বিড়ালের বিয়ে‚ ঘোড়দৌড়ে টাকার ফোয়ারা ওড়ানো গওহর জানের মৃত্যু হয়েছিল নিঃস্ব‚ রিক্ত‚ নিঃসঙ্গ অবস্থায়

মেহফিলের জৌলুস কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বাঈজির হিরের গয়না | চারদিক যেন ধাঁধিয়ে যাচ্ছে | ঝলমল করছে বেনজির বাইয়ের গায়ে হিরের দ্যুতি | সুরের সাগরে শ্রোতাদের ভাসিয়ে এ বার উঠবেন তিনি | পর্দার ওপারে অপেক্ষায় পরের তারকা শিল্পী | 

চিকের আড়ালে সেই শিল্পী এ বার বললেন বেনজিরকে | বেনজির‚ তোমার হিরের গয়না বিছানায় চমকাতে পারে | কিন্তু মেহফিলে যা উজ্জ্বল হবে তা হল তোমার কণ্ঠস্বরের জাদু | শুনে লজ্জায় মুখ নিচু করে রইলেন বেনজির | 

এরপর বেনজির বাঈ সব গয়না অর্পণ করলেন উস্তাদের পায়ে | দশ বছর ধরে শুধু তালিম নিলেন | কোনও মেহফিল জলসা কিছু করলেন না | আবার দশ বছর পরে সেই শিল্পীর মুখোমুখি | এ বার গান শুনে ওই শিল্পী বললেন‚ বেনজির‚ এ বার তোমার হিরে সত্যি হিরের মতো উজ্জ্বল হয়েছে |

সেই শিল্পীর নাম গওহর জান | ভারতের প্রথম মহিলা সুপারস্টার | প্রথম ভারতীয় শিল্পী যাঁর গান রেকর্ড করেছিল গ্রামাফোন কোম্পানি | এখন কথায় কথায় শিল্পী বলা হচ্ছে | নিজের সময় তিনি ছিলেন বাঈজি  | মেহফিল জমানো তওয়াইফ | তবে এই পরিচয় কোনওদিন টেনে নিচে নামাতে পারেনি তাঁকে | যতদিন ছিলেন‚ নিজের কেতায় ছিলেন |

জন্ম ১৮৭৩-এর ২৬ জুন | আজকের উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে | দাদু ছিলেন ব্রিটিশ | দিদিমা ভারতীয় | তাঁদের মেয়ে ভিক্টোরিয়া ছোট থেকেই নাচগানে পারদর্শী | হিন্দুস্তানি গান‚ কত্থক‚ ভারতীয় ধ্রুপদী শিল্পকলায় ছিল তাঁর অনায়াস গতি |

কিশোরীবেলায় ভিক্টোরিয়ার মন দেওয়া নেওয়া হল জনৈক উইলিয়াম ইওয়ার্ডের সঙ্গে | আর্মেনিয়ান ইহুদি তিনি | ভারতে এসেছিলেন ভাগ্যের খোঁজে | কাজ করতেন শুষ্ক বরফের কারখানায় | বিয়ে হল উইলিয়াম-ভিক্টোরিয়ার | ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুন জন্ম নিল একমাত্র মেয়ে‚ নাম রাখা হল অ্যাঞ্জেলিনা |

মনে ভরে মেয়েকেও নাচ গান শেখাতে লাগলেন ভিক্টোরিয়া | কিন্তু ঈশান কোণে জমেছে মেঘ | টিকল না ইহুদি-খ্রিস্টান বিয়ে | ভিক্টোরিয়ার জীবনে হাজির প্রেমিক খুরশিদ | মা মেয়েকে ছেড়ে চলে গেলন উইলিয়াম | আর ফিরে আসেননি | 

খুরশিদ ছিলেন ভিক্টোরিয়ার শিল্পকলার সমঝদার ‚ তাতেই দৃঢ় হল প্রেম | মেয়েকে নিয়ে খুরশিদের সঙ্গে চলে এলেন বেনারস | মা-মেয়ে গ্রহণ করলেন ইসলাম ধর্ম |  ভিক্টোরিয়ার নতুন নাম হল মালকা জান | অ্যাঞ্জেলিনা হলেন গওহর জান |  

বেনারস থেকে মালকা চলে এলেন কলকাতা | বুঝেছিলেন রাজধানীতে না থাকলে জমবে না ব্যবসা | তখন কলকাতার মেটেবুরুজে নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ | লখনৌ নগরী ছেড়ে তাঁর যা মনখারাপ হয়েছিল‚ দূর করেছিলেন মালকা জান | তিনি তখন নবাবের সভাগায়িকা ও নর্তকী | ভারতে তখন অনেক মালকা জান নামে বাইজি | তাই নিজেকে বড়ী মালকা জান বলতেন গওহরের মা |

কলকাতায় আসার তিন বছরের মধ্যে চিৎপুরে বিশাল বাড়ি কিনলেন মালকা | নগদ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে | ওটাই হল তাঁর নতুন কুঠী | একদিকে মায়ের ব্যবসা‚ অন্যদিকে মেয়ের প্রশিক্ষণ চলতে লাগল | বিশুদ্ধ ও লাইট দুই ধরণের ধ্রুপদ সঙ্গীত গওহরকে শেখালেন মালকা | কালু উস্তাদ‚ ওয়াজির খানের মতো শিল্পীদের কাছে তালিম নিয়েছেন গওহর | সৃজন বাইয়ের কাছে শিখেছিলেন ধ্রুপদ ধামার | চরণদাসের কাছে বাংলা কীর্তন | বিরজু মহারাজের -কাকা ঠাকুরদা বৃন্দাদিন মহারাজের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন কত্থকের |   

ক্রমে মালকা যুগের শেষে শুরু হল গওহর যুগ | কিশোরী গওহর প্রথম পারফর্ম করলেন ১৮৮৭ সালে | দ্বারভাঙার মহারাজের আমন্ত্রণে | কদিনের মধ্যেই তিনি হয়ে গেলেন রাজার সভাশিল্পী |

কয়েক বছর পর আবার স্বাধীন ভাবে পথ চলা | ১৮৯৬ সালে গওহর তখন বিভিন্ন শহরে মেহফিল করছেন | এমন সময়ে জীবনে এলেন পার্সি অভিনেতা অমৃত কেশব নায়ক |  মায়ের মৃত্যুযন্ত্রণার শোক ভুলতে অমৃতের আশ্রয় খুঁজেছিলেন গওহর | কিন্তি তাঁকে একা করে ১৯০৭ সালে পরলোকে চলে গেলেন অমৃত | মাত্র দু তিন বছরের সম্পর্ক‚ কিন্তু অমৃত অনেকখানি জায়গা নিয়ে ছিলেন গওহরের জীবনে | 

শুধু রাতকে রঙিন করা বাঈজি  নন | গওহর ছিলেন জাত শিল্পী | ১৯১১ সালে তিনি ডাক পেলেন দিল্লি দরবারে | ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের সম্মানে অনুষ্ঠান | সেখানেই ঘোষিত হল রাজধানী সরে যাবে কলকাতা থেকে দিল্লি | ইলাহাবাদের জানকীবাইয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠান পেশ করলেন গওহর | রাজা পঞ্চম জর্জ খুশি হয়ে এক হাজার গিনি করে নজরানা দিয়েছিলেন দুই শিল্পীকে | 

মালকা ও গওহরের গান শুনে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নেন বেগম আখতার | এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তিনি | ১৯০২ সালে প্রথম ভারতীয় শিল্পীর রেকর্ড বের করল গ্রামাফোন কোম্পানি | গওহর গাইলেন খেয়াল | সেই শুরু | ১৯০২ থেকে ১৯২০ অবধি ১০ ভাষায় অজস্র গান রেকর্ড হয়েছে তাঁর | বাংলা‚ হিন্দি‚ গুজরাতি‚ তামিল‚ মরাঠি‚ আরবি‚ পার্সি‚ পাশতু‚ ফরাসি‚ ইংরেজিকোন ভাষায় গান গাননি তিনি ! তখন কলের গান মানেই গওহর জান | প্রতি রেকর্ডের শেষে তিনি বলতেন‚  মাই নেম ইজ গওহর জান | 

গওহর যে কত বড় তারকা ছিলেন‚ কত টাকা উপার্জন করেছেন‚ আবার জলের মতো উড়িয়েছেন তার সীমা নেই | শোনা যায়‚ পোষা বিড়ালের বিয়ে দিতে বিশ শতকের গোড়ায় খরচ করেছিলেন ১২০০ টাকা | সেই মেনি যখন মা হল‚ গওহর উড়িয়ে দিলেন ২০০০ টাকা | ৪ ঘোড়ায় টানা বুগি গাড়ির জন্য ভাইসরয়কে জরিমান দিয়েছিলেন ১০০০ টাকা করে‚ প্রতিদিন | মেহফিলে তাঁর নজরানা ছিল ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা | রেকর্ডিং পিছু পেতেন ৩ হাজার টাকা | তখনকার দিনের কোটিপতি তিনি | নিয়মিত বাজী ধরতেন রেসের মাঠে | একবার অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার সময় তাঁর আব্দারে ভাড়া করতে হয়েছিল আস্ত ট্রেন | তাতে বাজনদারদের ছাড়াও গওহর নিয়ে গিয়েছিলেন নিজস্ব রাঁধুনি‚ রাঁধুনির সহকারী‚ হাকিম‚ ধোপা‚ নাপিত এবং খাস চাকর |

যে পুরুষকে ভোলানোই ছিল তাঁর কাজ‚ যে পুরুষের নজরানায় তাঁর এত সমৃদ্ধি‚ সেই পুরুষের জন্যই পথের ভিখিরি হয়ে গিয়েছিলেন গওহর জান | বাঈজির জীবনে বহু পুরুষ আসবে, স্বাভাবিক | কিন্তু খুব কম জনই বাবু থেকে তাঁর মনের মানুষ হয়েছিলেন | তাঁদের মধ্যে একজন যদি হন জমিদার নিমাই সেন‚ অন্যজন তবে সৈয়দ আব্বাস | বয়সে অনেক ছোট আব্বাস ছিলেন গওহরের তবলচি | 

ভালবেসে আব্বাসকে বিয়ে করেছিলেন গওহর | কিন্তু একদিন বুঝতে পারলেন স্বামীর জন্য সর্বস্বান্ত হতে বসেছেন | তখন তাঁর বেশিরভাগ টাকা হয় আত্মসাৎ করেছে‚ নয়তো নয়ছয় করে ফেলেছে আবাস | বিয়ে ভাঙল | কিন্তু গওহরকে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেললেন আব্বাস | বহু বছর ধরে চলল মামলা | গওহর জিতলেন বটে | কিন্তু নামী উকিলদের পিছনে টাকা দিতে দিতে তিনি ফতুর হয়ে গেছেন ততদিনে |

যে গওহরের ছবি থাকত দেশলাই বাক্সে‚ পিকচার পোস্টকার্ডে আর কিংবদন্তিতে‚ সেই গওহর তখন নিঃস্ব | নেই মুজরো করার শক্তিটুকুও | পড়ন্ত বেলায় পাশে দাঁড়ালেন মহীশূরের রাজ পরিবার | রাজা কৃষ্ণ ওয়াদিয়ার চতুর্থর আমন্ত্রণে মহীশূর গেলেন গওহর | রাজসভার গায়িকা ও নর্তকী হয়ে | নামেই ওই পদ | শেষজীবনের প্রাপ্য কিঞ্চিৎ সম্মান |

কিন্তু পারফর্ম না করে অন্যের বদান্যতায় বাঁচার পাত্রী ছিলেন না তিনি | মাত্র দেড় বছর বেঁচেছিলেন মহীশূরে | ১৯৩০-এর ১৭ জানুয়ারি চোখ বুজলেন তিনি | নিঃসঙ্গ‚ কপর্দকহীন অবস্থায় | সবাই জানে তিনি বাঈজি ‚ মুজরোওয়ালি | সবাই জানে তিনি ধর্মপ্রাণ মুসলিম হয়েও চোখে জল নিয়ে গাইতেন রাধাকৃষ্ণের গান | সবাই জানে কলের গানে অমর হয়ে আছে গওহরের গজল-খেয়াল-ঠুমরি | কিন্তু কজন জানে বাঈজি  গওহর নিজেও গজল লিখেছেন হমদম ছ্দ্মনামে ? কজন খবর রাখতে চেয়েছিল নজরানা নিয়ে সেলাম ঠোকা মুজরোওয়ালির হৃদয়ের গান ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত ?

আজকের দিনে নতুন করে পাওয়া যায় গওহরের কণ্ঠে তনমন কি শুধ অন বন জিয়া‚ হমসে না বোলো রাজা‚ তন মন ঢুন্ঢ সাওয়ারিয়াঁ ‚ রস কে ভরে-এর মতো কালজয়ী গান | কিন্তু এত আধুনিকতার ডিজিটাল যুগেও কি বাঈজি ছেড়ে প্রবাদপ্রতিম ধ্রুপদ সঙ্গীত শিল্পীর পরিচয় পেলেন গওহর জান ? 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Illustration by Suvamoy Mitra for Editorial বিয়েবাড়ির ভোজ পংক্তিভোজ সম্পাদকীয়

একা কুম্ভ রক্ষা করে…

আগের কালে বিয়েবাড়ির ভাঁড়ার ঘরের এক জন জবরদস্ত ম্যানেজার থাকতেন। সাধারণত, মেসোমশাই, বয়সে অনেক বড় জামাইবাবু, সেজ কাকু, পাড়াতুতো দাদা