মৃণাল সেনের সঙ্গে আশিসতরু মুখোপাধ্যায়

এমনই দাবি, এমনই আন্তরিকতার সুতোয় বাঁধা ছিল বিশ্বখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেন ও বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সাংবাদিক আশিসতরু মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক। যার জোরে প্রতি বছর ১৪ মে পরিচালকের বাড়িতে অলিখিত নিমন্ত্রণ বাঁধা থাকত সাংবাদিকের। মৃণাল-ঘরনি গীতা সেনের রান্না করা রসগোল্লার পায়েস দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন। তারপরেই ‘দাদা’র কাছে ‘ভাই’-এর আবদার, ‘কিছু লিখে দেবেন ডায়েরিতে? প্রতিবছরের মতো?’ পাটভাঙা সাদা চোস্ত-পাঞ্জাবির সাজে চেনা মৃণাল প্রশ্রয় মিশিয়ে মৃদু প্রতিবাদ জানাতেন প্রতিবারই, ‘এভাবে খোঁচাও কেন আমাকে? প্রতিবছর? জন্মদিনে? বয়সটাকে বুঝিয়ে দিতে চাও?’ তারপর? বাকিটা শুনুন সাংবাদিকের জবানিতে—-

‘‘এটুকু বলার পরেই মৃণালদার কলম খসখস শব্দ তুলত আমার বাড়িয়ে দেওয়া ডায়েরির বুকে। ঠোঁটে তখন মৃদু হাসি আর পাইপের অদ্ভুত সহবাস। মৃণালদা লিখছেন—

কালিদাসের কালেই হোক বা একালেই হোক, ভাবি, আহা, যদি জন্মাতাম ২৯শে ফেব্রুয়ারিতে! বয়সটাকে তাহলে তিন ভাগ ছেঁটে এক ভাগে দাঁড় করিয়ে নিতে পারতাম। ভাবনাটা হয়তো মজাদার, কিন্তু কেমন একটা ভয় যেন উঁকি দিচ্ছে পেছন থেকে। এমনিতে একেবারেই বুঝি না, বুঝতে দিই না যে বয়স বাড়ছে। কিন্তু বয়সের অঙ্কটার দিকে তাকালে অস্বস্তি হয়।

অস্বস্তিটা সাময়িক— ভাবলেই, প্রশ্রয় দিলেই অস্বস্তি। ঝেড়েমুছে ফেললেই যেমন আছি, যেমন থাকতে চাই তাই হয়ে উঠি। আর কি! আবার কিছু বলব তোমাকে, কিছু লিখব এক বছর বাদে, এমনি এক সকালে। সময় তখন পাল্টাবে, আমি পাল্টাবো, তুমি পাল্টাবে, দুনিয়ার অনেক কিছুই পাল্টাবে।

Banglalive-8

মৃণাল সেন, ১৪ মে, ১৯৯০

Banglalive-9

 

বাড়িতে‚ এক জন্মদিনে

মৃণালদার সঙ্গে আমার পরিচয় আটের দশকে। বড়োমাপের পরিচালকের সঙ্গে একজন সাংবাদিকের যতটা পরিচিতি থাকা উচিত ঠিক ততটাই। ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে ’৮৫-র পর থেকে। তখন থেকেই প্রতিবছর ওঁর জন্মদিনে যেতাম বেলতলা রোডের বাড়িতে। সাংবাদিক হিসেবে নয়। ছোটো ভাই হয়ে। বরাবরই সাদামাঠা থাকতে ভালোবাসতেন মৃণালদা। সত্যজিত সমগোত্রীয় হয়েও কোনওদিন ধুমধাম করে জন্মদিন পালন করেননি। তাই ১৪ মে বিশপ লেফ্রয় রোডের মতো তারকা, পরিচালক, প্রযোজকের ভিড় দেখা যেত না দাদার বাড়িতে। সেদিন মৃণালদা বিখ্যাত পরিচালক নন। নিপাট ভদ্র আটপৌঢ়ে গৃহস্বামী। জন্মদিনে যাঁর স্ত্রী নিজের হাতে রসগোল্লার পায়েস রেঁধে অতিথি আপ্যায়ন করেন। রোজের মতোই স্নান সেরে পাটভাঙা সাদা চোস্ত-পাঞ্জাবিতে বসতেন বসার ঘরে। মুখে টোব্যাকো পাইপ। তখন মোবাইল নয়, টেলিফোনের যুগ। ব্যতিক্রম, সেদিন ফোন ধরতেন মৃণাল নিজেই। শুভেচ্ছাবার্তার বিনিময়ে মৃদুস্বরে কিছু না কিছু বলতেনই। তাঁর ইউনিটের কিছু মানুষ আসতেন। রসিকতায় মোড়া হাল্কা আলাপচারিতা। আমি চুপচাপ দেখতাম মৃণালদাকে। কথা শেষে হাসিমুখে তাকাতেন। খুব আন্তরিক গলায় বলতেন, ‘কেমন আছ আশিস? নতুন কী লিখলে?’ একজন দাদা যেভাবে ছোটো ভাইয়ের খোঁজ নেন, একদম সেই ভঙ্গিতে। সেই আড্ডায় যোগ দিতেন গীতা বউদিও, ‘ঠিক জানি, আর কেউ আসুক না আসুক আশিস আসবে। আমার রসগোল্লার পায়েস খেতে।’

সত্যজিৎ রায়ের থেকে মাত্র দু’বছরের ছোটো মৃণাল সেন। মানিকদার মতোই তাঁকেও এক ডাকে চেনে বিশ্ব চলচ্চিত্র। তবু দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে যেন আসমান-জমিন ফারাক। মানিকদা স্নেহ করলেও বরাবরই তারকা পরিচালক। আর মৃণালদা? বুকের কাছ ঘেঁষে থাকা আপনজন। যিনি দেবতা নন। যাঁকে ধরাছোঁয়া যেত। ইচ্ছে করলেই। আমার প্রতি মৃণালদার এই পক্ষপাতিত্ব নিয়ে অনেকে মজাও করতেন। যুগান্তর পত্রিকার চলচ্চিত্র সম্পাদক থাকার সুবাদে প্রতিবছর ওঁর জন্মদিন কভার করতাম। আর তাই দেখে বাকিরা বলতেন, ‘যুগান্তর তো মৃণাল সেনের কাগজ। সেখানে ওঁর জন্মদিন পালন হবে না তো আর কার হবে!’

১৯৮৯ সালের ১৫ অগাস্ট। গলব্লাডার অপারেশনের পর উডল্যান্ডস থেকে সদ্য ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন মৃণালদা। ডাক্তার তখনও বাড়ির বাইরে বেরোতে দেননি তাঁকে। সবে ঘরে হাঁটাচলা শুরু করেছেন। গেলাম একদিন সকালে মৃণালদাকে দেখতে। আমাকে দেখেই ব্যাজার মুখে বললেন, ‘এভাবে থাকতে ভীষণ খারাপ লাগছে। যদিও একেবারে চুরচাপ বসে নেই। সমানে পড়া-লেখা চালিয়ে যাচ্ছি। তবুও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি পরাধীন! কিন্তু কী করব? ডাক্তারের নির্দেশ না মানলে যদি ভালো-মন্দ কিছু ঘটে? সে আরেক বিপত্তি। তার চেয়ে ক’টা দিন ডাক্তারবাবুর ‘বাধ্য রোগী’ হয়ে থাকাটাই বোধহয় ভালো। কী বল?’

১৯৯১-এ সস্ত্রীক ঢাকা ফিল্মোৎসবে আমন্ত্রণ পেয়ে বাংলাদেশ সফরে গেছিলেন মৃণালদা। ফেরার পর মুখোমুখি হতেই উচ্ছ্বসিত তিনি, ‘৪৮ বছর পরে দেশের বাড়িতে ফিরলাম আশিস। ফরিদপুরে। গীতা এই প্রথম পা রাখল আসল শ্বশুরবাড়িতে। ওখানে গিয়েই মিশে গেছিলাম বিশাল জনস্রোতে। সবাই এসেছেন আমাদের দেখতে। আমাদের সঙ্গে কথা বলতে। ফরিদপুরের মাটিতে পা ফেলেই একেক পা এগোই আর ছেলেবেলার স্মৃতি যেন পা আঁকড়ে ধরে। কাউকে বলতে না দিয়ে একবারেই নিজের বাড়ি চিনে ফেললাম! বাড়ির বর্তমান মালিক এক সাধারণ মুসলিম পরিবার। সেখানে পা রাখতেই এগিয়ে এলেন তাঁরা। প্রথম কথাই ছিল, আপনার এক বোন ছিল? নাম রেবা? চমক সামলে উত্তর দিলাম, হ্যাঁ। ৫৪ বছর আগে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে আমাদের পুকুরেই ডুবে মারা যায়। এবার বাড়ির মালকিন নরম গলায় জানালেন, পুকুরের পাশে ওঁর ছোট্ট বেদিটা এখনও আছে। আমরা ওটা নষ্ট হতে দিইনি। আসুন, দেখবেন আসুন। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, আমাকে বলবেন না। আমি জানি ওটা কোথায় আছে। আমি নিজেই যাব।

আমি এগিয়ে চললাম। আমার পেছনে গীতা। তার পেছন পেছন ছোট্টো ভিড়। সাড়ে তিন ফুটের বেদিটা ঠিক যেমন ছিল তেমনি আছে। সময়ের ধাক্কায় সামান্য ভাঙাচোড়া তার গায়ে। কিন্তু ‘রেবা’ নামটা তখনও জ্বলজ্বলে। গীতা ঘোমটা টেনে বসতে যাবে, ওঁদেরই এক মহিলা দৌড়ে এসে সাজিয়ে দিলেন ওকে। ফুল দিয়ে সাজানো হল বোনের বেদি-ও। সবাই ক্যামেরাবন্দি করলেন সেই দৃশ্য।’

২০১৭ কেড়েছে গীতা সেনকে। ২০১৮-র চলে যাওয়ার সঙ্গী মৃণাল সেন। নিতান্ত কেজো প্রয়োজন ছাড়া কোর্টশিপ এবং দাম্পত্য জীবনে কেউ কাউকে ছেড়ে থাকেননি কোনোদিন। একবেলা ভাত আর একবেলা মুড়ি খেয়ে ওঁরা স্ট্রাগল করেছেন একসঙ্গে। একবছরের এই বিরহ কী করে সহ্য করেছেন, তা একমাত্র মৃণালদাই বলতে পারতেন। তবে যাওয়ার জন্য ২০০৮ থেকেই সম্ভবত মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মৃণালদা। সেবার আমার ডায়েরির পাতায় আঁচড় কেটেছিল এক ক্লান্ত ‘পদাতিক’—-

‘ আর কত, অনেকদিন তো হল। আমি কখনও নেশা করিনি, শুধু ঘুমের ওষুধ ছাড়া। না ঘুমুলে চলে না বলেই। কিন্তু এখন দেখছি বাঁচার নেশায় চেপে ধরেছে। ঠিক নয়। আর পারছি না। এবার ছেড়ে দাও। অনেক দেখেছি জীবনে, দেখছি। আর দেখা যায় না। অন্যায়, অবিচার, অসভ্যতার মাত্রা বেড়েই চলেছে দিনের পর দিন। আর পারছি না।বেঁচে থাক, ভালো থাক। যেভাবে বেঁচে থাকা অর্থহীন নয়।’’

মৃণাল সেন, ১৪ মে, ২০০৮

        

আরও পড়ুন:  কয়েকশো বছর ধরে চিনে পূজিত ভারতীয় দেবদেবীরা

NO COMMENTS