঙ্গল যেখানে শেষ হচ্ছে তার একটু আগেই রয়েছে বনলতা লজ | তার পিছনে জঙ্গলেরর মধ্যে মিনিট পনেরো হাঁটলেই ওয়াচ টাওয়ার | গাড়ীর রাস্তাও আছে, জয়পুর গ্রামের ভিতর দিয়ে ঘুরে যেতে হয় |”

“বা: এখানে থাকার জায়গাও আছে |” খুশি খুশি গলায় বলল অনির্বান |

দেবাশীষ ভুরু কুঁচকে ধনঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে বলল “কিন্ত আমার তো মনে হল তুমি এইখানের কোনো টাওয়ারের কথা বলছিলে |”

semaphore tower
সিমাফোর টাওয়ার (ছবি : লেখক)

ধনঞ্জয় আমার দিকে তাকাল | উপায় নেই দেখে আমি বললাম “এই জঙ্গলের ভিতরে ইংরেজ জমানার একটা সিমাফোর টাওয়ার আছে | উচ্চতা প্রায় ৮০ ফুট | টেলিগ্রাফ আবিস্কারের আগে ইংরেজরা কলকাতা থেকে বারানসীর চুনার দুর্গ পর্যন্ত এই রকম ৪৫টি গম্বুজ বানিয়ে সিমাফোর সঙ্কেতের সাহায্য নিয়ে খবর পাঠাতো | বছর দুয়েক আগে আমি আর আমার বন্ধু রঙ্গন দত্ত এই জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে তার ছবি তুলেছিলাম | তবে ভিতরটা যথেষ্ট বিপজ্জনক | সাপ তো আছেই, তার উপরে বিচ্ছিরি সব পোকামাকড় | বেলের কাঁটায় ক্ষত বিক্ষত হয়েছিলাম, জামা কাপড়ও ছিঁড়ে গিয়েছিল |”

“ আরিব্বাস … জঙ্গলের মধ্যে গম্বুজ! এই খবরটা তুমি চেপে যাচ্ছিলে? আরে, হরিন তো সব জঙ্গলে দেখা যায়…কিন্ত এমন একটা জিনিস কোন জঙ্গলে আছে ? চলো তো, সাপ ব্যাং যা থাক, আমি তো এখানে ঢুকবই | ” উত্তেজিত হয়ে বলল দেবাশীষ | অনির্বানও সায় দিল |

দুজনের জেদের কাছে হার মানতে হলো আমায় | গাড়ি ঘুরিয়ে মূল রাস্তায় ফেরত এলাম | মূল রাস্তা থেকে গম্বুজের কাছে যাওয়ার জন্য একটা সুঁড়িপথ গিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে | বর্ষার দরুন জঙ্গল আরও দুর্ভেদ্য হয়েছে | কিন্ত এবার আমার কাছে একটা hunting knife থাকায় ডাল পালা কেটে ঢুকতে একটু সুবিধে হলো | এক সময় সিমাফোর টাওয়ারের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম | গম্বুজের আশে পাশে একটু ফাঁকা জায়গা আছে |

“গম্বুজের মেঝেতে এত বড় গর্ত কেন ?” অনির্বান প্রশ্ন করল |

“সঠিক কারন জানা নেই | মনে হয় গুপ্তধনের লোভে | বাঁকুড়ায় অনেকেই এগুলোকে মল্ল রাজাদের গম্বুজ মনে করেন |”

ফিরে আসার সময় ঘাসের উপর দিয়ে দ্রুত গতিতে কিছু একটা বেরিয়ে গেল | সেটা সাপ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল | আমরা পা চালিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম |

বনলতা লজ পেরিয়ে আমরা জয়পুর গ্রামের ভিতরকার রাস্তা দিয়ে ওয়াচ টাওয়ারের সামনে এসে পৌঁছালাম | আমি যখন তাদের জানালাম যে ওয়াচ টাওয়ারের ভিতরে থাকার ঘর আছে, তখন তাদের চোখ চকচক করে উঠল | ওদের জানালাম যে এখানে থাকার জন্যে বন দপ্তর থেকে অনুমতি নিতে হয় |

“পরের বার এখানেই থাকব |” ঘোষনা করল দেবাশীষ |

ওয়াচ টাওয়ার দেখে আমরা জয়পুর গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলাম | এই গ্রামের সবচেয়ে দর্শনীয় বস্তু হলো দেপাড়া ও দত্তপাড়ার দুটি পঞ্চরত্ন মন্দির যার দেওয়ালে কিছু সুন্দর টেরাকোটার কাজ রয়েছে | দেবাশীষ টেরাকোটা অলঙ্করনের কিছু কিছু বোঝে | অনির্বান কিছুই বোঝে না | তাই সে আমাদের অজস্র প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে থাকল আর আমরা তার সাধ্যমত জবাব দিতে থাকলাম |

দত্তপাড়া মন্দির
দত্তপাড়া মন্দির (ছবি : লেখক)

উদহারন স্বরূপ কয়েকটা নমুনা দিলাম

– “আচ্ছা ওই যে দুজন মিলে আরেকজনের চুলের মুঠি ধরে টানাটানি করছে, ওটা কি ব্যাপার ?”

– “ ওটা মামা ভাগ্নে কান্ড | কৃষ্ণ আর বলরাম কংসকে সিংহাসন থেকে টেনে নামাচ্ছে |”

– “ ওই মানুষ, ঘোড়া আর পাখির কম্বিনেশনটা কে কী বলে ?”

– “ ওটাকে বলে ‘অমিত তেজ পুরুষমূর্তি’ | পুরুষ সিংহ শুনেছ তো ? ওটা তার অ্যাডভান্স ভার্সন |”

জয়পুর গ্রামের থেকে দেড় কিলোমিটার দুরেই গোকুলনগর |  এখানে রয়েছে মাকড়া পাথর এর তৈরী সুবিশাল পঞ্চরত্ন গোকুল চাঁদ মন্দির | পাঁচিল দিয়ে ঘেরা মন্দির চত্বরে একটি নাটমন্দিরও আছে | এর দেওয়ালেও অলঙ্করণ আছে, তবে অনেক কম | অধিকাংশ অলঙ্করণ ক্ষয়ে গেছে | বর্তমানে এই মন্দির ভারতীয় পুরাতত্ত্ব
বিভাগের অধীনে রয়েছে |

গোকুলচাঁদ মন্দির
গোকুলচাঁদ মন্দির (ছবি : লেখক)

গোকুলনগর থেকে যখন ফিরলাম তখন একটা বাজে | মাঝে একটু রোদ উঠেছিল, এখন আবার সব মেঘলা | বনলতা লজের সামনের রেস্টুরেন্ট-এ ঢুকে যখন লাঞ্চ এর অর্ডার দিলাম তখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে |

“ইস , এই জায়গাটা কলকাতার এত কাছে – সাড়ে তিন ঘন্টার ড্রাইভেই  চলে আসা যায় |” বলল অনির্বান |

“ হ্যাঁ, তাই দেখছি |… আচ্ছা অমিতাভদা..” বলে দেবাশীষ আমার দিকে তাকাল | একটু উত্সাহিত গলায় বলল – “ আজ রাতটা এখানে থেকে গেলে হয়না ? দারুন জমবে কি বলো ? দেখো না, ঘর খালি আছে কিনা |”

“তোদের দুজনের না কাল অফিস ? আমদের রিটার্ন টিকেট তো আজ বিকেলের ?” অবাক হয়ে বললাম |

“অনলাইন কেটেছ তো ? এক্ষুনি ক্যানসেল করে দাও | কাল সকালের ট্রেনে যাব | অফিস একটু দেরী করে যাবো | আর গাড়িটা নিয়ে বিষ্ণুপুর লজ থেকে মালপত্রগুলো এখানে নিয়ে আসি |” অনির্বান বলে উঠল |

“তোদের দুজনের হলটা কি ?” আমি বেশ আশ্চর্য হয়ে বললাম “খেপচুরিয়াস মেরে গেলি দুজনে ?”

“সে তুমি যাই বল |” বেশ আবেগের সঙ্গে বলল দেবাশীষ “আজকে বৃষ্টির মধ্যে এই জঙ্গলের মাঝে না থাকলে আমার মন খারাপ হয়ে যাবে | চল আজকে জমিয়ে বসে আড্ডা হোক | তার আগে জঙ্গলের মধ্যে একটু হেঁটেও আসি |”

************************************************************************************************************************************

জয়পুর জঙ্গল

জেলা : বাঁকুড়া

নিকটবর্তী রেলস্টেশন : বিষ্ণুপুর (জয়পুর থেকে ১৪ কিমি পশ্চিমে)

কোথায় থাকবেন – বিষ্ণুপুরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ট্যুরিস্ট লজ | রসিক যাঁরা তাঁরা বেছে নিতে পারেন জয়পুর জঙ্গলের ভেতরে ‘বনলতা লজ’ | এখানে একটি এমু ফার্ম আছে , চাইলে ভাতের সঙ্গে চেখে দেখতে পারেন ‘এমু কষা’ |

কিভাবে যাবেন :

গাড়িতে যেতে হলে – কোনা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ভায়া ডানকুনি, চাঁপাডাঙা, আরামবাগ, কোতুলপুর হয়ে পৌঁছে যাবেন জয়পুর ফরেস্ট (১৩২ কিমি)|

ট্রেনে যেতে হলে – সাঁতরাগাছি থেকে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ধরে বিষ্ণুপুর পৌঁছন সকাল ৯:৩৭ এ | তারপর সেখান থেকে গাড়িতে পৌঁছে যান জয়পুর জঙ্গলে |

অমিতাভ গুপ্ত
ছিলেন নামী কোম্পানির দামী ব্র্যান্ড ম্যানেজার | নিশ্চিত চাকরির নিরাপত্তা ছেড়ে পথের টানেই একদিন বেরিয়ে পড়া | এখন ফুলটাইম ট্র্যাভেল ফোটোগ্রাফার ও ট্র্যাভেল রাইটার আর পার্টটাইম ব্র্য্যান্ড কনসাল্টেন্ট | পেশার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছেন নেশাকেও | নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হয় বেড়ানোর ছবি এবং রাইট আপ |

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.