আমাদের অনেকের কাছে আজও অজানাই রয়ে গেছে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ের থেকে ১৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত মুরুদ নামে একটি ছোট্ট গ্রামের গর্ব অপরাজিত দুর্গ জঞ্জিরার কথা | জঞ্জিরা একটি এমন দুর্গ যা মুম্বইয়ের আরব সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে অবস্থিত | মহারাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানাধিকারী এই দুর্গটি এখন একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র | আরব শব্দ  জজিরা  থেকে  জঞ্জিরা  কথাটির উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়, যার অর্থ হল দ্বীপ | একসময় মুরুদের নাম ছিল হাসবান | কোঙ্কণী  মোরোদ  ও আরবি জজিরা  শব্দদুটির মিলনে মুরুদের জঞ্জিরা দুর্গের নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয় |


আরব সাগরের মধ্যে অবস্থিত ডিম্বাকৃতি একটি বিশালাকার পাথুরে উপত্যকার উপরে অবস্থিত জঞ্জিরা দুর্গটি | এটি ভারতবর্ষের এমনই একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক দুর্গ যাকে আজ অবধি কোনও বহিঃশত্রু জয় করতে পারেনি | নিকটবর্তী রাজাপুরী জেটি থেকে নৌকায় করে জঞ্জিরায় পৌঁছনো যায় | দুর্গের প্রধান ফটক বা দরজাটি দুর্গের ১২ মিটারের মধ্যে এসে পৌঁছলে তবেই দেখা যায় | দুর্গ থেকে বাইরে যাওয়ার প্রধান পথ ওই একটিই | প্রবেশপথের ফটকটিতে দেখা যায় এমন এক ভাস্কর্য ৬ টি হাতিকে পর্যুদস্ত করছে ১ টি মাত্র বাঘ | জঞ্জিরার অধিকারীদের কাছে এই চিহ্ন সাহসিকতার প্রতীক ছিল |



এই দুর্গের মধ্যে ২৬ টি গড় আজও অক্ষত অবস্থায় আছে | একসময় এই দুর্গে ৫৭২ টি কামান ছিল বলে জানা যায় | এরে মধ্যে ৩ টি কামান কালাল বাঙরি‚ ছবড়ি ও লান্ডা কসম আজও অক্ষত অবস্থায় দুর্গটিতে রয়েছে | ঐতিহাসিক তথ্য সূত্রে জানা যায় জঞ্জিরা দুর্গের অধিপতি ছিলেন আবিসিনিয়ান সিদি বা হাবশিরা | এঁরা পূর্ব আফ্রিকার বান্টু উপজাতির একটি অংশ ছিলেন | ১৬২১ সালে মালিক অম্বরকে পরাস্ত করে এই দুর্গের অধিকারি হন সিদি অম্বর | সেই সময় সিদিরা ছিল খুবই শক্তিশালী | 

আরও পড়ুন:  বারো হাজার কিলোমিটার সাঁতরে অবশেষে মৃত্যু হল দৈত্যাকৃতি মাছের!



জানা যায় আহমেদনগরের সুলতানের আবিসিনিয়ান মন্ত্রী মালিক অম্বর সপ্তদশ শতকে এই দুর্গটি বানিয়েছিলেন | চারিদিকে ৪০ ফিটের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা এই দুর্গ সেই সময়ের স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন | বছরের পর বছর এই দুর্গের প্রাচীরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়া সত্ত্বেও প্রাচীরটি আজও কীভাবে অবিক্ষত রয়েছে তা আদতেই একটি রহস্য | বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাচীরটি নির্মাণের উপাদানের মধ্যে ছিল এমন কোনও পদার্থ যা জলরোধক | সেই প্রাচীন সময়েও স্থাপত্যবিদ্যার এমন মুন্সিয়ানা অবাক করারই মত |

Banglalive-8



জঞ্জিরার দুর্গের সুরক্ষার কবচ ছিল অনেক | এরই ভিতরে রয়েছে প্রাসাদ‚ মসজিদ সহ যাবতীয় জরুরি জিনিস | সমুদ্রের নোনা জল দিয়ে ঘেরা এই দুর্গের ভিতরে রয়েছে ২ টি ৬০ ফুট গভীর মিষ্টি জলের হ্রদ | নারকেল ও সুপুরি গাছে ঘেরা এই দুর্গের কাছে পৌঁছবার আগেই শত্রুরা দুর্গের ভিতরের সৈন্যদের নজরে পড়ে যেত | দূর থেকেই কামানের তোপে ধ্বংস হত শত্রুর দল | শোনা যায় অনেকগুলি হাতি একসঙ্গে ধাক্কা মেরেও দুর্গের প্রধান দরজাটি ভাঙতে পারেনি | জলভাগ দিয়ে ঘেরা‚ মজবুত প্রাচীরে ঘেরা‚কামানের তোপে সুরক্ষিত‚ মজবুত দরজা দিয়ে বদ্ধ এই দুর্গকে জয় করা হয়ত এইসব কারণেই ছিল অসম্ভব |

Banglalive-9



জঞ্জিরা দুর্গের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন শাসকের মধ্যে ছিলেন সিদি হিলাল‚ ইয়াইহা সালেহ এবং সিদি ইয়াকুব | ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে মুঘল সাম্রাজ্যের শাসকেদের সাথে সন্ধি করে বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানে এসেছিল সিদি সাম্রাজ্যের শাসকরা | পর্তুগিজ‚ ব্রিটিশ‚ মারাঠা ইত্যাদি বহিঃশত্রু বহুবার আক্রমণ করার পরেও সিদিদের হারাতে পারেনি | ১৬৭৬ সালে মোরো পণ্ডিতের পাঠানো ১০‚০০০ জন সৈন্যকেও যুদ্ধে পরাজিত করে সিদি বংশ |

মারাঠা বীর শিবাজি দুর্গের ৪০ ফুট উঁচু গ্রানাইট প্রাচীরটিকে লঙ্ঘন করার চেষ্টা করলেও সফল হতে পারেননি | তাঁর পুত্র শম্ভুজিও মাটির তলা দিয়ে দুর্গ আক্রমণের চেষ্টা করে বিফল হন | ১৭৩৬ সালে মারাঠার পেশোয়া বাজীরাও জঞ্জীরা আক্রমণ করেন | কিন্তু এই সমস্ত বীর যোদ্ধাদের কেউই জঞ্জীরার দুর্ভেদ্য প্রাচীর লঙ্ঘন করে তা অধিকার করতে পারেননি | ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাষণ থেকে মুক্ত হওয়ার পর জঞ্জিরা দুর্গকে ভারতবর্ষের সীমানার অন্তর্গত করা হয় | ইতিহাসের পাতায় গৌরবান্বিত হয়ে অজেয় এই সামুদ্রিক দুর্গ আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আরবসাগরের বুকে |

NO COMMENTS