সাগরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গ কয়েকশো বছর ধরে শত্রুদের কাছে অজেয়

2284

আমাদের অনেকের কাছে আজও অজানাই রয়ে গেছে মহারাষ্ট্রের মুম্বইয়ের থেকে ১৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত মুরুদ নামে একটি ছোট্ট গ্রামের গর্ব অপরাজিত দুর্গ জঞ্জিরার কথা | জঞ্জিরা একটি এমন দুর্গ যা মুম্বইয়ের আরব সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মধ্যে অবস্থিত | মহারাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থানাধিকারী এই দুর্গটি এখন একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র | আরব শব্দ  জজিরা  থেকে  জঞ্জিরা  কথাটির উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়, যার অর্থ হল দ্বীপ | একসময় মুরুদের নাম ছিল হাসবান | কোঙ্কণী  মোরোদ  ও আরবি জজিরা  শব্দদুটির মিলনে মুরুদের জঞ্জিরা দুর্গের নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয় |


আরব সাগরের মধ্যে অবস্থিত ডিম্বাকৃতি একটি বিশালাকার পাথুরে উপত্যকার উপরে অবস্থিত জঞ্জিরা দুর্গটি | এটি ভারতবর্ষের এমনই একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক দুর্গ যাকে আজ অবধি কোনও বহিঃশত্রু জয় করতে পারেনি | নিকটবর্তী রাজাপুরী জেটি থেকে নৌকায় করে জঞ্জিরায় পৌঁছনো যায় | দুর্গের প্রধান ফটক বা দরজাটি দুর্গের ১২ মিটারের মধ্যে এসে পৌঁছলে তবেই দেখা যায় | দুর্গ থেকে বাইরে যাওয়ার প্রধান পথ ওই একটিই | প্রবেশপথের ফটকটিতে দেখা যায় এমন এক ভাস্কর্য ৬ টি হাতিকে পর্যুদস্ত করছে ১ টি মাত্র বাঘ | জঞ্জিরার অধিকারীদের কাছে এই চিহ্ন সাহসিকতার প্রতীক ছিল |



এই দুর্গের মধ্যে ২৬ টি গড় আজও অক্ষত অবস্থায় আছে | একসময় এই দুর্গে ৫৭২ টি কামান ছিল বলে জানা যায় | এরে মধ্যে ৩ টি কামান কালাল বাঙরি‚ ছবড়ি ও লান্ডা কসম আজও অক্ষত অবস্থায় দুর্গটিতে রয়েছে | ঐতিহাসিক তথ্য সূত্রে জানা যায় জঞ্জিরা দুর্গের অধিপতি ছিলেন আবিসিনিয়ান সিদি বা হাবশিরা | এঁরা পূর্ব আফ্রিকার বান্টু উপজাতির একটি অংশ ছিলেন | ১৬২১ সালে মালিক অম্বরকে পরাস্ত করে এই দুর্গের অধিকারি হন সিদি অম্বর | সেই সময় সিদিরা ছিল খুবই শক্তিশালী | 



জানা যায় আহমেদনগরের সুলতানের আবিসিনিয়ান মন্ত্রী মালিক অম্বর সপ্তদশ শতকে এই দুর্গটি বানিয়েছিলেন | চারিদিকে ৪০ ফিটের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা এই দুর্গ সেই সময়ের স্থাপত্যের এক অসাধারণ নিদর্শন | বছরের পর বছর এই দুর্গের প্রাচীরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়া সত্ত্বেও প্রাচীরটি আজও কীভাবে অবিক্ষত রয়েছে তা আদতেই একটি রহস্য | বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাচীরটি নির্মাণের উপাদানের মধ্যে ছিল এমন কোনও পদার্থ যা জলরোধক | সেই প্রাচীন সময়েও স্থাপত্যবিদ্যার এমন মুন্সিয়ানা অবাক করারই মত |



জঞ্জিরার দুর্গের সুরক্ষার কবচ ছিল অনেক | এরই ভিতরে রয়েছে প্রাসাদ‚ মসজিদ সহ যাবতীয় জরুরি জিনিস | সমুদ্রের নোনা জল দিয়ে ঘেরা এই দুর্গের ভিতরে রয়েছে ২ টি ৬০ ফুট গভীর মিষ্টি জলের হ্রদ | নারকেল ও সুপুরি গাছে ঘেরা এই দুর্গের কাছে পৌঁছবার আগেই শত্রুরা দুর্গের ভিতরের সৈন্যদের নজরে পড়ে যেত | দূর থেকেই কামানের তোপে ধ্বংস হত শত্রুর দল | শোনা যায় অনেকগুলি হাতি একসঙ্গে ধাক্কা মেরেও দুর্গের প্রধান দরজাটি ভাঙতে পারেনি | জলভাগ দিয়ে ঘেরা‚ মজবুত প্রাচীরে ঘেরা‚কামানের তোপে সুরক্ষিত‚ মজবুত দরজা দিয়ে বদ্ধ এই দুর্গকে জয় করা হয়ত এইসব কারণেই ছিল অসম্ভব |



জঞ্জিরা দুর্গের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন শাসকের মধ্যে ছিলেন সিদি হিলাল‚ ইয়াইহা সালেহ এবং সিদি ইয়াকুব | ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে মুঘল সাম্রাজ্যের শাসকেদের সাথে সন্ধি করে বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানে এসেছিল সিদি সাম্রাজ্যের শাসকরা | পর্তুগিজ‚ ব্রিটিশ‚ মারাঠা ইত্যাদি বহিঃশত্রু বহুবার আক্রমণ করার পরেও সিদিদের হারাতে পারেনি | ১৬৭৬ সালে মোরো পণ্ডিতের পাঠানো ১০‚০০০ জন সৈন্যকেও যুদ্ধে পরাজিত করে সিদি বংশ |

মারাঠা বীর শিবাজি দুর্গের ৪০ ফুট উঁচু গ্রানাইট প্রাচীরটিকে লঙ্ঘন করার চেষ্টা করলেও সফল হতে পারেননি | তাঁর পুত্র শম্ভুজিও মাটির তলা দিয়ে দুর্গ আক্রমণের চেষ্টা করে বিফল হন | ১৭৩৬ সালে মারাঠার পেশোয়া বাজীরাও জঞ্জীরা আক্রমণ করেন | কিন্তু এই সমস্ত বীর যোদ্ধাদের কেউই জঞ্জীরার দুর্ভেদ্য প্রাচীর লঙ্ঘন করে তা অধিকার করতে পারেননি | ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাষণ থেকে মুক্ত হওয়ার পর জঞ্জিরা দুর্গকে ভারতবর্ষের সীমানার অন্তর্গত করা হয় | ইতিহাসের পাতায় গৌরবান্বিত হয়ে অজেয় এই সামুদ্রিক দুর্গ আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আরবসাগরের বুকে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.