মিউজিক্যাল চেয়ার

1312

যা যা, বেশি সতীত্ব মারাতে আসিস না, ভান্ড ফুটিয়ে দেব। ওই পোনপাকা পানদোকানিটার সাথে রোজ দুপুরবেলায় কোন পিরিতের গপ্প করিস রে হারামজাদি? ভাবিস কিছু দেখি না? চোখে ন্যাবা হয়েছে?
   লেগে গেছে খঞ্জনী আর কদলী।
   খঞ্জনী গা নাচিয়ে নাচিয়ে লড়াই করছে। আঁচল সরতে সরতে বুক হা। হুঁশ নেই। যারা দেখার দেখছে,  যারা শোনার শুনছে। এটা হররোজ হয়।
   কদলী তো একদিন মুখের ওপর বলেই দিল, দেখেছ কেমন কায়দা করে কাপড় সরাচ্ছে? ভাবছে ওর রূপগতর দেখে পুরুষ মানুষগুলা ওর দিকে ঢলে পড়বে। ওকে সাপোট করবে। অত সস্তা না, এখনও দেশে সাচ্চা লোক আছে রে, সবাই তোর মতো ঢ্যামনা না।

   খঞ্জনী আর কদলী। দুজনেই খরখরে বিধবা। ছেলেপুলে নেই।  পাশাপাশি দুটো ঘুপচিতে থাকে।
   আগে এর তার বাড়ি কাজকর্ম করত। সঙ্গে নিপুণ হাতসাফাই। উপরি কামাই। যে বাড়িতেই যায় সেই বাড়িতেই মাসের মশলা দশ দিনে ফুড়ুৎ। এছাড়া আনা-আধুলি এটা ওটা তো আছেই। একে একে সব গেরস্থরাই ছাড়ান দিল।
   এতে ওদের ভালই হল। ওদের সাফাই অভিযান সারা গ্রামে লাগু হল। প্রায় ব্লু হোয়েলের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল গাঁ ঘরে। উঠোনে মেলে রাখা গামছা-গেঞ্জির পাখা গজাল। ঘটি-চামচের পাখা গজাল। বাগানের পেয়ারা-বাতাবি, হাঁস-মুরগি, রোদপোহানো আচার-আমসি, নাক উঁচু ডালের বড়ি পটাপট উধাও হতে থাকল। সবাই বুঝে গেল হয় খঞ্জনীর কাজ, নয় কদলীর। কিন্তু বামাল ধরে কার সাধ্যি।
   দু একজন আন্দাজি চেপে ধরেছিল বটে, মালমশলা কিছুই উদ্ধার করতে পারেনি। উপরন্তু বাপের নাম খগেন করে ছেড়ে দিয়েছিল ক আর খ মিলে।
   খুব সামান্য ছুতো পেলেই হল, বাপ-বাপান্ত ওদের কাছে জলভাত। এর মুরগি ওর এঁটো বাসনে মুখ দিলেই চিত্তির। সতীত্ব নিয়ে টানাটানি। নেচে নেচে, দুলে দুলে, চেঁচিয়ে পেঁচিয়ে অমনি পাড়ায় ধামাকা লাগিয়ে দিল। নাকের ডগায় অনঙ্গ মুহুরির বাড়ি। তার হার্টে লাব আছে তো ডুব নেই। পেসমেকার বসেছে। মাঝে মাঝেই বার্স্ট করে প্রাণ যাই যাই অবস্থা। অনঙ্গর নাতির মাথায় হালকা ছিট। গাঁয়ের আরএমপি ডাক্তার গদাই দাস বলেছে, সেটা নাকি কদলী খঞ্জনীর উচ্চ ডেসিবেলের কুফল। গাঁ না ছাড়লে এ জিনিস সারবার নয়।
   গাঁয়ের মাতব্বররা মিটিং করল। মিটিং না বলে অনুরোধের আসর বলাই ভাল। বুড়ো নরহরি বিড়ি টানতে টানতে চোদ্দবার মা লক্ষী মা লক্ষী বলে তোয়াজ করল। আরেক বুড়ো যুধিষ্ঠির দাঁতমুখ খিচিয়ে চোটপাট করল। খঞ্জনী আঁচল আলগা করে দিল। দুই বুড়ো চুপ। মিটিং ভেস্তে গেল।
   আবার মিটিং বসল আমগাছের তলায়। ইয়ং জেনারেশন দায়িত্ব হাতে নিল। গাঁছাড়া করার ভয় দেখাল। এবার কাজ হল। চুরি আর চিৎকার দুটোই বেড়ে ফুসকুড়ি থেকে ফাইলেরিয়া হয়ে গেল।

   একদিন দু কানে আঙুল চেপে আমাদের বাড়িতে ছুটতে ছুটতে এল অনঙ্গ মুহুরির নাতি লবঙ্গ। এসেই লাফাতে লাগল- আর পারছি না বেচুদা, এবার পাক্কা মরে যাব। হিরোসিমাতে একবার বোমা পড়েছিল না?
   আচমকা ও বিশ্বযুদ্ধর ইতিহাসে লাফ মারায় আমি ঘাবড়ে গেলাম। বললাম- পড়েছিল। তাতে তোর কি?
   : তোর কি মানে? আমাদের গ্রামটাও এবার ধ্বংস হয়ে যাবে।
   : গোলাবর্ষণে?
   : না গো, গালিবর্ষণে। খঞ্জনী আর কদলী আবার লেগেছে। খঞ্জনী কি একটা ঝেড়ে এনেছিল, কদলী সেটা ঝেড়ে দিয়েছে। চোরের উপর বাটপারি। রেগেমেগে খঞ্জনী কদলীর লাউগাছ উপরে দিয়েছে। তারপর সমানে গালাগালি। আর পারা যাচ্ছে না বেচুদা। যেভাবেই হোক জব্দ করতেই হবে।
   : কে করবে? কার ঘাড়ে দুটো মাথা আছে?
   : আমি করব। আমার প্ল্যান আঁটা হয়ে গেছে।
   ওর প্ল্যান নিয়ে আমার কোনও আগ্রহই জন্মাল না। ওই খান্ডারীদের যে কোনও প্ল্যানেই কাবু করা যাবে না, এ বিশ্বাস আমার মনে বুড়ো বটের মতোই প্রতিষ্ঠিত।

   পুজোর মাস। এখানে ওখানে কাশ। আকাশের মেঘে রাজহাঁস। শিউলি ঝরছে ঝুরঝুরিয়ে।
   বাঁকাচর গ্রামেও একটা পুজো হয়। প্যান্ডেলের কেরামতি নেই। আলোর দাপট নেই। মূর্তিতে বাহার নেই। মায়ের মুখ গ্রামের মানুষগুলোর মতোই সাদামাটা। লবঙ্গ বলে, আমরা গরীব, তাই আমাদের মাও গরীব।
    তবু পুজো ঘিরে গাঁয়ের মানুষের উন্মাদনার শেষ নেই। ঠিক হল, মহালয়ার দিন গ্রামের মহিলাদের নিয়ে মিউজিক্যাল চেয়ার কম্পিটিশন হবে। জিততে পারলে সোনার মেডেল।
   ছোট গ্রাম। নিমেষের মধ্যে খবরটা এ কানে ও কানে চাউড় হয়ে গেল। বারোজন মহিলার নাম জমা পড়ল। নরহরির বউও এসেছিল আটাত্তর বছর বয়সে পাঙ্গা নিতে। সোনার মেডেলের হাতছানি। পাড়ার নাতিরা বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠান্ডা করেছে।
   জমে গেল মিউজিক্যাল চেয়ার।
   মাইকে গান বাজছে। রকম রকম আগমনী গান। প্রমীলাবাহিনী কোমরে কাপড় গুঁজে বাঁই বাঁই করে ঘুরছে। জনতা জনাদ্দন কদলী খঞ্জনীর ঘোর বিরোধী, কিন্তু সঙ্গীত নিয়ন্ত্রণে যে আছে, সেই লবঙ্গ হারামজাদা এমন জায়গায় গান থামিয়ে দিচ্ছে যে, আর কেউ চেয়ার পাক না-পাক, কদলী খঞ্জনীর ঠিক জুটে যাচ্ছে।

   পাবলিক তেতে লাল। কেউ কেউ পক্ষপাতিত্বের ধুয়ো তুলল। লবঙ্গ নির্বিকার। শেষকালে যখন খঞ্জনী আর কদলীই শুধু টিকে থাকল, কেউ আর মাঠে থাকার প্রয়োজনই অনুভব করল না। নরহরি লবঙ্গকে হাজার গন্ডা শাপ দিতে দিতে বাড়িমুখো হল। বাকিরাও পথ ধরল একে একে। কদলী বা খঞ্জনী সোনার মেডেল যেইই পাক, গ্রামের মানুষের তাতে কিছু যায় আসে না।
    মেডেলটা কেউ চোখে দেখেনি। পুজো কমিটির সেক্রেটারিও না। সে জানে শুধু হাফ ছিটেল লবঙ্গ। সব মিলিয়ে রহস্যর ঘাড়ে রহস্য চাপল।
   
   সন্ধ্যাবেলায় লবঙ্গ হাজির। বললাম- কি রে, মেডেলটা কে পেল?
   : কেউ না।
   : কেউ না মানে?  কেউ না কেউ তো পাবেই।
   : কি করে পাবে, কেউ তো খেলাটা শেষই করতে পারেনি। তার আগেই মাটিতে দড়াম দড়াম করে পড়ে গেল।
   : দুজনেই পড়ে গেল! যাহ…
   : সত্যি বলছি। দুগগার দিব্যি।
   লাস্ট রাউন্ডে এসে দুজনেই পড়ে গেল—- এভাবে ‘সুবর্ণ’ সুযোগ হাতছাড়া করল —- রহস্য পাকিয়ে পাকিয়ে মাথায় গিঁট পড়ে গেল। বললাম- কেসটা খুলে বল তো।
   : গান তো যেমন চলার চলছিল, বুঝলে কিনা। এদিকে ওরা হাঁপিয়ে হেদিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। তাও আশা ছাড়েনি, সোনার মেডেল বলে কথা। লেংচে লেংচে চলল খানিকক্ষণ। শেষে দেখি দুজনেই হামাগুড়ি দিচ্ছে।
   : হামাগুড়ি? তারপর?
   : তারপর হামাগুড়ি দিতে দিতে দুজনেই মুখ থুবড়ে ফ্যাতলাস এবং এক পাল্টি মেরে চিতপটাং। এখনও শুয়ে আছে মাঠে।
   : যাত্তারা, এত কাণ্ড হল কি করে?
   : হবে না? টানা দেড় ঘন্টা মহিষাসুরমর্দিনী চালিয়ে গ্যাঁট মেরে বসেছিলাম যে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.