জয়পুরের জঙ্গলে

জয়পুরের জঙ্গলে

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

জুলাই মাসের বৃষ্টির মরশুমে তিন বন্ধু মিলে বিষ্ণুপুরে উইকেন্ড কাটাতে এসেছি | বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বিষ্ণুপুরের যাবতীয় মন্দির দেখে আসার পর সবে গরম চা নিয়ে বসেছি | এমন সময় দেবাশিস সখেদে বলে উঠলো “এই বৃষ্টিতে যদি একটা জঙ্গলে রাত কাটানো যেত, তাহলে এই চায়ের স্বাদটাই আলাদা লাগত |”

“বর্ষায় জঙ্গল ভ্রমন?” চায়ের কাপ নামিয়ে একটা আলস্য ভরা হাই তুলে বলল অনির্বান | “ব্যাপারটা একটু সোনার পাথর বাটির মত শোনাচ্ছে না? এই বর্ষায় সব জঙ্গলে সাধারন জনগনের প্রবেশ নিষেধ |”

“একটা জঙ্গল আছে | সেখানে সব ঋতুতেই অসাধারন এবং সাধারন জনগনের প্রবেশ অবাধ |” একটা
সবজান্তা হাসি হেসে বললাম আমি | “আর সেটা এখান থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দুরে |”

“বিষ্ণুপুরের কাছে জঙ্গল?” দেবাশিস একটু অবাক হয়ে তাকাল “চেঁচুরিয়া ইকো পার্কের কথা বলছ নাকি?”

“একদম না | আমি একদম সত্যিকারের জঙ্গলের কথা বলছি | এই জঙ্গলে হরিন আছে, হাতি দেখা যায় – আর নানারকম পাখির কলতান শোনা যায় | একটা ওয়াচ টাওয়ারও আছে জঙ্গলের মধ্যে | এছাড়া পাশের গ্রামে দুটো ১৯শ শতাব্দীর মন্দির আছে |”

“বাহ… বেশ গুছিয়ে পরিবেশন করেছ তো | বিষ্ণুপুরে এসে জঙ্গলে যাওয়া যায় এ তো জানা ছিল না |” হেসে বলল দেবাশিস “ তা .. কি নাম এই জঙ্গলের ?”

Joypur_Jungle
জয়পুর জঙ্গল (ছবি : লেখক)

“জয়পুরের জঙ্গল | জঙ্গলের পাশের গ্রামের নাম জয়পুর | অনেকে তাঁতিপুকুরের জঙ্গল বলে | ওখান থেকে ১.৫ কিলোমিটার দুরে গোকুলনগর বলে একটা ইনটারেস্টিং জায়গা আছে |”

সেদিন সন্ধে হয়ে গিয়েছিল | পরের দিন সকালে আমার পরিচিত ড্রাইভার ধনঞ্জয় গাড়ি নিয়ে হাজির | আজ আকাশ মেঘলা, কিন্ত বৃষ্টি নেই |

যারা শান্তিনিকেতন থেকে ইলমবাজার গিয়েছেন, তারা সেই পথের ধারের জঙ্গলের সাথে জয়পুরের জঙ্গলের মিল খুঁজে পাবেন | একসময় মুল সড়ক থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে ধনঞ্জয় ডান দিকের একটা কাঁচা রাস্তায় ঢুকলো | কিছুটা ঢুকে সে স্টার্ট বন্ধ করে গাড়ি দাঁড় করাল | আমার দুই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলল “আগের দিন বিকেলবেলায় এখানে এক পাল হরিন দেখেছিলাম |” অনির্বান আর দেবাশীষ গাড়ির জানালা খুলে সতর্ক ভাবে এদিক ওদিক হরিন দেখার চেষ্টা করতে থাকলো |

“ইদানিং এদিকে হাতি দেখেছ কি?” আমি ধনঞ্জয়কে প্রশ্ন করি |

“এটা তো জংলি  জানোয়ার দেখার সিজন নয় স্যার | তবে এই এরিয়াটা এলিফ্যান্ট করিডর, বলা যায় না যে কোনো সময় তেনারা দেখা দিতে পারেন |” কথাগুলো বলে ধনঞ্জয় আমার দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল “স্যার জায়গাটা চিনতে পারছেন ? তাঁতিপুকুর বাসস্টপ থেকে একটু এগিয়ে সেই ডান দিকের রাস্তা | এখানেই তো সেবার আপনি সেই টাওয়ারটা…!”

আমি ইশারায় ধনঞ্জয়কে থামতে বললাম | কিন্ত দেবাশীষ কথাটা খেয়াল করেছিল | ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল “টাওয়ার ? কিসের টাওয়ার ? তুমি যে ওয়াচ টাওয়ারের কথা বলছিলে, সেইটা ?”

ধনঞ্জয়কে উত্সাহিত হয়ে বলল “ওয়াচ টাওয়ার তো আরও আগে স্যার | জঙ্গল যেখানে শেষ হচ্ছে তার একটু আগেই রয়েছে বনলতা লজ | তার পিছনে জঙ্গলেরর মধ্যে মিনিট পনেরো হাঁটলেই ওয়াচ টাওয়ার | গাড়ীর রাস্তাও আছে, জয়পুর গ্রামের ভিতর দিয়ে ঘুরে যেতে হয় |”

“বা: এখানে থাকার জায়গাও আছে |” খুশি খুশি গলায় বলল অনির্বান |

দেবাশীষ ভুরু কুঁচকে ধনঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে বলল “কিন্ত আমার তো মনে হল তুমি এইখানের কোনো টাওয়ারের কথা বলছিলে |”

semaphore tower
সিমাফোর টাওয়ার (ছবি : লেখক)

ধনঞ্জয় আমার দিকে তাকাল | উপায় নেই দেখে আমি বললাম “এই জঙ্গলের ভিতরে ইংরেজ জমানার একটা সিমাফোর টাওয়ার আছে | উচ্চতা প্রায় ৮০ ফুট | টেলিগ্রাফ আবিস্কারের আগে ইংরেজরা কলকাতা থেকে বারানসীর চুনার দুর্গ পর্যন্ত এই রকম ৪৫টি গম্বুজ বানিয়ে সিমাফোর সঙ্কেতের সাহায্য নিয়ে খবর পাঠাতো | বছর দুয়েক আগে আমি আর আমার বন্ধু রঙ্গন দত্ত এই জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে তার ছবি তুলেছিলাম | তবে ভিতরটা যথেষ্ট বিপজ্জনক | সাপ তো আছেই, তার উপরে বিচ্ছিরি সব পোকামাকড় | বেলের কাঁটায় ক্ষত বিক্ষত হয়েছিলাম, জামা কাপড়ও ছিঁড়ে গিয়েছিল |”

“ আরিব্বাস … জঙ্গলের মধ্যে গম্বুজ! এই খবরটা তুমি চেপে যাচ্ছিলে? আরে, হরিন তো সব জঙ্গলে দেখা যায়…কিন্ত এমন একটা জিনিস কোন জঙ্গলে আছে ? চলো তো, সাপ ব্যাং যা থাক, আমি তো এখানে ঢুকবই | ” উত্তেজিত হয়ে বলল দেবাশীষ | অনির্বানও সায় দিল |

দুজনের জেদের কাছে হার মানতে হলো আমায় | গাড়ি ঘুরিয়ে মূল রাস্তায় ফেরত এলাম | মূল রাস্তা থেকে গম্বুজের কাছে যাওয়ার জন্য একটা সুঁড়িপথ গিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে | বর্ষার দরুন জঙ্গল আরও দুর্ভেদ্য হয়েছে | কিন্ত এবার আমার কাছে একটা hunting knife থাকায় ডাল পালা কেটে ঢুকতে একটু সুবিধে হলো | এক সময় সিমাফোর টাওয়ারের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম | গম্বুজের আশে পাশে একটু ফাঁকা জায়গা আছে |

“গম্বুজের মেঝেতে এত বড় গর্ত কেন ?” অনির্বান প্রশ্ন করল |

“সঠিক কারন জানা নেই | মনে হয় গুপ্তধনের লোভে | বাঁকুড়ায় অনেকেই এগুলোকে মল্ল রাজাদের গম্বুজ মনে করেন |”

ফিরে আসার সময় ঘাসের উপর দিয়ে দ্রুত গতিতে কিছু একটা বেরিয়ে গেল | সেটা সাপ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল | আমরা পা চালিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম |

বনলতা লজ পেরিয়ে আমরা জয়পুর গ্রামের ভিতরকার রাস্তা দিয়ে ওয়াচ টাওয়ারের সামনে এসে পৌঁছালাম | আমি যখন তাদের জানালাম যে ওয়াচ টাওয়ারের ভিতরে থাকার ঘর আছে, তখন তাদের চোখ চকচক করে উঠল | ওদের জানালাম যে এখানে থাকার জন্যে বন দপ্তর থেকে অনুমতি নিতে হয় |

“পরের বার এখানেই থাকব |” ঘোষনা করল দেবাশীষ |

ওয়াচ টাওয়ার দেখে আমরা জয়পুর গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করলাম | এই গ্রামের সবচেয়ে দর্শনীয় বস্তু হলো দেপাড়া ও দত্তপাড়ার দুটি পঞ্চরত্ন মন্দির যার দেওয়ালে কিছু সুন্দর টেরাকোটার কাজ রয়েছে | দেবাশীষ টেরাকোটা অলঙ্করনের কিছু কিছু বোঝে | অনির্বান কিছুই বোঝে না | তাই সে আমাদের অজস্র প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে থাকল আর আমরা তার সাধ্যমত জবাব দিতে থাকলাম |

দত্তপাড়া মন্দির
দত্তপাড়া মন্দির (ছবি : লেখক)

উদহারন স্বরূপ কয়েকটা নমুনা দিলাম

– “আচ্ছা ওই যে দুজন মিলে আরেকজনের চুলের মুঠি ধরে টানাটানি করছে, ওটা কি ব্যাপার ?”

– “ ওটা মামা ভাগ্নে কান্ড | কৃষ্ণ আর বলরাম কংসকে সিংহাসন থেকে টেনে নামাচ্ছে |”

– “ ওই মানুষ, ঘোড়া আর পাখির কম্বিনেশনটা কে কী বলে ?”

– “ ওটাকে বলে ‘অমিত তেজ পুরুষমূর্তি’ | পুরুষ সিংহ শুনেছ তো ? ওটা তার অ্যাডভান্স ভার্সন |”

জয়পুর গ্রামের থেকে দেড় কিলোমিটার দুরেই গোকুলনগর |  এখানে রয়েছে মাকড়া পাথর এর তৈরী সুবিশাল পঞ্চরত্ন গোকুল চাঁদ মন্দির | পাঁচিল দিয়ে ঘেরা মন্দির চত্বরে একটি নাটমন্দিরও আছে | এর দেওয়ালেও অলঙ্করণ আছে, তবে অনেক কম | অধিকাংশ অলঙ্করণ ক্ষয়ে গেছে | বর্তমানে এই মন্দির ভারতীয় পুরাতত্ত্ব
বিভাগের অধীনে রয়েছে |

গোকুলচাঁদ মন্দির
গোকুলচাঁদ মন্দির (ছবি : লেখক)

গোকুলনগর থেকে যখন ফিরলাম তখন একটা বাজে | মাঝে একটু রোদ উঠেছিল, এখন আবার সব মেঘলা | বনলতা লজের সামনের রেস্টুরেন্ট-এ ঢুকে যখন লাঞ্চ এর অর্ডার দিলাম তখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে |

“ইস , এই জায়গাটা কলকাতার এত কাছে – সাড়ে তিন ঘন্টার ড্রাইভেই  চলে আসা যায় |” বলল অনির্বান |

“ হ্যাঁ, তাই দেখছি |… আচ্ছা অমিতাভদা..” বলে দেবাশীষ আমার দিকে তাকাল | একটু উত্সাহিত গলায় বলল – “ আজ রাতটা এখানে থেকে গেলে হয়না ? দারুন জমবে কি বলো ? দেখো না, ঘর খালি আছে কিনা |”

“তোদের দুজনের না কাল অফিস ? আমদের রিটার্ন টিকেট তো আজ বিকেলের ?” অবাক হয়ে বললাম |

“অনলাইন কেটেছ তো ? এক্ষুনি ক্যানসেল করে দাও | কাল সকালের ট্রেনে যাব | অফিস একটু দেরী করে যাবো | আর গাড়িটা নিয়ে বিষ্ণুপুর লজ থেকে মালপত্রগুলো এখানে নিয়ে আসি |” অনির্বান বলে উঠল |

“তোদের দুজনের হলটা কি ?” আমি বেশ আশ্চর্য হয়ে বললাম “খেপচুরিয়াস মেরে গেলি দুজনে ?”

“সে তুমি যাই বল |” বেশ আবেগের সঙ্গে বলল দেবাশীষ “আজকে বৃষ্টির মধ্যে এই জঙ্গলের মাঝে না থাকলে আমার মন খারাপ হয়ে যাবে | চল আজকে জমিয়ে বসে আড্ডা হোক | তার আগে জঙ্গলের মধ্যে একটু হেঁটেও আসি |”

************************************************************************************************************************************

জয়পুর জঙ্গল

জেলা : বাঁকুড়া

নিকটবর্তী রেলস্টেশন : বিষ্ণুপুর (জয়পুর থেকে ১৪ কিমি পশ্চিমে)

কোথায় থাকবেন – বিষ্ণুপুরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ট্যুরিস্ট লজ | রসিক যাঁরা তাঁরা বেছে নিতে পারেন জয়পুর জঙ্গলের ভেতরে ‘বনলতা লজ’ | এখানে একটি এমু ফার্ম আছে , চাইলে ভাতের সঙ্গে চেখে দেখতে পারেন ‘এমু কষা’ |

কিভাবে যাবেন :

গাড়িতে যেতে হলে – কোনা এক্সপ্রেসওয়ে ধরে ভায়া ডানকুনি, চাঁপাডাঙা, আরামবাগ, কোতুলপুর হয়ে পৌঁছে যাবেন জয়পুর ফরেস্ট (১৩২ কিমি)|

ট্রেনে যেতে হলে – সাঁতরাগাছি থেকে রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ধরে বিষ্ণুপুর পৌঁছন সকাল ৯:৩৭ এ | তারপর সেখান থেকে গাড়িতে পৌঁছে যান জয়পুর জঙ্গলে |

 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

2 Responses

Leave a Reply

Social isolation to prevent coronavirus

অসামাজিকতাই একমাত্র রক্ষাকবচ

আপনি বাঁচলে বাপের নাম— এখন আর নয়। এখন সবাই বাঁচলে নিজের বাঁচার একটা সম্ভবনা আছে। সুতরাং বাধ্য হয়ে সবার কথা ভাবতে হবে। কেবল নিজের হাত ধোওয়ার ব্যবস্থা পাকা করলেই হবে না। অন্যের জন্য হাত ধোওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এক ডজন স্যানিটাইজ়ার কিনে ঘরে মজুত রাখলে বাঁচা যাবে না। অন্যের জন্য দোকানে স্যানিটাইজার ছাড়তে হবে। আবেগে ভেসে গিয়ে থালা বাজিয়ে মিছিল করলে হবে না। মনে রাখতে হবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জানলায় বা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থালা বাজাতে। যে ভাবে অন্যান্য দেশ নিজের মতো করে স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করছে। রাস্তায় বেরিয়ে নয়। ঘরে থেকে।