কথায় আছে ‘মগের মুল্লুক’। কিন্তু কে এই মগ ? যার মুল্লুকে জোরজুলুম চলে ? মগের কথা বলে এ লেখার শুরু করা যাক ।

মগরাজার বাস ছিল আজকের চট্টগ্রামে । চট্টগ্রাম তখন লোকজনের কাছে আরাকান নামে পরিচিত। পঞ্চদশ শতকে আরাকনের লঙ্গিয়েত বংশের শেষ রাজা মিন সুয়ামুন ওরফে নরমিখলাকে বর্মী রাজা মেঙসোয়ে যুদ্ধি পরাজিত করেন । তবে দীর্ঘ রাজ্যপাট পুনর্দখল করেন মিন সুয়ামুন। প্রশ্ন হল, বাংলা সীমানায় বর্মী রাজা এল কোথা থেকে? আসলে দীর্ঘদিন ধরেই এই জল সীমানায় বর্মীদের অত্যাচার ছিল।

ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, মগ জলদস্যু এই বর্মীরাই । জলপথে মগরা ছিল ত্রাস । তাদের পাল্লায় পড়লে আর রক্ষে ছিল না । আর সেখান থেকেই কথাটার জন্ম ‘মগের মুলুক’ ।

পঞ্চদশ শতকে ভাস্কো দা গামা ভারতে আসার পর, ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে পর্তুগিজরা ভারতেরই নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কারের নেশায় মেতেছে । এ সময়ই তাঁদের বঙ্গোপসাগরে আসা। ঘটনাক্রমে পর্তুগিজদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল মগ জলদস্যুদের। আর একই সঙ্গে তাঁদের নাম হল মগ-ফিরিঙ্গি দস্যু। কেউ কেউ আবার তাঁদের হার্মাদ বলেও ডাকত । এ সম্পর্কে আহমেদ শরিফ লিখছেন—‘প্রায় আড়াইশ’
বছর ধরে সর্বপ্রকার অপকর্মে লিপ্ত ছিল । বাঙালির কাছে পর্তুগীজ তথা হার্মাদ (Armadan) নামটি ত্রাস ও বীভৎসতার প্রতীক। এমন পুরুষানুক্রমিক ভয়ানক রাক্ষুসে আচরণের নজির ইতিহাসে বিরল’।

Banglalive-8

এই জলদস্যুদের সঙ্গে পর্তুগিজদের বনিবনা হওয়ার সম্ভবত আরও দুটি কারণ আছে । চট্টগ্রামের রাজার সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যাওয়া । তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, ১৫২৭ সালে চট্টগ্রামে পর্তুগিজ জাহাজডুবির ঘটনা। শোনা যায়, জাহাজডুবির পর যাঁরা বেঁচেছিলেন, তাঁদের ওপর অত্যাচার চালায় বাঙালিরাই।

Banglalive-9

তবে বাঙালিদের প্রতিশোধ পরায়ণতা কাজ করলেও পর্তুগিজরা কিন্তু একেবারেই ধোয়া তুলসিপাতা ছিল না । তারা সমুদ্রপথে রাজ করত । বিভিন্ন বাণিজ্যতরী লুঠ করত। পিপলি বন্দরের পর পূর্ব মেদিনীপুরের হিজলিতে বন্দর তৈরি করে তাঁরা চট্টগ্রামে বন্দর করতে চান । কিন্তু অনুমতি পাননি ।

আরও পড়ুন:  ১৯৭১-এর পর আবার নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে আক্রমণ ভারতের

তারপর থেকে যেন লুঠতরাজ বেড়ে যেতেই লাগল । ফলে মার খেল বাংলার ব্যবসা । বাণিজ্য নৌকা লুঠ করেই ক্ষান্ত হত না হার্মাদের দল । স্থলেও নানা সময়ে হামলা চালাতে দেখা গিয়েছে তাদের। এই হামলার সময় তারা যাদের বন্দি করত, পরে তাদেরই বিক্রি করত অন্য কোনও জায়গায়। বাংলায় দাস প্রথাকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল এই পর্তুগিজরাই ।

তবে এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই যে বাংলায় দাস প্রথা আগে ছিল না । শ্রাবণী বসু লিখছেন—‘ভারতবর্ষে ইউরোপীয়রা দাস ব্যবসা বা দাস প্রথা চালু করেনি। বহু প্রাচীন কাল থেকে এই প্রথা চালু ছিল। তবে ভারতবর্ষের দাসত্বের যে সংজ্ঞা প্রাচীন বা মধ্য যুগে পাওয়া যায় ইউরোপীয়রা তার পরিবর্তন ঘটায় । প্রাচীন কালে জাতিভেদ প্রথার মধ্যে দাসত্বের পরিচয় পাওয়া যায় । দাসদাসী হাতবদল বা দান করার প্রথাও চালু ছিল বলে জানা যায় । মধ্যযুগে মুসলমানী শাসকদের আমলেও দাস বিক্রির বাজার ছিল ।…কিন্তু দেখা যাচ্ছে ধনতন্ত্র বিকাশের যুগে দাসরা একটা বস্তুতে পরিণত হচ্ছে । ১৭২৩ সালের ২০ জানুয়ারী লেখা এক ফরাসীর বিবাহের চুক্তিপত্রে দেখা যায় অস্থাবর বস্তু সামগ্রীর সঙ্গে ১৮ জন দাস দাসীর কথা উল্লেখ আছে। ১৭১২ সালে ১লা এপ্রিল লেখা এক চুক্তিপত্রের থেকে জানা যায় এক দম্পতি ২৬২ টাকার বিনিময়ে তাদের বাড়ি, সম্পত্তি, গয়নাগাঁটির সঙ্গে দাসদেরও বন্ধক রাখে’।

হ্যাঁ, পর্তুগিজরা নিঃসন্দেহে অন্যমাত্রা দিয়েছিল দাসপ্রথাকে। বন্দরে বন্দরে মানুষবিক্রির খেলায় মেতে উঠেছিল ফিরিঙ্গিরা। আর তাতে সায় ছিল বাংলার জমিদারদেরও। তাঁরাই দাস-দাসী নিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছিলেন দিন। তবে দাস প্রথা যে শুধু মাত্র চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল হার্মাদরা এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। অর্থনৈতিক কারণে বাংলার মানুষও নিজেদের বিক্রি করত দাস হিসেবে। ১৮৩৯ সালে ল’ কমিশন যে রিপোর্ট দেয়, তাতে দেখা যাচ্ছে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন দরিদ্র বাঙালি হল দাস। আর মূলত তাঁরা পূর্ববঙ্গেরই লোক।

আরও পড়ুন:  ছবিতে ভূত নাকি ভয়ের ছায়া?

মূলত বাংলায় দু-ধরনের কাজে দাস-দাসীদের ব্যবহার করা হতো। জমিদারদের জমিতে কাজ করতেন কিছু মানুষ আর তাঁদের বাড়িতে কাজ করে গৃহস্থালির কাজ করতেন অন্য শ্রেণি ।

বাংলার কোণায় কোণায় গজিয়ে উঠেছিল দাসের হাট । কলকাতাও হয়ত তার ব্যতিক্রম ছিল না। ‘তাঁতী বউ’-এ অমিয়ভূষণ মজুমদার সেরকমই একটি হাটের উল্লেখ করেছেন, দিয়ে গিয়েছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ—‘জমিদারেরা নিজে আসতেন, এমনকী উজিররাও কেউ কেউ আসতেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে । এদিকে বাঁদী-বান্দার দোকান। টাকা দিয়ে বান্দা পাওয়া যেত জোয়ান, বুদ্ধিমান, কৌশলী, পাঠান, মোবলা, খোজা, হিন্দু যার যেরকম চাই। বাঁদীও পাওয়া যেতো মুলতানি, গুজরাটি, আফগানি,শাদা, গোলাপি, শ্যামলা, কখনো বসরা থেকেও আসত। এসব দোকানের বর্ণনা ইতিহাস যা দিয়েছে তার চাইতে ভাল বলা যায় না। আনারকলি, নূরজাহাঁ এসব দোকানের বেসাতি।…’

কলকাতায় বেচাকেনার জন্য থাকত দালাল বা মধ্যভোগীরা । ইন্ডিয়ান রিফরমার সে কথায় জানিয়েছে। পত্রিকার পাতায় লেখা হয়েছে—‘In Calcutta and other places, there
are brokers for buying bondmen and bondwomen. After convicting some low-caste females of adultery, they employ them as servants, and on pretence of travelling, they sell them…’

ইংল্যান্ডে দাসত্ব বিরোধী আইন নিয়ে মাতামাতি শুরু হতেই এখানেও কোম্পানির ওপর চাপ আসতে শুরু করে । তবে কোম্পানির সাহেবরা তাতে রাজি ছিলেন না । টালবাহানা করতে করতেই কেটে যায় ষাটটি বছর। ১৮৪৩-এ ইংল্যান্ডে আইন হয়, আর সেই আইন মোতাবেক এ দেশে বন্ধ করা হয় দাস প্রথা। তবে এই আইন ছিল স্বাধীন মানুষ আর দাসের মাঝে একটি ছোট্ট ব্যবধান। দাসের দাসই থেকে যায় দীর্ঘদিন। তাঁদের আর অবস্থার উন্নতি হয় না ।

NO COMMENTS